দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ১২২ দেশে এগিয়ে বাংলাদেশ, পিছিয়ে ১০৪ দেশে
Published: 29th, November 2025 GMT
বিশ্বের ২২৬ দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য করে বাংলাদেশ; কিন্তু এ বাণিজ্য সব মহাদেশে সমান নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় রপ্তানিতে সাফল্যের ওপর ভর করে বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্যে এগিয়ে থাকলেও এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশ এখনো বাণিজ্যঘাটতির দেশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১২২ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তবে এ সাফল্য ঢাকা পড়ে গেছে ১০৪ দেশের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতিতে। কারণ, ঘাটতি এত বেশি যে ১২২ দেশে এগিয়ে থেকেও বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যঘাটতি বেশি।
এনবিআরের হিসাবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০১ দেশে ৪ হাজার ৬৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে বিশ্বের ২০৬ দেশ থেকে আমদানি করেছে ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৭ কোটি ডলারের। আমদানি–রপ্তানি মিলিয়ে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ হাজার ৪০২ কোটি ডলার।
সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে
বিশ্বের বৃহৎ ভোক্তার বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। গত অর্থবছরে দেশটিতে ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তার বিপরীতে আমদানি করেছে ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত বাণিজ্য ৬২৬ কোটি ডলারে, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি।
চার দশক আগে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে কোটাসুবিধা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি এগিয়েছে দেশটিতে। শুধু এগিয়ে নয়, একক বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। পাল্টা শুল্ক আরোপের পরও এখনো দেশটিতে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর আমেরিকার কানাডা, মেক্সিকো, পানামার মতো দেশগুলোয় বাংলাদেশের আমদানির তুলনায় রপ্তানি বেশি। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের ২৫টি দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৬৭ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে আমদানি করেছে ৩৪৮ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে ৭১৯ কোটি ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাংলাদেশের।
পোশাকে ভর করে এগিয়ে ইউরোপেও
ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যেও ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব দেশ থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানি কম, রপ্তানি বেশি। বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। মূলত এই একটি পণ্য দিয়েই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
গত অর্থবছর ইউরোপ মহাদেশের ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বাংলাদেশ দ২ হাজার ৬৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে এসব দেশ থেকে আমদানি হয়েছে ৫১০ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে এই মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত রয়েছে ২ হাজার ১৬৬ কোটি ডলার।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির সঙ্গে বাণিজ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছর দেশটিতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৫৩২ কোটি ডলারের পণ্য। আর আমদানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের। দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্তের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার। জার্মানি ছাড়াও যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, পোলান্ড, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, বেলজিয়ামের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
বড় ঘাটতি চীন–ভারতে
এশিয়া মহাদেশে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় ঘাটতি চীনের সঙ্গে। দেশটি থেকে গত অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারের। এর বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৭৪ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি ১ হাজার ৯৮৭ কোটি ডলারের।
চীনের পরেই বড় ঘাটতি ভারতের সঙ্গে। যদিও প্রতিবেশী দেশটিতে রপ্তানি বাড়তে থাকায় ঘাটতি কমছে। এরপরও গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ৯৬৮ কোটি ডলার পণ্য। রপ্তানি হয়েছে ১৮২ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে বছর শেষে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি ৭৮৬ কোটি ডলারের।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন–ভারত থেকে আমদানি বেশি হলেও তা আবার ইউরোপ–আমেরিকায় রপ্তানিতে ভূমিকা রাখছে। কারণ, এই দুই দেশ থেকে বাংলাদেশ রপ্তানির কাঁচামাল আমদানি করে বেশি, যা দিয়ে ইউরোপ–আমেরিকার দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ৫৪ শতাংশই ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। বাকি ৪৬ শতাংশ ছিল বাণিজিক পণ্য। একইভাবে ভারত থেকে গত অর্থবছরে আমদানি হওয়া পণ্যের ৩১ শতাংশই ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। বাংলাদেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বড় উৎস এই দেশ দুটি। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে কম সময়ে ও কম খরচে পণ্য আমদানি করা যায়। আবার রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ছাড়াও বাণিজ্যিক পণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্যের বড় উৎস চীন। দুই দেশ থেকে কম খরচে পণ্য আমদানি করা যায় বলে দেশের ভোক্তারাও সুফল পাচ্ছেন।
