বাঙালি মুসলমান চিন্তার মেরুকরণ
Published: 29th, November 2025 GMT
কিস্তি: ১
কিস্তি: ২
কিস্তি: ৩
মোল্লা বনাম তরুণের এই লড়াইয়ে লেবাস একটা বড় ব্যাপার হয়ে উঠল। আধুনিকতার যে মেছাল কামাল পাশার হাত ধরে মুসলমান দুনিয়ায় এল, তার নিজস্ব অনুভব, রুচি ও রস, চলনবলন, ধাঁচ ও ঝোঁক, অত্যন্ত শরীরী আমলে ব্যক্তির বান্দাগঠনের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হবেই হবে। এরই এক নমুনা হয়ে দাঁড়াল দাড়ি কামানো প্রশ্ন। দাড়ি কামানোর চল ওসমানি সাম্রাজ্যে উনিশ শতকেই শুরু হয় তাঞ্জিমাত নামের সংস্কার তৎপরতার অধীনে। তুর্কিরা দাড়ি কামাতে কামাল আতাতুর্কের সংস্কারের অপেক্ষা করেনি। যে আনোয়ার পাশার অনুরাগী ছিলেন সেলবর্সী, তাঁরও গাল ছিল মসৃণ কামানো।
নজরুল ‘কামাল’ প্রবন্ধে আগেই লিখেছিলেন, ‘দাড়ি ইসলামের বিশেষ নয়, বরং ইসলামের বিশেষ তলোয়ার।’ রবীন্দ্রনাথের এক টিপ্পনীর বরাত দিয়ে ১৯২৫ সালে নজরুল ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় লিখলেন, ‘গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!’ তারপর যোগ করছেন, ‘যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!’ নজরুল যখন বলেছিলেন ইসলামের বিশেষ তলোয়ার, সে কথায় তলোয়ার ছিল রাজনীতির প্রতীক। অর্থাৎ উপনিবেশবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতীক। যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ঘটনা একটা আধুনিক রাজনৈতিক পরিসর গঠন করবে, সেখানে দাড়ি দিয়ে নিজের পরিচয়কে আলাদা করা অনাবশ্যক বলেই নজরুলের বিবেচনা। মোদ্দাকথা, অসহযোগ-খেলাফতের পরে যখন হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে, তখন নজরুলের গরজ ছিল চিহ্নতান্ত্রিক মেরুকরণকে নাকচ করা। তাই তিনি ১৯২৫ সালে লিখেছেন:
‘মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
এবার মোল্লাবিরোধীরা সদলবলে দাড়ি কামানোয় উদ্যোগী হলেন। ব্যাপারটা কেবল ব্যক্তির আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না, এটার আকিদাগত বিস্তরণও লাগবে—এই বিবেচনায় আবুল মনসুর আহমদ মাওলানা আযাদের বরাতে মাওলানা মলিহাবাদীকে সভাপতি করে এক সভা করলেন। মলিহাবাদী ছিলেন কিনা ‘সুরতি-সিরতি পাক্কা মুসলমান’। ফলে মনসুর বুঝলেন ‘মোল্লাবিরোধী জেহাদ’ তাঁকে দিয়েই ভালো চলবে। ‘মলিহাবাদী ফুটফুটে গৌরবর্ণ খুব–সুরত সুপুরুষ। মুখ ও বুকভরা লম্বা চাপদাড়ি। চোখ-মুখ হইতে প্রতিভা ও জ্ঞানের নূর ফাটিয়া পড়িতেছে।’
মোল্লা বনাম তরুণের এই লড়াইয়ে লেবাস একটা বড় ব্যাপার হয়ে উঠল। এরই এক নমুনা হয়ে দাঁড়াল দাড়ি কামানো প্রশ্ন। মলিহাবাদী তাঁর অভিভাষণে হাদিসের বরাত দিয়ে বলেন যে একালে দাড়িমোচ রাখা নয়; বরং মোড়ানটাই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। দাড়ি চেঁছে ফেলার এই হুজুক দেখে সেলবর্সীর আল মুসলিম পত্রিকা ফুঁসে উঠল।ওই সভায় মলিহাবাদী তাঁর অভিভাষণে হাদিসের বরাত দিয়ে বলেন যে একালে দাড়িমোচ রাখা নয়; বরং মোড়ানটাই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। প্রাচীন আরবেরা যেমন রোমানদের মতো সভ্যতার অনুসরণে দাড়ি ও চোগা অবলম্বন করেছিল, তেমনি একালের সভ্যদের পোশাকে-পাতি অনুসরণ করলেই ইসলামের সৌন্দর্য বিশ্ব বুঝতে পারবে। [আহমদ, আত্মকথা] যে মাওলানা আযাদের বরাতে আফগানিস্তান গিয়েছিলেন সেলবর্সী বলে রটনা আছে, তাঁরই রেফারেন্সে দাড়ির বিরুদ্ধবাদ পেয়ে গেলেন তরুণেরা।
