স্বাস্থ্যে প্রকল্প থেকে সরছে সরকার: ১৭ মাস বেতনহীন, চাকরি হারানোর শঙ্কা
Published: 29th, November 2025 GMT
প্রকল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। দুই হাজারের বেশি কর্মী ১৭ মাস বেতন–ভাতা পাচ্ছেন না। অনেকের চাকরিচ্যুতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এতে কিছু সেবা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৯৮ সালে সরকার স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (সেক্টর প্রোগ্রাম নামে পরিচিত) শুরু করেছিল। এ পর্যন্ত সরকারের চারটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। সর্বশেষ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। পরের মাস জুলাই থেকে পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল।
১৯৯৮ সালে সরকার ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ শুরু করেছিল। ৩০টির বেশি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। গত বছরের ৫ আগস্টের পর এ কর্মসূচি বন্ধ। অস্থায়ীভাবে থাকা অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাদ পড়ছেন। যাঁরা আছেন, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে অনেকের বেতন-ভাতাও বন্ধ।৩০টির বেশি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। অপারেশন প্ল্যানগুলো ছিল এক একটি পৃথক প্রকল্প। এসব প্রকল্পে বিভিন্ন দাতা সংস্থা তাদের সামর্থ্য ও স্বার্থ অনুযায়ী অর্থসহায়তা দিত। এসব প্রকল্পে স্বাস্থ্য বিভাগের নিজস্ব জনবল ছিল। পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী জনবলও ছিল।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় হঠাৎই অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। এ কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন অস্থায়ীভাবে থাকা অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাদ পড়ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে অনেকের বেতন–ভাতা বন্ধ। অন্যদিকে দাতা সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড অর্থসহায়তা কমিয়ে দেওয়ার কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে যুক্ত জনবলের একটি অংশ ৩১ ডিসেম্বরের পর আর চাকরিতে থাকতে পারবে না।
তবে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম চেষ্টা করছেন সেক্টর প্রোগ্রামে যাঁরা অস্থায়ী নিয়োগে চাকরি করতেন, তাঁরা যেন স্বাস্থ্য বিভাগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে কাজ করার সুযোগ পান।
গত ৯ অক্টোবর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, সেক্টর কর্মসূচি শেষে স্বাস্থ্য বিভাগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ডিপিপির (ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান বা বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা) প্রস্তাব করা হয়েছে। সেক্টর কর্মসূচিতে কাজ করা জনবলকে ডিপিপিতে ‘ক্যারিড ওভার’ করা হবে।
এমন পদক্ষেপ আগেও নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে পর্যায়ভিত্তিক নিয়োগ করা জনবল পরবর্তী প্রকল্পে অব্যাহত রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ, এইচআইভি-এইডস, পুষ্টিসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে শিথিলতা এসেছে। এতে রোগ বেড়ে যেতে পারে—এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।কেন সেক্টর কর্মসূচি বাদএকসময় স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচি ও এর অপারেশন প্ল্যানগুলোতে দাতা সংস্থার অর্থায়ন বেশি ছিল। এখন তা কমে এসেছে। স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচিতে এখন বেশির ভাগ অর্থায়ন সরকারের। তাই প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচি থেকে সরে এসে সব কর্মকাণ্ড স্বাস্থ্যের মূল কাঠামোতে যুক্ত করা প্রয়োজন মনে করছে সরকার।
৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সেক্টর কর্মসূচির দুর্বলতা ও এই কর্মসূচি থেকে সরে আসার যুক্তি তুলে ধরা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণীতে অন্তত সাতটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ আছে। এক, রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কাজের ডুপ্লিকেশন ও ওভারল্যাপিং হয়। দুই, স্থায়ী কাজ বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে উন্নয়ন বাজেটের কারণে। তিন, ২৬ বছর চলার পরও স্বাস্থ্য খাতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। চার.
বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ, ইউএসএআইডি, জাইকা, ডিফিডসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেক্টর কর্মসূচিতে যুক্ত ছিল। বেশ কিছু দেশের দূতাবাস ছোট–বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। এ ছাড়া দেশের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় সেক্টর কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত ছিল। এদের কারও সঙ্গে আলোচনা না করে সরকার কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ২৬ নভেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এতকাল দাতাদের অর্থে, পরামর্শে চলেছে। এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দাতা সংস্থা, এমনকি দেশের জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়েরও প্রয়োজন বোধ করল না। এটা দুঃখজনক।’
ঢাকার আজিমপুরের এই শিশু বিকাশ কেন্দ্র আগে থেকে ধুঁকছিল। এখন টিকে থাকা নিয়েই সংশয়উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
চাকরিতে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন চাইলেন বাদ পড়া এসআই ও সার্জেন্ট প্রার্থীরা
২০০৭ সালে ‘দলীয় বিবেচনায়’নি য়োগ বাতিল হওয়া ৭৫৭ জন উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্ট প্রার্থীরা চাকরিতে যোগদানের জন্য প্রধান উপদেষ্টার চূড়ান্ত অনুমোদন চেয়েছেন।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এ দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিয়োগ বাতিল হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আরও বলেন, ‘২০০৬ সালে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ৫৩৬ জন এসআই ও ২২১ জন সার্জেন্টকে কোনো প্রজ্ঞাপন ছাড়াই কেবল একটি সাদা কাগজে নোটের মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ ও ডিআইজি বেনজীর আহমেদের স্বাক্ষরে দলীয় ট্যাগের অভিযোগ তুলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল ঘোষণা করা হয়।’
জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তাঁরা ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে নানা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। ওই সময় আইনের দ্বারস্থ হয়েও তাঁরা সুবিচার পাননি।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্বহালের বিষয়ে ৩৩০ জনের তালিকাসহ আবেদন করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন ও আইন এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত ৭ মে বাতিল আদেশটি অকার্যকর ঘোষণা করে নিয়োগ পুনর্বহালের সুপারিশ করে। এরপর ওই কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি বিষয়টি যাচাই করে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দেয় গত ২৩ এপ্রিল। এসব সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীদের বয়স, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশিক্ষণকাল প্রমার্জনার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীরা বলেন, এত বছর ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কেউ রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পাঠাও চালাচ্ছেন, আবার অনেকে মা–বাবার চিকিৎসা খরচ বহন করতে পারছেন না। কিছু প্রার্থী বেসরকারি চাকরি থেকেও ছিটকে পড়েছেন।
৭৫৭ জন নিয়োগবঞ্চিত এসআই ও সার্জেন্টকে বয়স ও জ্যেষ্ঠতা প্রমার্জন করে দ্রুত চাকরিতে যোগদানের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানান নিয়োগ বাতিল হওয়া প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে ৩৩০ জন প্রার্থীর ফাইল প্রস্তুত করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
আরও পড়ুনপুলিশের চাকরি চান ২০০৭ সালে ‘দলীয় বিবেচনায়’ বাদ পড়া ৭৫৭ এসআই ও সার্জেন্ট প্রার্থী২৩ আগস্ট ২০২৪