Samakal:
2025-05-01@03:00:51 GMT

তারুয়া, লাল কাঁকড়ার দেশ

Published: 20th, March 2025 GMT

তারুয়া, লাল কাঁকড়ার দেশ

ভোরের কুয়াশা তখনও কাটেনি। ভ্রমণিয়াদের ভিড়ে ঠাসা চরফ্যাশনের কচ্ছপিয়া ঘাট। লঞ্চের অপেক্ষায় বসে আছে কয়েকশ ভ্রমণিয়া। ব্যাকপ্যাকে ক্যাম্পিং, বারবিকিউ সরঞ্জাম, বাইনোকুলার আর লম্বা লেন্সওলা ডিএসএলআর ক্যামেরা। শেষ হেমন্তের বিগত সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে জাহাজে চেপেছিল তারা। মধ্যরাত অবধি কোলাহলান্তে শেষরাতে নদীমগ্ন ঘুমের পর ভরফজরে নেমেছে বেতুয়া ঘাটে। অনতিদূরের বাজার থেকে বোরাক বা মোটরসাইকেলে চেপে শশীভূষণ বাজার পেরিয়ে পৌঁছেছে এই ট্রলার ঘাটে। কেউ কেউ এসেছে রিজার্ভ বাসে। মেঘনা মোহনায় জেগে ওঠা দ্বীপ তারুয়ার সৈকতমুখী এই ভ্রমণমিশন। ভিশন– কংক্রিটের শহর ছেড়ে নির্জন প্রকৃতিবিহার। এ রকম মানব প্রকৃতিপ্রেমিক পৃথিবীতে হাতে গোনা বটে!
জোয়ার-ভাটার নিয়ম মেনে ঘাট থেকে লঞ্চ, ট্রলার ছেড়ে যায়। এখন মেঘনায় জোয়ারের বেলা নয়, ভাটার টান। লঞ্চ, ট্রলার সব বন্ধ। প্রহর গোনা ছাড়া ভ্রমণিয়াদের কাজ নেই। বৃন্দভ্রমণের মুখ্য কুশীলব অনিকেত হাতমাইকে অস্থিরকণ্ঠে এলান দিচ্ছে– ভাইসব, মাঝিদের বরাত দিয়ে জানানো যাচ্ছে যে, জোয়ারে সমুদ্রে ভেসে থাকা তারুয়া দ্বীপভ্রমণ অনিশ্চিত হতে পারে, মাঝসমুদ্রে থাকতেই জানিয়ে দেব, ওকূলে না ভিড়লে যাতে আনন্দতরী ভেড়ানো যায় কুকরিমুকরি কূলে। আগাম টিম স্পিডবোটে রেকি করবে, সব জোগাড়যন্ত্র আছে আমাদের। 
জোগাড়যন্ত্র যে আছে, পূর্ব-অভিজ্ঞতায় ভ্রমণিয়ারা নিশ্চিত। অধীর-অস্থির অনিকেত উচ্চতায় হ্রস্ব, ভ্রমণকল্পে দীর্ঘ, শিল্পভ্রমণে তার সিদ্ধহস্ত প্রলম্বিত। এন্তেজামপ্রধান পারভেজ শান্ত, ধীর-স্থির, কেজো। দোঁহের গঠিত টিমের হাতে ভ্রমণভাগ্য সঁপে নির্ভার সবাই। অনিকেতের অস্থিরকণ্ঠকে ভ্রমণিয়ারা পাত্তায় না এনে তাই প্রশান্ত পারভেজের দিকে তাকিয়ে কোরাস গাওয়ায় মনোনিবেশ করেছে। কোরাস: ‘শোন আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল, এলো মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনই নামিবে ঢল’। ‘এলো মেঘনায় জোয়ারের বেলা’ স্তবক উচ্চারিত হচ্ছে বারবার। পার-আকাঙ্ক্ষীদের বিশ্বাস, আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর, সমুদ্র দেবতা বা প্রকৃতি এই ডাকে সাড়া দিলে এখনই আসতে পারে জোয়ার।
পারঘাটাতে পারের কড়ি গুনতে হয়নি পার-আকাঙ্ক্ষী দলের অর্ক-শশী জোড়ের। বিলাসবহুল জাহাজ শুভরাজে রাত গুজরান করে এই সূর্য ও চন্দ্র জোড় প্রথম নোঙর ফেলে জাহাজমারায়। তারপর কচ্ছপিয়ায়। গভীর পানিতে চলে বলে জাহাজ চলাচলে জোয়ার-ভাটার আসর নেই। কচ্ছপিয়াঘাটের মতো কোথাও অপেক্ষা করার দরকার পড়েনি। জাহাজযাত্রী হয়ে এসে ভোলার বেতুয়া থেকে লঞ্চে তারুয়া দ্বীপ যাত্রার কারণ সমুদ্রঘেরা দ্বীপে লঞ্চ, ট্রলারই কেবল তীরে ভিড়তে পারে, জাহাজ নয়।  
শশী হিন্দি সিনেমাবুঁদ মানুষ। কমলারঙা টসটসে গাল, আয়তচক্ষু, সুচালো নাসিকা, মাদকতাময় ওষ্ঠ। সাউথ ইন্ডিয়ার নিকষ কালো রং, গভীর চোখ আর চওড়া গোঁফওলা হিরোদের প্রেমে কাবু। নায়কদের পর্দা কাঁপানো দেখে দেখে তার মানস অধিকার করে রেখেছে  জিমনেসীয় তামিল ফিগার ও বীরত্ব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই মানস-অবস্থাকে ইরোটোম্যানিয়া বলা যায় কিনা, তা চিকিৎসকরা ভালো জানেন। অর্ক চেহারাসুরতে মাশাল্লাহ সূর্যের মতোই রঙা। মননে সরল ও আবেগি। তামিল হিরোদের মতো তেল কুচকুচে শরীর, গোঁফ কিছু নেই তার। পছন্দিদা তালিকার না হলেও নতুনের হাত ধরে টাইটানিক আমেজে বিগত সন্ধ্যায় সমুদ্রগামী জাহাজে উঠে পড়েছিল চন্দ্রের মতো দুধসাদা শশী। 