দাড়ি চেঁছে ফেলার এই হুজুক দেখে সেলবর্সীর আল মুসলিম পত্রিকা ফুঁসে উঠল। লিখল, ‘মোল্লা-দলনকারী দাড়ি-বিদ্বেষী যে আগাছাগুলি মুসলমান সমাজে গজাইয়া উঠিয়াছে, এই ধর্ম্ম-দ্বেষী অকাল-কুষ্মাণ্ড দলকে আমরা জিজ্ঞাসা করি, তাঁহারা ইসলামী “দায়েরা”র (বেষ্টনীর) মধ্যে থাকিয়া এইরূপ দানবীয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতেছে, না দায়েরার বাহিরে থাকিয়া? ভেতরে থাকলে তাদের মুজতাহিদদের মৌলবি-আলেমদের সঙ্গে তর্ক করুক এসে’—আহ্বান জানাল সেলবর্সীর পত্রিকা। দাড়ি বাপ-দাদার উত্তরাধিকার এবং লিঙ্গচিহ্ন। ‘নর হইয়া যাহারা নারী মূর্ত্তি ধারণ করে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহারা…কাপুরুষ।’
মাওলানা আযাদের প্রতিও খড়্গহস্ত হলেন সেলবর্সী। সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিস্তারের যুগে কংগ্রেসি আযাদের প্রভাব তখন ক্রমহ্রাসমান। সেলবর্সী পত্রিকায় লিখলেন, আযাদ ‘কংগ্রেসের একজন চেলা।…কংগ্রেসের গুণকীর্তন করা, মুসলমানদিগকে কংগ্রেসের দলভুক্ত করিতে চেষ্টা পাওয়া, যেখানে হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষ উপস্থিত হয়, সে স্থলে সকল দোষ মুসলমানের ঘাড়ে ন্যস্ত করা, ইহাই তাঁহার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘একবার পেশাওরে গিয়া নিজের কেরদানী ফলাইতে চেষ্টা পাইয়াছিলেন, গবর্নমেন্ট তাঁহাকে সেখানে যাইতে দেন নাই; গেলে হয়তো একটা নূতন বিভ্রাট ঘটিত।’ মূলত কংগ্রেস, স্বরাজী ও জমীয়তে উলামা দলের মুসলমানদের বিরুদ্ধেই খর-জিভ হলেন সেলবর্সী। বিশ দশকের গোড়ায় যেখানে গান্ধীর কংগ্রেসের সঙ্গে খেলাফতপন্থী মুসলমানদের সহযোগিতা ছিল, সেখানে দশকের শেষে গিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক অনেকটা চুকে যাচ্ছে, আর নসিব ফিরছে স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলিম লীগের। অন্যদিকে নজরুল এই পরিস্থিতিতে না কংগ্রেস না মুসলিম লীগ—কোনোটাতেই বায়াত রাখেননি।
চিহ্নতন্ত্র ও অণু-শাসনমুসলমান সমাজের বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের নতুন শর্ত রচনা নিয়ে বিবেচনা করছিলেন। সেখানে চিহ্নকেন্দ্রিক মেরুকরণ ছিল একটা মস্ত প্রশ্ন। বাংলায় হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর সম্ভাবনা চিত্তরঞ্জন দাশ, এ কে ফজলুল হক প্রমুখের মধ্যে জাগরূক ছিল। মোল্লাপক্ষীয়রা ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভেদের প্রসঙ্গ যে একত্র করতেন, সেখানে তাঁদের প্রতীকী বলপ্রয়োগের মস্ত হাতিয়ার ছিল তাকফির করা। তাঁরা হিন্দুকে যেমন ‘কাফের’ বলতেন, তেমন ভিন্নমতের মুসলমান যুবকদেরও অকাতরে তাকফির করতেন। তাকফিরের এই খড়্গ সদাই ঝুলন্ত ছিল জনপরিসরে মতামতের বাহাসে। দাড়ি প্রশ্নে সেলবর্সীর পত্রিকায় যে প্রতিপক্ষকে ইসলামের দায়েরার বাহির বলে প্রশ্ন করার আভাস দেওয়া হয়েছে, সেটা নিছক কথার কথা ছিল না। সেটা মূলত চিহ্নতান্ত্রিক মেরুকরণের লড়াইয়ে তাকফির অস্ত্রেরই আভাস।
