জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে গণভোট একটি; যদিও এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো বিতর্ক চলছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু দলের দাবি ছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর গণভোট হোক। জামায়াতে ইসলামী বলেছিল, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। সরকার দুই পক্ষের মধ্যে আপসরফা হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং গত সপ্তাহে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারিও করেছে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোটে একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’; (হ্যাঁ/না):

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

এখানে প্রশ্ন চারটি। উত্তর একটি। আপনি সমর্থন করলে চারটিকেই করতে হবে। আর সমর্থন না করলে চারটির বিষয়েই ‘না’ ভোট দিতে হবে। এই চার প্রশ্নের মধ্যে স্ববিরোধিতাও আছে। শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যদি ওপরে বর্ণিত প্রথম তিন অনুচ্ছেদ সাংঘর্ষিক হয়, তখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুনগণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস করলে কী হবে, ‘না’ পাস করলে কী হবে১৯ নভেম্বর ২০২৫

বিএনপির বক্তব্য হলো, জুলাই সনদে বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলের আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্টের উল্লেখ ছিল। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সাংবিধানিক আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে সেই আপত্তির কথা নেই। ফলে এর দায় তারা নেবে না। দায় অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে।

জুলাই সনদ সইয়ের পরও যে সাংবিধানিক আদেশ ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতের বিস্তর ফারাক আছে, সেটা স্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী দলের নেতারা গণভোটকে সফল করতে প্রচার চালাচ্ছে। তারা মনে করেন, গণভোটের সাফল্যের ওপরই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। কিন্তু বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলো তা মনে করে না।

২৭ নভেম্বর ডেইলি স্টার-এর শিরোনাম ছিল ‘পোলস স্ট্রাডিজ: রেফারেন্ডাম নট বিএনপি’স মাইন্ড’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘নির্বাচনী কৌশল : বিএনপির মনে রেফারেন্ডাম নেই’। প্রতিবেদনের মোদ্দাকথা হলো, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট বিএনপির অগ্রাধিকার তালিকায় নিচের দিকে রয়েছে এবং দলটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনোটির পক্ষে প্রচারে নামার পরিকল্পনাও করছে না।

বিএনপি যদি এ বিষয়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ থাকে, গণভোটের ফলাফলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা কাউকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও বলবেন না, ‘না’ ভোট দিতেও বলবেন না। ফলে অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালট নিতে আগ্রহ দেখাতে না–ও পারেন। তাঁরা সংসদ নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।  

আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা গণভোটের পক্ষে থাকবেন, এটা ভাবার কারণ নেই।  

এ পটভূমিতে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অনুসারী সব দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও খুব আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হলে ভোটার উপস্থিতি আরও কম হতো। এখন ভোটার উপস্থিতি বাড়লেও তারা সবাই গণভোটে অংশ নেবেন—এ নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির মনে গণভোট নেই। কেবল জামায়াত, এনসিপি ও তাদের সহযোগীরাই চাইলেই ভোটারদের গণভোটের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটির চরিত্র মোটামুটি এক। সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতায় আসা দুই সামরিক শাসকই নিজেদের শাসনকে বৈধতা দিতে গণভোটের আয়োজন করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে আর এরশাদ ১৯৮৫ সালে। এই দুটি গণভোটে খুব কমসংখ্যক লোক উপস্থিত থাকলেও দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ ও ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথমটিতে ‘হ্যাঁ’ পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও দ্বিতীয়টিতে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

আরও পড়ুনভোটের আগে যে ‘বিজয়’ দরকার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ১১ নভেম্বর ২০২৫

দুটি গণভোটই করা হয়েছিল প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে, প্রচারও চালানো হয়েছিল তাদের মাধ্যমে। ১৯৭৭ সালে প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জিয়াউদ্দিন চৌধুরী গণভোটের আজগুবি চিত্র তুলে ধরে লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের অতি উৎসাহী বুদ্ধিদাতা ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে হোক, আর যে কারণেই হোক, গণভোটের ঘোষিত ফলাফলে এই ভোটার উপস্থিতি ও “হ্যাঁ” ভোটের অবিশ্বাস্য উচ্চ হার দেশে-বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।’ (প্রথম আলো, ৬ জানুয়ারি ২০১৯) জিয়াউদ্দিন চৌধুরী প্রথম গণভোটের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় গণভোট দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। এরশাদ তাঁকে দেশে ফিরতে দেননি। দ্বিতীয় গণভোটও ছিল প্রহসন।

তৃতীয় গণভোট হয় ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি–শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী–শাসিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার আইন পাস হওয়ার পর। এই গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।

আরও পড়ুনযাঁরা গণভোট দেবেন তাঁরা গণভোট নিয়ে কতটা জানেন১০ অক্টোবর ২০২৫

এই গণভোটে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও এটা ছিল স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। জাতীয় পার্টি সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে মেনে নেয়। যদি ধরে নিই তাদের সমর্থকেরা ‘না’ ভোট দিয়েছেন, তাহলেও এবারের গণভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে বৈকি।

একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ভোটারদের আগ্রহ থাকবে সংসদের প্রতি। প্রার্থীরাও বিজয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে চাইবেন। সেখানে গণভোটের কথা ভোটারদের মনে কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বিএনপি যদি এ বিষয়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ থাকে, গণভোটের ফলাফলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা কাউকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও বলবেন না, ‘না’ ভোট দিতেও বলবেন না। ফলে অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালট নিতে আগ্রহ দেখাতে না–ও পারেন। তাঁরা সংসদ নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।  

কত শতাংশ ভোটার উপস্থিত থাকলে গণভোট বৈধতা পাবে, তা নির্দিষ্ট করা নেই। ‘না’–এর চেয়ে ‘হ্যাঁ’ বেশি পেলেই গণভোট আইনি বৈধতা পাবে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের সমর্থন না থাকলে আইনি পরীক্ষায় উতরে গেলেও নৈতিকতার প্রশ্ন থেকেই যাবে।

সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি

* মতামত লেখকের নিজস্ব

[২৯ নভেম্বর ২০২৫ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ‘গণভোটে বিএনপির মন নেই, ভোটারদের থাকবে?’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ভ ট দ ত ও বলব ন ন জ ল ই জ ত য় সনদ ভ ট র উপস থ ত র জন ত ক দল জ ল ই সনদ ই গণভ ট র গণভ ট গণভ ট হ ব এনপ র গণভ ট র বর ণ ত প রথম সরক র দশম ক

এছাড়াও পড়ুন:

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ১২২ দেশে এগিয়ে বাংলাদেশ, পিছিয়ে ১০৪ দেশে

বিশ্বের ২২৬ দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য করে বাংলাদেশ; কিন্তু এ বাণিজ্য সব মহাদেশে সমান নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় রপ্তানিতে সাফল্যের ওপর ভর করে বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্যে এগিয়ে থাকলেও এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশ এখনো বাণিজ্যঘাটতির দেশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১২২ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তবে এ সাফল্য ঢাকা পড়ে গেছে ১০৪ দেশের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতিতে। কারণ, ঘাটতি এত বেশি যে ১২২ দেশে এগিয়ে থেকেও বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যঘাটতি বেশি।

এনবিআরের হিসাবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০১ দেশে ৪ হাজার ৬৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে বিশ্বের ২০৬ দেশ থেকে আমদানি করেছে ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৭ কোটি ডলারের। আমদানি–রপ্তানি মিলিয়ে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ হাজার ৪০২ কোটি ডলার।

সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে
বিশ্বের বৃহৎ ভোক্তার বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। গত অর্থবছরে দেশটিতে ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তার বিপরীতে আমদানি করেছে ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত বাণিজ্য ৬২৬ কোটি ডলারে, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি।

চার দশক আগে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে কোটাসুবিধা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি এগিয়েছে দেশটিতে। শুধু এগিয়ে নয়, একক বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। পাল্টা শুল্ক আরোপের পরও এখনো দেশটিতে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর আমেরিকার কানাডা, মেক্সিকো, পানামার মতো দেশগুলোয় বাংলাদেশের আমদানির তুলনায় রপ্তানি বেশি। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের ২৫টি দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৬৭ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে আমদানি করেছে ৩৪৮ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে ৭১৯ কোটি ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাংলাদেশের।

পোশাকে ভর করে এগিয়ে ইউরোপেও
ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যেও ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব দেশ থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানি কম, রপ্তানি বেশি। বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। মূলত এই একটি পণ্য দিয়েই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

গত অর্থবছর ইউরোপ মহাদেশের ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বাংলাদেশ দ২ হাজার ৬৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে এসব দেশ থেকে আমদানি হয়েছে ৫১০ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে এই মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত রয়েছে ২ হাজার ১৬৬ কোটি ডলার।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির সঙ্গে বাণিজ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছর দেশটিতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৫৩২ কোটি ডলারের পণ্য। আর আমদানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের। দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্তের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার। জার্মানি ছাড়াও যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, পোলান্ড, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, বেলজিয়ামের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

বড় ঘাটতি চীন–ভারতে
এশিয়া মহাদেশে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় ঘাটতি চীনের সঙ্গে। দেশটি থেকে গত অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারের। এর বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৭৪ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি ১ হাজার ৯৮৭ কোটি ডলারের।