জাহাজের তিনশ কেবিনভর্তি যুগল। জুটিছুট ভ্রমণিয়াদের ঝিমানোর জায়গা স্লিপিং চেয়ারে। এ যেন প্রীতি, স্মৃতি ও সৃজন কারবারিদের ভাসমান মেলা। মেঘনা মোহনাবিহারী এ জাহাজ শশীর জন্য জীবন্ত টাইটানিক। নদীলগ্ন কেবিনের জানালায় আছড়ে পড়া তৃতীয়া তিথির জোসনা আর উচ্ছল ঢেউ অর্ক-শশীকে হলিউডি জ্যাক-রোজের ইয়াদ দেলাতে কসুর করেছে বলে মনে হয় না। দুলুনির তালে তালে নৃত্য করতে করতেই তারা চলে এসেছে মোহনায়; দ্বীপমালা ঘেরা নদীগুলো যেখানে সাগরে মিলিত হওয়ার অমিত আবেগে ভরা। একটি বানানো মঞ্চ ছাড়া জাহাজের দুলুনিতে এর কোন কোণে কার মন কেমন দুলছে আল্লাহ মালুম!
মেঘনা মোহনা বিহারে আমি কে! আমি প্রেমযাত্রার বেরসিক একক, জুটিছুট। এককগণের অনেকে স্লিপিং চেয়ারেই নিয়তি মেনেছেন, আমি নিয়েছি একলা এক কেবিন। নিঃসঙ্গতার সঙ্গী করেছি প্রিয় কাফকার মেটামরফোসিস আর কালো কফি। প্রেম ও রোমাঞ্চ বোঝাই জাহাজের লম্বা গল্পগুলোর মধ্য থেকে অর্ক-শশীর জীবনকে বেছে নিয়েছি বলার জন্য। আর অখণ্ড অবসরে দেখে চলেছি নদীমাতৃক প্রকৃতি। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনারা যেমন অন্য সৈনিকদের কাভার দেয়, আলোচ্য যুগলের টাইটানিকীয় রোমান্সকে লোকচক্ষু থেকে বাঁচাতে পাশের কেবিনে আসন পেতেছি। সম্ভাব্য উৎপাতে কৌতূহলী প্রশ্নবাণের মুখে অনায়াসে উত্তর হিসেবে দাঁড় করানো যায় দুই কেবিনের তিন আসন। টাইটানিকীয় নায়ক-নায়িকাকে রোমান্সে পাঠিয়ে মনে সাজিয়ে নিচ্ছি জাহাজভর্তি রোমান্সের টুকরো টুকরো গল্প। আহা, ছোট্ট পরিসরের ভ্রমণগদ্যে তিনশ গল্প তো আর লেখা যায় না!
এ যুগলের দু’জনই আমার বন্ধু বলে জেনেছি যে অভিযাত্রার মাস দেড়েক আগে থেকেই চলে আসছে তাদের জাহাজ ভ্রমণকেন্দ্রিক রসালাপ। সে আলাপে টাইটানিক ধারণাটি শশীই প্রথম তোলে। এ নিয়ে যেসব মান-অভিমান পরিকল্পনা আর গল্প তৈরি হয়েছিল তা শোনা ও গোনা এ রকম–
: জেনো জনাব, এই জাহাজ ভ্রমণ হবে আমার জীবনের টাইটানিক। প্রান্তবেলায় নাতি-নাতনিকে সে গল্প শোনাব। 
: দ্বীপ তারুয়ায় রোমান্সের সূচনা না হতেই আমার মৃত্যু চাও নাকি? এমন হলে জাহাজ ভ্রমণ বাদ। 
: আরে না, তা চাইব কেন! টাইটানিক সিনেমার গল্পটির শেষাংশে বদলে দেব। সেখানে আনন্দ ছাড়া, থাকবে না মৃত্যু ও জরা। 
: তাই বলো। শুনেছি এমভি শুভরাজেও টাইটানিক জাহাজের মতোই ডেক। সেখানেও সমুদ্রছোঁয়া শীতল বাতাসের তীব্র ঝাপটা। 
: তারচে’ বলো, টাইটানিকের চেয়ে আরেক কাঠি সরেস। শুভরাজ আসল সমুদ্রে ভাসবে, সিনেমার টাইটানিক তো ভাসেনি … সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে মন-তরঙ্গ মিলে এ ভ্রমণ হবে রোমাঞ্চকর ও রোমান্সময়। 
এর মধ্যেই এসে গিয়েছিল ভ্রমণের দিনক্ষণ। কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, অর্ক-শশী পরিণত ভালোবাসায় নিজেদের জড়াতে মানসিক প্রস্তুতির সময় পেয়েছে বহুদিন। দ্বীপ তারুয়াগামী জাহাজে পা ফেলার আগেই আমার প্রতীতি জন্মায় যে, ভাসমান যানে দীর্ঘ ভ্রমণের ফুরসতে এ যুগল ঝালিয়ে নিতে পারবে প্রেম নামের চিরায়ত অমর অক্ষয় বস্তুটির ভেতর বাহির। 
কচ্ছপিয়াঘাটে অনিকেত অনিকেত ধ্বনিতে আমার সংবিৎ ফেরে। বুঝতে বাকি থাকে না– ভ্রমণিয়াদের কাঙ্ক্ষিত জোয়ার শুরু হয়েছে। তারুয়া দ্বীপসৈকতগামী লঞ্চ-ট্রলার 