চীন–ভারতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও আমাদের আমদানি বেশি, রপ্তানি কম। সবমিলিয়ে এশিয়া মহাদেশের ৫১টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ হয়েছে এই মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে কোনো দেশের সঙ্গে ঘাটতি থাকবে, কোনো দেশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে মোট বৈদেশিক বাণিজ্য যাতে উদ্বৃত্ত থাকে, সেই চেষ্টা থাকতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডিক্ষুদ্র বাজার, তবু ঘাটতি
দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বেশ পিছিয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেশি, রপ্তানি কম। এই তিন দেশ থেকে মূলত সয়াবিন তেল, সয়াবিন বীজ, গমসহ কৃষিপণ্য আমদানি করা হয়। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের দেশগুলো থেকে ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ৬০ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩২৯ কোটি ডলারে।
আফ্রিকার দেশগুলোতেও বাংলাদেশের রপ্তানি কম, আমদানি বেশি। গত অর্থবছরে এই মহাদেশের দেশগুলো থেকে ২৮১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ৪৪ কোটি ডলার। তাতে অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৩৭ কোটি ডলারে।
একইভাবে ওশেনিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে গত অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ১০৩ কোটি ডলারের পণ্য, আমদানি হয়েছে ১৮৫ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে বাণিজ্যঘাটতি ৮৩ কোটি ডলারের।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল শিল্প গড়ে উঠবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ঘটবে। তাতে রপ্তানি বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি কমানো সম্ভব।আমিরুল হক, এমডি, সিকম গ্রুপ
আমদানি কেন বেশি, রপ্তানি কেন কম
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পের কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত পণ্যে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা বেশি। আমদানি প্রতিস্থাপক কারখানা গুটিকয় পণ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভরতাও কমছে না। আবার রপ্তানির ঝুড়িতে পণ্যের সংখ্যাও কম। প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য রপ্তানিতে অগ্রগতি নেই। যেমন গত অর্থবছরে রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই বা ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ডলার ছিল তৈরি পোশাক। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের হিস্যা মোট রপ্তানির ২ শতাংশের কাছাকাছি বা ১১৩ কোটি ডলারের। আর কোনো খাতের রপ্তানি আয় বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেনি।
আমদানি বেশি হওয়ায় বাংলাদেশমুখী পণ্যে পরিবহনভাড়া তুলনামূলক বেশি, যা মূলত পরিশোধ করে আমদানিকারকেরা। কিন্তু রপ্তানি কম থাকায় রপ্তানিতে পরিবহনভাড়া কম, যা মূলত পরিশোধ করেন বিদেশি ক্রেতারা।
ঘাটতি কমাতে যা দরকার
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে কোনো দেশের সঙ্গে ঘাটতি থাকবে, কোনো দেশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে মোট বৈদেশিক বাণিজ্য যাতে উদ্বৃত্ত থাকে, সেই চেষ্টা থাকতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও যোগাযোগ—এই তিনের সংশ্লেষ ঘটিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাতে রপ্তানি বাড়তে পারে। মানবতন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের বৈচিত্র যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বহুমুখী পণ্যের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ দরকার।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ানের দেশগুলো থেকে আমাদের আমদানি ৬০ শতাংশের বেশি। কিন্তু রপ্তানি ১২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব দেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে। তাই দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে নজর দিতে হবে। তাহলে বৈদেশিক বাণিজ্যে আমরা উদ্বৃত্ত অবস্থায় থাকব।’
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্যঘাটতি কমাতে দুটি বিষয় জরুরি। এক, সরকারি বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাণিজ্যে সমঝোতার দক্ষতা। যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের আমদানি বেশি তাদের বলতে হবে, তুমি কী কিনবে? যেমন ভারতের সঙ্গে আমাদের শুল্ক–অশুল্ক বাধা অনেক। ভিসাও পাওয়া যায় না। তাহলে রপ্তানি বাড়বে কীভাবে? দুই, সহায়তা নয়, একজন উদ্যোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। যেমন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল শিল্প গড়ে উঠবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ঘটবে। তাতে রপ্তানি বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি কমানো সম্ভব।’
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: য ক তর ষ ট র উদ ব ত ত থ ক র আমদ ন র ইউর প পর ম ণ দ শট ত আম র ক আম দ র অবস থ
এছাড়াও পড়ুন:
