লেখাটি ছোট। প্রস্তাবও সহজ। কিন্তু ব্যাপ্তি অনেক। এ দাবি মানা উচিত, মানতে হবে! বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের বেশির ভাগই ভোট দিতে পারেন না। এটি গণতন্ত্রের এক চাক্ষুষ বৈষম্য। এ বৈষম্য রোধ করতে রাষ্ট্রকে সহজ পথ খুঁজে বের করতে হবে।

সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটু পেছনে ফিরলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তখন দেশে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র ছিল। ৬৬ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৫৯২ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৪২ হাজার ১৪৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ওই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন।

একটি কেন্দ্রে একাধিক বুথ বা ভোটকক্ষ থাকে। দ্বাদশ নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতিটি ভোটকক্ষের দায়িত্বে থাকেন একজন করে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। সুতরাং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাও ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতি কক্ষে দুজন করে পোলিং এজেন্ট ছিলেন, সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। এ হিসাবে দ্বাদশ নির্বাচনে শুধু ব্যালটের সঙ্গে যুক্ত ভোটকর্মীই ছিলেন ৮ লাখের বেশি। আসন্ন নির্বাচনেও এ সংখ্যা প্রায় এমনই থাকবে।

এর বাইরে সাধারণত প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার মিলে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন প্রায় ১৬ জন। এ হিসাবে মোট ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা সাত লাখের মতো। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে এ সংখ্যা আরও বেশি হয়। এ ছাড়া রিজার্ভ পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্যরা রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন স্তরে ২০ লাখের মতো মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

নিজ শহর ছেড়ে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করা গণমাধ্যমকর্মীদের সংখ্যা অনেক। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, থানাসহ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে অনেক। ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এ মানুষদের অনেকের পক্ষেই ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ এ মানুষগুলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ অংশীদার। এ মানুষগুলো তাঁদের কর্মের কারণে দেশের ভালো–মন্দের বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্ট সাধারণত শিক্ষকদের মধ্য থেকে হয়ে থাকেন। এ মানুষগুলো রাষ্ট্রের নাগরিক গড়ার মূল কারিগর। অথচ তাঁরা নির্বাচনে তাঁদের রায় দিতে পারেন না।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এ ভোটকর্মীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু তা অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনী প্রজ্ঞাপন জারির ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর সংশ্লিষ্ট ভোটারকে আবেদন করতে হয়। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই ভোটারের ঠিকানা বরাবর ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবেন। সেটি আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করে আরেকজন ব্যক্তির দ্বারা সত্যায়ন করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাঠাতে হবে। এই পদ্ধতি পড়তে গেলেই মাথা ঝিম করে ওঠে। এ ঝক্কি পেরিয়ে কয়জনের পক্ষে এ পোস্টাল ভোট দেওয়া সম্ভব?

কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন ১০ জন শিক্ষককের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। তাঁদের কেউই তাঁদের পোস্টাল ভোটিং সম্পর্কে অবগত নন। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা জানালেন, ভোটকর্মীদের পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়টি মোটাদাগে নির্বাচনী নথি ও আরপিওর ভেতরই সীমাবদ্ধ, জনপরিসরে চর্চিত নয়।

সহজ প্রস্তাব

রিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সব ধরনের ভোটকর্মীর ভোটাধিকার সহজ করা হোক। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্ক্যান করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। এর জন্য একবার ব্যবহারযোগ্য টেমপ্লেট ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে নির্বাচন কমিশন। কারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কল্যাণে ব্যক্তির আঙুলের ছাপ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, স্মার্ট কার্ডধারীদের আইরিশও আছে। আর এই ডিভাইসগুলোও পর্যাপ্ত আছে বলে মনে করি। এনআইডি স্ক্যানের পর ক্রস চেকের জন্য শুধু আঙুলের ছাপ নিতে চাইলে সিম বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনের দিনের জন্য কিছু বায়োমেট্রিক মেশিনও ধার নিতে পারে কমিশন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একটি মেশিন সেটআপের বেশি প্রয়োজন হবে না।

মনে রাখতে হবে, এই যে কমবেশি ২০ লাখ ভোটকর্মীর ধারণা দেওয়া হলো, তাঁরা সবাই কিন্তু রাষ্ট্রে সচেতন শ্রেণির নাগরিক, শিক্ষিত শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাই এই মানুষগুলোর নির্বাচনী রায় অনেকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তাঁরা একজন প্রার্থীকে বা একটি দলকে অনেক কিছুর ওপর ভিত্তি করে রায় দেবেন। তাঁদের পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালের মতো জরুরি সেবা-পরিষেবামূলক খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও এনআইডি স্ক্যান করে কর্মস্থলের পাশের কোনো কেন্দ্রে ভোটাধিকার দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। এটা একটি নাগরিক অধিকার বলে মনে করি।

মো.

ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ভ টক ন দ র কর মকর ত প রস ত ব ভ টকর ম ২০ ল খ র জন য কর ম র সহক র

এছাড়াও পড়ুন:

হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠি পরীক্ষা করে দেখছে ভারত: রণধীর জয়সওয়াল

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠি পরীক্ষা করে দেখছে ভারত। আজ বুধবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেছেন।

ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ‘চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুরোধটি (চিঠি) পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। আমরা শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি এবং স্থিতিশীলতাসহ বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা অব্যাহতভাবে সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকব।’

নয়াদিল্লিকে দেওয়া চিঠির বিষয়ে আজ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে পাঠানো চিঠির জবাব এখনো আসেনি। আজ দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ খবর জানান।

কোন প্রক্রিয়ায় ভারতে চিঠি পাঠানো হয়েছে, সে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘নোট ভারবাল (কূটনৈতিক পত্র) আমাদের মিশনের মাধ্যমে ওদের (ভারতের) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কোনো উত্তর আসেনি। এত তাড়াতাড়ি উত্তর আশাও করি না আমরা।’

গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ দুই দফায় চিঠি দিলেও সাড়া দেয়নি ভারত। এর মধ্যে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ওই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এরপর শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে তৃতীয়বারের মতো চিঠি দেয় বাংলাদেশ। চিঠিতে বলা হয়, বিস্তারিত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন। আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে আবার অনুরোধ জানাচ্ছে।

এই চিঠির কোনো জবাব নয়াদিল্লি না দিলেও শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণার পর একটি বিবৃতি দিয়েছিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়েছিল, ‘নিকট প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি, স্থিতিশীলতাসহ বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা সব সময় সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকব।’

আরও পড়ুনশেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে লেখা চিঠির জবাব এখনো আসেনি: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা২ ঘণ্টা আগে

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় ঝিনাইদহে দোয়া মাহফিল
  • গণতন্ত্রের পুনরুত্থানে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি এখন জরুরি: নাহিদ 
  • রাজনৈতিক জনসভায় জনসাধারণের ভোগান্তির কথা কে ভাবে
  • খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়: মির্জা ফখরুল
  • ভিন্নমত পোষণ করলেই তাকে শত্রু মনে করা হয়: ফখরুল
  • মুক্ত দেশ না হয়েও চীন কীভাবে উদ্ভাবনে এগিয়ে
  • ডা. মিলন শহীদ হলো, গণতন্ত্র এল কি?
  • হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠি পরীক্ষা করে দেখছে ভারত: রণধীর জয়সওয়াল
  • প্রান্তিক মানুষের অন্তর্ভুক্তি গণতন্ত্রের বড় চ্যালেঞ্জ: হোসেন জিল্লুর রহমান