সস্ত্রীক আবুল হুসেন.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ল ন স লবর স স লবর স র ইসল ম র ম সলম ন র জন ত র বর ত ম নদ র নজর ল
এছাড়াও পড়ুন:
বাঙালি মুসলমান চিন্তার মেরুকরণ
কিস্তি: ১
কিস্তি: ২
কিস্তি: ৩
মোল্লা বনাম তরুণের এই লড়াইয়ে লেবাস একটা বড় ব্যাপার হয়ে উঠল। আধুনিকতার যে মেছাল কামাল পাশার হাত ধরে মুসলমান দুনিয়ায় এল, তার নিজস্ব অনুভব, রুচি ও রস, চলনবলন, ধাঁচ ও ঝোঁক, অত্যন্ত শরীরী আমলে ব্যক্তির বান্দাগঠনের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হবেই হবে। এরই এক নমুনা হয়ে দাঁড়াল দাড়ি কামানো প্রশ্ন। দাড়ি কামানোর চল ওসমানি সাম্রাজ্যে উনিশ শতকেই শুরু হয় তাঞ্জিমাত নামের সংস্কার তৎপরতার অধীনে। তুর্কিরা দাড়ি কামাতে কামাল আতাতুর্কের সংস্কারের অপেক্ষা করেনি। যে আনোয়ার পাশার অনুরাগী ছিলেন সেলবর্সী, তাঁরও গাল ছিল মসৃণ কামানো।
নজরুল ‘কামাল’ প্রবন্ধে আগেই লিখেছিলেন, ‘দাড়ি ইসলামের বিশেষ নয়, বরং ইসলামের বিশেষ তলোয়ার।’ রবীন্দ্রনাথের এক টিপ্পনীর বরাত দিয়ে ১৯২৫ সালে নজরুল ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় লিখলেন, ‘গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!’ তারপর যোগ করছেন, ‘যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!’ নজরুল যখন বলেছিলেন ইসলামের বিশেষ তলোয়ার, সে কথায় তলোয়ার ছিল রাজনীতির প্রতীক। অর্থাৎ উপনিবেশবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতীক। যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ঘটনা একটা আধুনিক রাজনৈতিক পরিসর গঠন করবে, সেখানে দাড়ি দিয়ে নিজের পরিচয়কে আলাদা করা অনাবশ্যক বলেই নজরুলের বিবেচনা। মোদ্দাকথা, অসহযোগ-খেলাফতের পরে যখন হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে, তখন নজরুলের গরজ ছিল চিহ্নতান্ত্রিক মেরুকরণকে নাকচ করা। তাই তিনি ১৯২৫ সালে লিখেছেন:
‘মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
এবার মোল্লাবিরোধীরা সদলবলে দাড়ি কামানোয় উদ্যোগী হলেন। ব্যাপারটা কেবল ব্যক্তির আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না, এটার আকিদাগত বিস্তরণও লাগবে—এই বিবেচনায় আবুল মনসুর আহমদ মাওলানা আযাদের বরাতে মাওলানা মলিহাবাদীকে সভাপতি করে এক সভা করলেন। মলিহাবাদী ছিলেন কিনা ‘সুরতি-সিরতি পাক্কা মুসলমান’। ফলে মনসুর বুঝলেন ‘মোল্লাবিরোধী জেহাদ’ তাঁকে দিয়েই ভালো চলবে। ‘মলিহাবাদী ফুটফুটে গৌরবর্ণ খুব–সুরত সুপুরুষ। মুখ ও বুকভরা লম্বা চাপদাড়ি। চোখ-মুখ হইতে প্রতিভা ও জ্ঞানের নূর ফাটিয়া পড়িতেছে।’
মোল্লা বনাম তরুণের এই লড়াইয়ে লেবাস একটা বড় ব্যাপার হয়ে উঠল। এরই এক নমুনা হয়ে দাঁড়াল দাড়ি কামানো প্রশ্ন। মলিহাবাদী তাঁর অভিভাষণে হাদিসের বরাত দিয়ে বলেন যে একালে দাড়িমোচ রাখা নয়; বরং মোড়ানটাই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। দাড়ি চেঁছে ফেলার এই হুজুক দেখে সেলবর্সীর আল মুসলিম পত্রিকা ফুঁসে উঠল।ওই সভায় মলিহাবাদী তাঁর অভিভাষণে হাদিসের বরাত দিয়ে বলেন যে একালে দাড়িমোচ রাখা নয়; বরং মোড়ানটাই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। প্রাচীন আরবেরা যেমন রোমানদের মতো সভ্যতার অনুসরণে দাড়ি ও চোগা অবলম্বন করেছিল, তেমনি একালের সভ্যদের পোশাকে-পাতি অনুসরণ করলেই ইসলামের সৌন্দর্য বিশ্ব বুঝতে পারবে। [আহমদ, আত্মকথা] যে মাওলানা আযাদের বরাতে আফগানিস্তান গিয়েছিলেন সেলবর্সী বলে রটনা আছে, তাঁরই রেফারেন্সে দাড়ির বিরুদ্ধবাদ পেয়ে গেলেন তরুণেরা।
