ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গতকাল শুক্রবার তাঁর প্রভাবশালী চিফ অব স্টাফ ও শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী আন্দ্রি ইয়ারমাককে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে গোয়েন্দারা তাঁর বাড়িতে অভিযান চালানোর পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

ইয়ারমাককে এমন সময় অপসারণ করা হলো, যখন ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে ইউক্রেনের আশঙ্কা, এটি বাস্তবায়িত হলে কিয়েভের তরফে রাশিয়াকে বড় ছাড় দিতে হতে পারে। যুদ্ধ বন্ধের প্রয়াসের মধ্যেও রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে ইয়ারমাকের অপসারণ জেলেনস্কির জন্য একটি গুরুতর ধাক্কা। যুদ্ধের পুরো সময় ইয়ারমাক অবিচলভাবে জেলেনস্কির পাশে ছিলেন। প্রেসিডেন্টের প্রায় সব দাপ্তরিক ছবিতে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়।

এ বিষয়ে অবগত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনায় ইউক্রেনের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ৫৪ বছর বয়সী ইয়ারমাকের। কিন্তু এখন সে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।

ইয়ারমাক একটি কৌশলগত জ্বালানি খাতে ১০ কোটি ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। চলতি মাসের শুরুর দিকে তদন্তকারীরা এ তথ্য উন্মোচন করেছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলেছেন, ইয়ারমাকের পরিবর্তে ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি রুস্তেম উমেরভ আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন।

বিতর্কিত চিফ অব স্টাফ ইয়ারমাককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিরোধী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ছিলেন জেলেনস্কি। এরপরও গত সপ্তাহে তিনি ইয়ারমাককে ইউক্রেনের শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মনোনীত করেন।

আরও পড়ুনইইউ অংশীদারদের অগ্রাহ্য করে আবারও মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বসলেন অরবান১১ ঘণ্টা আগে

তবে গতকাল জেলেনস্কি একটি ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে। কার্যালয়ের প্রধান আন্দ্রি ইয়ারমাক পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে। কার্যালয়ের প্রধান আন্দ্রি ইয়ারমাক পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। -ভলোদিমির জেলেনস্কি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট

এ ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই জেলেনস্কি ইয়ারমাককে ‘বরখাস্ত করার’ একটি অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন।

গতকাল সকালে জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা (এনএবিইউ) এবং বিশেষায়িত দুর্নীতিবিরোধী প্রসিকিউটর অফিস (এসপিও) জানায়, তারা একটি তদন্তের অংশ হিসেবে ইয়ারমাকের বাসায় অভিযান চালিয়েছে। তবে তারা কোন অভিযোগের তদন্ত করছে, তা জানায়নি। ইয়ারমাক বলেছেন, তিনি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে তদন্তে পুরোপুরি সহযোগিতা করছেন।

আরও পড়ুনখারাপ চুক্তি, নয়তো আরও যুদ্ধ—মহাসংকটে জেলেনস্কি১৪ ঘণ্টা আগে

ইয়ারমাক একটি কৌশলগত জ্বালানি খাতে ১০ কোটি ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। চলতি মাসের শুরুর দিকে তদন্তকারীরা এ তথ্য উন্মোচন করেন।

রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা চালাচ্ছে। এ কারণে অনেক এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়ারমাকের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

জেলেনস্কি বলেছেন, আজ শনিবার নতুন চিফ অব স্টাফ নিয়োগের বিষয়ে তিনি আলোচনা করবেন। এই কেলেঙ্কারির মুখে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুনযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানাল ইউক্রেন, ক্রেমলিন কী বলছে২৬ নভেম্বর ২০২৫.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ইউক র ন র প র স ড ন ট চ ফ অব স ট ফ বল ছ ন তদন ত

এছাড়াও পড়ুন:

রাষ্ট্র সংস্কার কি সরকারের কাছে শুধুই ফাঁকা বুলি, প্রশ্ন টিআইবির

‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন করায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি কি না, এ প্রশ্নও তুলেছে টিআইবি।

আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত দুদকের উত্তরণের লক্ষ‍্যে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সুপারিশ বাদ দেওয়া শুধু হতাশাজনক নয়, সরকারের অভ্যন্তরে প্রায় সব ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী মহলের ষড়যন্ত্রের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্টের জিম্মিদশারও পরিচায়ক।

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতির পরও চূড়ান্ত অধ্যাদেশে এই সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের অনাগ্রহের ইঙ্গিত বলে মনে করে টিআইবি।

দুদককে প্রকৃত অর্থে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এই কৌশলগত সুপারিশটি অনুধাবনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বলে উল্লেখ করে টিআইবি আরও বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের জন্য এটি স্ববিরোধী ও সংস্কারপরিপন্থী নজির।

ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ও ১১টি সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা দুদককে জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলসহ দেশবাসীকে কি এই বার্তা দিতে চাইছেন যে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি—এ প্রশ্নও বিবৃতিতে তুলেছে টিআইবি।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা, অংশীজনদের মতামত, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় দুদক যাতে ক্ষমতাসীনদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে চলমান না থাকে, সে লক্ষ‍্যে দুদক সংস্কার কমিশন ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে দুদক যেভাবে জন–আস্থার সংকটে ভুগছে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রীড়নক হিসেবে ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা আর প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রস্তাবটি করা হয়েছিল।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে অন্তত সাতজন উপদেষ্টা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাঁরা জানেন যে এই প্রস্তাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। জুলাই সনদ লঙ্ঘনের এরূপ উদাহরণ সৃষ্টি করার আগে সরকার কেন ভাবছে না যে এর মাধ‍্যমে রাজনৈতিক দলকে তারা নিজেরাই জুলাই সনদ লঙ্ঘনে উৎসাহিত করছে? তাহলে কেন এত রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ? দুর্নীতির কার্যকর নিয়ন্ত্রণের উপায় রুদ্ধ করে কীসের রাষ্ট্র সংস্কার?’

অধ‍্যাদেশটির যে খসড়াটি টিআইবির দেখার সুযোগ হয়েছিল, তা অনেকাংশে বিদ্যমান আইনের তুলনায় উন্নত মানের হওয়ায় টিআইবি সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যানুযায়ী, চূড়ান্ত অধ্যাদেশে উল্লিখিত বিষয়টির পাশাপাশি আরও কিছু ঐকমত্য-অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের অভ্যন্তরে স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতি-সহায়ক ও সংস্কার-পরিপন্থী অবস্থান ছাড়া আর কিছু হতে পারে না বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • রাষ্ট্র সংস্কার কি সরকারের কাছে শুধুই ফাঁকা বুলি, প্রশ্ন টিআইবির