ছাড়া এখন সময়ের ব্যাপার। আমাদের জন্য মজুত তিনটি লঞ্চ। লঞ্চের ছাদ রঙিন কাপড়ের ঝালরওলা শামিয়ানায় সজ্জিত। ভিতরে চিরায়ত কেতার কাঠের লম্বা বেঞ্চ। ডেক ও শামিয়ানার নিচে প্লাস্টিকের চেয়ার। ভিতরে বাজছে আবদুল জব্বারের ভরাট কণ্ঠ ‘ও রে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’। এই আমুদে আয়োজন অর্ক ও শশীর অমর প্রেমকে স্মৃতিময় রাখার জন্য জুৎসই বলে ভেবে নিতে ক্ষতি নেই। লঞ্চে ওঠার তোড়জোড় চলছে। আসন নেওয়ার আগে এক প্রস্ত চা পান করে নিচ্ছে সবাই। চায়ের জন্য চাপাচাপি করছে এ অংশের আয়োজনের কারুকার হাসান। এটা হাসানের এলাকা আর উদার আতিথেয়তা তার মজ্জাগত। 
যুগলগণ আসন নিতে শুরু করেছে। বড় জাহাজ বোঝাই হয়ে আসা এত এত ভ্রমণিয়াকে মাত্র তিনখানা ছোট লঞ্চ অনায়াসে পুরে নিচ্ছে পেটে। থ্যাঙ্ক গড, শরীর খারাপ বা রাতে ঘুম হয়নি অজুহাতে বহু জোড়া বেতুয়া ঘাটে নোঙর জাহাজেই থেকে গেছে। হাতমাইকে লঞ্চ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কী আশ্চর্য, অর্ক হন্তদন্ত হয়ে একা ছুটে আসছে আমাদের লঞ্চের দিকে। ফিসফিস করে জানাল, শশীকে সে খুঁজে কোথাও পাচ্ছে না। কোন লঞ্চে উঠল, আদৌ উঠল কিনা সে জানে না। ফোনও তুলছে না শশী। হয় সে বেবুঝ, হয় অতি-অভিমানী নয় নতুন বন্ধুসন্ধানী। রিজার্ভ বাসে কচ্ছপিয়াঘাটে নামা পর্যন্ত দেখা গেছে তাকে। সবাই যখন চা পানে ব্যস্ত, তখন থেকে হাওয়া। লঞ্চের আমার আসনের পাশেই বসে পড়ে অর্ক। শশীবিরহে উদ্‌ভ্রান্ত, বিষণ্ণ, নিশ্চুপ। লঞ্চ বুঝি ছাড়ল!
সাগর মোহনায় ছোট নদী খালের অনেক ধারায় নিজেকে ভাগ করে সমুদ্রে মিশেছে মেঘনা। মেঘনাদুহিতার একটির নাম তেঁতুলিয়া। তেঁতুলিয়ার ক্ষীণস্রোতা খালেই এই কচ্ছপিয়া ঘাট। ছাড়ার পর তিনটি লঞ্চ পরপর চলতে শুরু করল। খালের ক্রমবর্ধমান আয়তন চলমান লঞ্চগুলো পাশাপাশি নিয়ে এলো। ডিসেম্বরের নরম রোদে সাগরস্পর্শী বাতাস আমাদের মাতাল করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়ি মোহনার বিশালতায়। আদিগন্ত নীল আকাশ, কূলকিনারাহীন দিগন্তজোড়া জলরাশি। ভ্রমণিয়া শাকুর ভাটির দেশের গানপাগল মানুষ। মাঝির পাটাতনে এক গায়েনকে এনেছে ফোনক্যামেরার ফোকাসে। ঝিরি ঝিরি বাতাসে সুর ভাসছে: ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে…।’ শ্রোতারা সুরেলাকণ্ঠের জাদুতে আনন্দে গদগদ। দয়িতাবিরহে অর্কের অবস্থা পূর্ববৎ।  