দাড়ি চেঁছে ফেলার এই হুজুক দেখে সেলবর্সীর আল মুসলিম পত্রিকা ফুঁসে উঠল। লিখল, ‘মোল্লা-দলনকারী দাড়ি-বিদ্বেষী যে আগাছাগুলি মুসলমান সমাজে গজাইয়া উঠিয়াছে, এই ধর্ম্ম-দ্বেষী অকাল-কুষ্মাণ্ড দলকে আমরা জিজ্ঞাসা করি, তাঁহারা ইসলামী “দায়েরা”র (বেষ্টনীর) মধ্যে থাকিয়া এইরূপ দানবীয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতেছে, না দায়েরার বাহিরে থাকিয়া? ভেতরে থাকলে তাদের মুজতাহিদদের মৌলবি-আলেমদের সঙ্গে তর্ক করুক এসে’—আহ্বান জানাল সেলবর্সীর পত্রিকা। দাড়ি বাপ-দাদার উত্তরাধিকার এবং লিঙ্গচিহ্ন। ‘নর হইয়া যাহারা নারী মূর্ত্তি ধারণ করে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহারা…কাপুরুষ।’
মাওলানা আযাদের প্রতিও খড়্গহস্ত হলেন সেলবর্সী। সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিস্তারের যুগে কংগ্রেসি আযাদের প্রভাব তখন ক্রমহ্রাসমান। সেলবর্সী পত্রিকায় লিখলেন, আযাদ ‘কংগ্রেসের একজন চেলা।…কংগ্রেসের গুণকীর্তন করা, মুসলমানদিগকে কংগ্রেসের দলভুক্ত করিতে চেষ্টা পাওয়া, যেখানে হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষ উপস্থিত হয়, সে স্থলে সকল দোষ মুসলমানের ঘাড়ে ন্যস্ত করা, ইহাই তাঁহার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘একবার পেশাওরে গিয়া নিজের কেরদানী ফলাইতে চেষ্টা পাইয়াছিলেন, গবর্নমেন্ট তাঁহাকে সেখানে যাইতে দেন নাই; গেলে হয়তো একটা নূতন বিভ্রাট ঘটিত।’ মূলত কংগ্রেস, স্বরাজী ও জমীয়তে উলামা দলের মুসলমানদের বিরুদ্ধেই খর-জিভ হলেন সেলবর্সী। বিশ দশকের গোড়ায় যেখানে গান্ধীর কংগ্রেসের সঙ্গে খেলাফতপন্থী মুসলমানদের সহযোগিতা ছিল, সেখানে দশকের শেষে গিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক অনেকটা চুকে যাচ্ছে, আর নসিব ফিরছে স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলিম লীগের। অন্যদিকে নজরুল এই পরিস্থিতিতে না কংগ্রেস না মুসলিম লীগ—কোনোটাতেই বায়াত রাখেননি।
চিহ্নতন্ত্র ও অণু-শাসনমুসলমান সমাজের বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের নতুন শর্ত রচনা নিয়ে বিবেচনা করছিলেন। সেখানে চিহ্নকেন্দ্রিক মেরুকরণ ছিল একটা মস্ত প্রশ্ন। বাংলায় হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর সম্ভাবনা চিত্তরঞ্জন দাশ, এ কে ফজলুল হক প্রমুখের মধ্যে জাগরূক ছিল। মোল্লাপক্ষীয়রা ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভেদের প্রসঙ্গ যে একত্র করতেন, সেখানে তাঁদের প্রতীকী বলপ্রয়োগের মস্ত হাতিয়ার ছিল তাকফির করা। তাঁরা হিন্দুকে যেমন ‘কাফের’ বলতেন, তেমন ভিন্নমতের মুসলমান যুবকদেরও অকাতরে তাকফির করতেন। তাকফিরের এই খড়্গ সদাই ঝুলন্ত ছিল জনপরিসরে মতামতের বাহাসে। দাড়ি প্রশ্নে সেলবর্সীর পত্রিকায় যে প্রতিপক্ষকে ইসলামের দায়েরার বাহির বলে প্রশ্ন করার আভাস দেওয়া হয়েছে, সেটা নিছক কথার কথা ছিল না। সেটা মূলত চিহ্নতান্ত্রিক মেরুকরণের লড়াইয়ে তাকফির অস্ত্রেরই আভাস।
সস্ত্রীক আবুল হুসেন