চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সমর্থন করে না বিএনপি
Published: 8th, February 2025 GMT
দেশজুড়ে চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সমর্থন করছে না বিএনপি। তাদের দৃষ্টিতে গণঅভ্যুত্থানের ছয় মাস পর এই ধরনের ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। এটা নির্বাচন প্রলম্বিত করার ষড়যন্ত্র। বিভিন্ন জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই বর্তায়। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সরকারকেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। নইলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আরও বাড়বে।
গতকাল শুক্রবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে এসব কথা বলা হয়েছে। রাজধানীর গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড.
জানা গেছে, গতকালের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সারাদেশে ভাঙচুর ও সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতারা মনে করছেন, দেশজুড়ে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনাগুলো আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রলম্বিত করার ষড়যন্ত্র। তা ছাড়া এটা এক ধরনের ফাঁদ। তাই নেতাকর্মীকে বিশৃঙ্খলা ও হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে
বিরোধী পক্ষের বাড়িঘরে আগুন ও ম্যুরাল ভাঙচুরসহ হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না। দেশ ও দলের বৃহত্তর স্বার্থে এই নির্দেশ প্রতিটি নেতাকর্মী অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন বলে দলীয়ভাবে প্রত্যাশা করা হয়েছে।
দলটির এক শীর্ষ নেতা বৈঠকে বলেছেন, বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানের পরপরই নানা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এতদিন পরে এসে কেন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটবে? তাহলে দেশ কি স্থিতিশীল হবে না?
এ বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা বলেছেন, এসব অরাজকতার মূল টার্গেট বিএনপি ও নির্বাচন। একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে ছাত্ররা শক্তি প্রদর্শন করছে। নির্বাচনকে প্রলম্বিত করা এর উদ্দেশ্য, যাতে দ্রুত সময়ে রোডম্যাপ ঘোষণা না করা হয়। কারণ, ছাত্ররা নতুন দল গঠন করে সারাদেশে সংগঠনকে সুসংহত করতে যথেষ্ট সময় চায়। অন্যদিকে বিএনপির দাবি, দ্রুত নির্বাচন।
আবার নির্বাচনের জন্য দেশি-বিদেশি চাপও বাড়ছে। এমন অবস্থায় নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সেই সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য পূরণ হবে না বলেও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নেতারা বলেছেন, ন্যূনতম সংস্কার করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই সরকারের লক্ষ্য। বৈঠকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ ও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে রমজান মাস শুরুর আগেই বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে সমাবেশের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। আগামী সোমবার কর্মসূচি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালে ডামি প্রার্থীর নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। আর দ্রুতই জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা দৃশ্যমান করুন
দেশের বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলা হয়, এর ব্যত্যয় হলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির প্রসার ঘটবে। তাই কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান করাটাই এখন সময়ের দাবি।
উদ্বেগ প্রকাশ করে এতে বলা হয়, সরকার চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা প্রকাশ করতে না পারলে রাষ্ট্র ও সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। উগ্র নৈরাজ্যবাদী গণতন্ত্রবিরোধী দেশি-বিদেশি অপশক্তির পাশাপাশি পরাজিত ফ্যাসিস্টদের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, যার উপসর্গ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এখনও প্রশাসনকে পতিত ফ্যাসিস্ট শাসকের দোসরমুক্ত করা হয়নি। বিচার বিভাগে কর্মরত ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনও বিদ্যমান। গণঅভ্যুত্থানবিরোধী সক্রিয় সদস্যরা এখনও পুলিশ প্রশাসনে কর্মরত। এ অবস্থায় সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সফলতা অর্জন করতে পারবে কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে।
বর্তমান সরকার গত ছয় মাসেও পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ জনসম্মুখে দৃশ্যমান করতে সফল হয়নি বলে জনগণের মনে হয়েছে। ফলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হচ্ছে। একটি সরকার বহাল থাকা অবস্থায়, জনগণ এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিলে, দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জনগণের প্রত্যাশা ছিল– আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, যা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। তা ছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা ধরনের দাবি নিয়ে যখন-তখন সড়কে ‘মব কালচারের’ মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে, যা নিয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে মুনশিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ব এনপ গণঅভ য ত থ ন র পর স থ ত পর স থ ত র সরক র র ন সরক র কম ট র ব ত কর র জন ত র জন য অবস থ ব এনপ