দেখতে দেখতে সমুদ্রের পানি ছুঁয়েছে লঞ্চ। গতিভিন্নতা ও জলরাশি মধ্যকার দূরত্বও দিয়েছে বাড়িয়ে। একে অপরের নাগাল থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। এ যেন অর্কের চোখ থেকে শশীকে আড়ালে সরে যাওয়ার নামান্তর। জেগে কি স্বপ্ন দেখছি আমি! দৃশ্যপটে আকস্মিক শশীর আবির্ভাব। দৃষ্টি থেকে অপস্রিয়মাণ অন্য লঞ্চের ডেকে সুহৃদ সমভিব্যাহারে শশী। দূর থেকেও দীর্ঘকায় রূপবতীকে চিনে নেওয়া যায়। আমার অস্ফুট ধ্বনি: ওই যে শশী!
অর্ক ধড়মড়িয়ে সেদিক পানে চেয়ে মাথা ঝাঁকায়। হন্তদন্ত হয়ে একজনের কাছ থেকে জোগাড় করে নেয় বাইনোকুলার। বাইনোকুলারের লেন্সে দূরদৃষ্টি ফেলে বলে ওঠে– হুমম, সেইই। নানা ভঙ্গিতে ছবির পোজ দিচ্ছে। দুই সুহৃদ পরিণত সুন্দরীর ভ্রুভঙ্গি আর বাতাসে এলোমেলো কেশদামের ছবি তুলেই ধন্য। বাইনোকুলার রেখে মুকুল ফোনে নিমগ্ন। হয়তো চলছে অভিমান-অনুযোগ। 
নীল দিগন্তছোঁয়া সমুদ্রের মধ্যে একটু টুকরো দ্বীপের ছায়া আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। মাঝি ভাইয়ের উচ্চ স্বর: ‘লাল কাঁকড়ার দেশ– তারুয়া, তারুয়া’। মিনিট দশকের মধ্যে পৌঁছে যাব পৃথিবীতে অচিন প্রায় মাঝিকথিত ‘লাল কাঁকড়ার দেশে’। সামনে যখন লাল কাঁকড়ার দেশ, পেছনে তখন বুনোসবুজের পটভূমিতে লাল বিন্দুর সমষ্টি। মাঝি ভাই জানায়, পেছনের লাল হচ্ছে চর কুকরিমুকরি। বিন্দুগুলো বন অফিসের লালটিনের চালা। 
ছুটে আসছে স্পিডবোট। ছুটন্ত বোটে দাঁড়িয়ে অনিকেত হাতমাইকে বলে গেল তারুয়ার ঘাট ডুবেছে জোয়ারে। আমাদের বিকল্প নোঙর কুকরিমুকরি। ঘুরে যায় লঞ্চের নিশানা। একটি লঞ্চ তারুয়া সৈকতে পৌঁছেছে প্রায়। খবর এলো, সাঁতরে হলেও তারুয়ায় না নেমে অভিযাত্রীরা ফিরবে না। আমাদের পেছনে থাকা লঞ্চ দেখাদেখি ঘুরে গেছে কুকরিমুকরির লাল নিশানার দিকে। কুকরিমুকরির যত কাছে আসছি, ততই দেখা যাচ্ছে বনলগ্ন চরে টাঙানো রঙিন শামিয়ানা। ভ্রমণিয়াদের দিনগুজরান আর মধ্যাহ্ন আহারের এন্তেজাম এই শামিয়ানায়। দুপুরের খাওয়া সারতে সারতে সমুদ্র আগন্তুকরা দূরসাগরে তাকিয়ে দেখবে ভেসে থাকা দ্বীপ তারুয়া– পৃথিবীতে বিরল লাল কাঁকড়ার অভয়ারণ্য। অচেনা, অফবিট, আনটাচ অবগুণ্ঠিত দ্বীপ– ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’। 
কুকরিমুকরি নেমে ভ্রমণিয়াদের হুল্লোড়ের মধ্যে অর্ক পূর্ববৎ বিষণ্ণ। থেকে থেকে সে ডুকরে ওঠে: শশী শশী। আমি বলি– কোথায় শশী?