বাংলাদেশ কীভাবে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকদের ‘কাঁদাচ্ছে’
ভারতের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম তলানিতে ঠেকেছে। তারপরও দেশটির পেঁয়াজ রপ্তানি স্থবির। সরকারি কর্মকর্তারা পেঁয়াজ রপ্তানির এই দুরবস্থা দেখে হতবাক হলেও তার পেছনের কার হচ্ছে কৃষিপণ্যটি উৎপাদনে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ভারতের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তান ও চীন থেকে পণ্যটি সংগ্রহ করা। এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে মূলত নয়াদিল্লি বারবার অস্থায়ীভাবে পেঁয়াজ রপ্তানির বন্ধ করার কারণে।
ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একসময় ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া পেঁয়াজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। তবে গত আট মাসে বাংলাদেশ ভারত থেকে খুবই সামান্য পরিমাণ পেঁয়াজ কিনেছে। যদিও ঢাকার বাজারে দাম ভারতের স্থানীয় বাজারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। অন্যদিকে সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে খুব কম পরিমাণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি করেছে।
এদিকে ভারতের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ বেআইনিভাবে রপ্তানি হচ্ছে। সেই বীজই ভারতের পেঁয়াজের ঐতিহ্যবাহী ক্রেতাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে, যা কিনা পণ্যটির বাণিজ্যে ভারতের বহুদিনের আধিপত্যকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হর্টিকালচার প্রোডিউস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এইচপিইএ) সাবেক প্রধান ও অভিজ্ঞ পেঁয়াজ রপ্তানিকারক অজিত শাহ বলেন, ‘আমরা আমাদের গুণমানের জন্য অতিরিক্ত দাম নিতে পারতাম। যখন আমরা দীর্ঘদিন বাজারে ছিলাম না, তখন আমাদের গ্রাহকেরা বিকল্প সরবরাহকারীর খুঁজে নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন তারা (ভারতীয় পেঁয়াজের ক্রেতা) আর গুণমান তুলনা করে না; বরং আমাদের প্রতিযোগীদের সঙ্গে দামের তুলনা করে।’
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তার আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ছয় মাসের জন্য এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ মাসের জন্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশের বাজারগুলোয় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়।
২০২০ সালে, ঘন ঘন পেঁয়াজ রপ্তানির নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে ভারতকে একটি কূটনৈতিক নোটও পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশের কৃষকদের সুরক্ষা ও স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ কিনেছিল বাংলাদেশ। ওই অর্থবছরে ভারত থেকে মোট পেঁয়াজ রপ্তানি হয়েছিল ১৭ লাখ ১৭ হাজার টন। তার মানে বাংলাদেশ একাই আমদানি করেছিল ৪২ শতাংশ পেঁয়াজ। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে মাসে ভারত থেকে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে বাংলাদেশ।
যদিও কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, ঢাকায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ কম। তবে রপ্তানিকারকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, রপ্তানির নীতি ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলেই (যা মূলত স্থানীয় বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত হয়) ভারতের পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অন্যত্র কেনাকাটা করতে বাধ্য হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বোর্ড অব ট্রেডের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য পাশা প্যাটেল বলেন, ‘আমরা কেবল আমাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক ক্রেতাকে হারাইনি, তারা ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজে স্বাবলম্বী হতেও শুরু করেছে।’
রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় পেঁয়াজ কিনছে না। সরকার যখন রপ্তানিকারকদের কাছে জানতে চায়, তখন তাঁরা বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আমদানি অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
এইচপিইএ সরকারকে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা ইয়েমেন ও ইরান থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে পেঁয়াজ কিনছে। এ ছাড়া স্থানীয় ফসল থেকেও তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে। এমনকি ফিলিপাইনসও চীন থেকে না পেলে তবেই ভারতীয় পেঁয়াজ কেনে।
২০২০-২১ অর্থবছরে ভারত সৌদি আরবে ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল, যা পরবর্তী বছরগুলোয় কমতে কমতে থাকে। চলতি অর্থবছর এখন পর্যন্ত মাত্র ২২৩ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করেছেন সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে ক্রমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। এ কারণে রপ্তানিকারকেরা হর্টিকালচার কমিশনারের কাছে প্রতিযোগী দেশগুলোয় পেঁয়াজের বীজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
এইচপিইএর সহসভাপতি বিকাশ সিং বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অন্য প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজ উৎপাদন করছে। এই প্রবণতা ভারতীয় কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বীজ চীন ও পাকিস্তানেও ভারতীয় পেঁয়াজের বড় ধরনের চাহিদা রয়েছে।