সবাই নির্বাচন চায়, তবে কমিশন দৃশ্যমান পদক্ষেপে ঢুকতে পারেনি: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
Published: 29th, November 2025 GMT
দেশের সবাই নির্বাচন চায়। তবে নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপের ভেতরে ঢুকতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
আজ শনিবার রংপুর নগরের আরডিআরএস মিলনায়তনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত প্রাক্-নির্বাচনী আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় তিনি এ কথা বলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও দাবিগুলো তুলে ধরতে এ নাগরিক সংলাপের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
বেলা ১১টার দিকে শুরু হওয়া পরামর্শ সভা চলে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। এতে ‘নির্বাচিত পরবর্তী সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা’ এবং ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে কী প্রত্যাশা’ শিরোনামে মুক্ত আলোচনা হয়। এতে রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ অংশ নেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের মানুষ নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে আছেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের পেশাজীবী, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, প্রবাসী ও বিদেশিরা নির্বাচন চান। আমলাতন্ত্রের ভেতরে যে অস্বস্তি সেটা কাটানোর জন্য তাঁরা নির্বাচন চান। তিনি বলেন, ‘একই সাথে আবার দেখি যে মানুষের আস্থার খুব ঘাটতি। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়ে তারা আস্থা পাচ্ছে না। নির্বাচনের পথে সহিংসতা বাড়বে কি না, একইভাবে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে কি না। স্থানীয় পর্যায়ে এ রকম একটা পরিস্থিতি রয়েছে এবং আস্থার ঘাটতি আছে। একটা বৈপরীত্যের মধ্যে অবস্থান করছি—একদিকে প্রচণ্ড প্রত্যাশা, অপর দিকে আস্থার অভাব।’
নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
কৌশলগত সুপারিশ বাদ দিয়ে দুদক অধ্যাদেশ চূড়ান্ত নিয়ে টিআইবির বিবৃতি উল্লেখ করে সিপিডির এই ফেলো বলেন, ‘ইফতেখার ভাইয়ের আজকের স্টেটমেন্ট দেখেছেন কি না? উনি তো মারাত্মক কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, “ক্যাবিনেটের মধ্যে সাতজন উপদেষ্টা এটার বিরোধিতা করেছেন।” আমরা বাইরের মানুষ তবুও ভেতরের কিছু খবর জানি। এটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক বিষয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকারের ভেতর একটা সংস্কারবিরোধী মনোভাব ক্রমান্বয়ে বের হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতেই অনলাইনে ‘নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা’ ও ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে কী প্রত্যাশা’ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। উপস্থিত ব্যক্তিরা অনলাইনে তাঁদের মতামত জানান। এতে জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা, দুর্নীতি দূর করা, নির্বাচন কমিশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানা বিষয় উঠে আসে। পরে তাঁদের মতামতের সঙ্গে অন্য পাঁচটি বিভাগের পরামর্শ সভায় দেওয়া মানুষের মতামত সভায় দেখানো হয়।
এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার উদ্দেশে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন রাখেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়া সম্ভব কি না এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি তাঁদের আস্থা আছে কি না? জবাবে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী জানান, তাঁরা মনে করেন নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া কঠিন এবং কমিশনের প্রতি তাঁদের আস্থা নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বলেন, দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে সেই আস্থার জায়গায় এখনো দেখে না। ভোটের দিন নিরাপদে ভোট দিতে পারবে কি না, এটা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা আছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিগত দিনে নিরপেক্ষ থাকতে পারেনি এবং আগামী দিনেও নিরপেক্ষতা রাখার মতো কিছু তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না। নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যে কার্যক্রম, আন্তরিকতা ও সমন্বয় থাকা দরকার, সেই জায়গায়ও ঘাটতি থেকে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, ভোটের আচরণবিধি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, যারা চাপ প্রয়োগ করে, তাদের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন নরম আচরণ করে।
গণ অধিকার পরিষদের প্রতিনিধি জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘আমরা রকিব-হুদা কমিশনের মতো নির্বাচন কমিশন চাই না। যারা শিরদাঁড়া দাঁড় করে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবে, এমন মানুষ ছাড়া কমিশনের প্রতি মানুষ আস্থা পাবে না এবং ভোটের প্রতি আগ্রহী হবে না।’
সিপিবির মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাতুজ্জামান বলেন, ‘সবাই নির্বাচন চায়। আমরাও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এখনো আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারছে না। এটা নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে।’ এ সময় আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি উপেন, হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি আনোয়ার ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ বক্তব্য দেন।