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ভ রমণ য় দ র ব ইন ক ল র ক কর ম কর ট ইট ন ক র জন য অন ক ত আম দ র

এছাড়াও পড়ুন:

শ্রমিক অধিকার, আন্দোলন ও শ্রম সংস্কারের প্রস্তাবনার বাস্তবতা

মে দিবস শুধু একটি তারিখ নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের শতবর্ষব্যাপী সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ১৮৮৬ সালে শিকাগো শহরে শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল দিনটি। আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দিনটি পালিত হয় শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। বাংলাদেশেও মে দিবস পালিত হয় আনুষ্ঠানিকতা ও প্রতীকী উদ্‌যাপনের ভেতর দিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের শ্রমিকশ্রেণির জীবনমান, অধিকার ও কর্মপরিবেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই প্রবন্ধে মে দিবসের তাৎপর্য, বাংলাদেশের শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থান, শ্রমিক আন্দোলনের ধারা ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণি: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৃহৎ অবদান রাখা সত্ত্বেও শ্রমিকেরা চূড়ান্ত পর্যায়ের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। দেশের প্রায় ছয় কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশ পোশাক কারখানা, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও সেবা খাতে যুক্ত। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চাকরির নিরাপত্তা, নেই শ্রমিককল্যাণ সুবিধা এবং নেই সংগঠনের অধিকার।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এখান থেকে। কিন্তু এ খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশই পান না যথোপযুক্ত মজুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, যেমন রানা প্লাজা ধস কিংবা তাজরীন ফ্যাশনসের আগুন।

