খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জাপার, সুস্থতা কামনা
Published: 29th, November 2025 GMT
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষকে বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
আরো পড়ুন:
নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কী আদৌ হবে, হাওলাদারের প্রশ্ন
বিবৃতিতে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, এক সময় আমরা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। বেগম খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে আমাদেরকে স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তার অসুস্থতার খবরে, আমরা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত, মর্মাহত। তাছাড়া এক সময় আমরা বেগম খালেদা জিয়া ও পল্লীবন্ধু এরশাদের নেতৃত্বে যৌথভাবে দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। আজ সে স্মৃতি আমাদের মনে পড়ছে।
জাপা নেতৃবৃন্দ বলেন, রাজনীতিতে প্রতিহিংসা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনীতি হলো মানবিকতা, ঐক্য উদারতা ও ভালোবাসার প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া আজীবন সেই ধরনের রাজনীতির চর্চা করেছেন। জাতীয় পার্টিও সে রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাছাড়া বেগম জিয়া শুধু বিএনপি চেয়ারপার্সনই নয়, তিনি বাংলাদেশের একাধিকবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের অগ্রসৈনিক। নিশ্চয় সরকার এবং তার দল বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করবার জন্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস, দেশের অগণিত মানুষের প্রার্থনায় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ বেগম খালেদা জিয়াকে আবারো পরিপূর্ণ সুস্থতা প্রদান করে দেশের মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ প্রদান করবেন।
ঢাকা/নঈমুদ্দীন/ফিরোজ
.উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ব গম খ ল দ র জন ত ব এনপ
এছাড়াও পড়ুন:
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫ হাজার
‘খাও, খাও বাবা; লক্ষ্মী বাবা খাও! বমির সমস্যা নাই বাবা। ডাক্তার বলছে, বমির ইনজেকশন দিয়ে দিছে।’ এভাবেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে আক্রান্ত ছেলেকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন মা অঞ্জু রানী মজুমদার। ছেলে অরিত্র মজুমদার (১৫) সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। জ্বরের তিন দিন পর টেস্ট করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
২২ নভেম্বর কথা হচ্ছিল অঞ্জু রানীর সঙ্গে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে গিয়ে। অঞ্জু রানী বলেন, ‘১০৩-১০৪ ডিগ্রি জ্বর ছিল। আমরা বুঝতেই পারতেছিলাম ডেঙ্গু। এখন শরীর খুব দুর্বল। প্ল্যাটিলেট ৩৫ হাজারে নেমে আসছে।’ ছেলে পানি চাওয়ায়, কথা ছেড়ে আবার ছেলেকে স্যালাইন খাওয়াতে মন দিলেন অঞ্জু রানী। দুই দিন পর কিছুটা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়েন তাঁরা।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত (২৭ নভেম্বর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ০ থেকে ১৫ বছরের ৫৪ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মোট মৃত্যুর ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। এই সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭৭। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানা যায়। ২৭ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৭ জন। এর মধ্যে ৯ ও ১৩ বছর বয়সী দুটি শিশু রয়েছে। এই সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৩৬৬ শিশু, যা মোট আক্রান্তের ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
গত বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৭৫, যার মধ্যে শিশু ছিল ৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক রোগী এমনকি শিশুদেরও যথেষ্ট বিলম্বে হাসপাতালে আনা হচ্ছে, একেবারে শেষ সময়ে। আমরা বলেছি, জেলা শহরগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু অনেকেই ১০-১২ ঘণ্টার পথ পার হয়ে ঢাকায় রোগী নিয়ে আসছে। বিলম্বে রোগী নিয়ে আসা মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ।’