চীনের পরেই বড় ঘাটতি ভারতের সঙ্গে। যদিও প্রতিবেশী দেশটিতে রপ্তানি বাড়তে থাকায় ঘাটতি কমছে। এরপরও গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ৯৬৮ কোটি ডলার পণ্য। রপ্তানি হয়েছে ১৮২ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে বছর শেষে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি ৭৮৬ কোটি ডলারের।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন–ভারত থেকে আমদানি বেশি হলেও তা আবার ইউরোপ–আমেরিকায় রপ্তানিতে ভূমিকা রাখছে। কারণ, এই দুই দেশ থেকে বাংলাদেশ রপ্তানির কাঁচামাল আমদানি করে বেশি, যা দিয়ে ইউরোপ–আমেরিকার দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ৫৪ শতাংশই ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। বাকি ৪৬ শতাংশ ছিল বাণিজিক পণ্য। একইভাবে ভারত থেকে গত অর্থবছরে আমদানি হওয়া পণ্যের ৩১ শতাংশই ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। বাংলাদেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বড় উৎস এই দেশ দুটি। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে কম সময়ে ও কম খরচে পণ্য আমদানি করা যায়। আবার রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ছাড়াও বাণিজ্যিক পণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্যের বড় উৎস চীন। দুই দেশ থেকে কম খরচে পণ্য আমদানি করা যায় বলে দেশের ভোক্তারাও সুফল পাচ্ছেন।

চীন–ভারতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও আমাদের আমদানি বেশি, রপ্তানি কম। সবমিলিয়ে এশিয়া মহাদেশের ৫১টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ হয়েছে এই মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে কোনো দেশের সঙ্গে ঘাটতি থাকবে, কোনো দেশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে মোট বৈদেশিক বাণিজ্য যাতে উদ্বৃত্ত থাকে, সেই চেষ্টা থাকতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

ক্ষুদ্র বাজার, তবু ঘাটতি
দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বেশ পিছিয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেশি, রপ্তানি কম। এই তিন দেশ থেকে মূলত সয়াবিন তেল, সয়াবিন বীজ, গমসহ কৃষিপণ্য আমদানি করা হয়। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের দেশগুলো থেকে ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ৬০ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩২৯ কোটি ডলারে।

আফ্রিকার দেশগুলোতেও বাংলাদেশের রপ্তানি কম, আমদানি বেশি। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের দেশগুলো থেকে ২৮১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ৪৪ কোটি ডলার। তাতে অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৩৭ কোটি ডলারে।

একইভাবে ওশেনিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে গত অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ১০৩ কোটি ডলারের পণ্য, আমদানি হয়েছে ১৮৫ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে বাণিজ্যঘাটতি ৮৩ কোটি ডলারের।

 নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল শিল্প গড়ে উঠবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ঘটবে। তাতে রপ্তানি বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি কমানো সম্ভব।
আমিরুল হক, এমডি, সিকম গ্রুপ

আমদানি কেন বেশি, রপ্তানি কেন কম
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পের কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত পণ্যে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা বেশি। আমদানি প্রতিস্থাপক কারখানা গুটিকয় পণ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভরতাও কমছে না। আবার রপ্তানির ঝুড়িতে পণ্যের সংখ্যাও কম। প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য রপ্তানিতে অগ্রগতি নেই। যেমন গত অর্থবছরে রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই বা ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ডলার ছিল তৈরি পোশাক। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের হিস্যা মোট রপ্তানির ২ শতাংশের কাছাকাছি বা ১১৩ কোটি ডলারের। আর কোনো খাতের রপ্তানি আয় বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেনি।

আমদানি বেশি হওয়ায় বাংলাদেশমুখী পণ্যে পরিবহনভাড়া তুলনামূলক বেশি, যা মূলত পরিশোধ করে আমদানিকারকেরা। কিন্তু রপ্তানি কম থাকায় রপ্তানিতে পরিবহনভাড়া কম, যা মূলত পরিশোধ করেন বিদেশি ক্রেতারা।

ঘাটতি কমাতে যা দরকার
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে কোনো দেশের সঙ্গে ঘাটতি থাকবে, কোনো দেশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে মোট বৈদেশিক বাণিজ্য যাতে উদ্বৃত্ত থাকে, সেই চেষ্টা থাকতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও যোগাযোগ—এই তিনের সংশ্লেষ ঘটিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাতে রপ্তানি বাড়তে পারে। মানবতন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের বৈচিত্র যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বহুমুখী পণ্যের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ দরকার।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ানের দেশগুলো থেকে আমাদের আমদানি ৬০ শতাংশের বেশি। কিন্তু রপ্তানি ১২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব দেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে। তাই দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে নজর দিতে হবে। তাহলে বৈদেশিক বাণিজ্যে আমরা উদ্বৃত্ত অবস্থায় থাকব।’

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্যঘাটতি কমাতে দুটি বিষয় জরুরি। এক, সরকারি বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাণিজ্যে সমঝোতার দক্ষতা। যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের আমদানি বেশি তাদের বলতে হবে, তুমি কী কিনবে? যেমন ভারতের সঙ্গে আমাদের শুল্ক–অশুল্ক বাধা অনেক। ভিসাও পাওয়া যায় না। তাহলে রপ্তানি বাড়বে কীভাবে? দুই, সহায়তা নয়, একজন উদ্যোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। যেমন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল শিল্প গড়ে উঠবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ঘটবে। তাতে রপ্তানি বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি কমানো সম্ভব।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