এছাড়াও পড়ুন:
গণঅভ্যুত্থানে শহীদ রিজভীর ভাইকে কুপিয়ে জখম, গ্রেপ্তার ৩
নোয়াখালী জেলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মাহমুদুল হাসান রিজভীর ছোট ভাই স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসান রিমনকে (১৬) এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে আহতের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। রবিবার (২৮ এপ্রিল) রাতে সুধারাম মডেল থানায় রিমনের মা বাদী হয়ে দায়ের করেন। পুলিশ এ ঘটনায় তিন কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম ও ছবি প্রকাশ করেনি।
এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে রিমনের স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে।
আহত শাহরিয়ার হাসান রিমন জেলা শহরের বসুন্ধরা কলোনি বাসিন্দা মো. জামাল উদ্দিন ও ফরিদা ইয়াছমিন দম্পত্তির ছেলে। সে স্থানীয় হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আরো পড়ুন:
কুমিল্লায় বজ্রপাতে ৪ জনের মৃত্যু
ধর্ষণের অভিযোগে গণপিটুনি, কারাগারে ইমামের মৃত্যু
বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে রোববার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে কিশোর গ্যাং সদস্যরা শাহরিয়ার হাসান রিমনকে ধারালো ছুরি এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তবে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় রাতে আহত রিমনের মা ফরিদা ইয়াছমিন ২১ জনকে এজহারভুক্ত ও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ রাতেই অভিযান পরিচালনা করে তিন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে।
রিমনের মা ফরিদা ইয়াছমিন জানান, রিমনের পিঠে, মাথায়সহ মোট ছয়টি ছুরির আঘাত করা হয়। তার অপারেশন ঢাকা মেডিকেল কলেজে করানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসা চলছে। তার পিঠের আঘাতগুলো ফুসফুস পর্যন্ত চলে গেছে বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।
তিনি আরো জানান, হামলাকারীরা ভেবেছিল রিমন মারা গেছে। যখন জানতে পারে সে বেঁচে আছে, তখন তারা ফের হামলা করতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। রিমনের অপরাধ দুই দল কিশোরের মাঝে চলমান দ্বন্দ্ব মিমাংসা করে দেওয়া। একপক্ষ মানলেও অপরপক্ষ মিমাংসার বিষয়টি মন থেকে মানতে পারেনি। তারাই আমার ছেলের উপর হামলা করেছে।
রিমনের বাবা জামাল উদ্দিন বলেন, রিমনকে ধারালো ছুরি দিয়ে মোট ছয়টি আঘাত করা হয়েছে। নোয়াখালী জেনারেল হাসপতালে নেওয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি রিমনের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছেন।
ঢাকায় রিমনের সঙ্গে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদা সুলতানা ইতু জানান, রাতেই রিমনের সিটিস্ক্যান করা হয়েছে। এরপর তার অপারেশন হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, রিমনের পিঠের আঘাতগুলো গুরুতর। ছুরির আঘাত প্রায় ফুসফুস পর্যন্ত চলে এসেছে। তার সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে।
রবিবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে জেলা শহরের বার্লিংটন মোড়ে একদল কিশোর রিমনকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করে।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নোয়াখালী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের বার্লিংটন এলাকাটি কিশোর গ্যাংয়ের আখড়া। এই এলাকা দিয়ে প্রতিদিন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, হরিনারায়ণপুর স্কুল, সরকারি মহিলা কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা যাতায়াত করে। প্রতিদিন তাদের উত্ত্যক্ত করা হয়। কিন্তু ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করে না। প্রশাসনেরও নজরদারি নেই।
এদিকে, রিমনকে ছুরিকাঘাত করে আহত করার প্রতিবাদে তার স্কুলের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্কুলের সামনে প্রধান সড়কে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে রিমনের স্কুলের শিক্ষার্থী ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী, স্কুলের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বক্তারা অবিলম্বে রিমনের উপর যারা হামলা করেছেন, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এজহারভুক্ত একজনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় আমাদের আরো অনুসন্ধান চলছে। সিসি ক্যামেরা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপরাধীদের খুব দ্রুতই আইনের আওতায় আনতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি।
ঢাকা/সুজন/বকুল