শিশুদের রক্ষায় উদ্যোগ দরকারঅরিত্রের পাশের বেডেই শুয়ে ছিল মো. হোসাইন (১৪)। বরিশাল থেকে যাত্রাবাড়ীতে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এই শিশু। ছয় দিন ধরে সে হাসপাতালে ভর্তি। মা নাসিমা বেগম বললেন, ‘আজ আষ্ট দিন ধইরা এই রোগ। ডাক্তারে কইছে ডেঙ্গু। এইহানে ছয় দিন ধইরা ভর্তি। জ্বর, পাতলা পায়খানা, বমি আল্লায় দিলে এখন নাই। কিন্তু মুখে কিছু দেয় না। এই জন্য ডাক্তার ছাড়ে না।’
আকাশ আহমেদের (১২) ডেঙ্গু ধরা পড়ে নভেম্বরের ১০ তারিখে। এর আগেও জ্বর ছিল ৭ দিন। আকাশকে দেখাশোনা করছিলেন বড় বোন জায়নাফ ইসলাম। তিনি জানান, তাঁরা হাজারীবাগের বাসিন্দা। মা নেই তাঁদের। বাবা বাইরে থাকেন। আকাশের পড়াশোনা থেকে সবকিছু একাই করতে হয় জায়নাফকে। যেদিন আকাশকে হাসপাতালে ভর্তি করান, তার আগের রাতে আকাশের বমি অত্যধিক বেড়ে যায়। রাতে একা তিনি হাসপাতালে আসতে পারেননি। ভর্তি করানোর পর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কিছুই খেতে পারছিল না। নল দিয়ে খাওয়ানোর কথা চিন্তা করেন। পরে অবস্থা কিছুটা ভালো হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গুতে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাদের মধ্যে আছে যাদের বয়স সবচেয়ে কম আর যাদের বয়স সবচেয়ে বেশি। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে; ফলে তারা রোগ ঠেকাতে পারে না। আবার দরিদ্র শিশুদের পুষ্টিরও অভাব থাকে, সেটি আরও ঝুঁকি তৈরি করে। তা ছাড়া পূর্ণ বয়স্কদের মতো শিশুরা মশার কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না।
মুশতাক হোসেন বলেন, শিশুদের রক্ষায় সামাজিক ও সরকারি উদ্যোগ দরকার। উচ্চবিত্তরা সহজেই চিকিৎসকের কাছে নিতে পারলেও নিম্নবিত্তরা তা পারে না। তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার।
মুগদা হাসপাতালের চিত্ররাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ২৩ নভেম্বর গিয়ে দেখা যায়, মশারির ভেতর ছেলেকে নিয়ে বসে আছেন মরিয়ম বেগম। ছেলে মো. ফাহিম মুন্সি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এক দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মরিয়ম বেগম জানান, দুই দিন ধরে ছেলের জ্বর ১০৪ ডিগ্রির আশপাশে ঘুরছিল। টেস্ট করার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ছেলের শরীর দুর্বল, কিছু খেতে পারে না। মরিয়ম বেগমের স্বামী নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন। দুজনে পালাক্রমে ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে থাকছেন।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ রোগী তখনই হাসপাতালে আসে, যখন বাড়িতে আর নিজে টিকতে পারে না। তখন রোগীর অবস্থা ইতিমধ্যে সংকটাপন্ন থাকে। এটি করা উচিত নয়। প্রাথমিক অবস্থায়ই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মুগদা মেডিকেল কলেজের মৃত রোগীদের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত মাসে (অক্টোবর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের ২২ জনের মধ্যে ৩ জন ছিল শিশু।
সপ্তাহে অন্তত এক দিন ‘ক্লিনিং ডে’জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের মশা বেশি কামড়ায়। শিশুরা বেশি ছোটাছুটি করে। এতে তাদের ঘাম হয়। এ জন্য মশা বেশি আকৃষ্ট হয়। আবার তাদের ত্বকও নরম, ফলে মশা বেশি কামড়ায়।
কবিরুল বাশার বলেন, বাড়িতে এবং স্কুলে কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন নেই। খেয়াল রাখতে হবে মশার প্রজনন হওয়ার মতো কোনো পরিবেশ যাতে তৈরি না হয়। সে ক্ষেত্রে স্কুলে এবং বাড়িতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন ‘ক্লিনিং ডে’ করা যেতে পারে।
এই অধ্যাপক আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িতদের বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে এটি বাড়ছে।
কবিরুল বাশার বলেন, ‘আমদের মশা নিয়ন্ত্রণ প্রধানত কীটনাশকনির্ভর। মশা নিয়ন্ত্রণে দরকার বছরব্যাপী সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা।’