শ্রমিকসংগঠন ও আন্দোলনের ধারা

বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। পাকিস্তান আমলে শ্রমিকেরা বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরি বৃদ্ধির দাবি আদায় করেছিলেন। স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব, সুবিধাবাদী নেতৃত্ব ও বিভক্তি শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দেয়।

বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে দুটি চিত্র স্পষ্ট—একদিকে কিছু আন্তরিক ও ত্যাগী শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে লড়ছেন; অন্যদিকে কিছু নেতার ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক যোগসূত্র আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এ কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকেরা আস্থা হারাচ্ছেন সংগঠনের প্রতি।

সরকার ও শ্রমিকনীতি

বাংলাদেশ সরকার শ্রমনীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তা অনেক সময়েই কার্যকর হয় না। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার, মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি করার অধিকার থাকলেও বহু ক্ষেত্রে এই অধিকার চর্চা করতে গিয়ে শ্রমিকেরা হয়রানির শিকার হন।

অনেক মালিক প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনকে ভয় পান। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সংগঠনের চেষ্টা দমন করতে তাঁদের ছাঁটাই করা হয়, ভয়ভীতি দেখানো হয়; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়রানি, হামলা বা মামলা দেওয়া হয়। আর তাই শ্রমিকেরা সংগঠিত হওয়ার আগে দশবার ভাবেন।

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব: আশার আলো নাকি প্রতীকী পদক্ষেপ?

সম্প্রতি গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কমিশনের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে–

১. তিন বছর পরপর জাতীয় মজুরি নির্ধারণ করা, ২. বার্ষিক মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে মজুরি সমন্বয়, ৩. সময়মতো বেতন না দিলে ক্ষতিপূরণ, ৪. শ্রমিকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন, ৫. ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিল, ৬. আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ বন্ধ, ৭. মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করা, ৮. শ্রম আদালতকে আধুনিকায়ন ও সংস্কার ও ৯. শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা বাড়ানো।

এই প্রস্তাবগুলো অনেকাংশেই সময়োপযোগী ও শ্রমিকবান্ধব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার কতটা আন্তরিক? অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নীতিগত সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই মাঠপর্যায়ে এসে বাস্তবায়িত হয় না। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল থাকে। আবার মালিকদের সংগঠন যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে ব্যাহত করতে সক্রিয় থাকে।

শ্রম সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

প্রথমত, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কারই বাস্তব ফল দেবে না। দ্বিতীয়ত, শ্রম আদালতের ধীরগতি, মামলার জট ও রায় কার্যকর না হওয়া শ্রমিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে। তৃতীয়ত, শ্রম আইন প্রয়োগে যাঁরা দায়িত্বে আছেন, যেমন শ্রম পরিদর্শক বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ— তাঁদের প্রশিক্ষণ, জনবল ও নিরপেক্ষতা অনেক সময়েই প্রশ্নবিদ্ধ।

এ ছাড়া নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন ছুটি, যৌন হয়রানিবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বেও নারীর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত, যা একটি দুঃখজনক বাস্তবতা।

আশাবাদ ও করণীয়

তবু শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো যদি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মালিক-শ্রমিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর কাঠামো গঠন।

সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, যেন কোনো শ্রমিককে সংগঠন গঠনের জন্য হেনস্তার শিকার না হতে হয়। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার। নেতৃত্বে প্রগতিশীল, শ্রমিকবান্ধব ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের আনতে হবে। শ্রমিকদের সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও অধিকারবিষয়ক প্রচার চালাতে হবে।

সর্বোপরি, মালিক শ্রেণিকে বোঝাতে হবে যে শ্রমিকদের কল্যাণ শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্তও বটে। একটি কর্মিবান্ধব পরিবেশ কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত মালিকেরও লাভ।

উপসংহার

মে দিবসের চেতনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি তাঁর প্রাপ্য। এই চেতনাকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কেবল মে দিবসে ব্যানার, শোভাযাত্রা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সংগঠনের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার।

শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা যদি শ্রমিকদের উন্নত জীবনের ভিত্তি তৈরি করতে পারি, তবেই মে দিবস হবে অর্থবহ; আর বাংলাদেশ একটি মানবিক, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

সাহিদা পারভীন শিখা সাধারণ সম্পাদক জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

সম্পর্কিত নিবন্ধ