সভা শেষে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা ও আগামী নির্বাচিত সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা, তা নিয়ে সারা দেশের মানুষের কাছে শুনছেন। মানুষের নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা কম বলে জানিয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষকে হতাশ হলে চলবে না।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ন র জন য পদক ষ প সরক র র র ভ তর আস থ র
এছাড়াও পড়ুন:
১০ বছর পর রাবির গোল্ড মেডেলিস্ট রফিকুলের মাস্টার্সের ফল প্রকাশ
দীর্ঘ এক দশকের ভোগান্তি ও জটিলতা পেরিয়ে সিজিপিএ ৪.০০ পেয়ে মাস্টার্সের ফলাফল পেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রিভিউ শেষে তার মাস্টার্সের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
আরো পড়ুন:
রাবিতে চালু হলো কাঙ্ক্ষিত ই-কার
রাবিতে পাঁচ দোকানে অভিযান, জরিমানা
রাইজিংবিডি ডটকমের হাতে আসা তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, রফিকুল ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষে ফলিত গণিত বিভাগে ভর্তি হন। প্রথম বর্ষেই তিনি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরের বছর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। শুরু হয় বিরোধীদের দমন-পীড়ন। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে শিবির করার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। তবে জেল থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আবার প্রথম হন রফিকুল। অনার্সে ৩.৮০ সিজিপিএ পেয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন এবং গোল্ড মেডেল অর্জন করেন।
২০১৪ সালে বিভাগে দুজন প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে রফিকুল এপিয়ার্ড সনদ দিয়ে আবেদন করেন। এরপরই শুরু হয় নতুন জটিলতা। একই বছর বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামসুল আলম সরকারের বিরুদ্ধে নম্বরপত্র টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তোলা হয়, যার সঙ্গে রফিকুলকেও জড়ানো হয়। যদিও পরবর্তীতে তদন্তে এর সত্যতা মেলেনি।
বিভাগের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান খান আকাশ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজান উদ্দিনের কাছে রফিকুলের ব্যাপারে থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ দেন এবং বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীকে দিয়ে মানববন্ধনও করান বলে ছাত্রশিবিরের জোর অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার জেরে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত থিসিস জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগে রফিকুলের ছাত্রত্ব বাতিল করেন সুপারভাইজার।
জুলাই অভ্যুত্থানের আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত বছরের ৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের কাছে রেজিস্ট্রেশন পুনর্বহালের আবেদন করেন রফিকুল। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিভিউ কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিয়ে সনদ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৬তম সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক আখতার হোসেন মজুমদার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে সিন্ডিকেটে রিভিউ কমিটি গঠন করে। কমিটি যাচাই করে থিসিস পুনঃসংশোধনের নির্দেশ দেয়। সংশোধিত থিসিস মূল্যায়নের পর আজ তার ফল প্রকাশ করা হয়।
ফল প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় রফিকুল ইসলাম বলেন, “২০১৫ সালে আমার ছাত্রত্ব বাতিলের পর প্রায়ই দোয়া করতাম, আল্লাহ আমার মৃত্যুর পূর্বে হলেও আমার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিও, আমার মায়ের জীবদ্দশায় তার চোখের পানির প্রতিদান দিও। মহান রব আমার দোয়া কবুল করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এ সম্মান ফিরে পেতে অনেকের ত্যাগ রয়েছে, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।”
একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার পেছনে যেসব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন তিনি।
এ বিষয়ে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “রফিকুল ইসলাম ভাই রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক শিক্ষা সম্পাদক ছিলেন। ভাইটির ওপর করা ফ্যাসিবাদী জুলুমের যুগাবসান ঘটল আজকে। জেলে থেকে পরীক্ষা, অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, মাস্টার্সেও ৪.০০ পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। এত ভালো ফলাফল। তাই জেলে ভরেও শান্তি হলো না। আটকে রাখা হয় ফলাফল। এক দিন-দুদিন নয়, ১২ বছর পর আজ ফলাফল পেলেন তিনি।”
রাকসু ভিপি আরো বলেন, “এভাবে ছাত্রশিবিরের কত ভাই যে শুধু একাডেমিক হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছেন, তার ইয়ত্তা নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে গেছেন কিন্তু সার্টিফিকেট উঠাতে দেয়নি- এরকম ভাইয়ের সংখ্যা ভূরি ভূরি। ছাত্রশিবিরের ত্যাগ তিতীক্ষার শেকড় এই ক্যাম্পাসের অনেক গভীরে। আমাদের বিজয় তাদের স্যাক্রিফাইসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।”
রফিকুলের ওপর তৎকালীন প্রশাসন ও সংশিষ্ট শিক্ষকরা যে আচরণ করেছেন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা আমিরুল ইসলাম বলেন, “এর মাধ্যমে তারা শুধু ছেলেটির রেজাল্টই নষ্ট করেনি, তার জীবনের ছন্দও নষ্ট হয়েছে। সেজন্য যে বিচার তিনি চান, আমার ধারণা- তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বলেন, “তার ওপর সত্যিই জুলুম করা হয়েছে। তার রেজাল্টের জন্য একটি পরীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির অধীনেই আজকের এই রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে। যারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছিল, অলরেডি সেই পাঁচজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। চেয়ারম্যান পদ বাতিলসহ অ্যাকাডেমিক কাজ থেকে তাদের বিরত রাখা হয়েছে।”
ঢাকা/ফাহিম/রাসেল