চালের দাম বিশ্ববাজারে সর্বনিম্ন, দেশে চড়া
Published: 30th, November 2025 GMT
বিশ্ববাজারে চালের দাম ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিকারক দেশগুলোতে আমদানির চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশেও উৎপাদন বেড়েছে বলে সরকারি হিসাবে উঠে এসেছে। কিন্তু দাম সেভাবে কমছে না; বরং তা সর্বোচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে চালের গড় দাম এখন পর্যন্ত ৩১ শতাংশ কমেছে। ২০২৬ সালে আরও ১ শতাংশ কমতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। খোলাবাজারে চাল বিক্রি অব্যাহত আছে। বাজারে দাম না কমলে প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।এফপিএমইউ মহাপরিচালক মো.মাহবুবুর রহমান
বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত ১ জানুয়ারি মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকা, যা এখন ৫৪-৬০ টাকা। সরু চালের দাম জানুয়ারিতে ছিল ৭০-৮০ টাকা, যা এখন ৭০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর বিশ্ববাজারে চালের দাম ৩১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে কমেনি, বরং বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখন নিয়মিত চাল আমদানি করছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। আর গত জুলাই থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫ লাখ টন।
চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। মূল্যস্ফীতিতে চালের দামের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে গত এক বছরে ধানের দাম ১১ শতাংশ, সরু চালের দাম ১১ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ১৩ শতাংশ ও মোটা চালের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে চালের দাম কমেছে ৩৬-৩৭ শতাংশ।ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ফেলেছে। তবে বাংলাদেশে এখনো মূল্যস্ফীতির হার চড়া, ৮ শতাংশের বেশি। অবশ্য এ হার আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে ওই অনুপাতে দাম কমেনি, এটা তাঁরাও অনুধাবন করেছেন। কিছুদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মাহবুবুর রহমান বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। খোলাবাজারে চাল বিক্রি অব্যাহত আছে। বাজারে দাম না কমলে প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।
রাজধানীর বাজারে চড়া দামে চাল বিক্রি হওয়ার বিষয়টিতে তদারকির অভাব।বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম লায়েক আলী চালের চাহিদা ও উৎপাদন২০২০ সালের পর থেকেই দেশের বাজারে চালের দাম চড়া। টিসিবির হিসাবে, ওই বছরের শুরুতে মোটা চালের কেজি ছিল ৩০-৩৫ টাকা। এর পর থেকেই দর বাড়ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দাম কমাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে স্বস্তিকর পরিস্থিতির পরও দাম কমছে না।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে চাল উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি। যদিও এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে গত এক বছরে ধানের দাম ১১ শতাংশ, সরু চালের দাম ১১ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ১৩ শতাংশ ও মোটা চালের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে চালের দাম কমেছে ৩৬-৩৭ শতাংশ।
বিশ্ববাজার থেকে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের দাম ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় সমস্যা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডলারের দাম ১২২ টাকার আশপাশেই আছে। ফলে ডলারের কারণে খরচ বেড়েছে, তা বলা যাবে না।
অন্যদিকে সরকার চাল আমদানি শুল্ক–কর প্রায় পুরোটাই তুলে নিয়েছে। তবে আমদানি উন্মুক্ত নয়। চাল আমদানির জন্য আবেদন করতে হয়। সরকার অনুমতি দিলেই কেবল আমদানি করা যায়।
দেশে উৎপাদন বেশি, বিশ্ববাজারে দাম কম, তারপরও কেন চালের দর কমছে না, জানতে চাইলে ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মিল পর্যায়ে চালের দাম কমেনি। তাই তাঁরাও আগের দামেই বিক্রি করছেন।
বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে কত খরচ পড়ছে, তা দেখা যায় সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ১৬ নভেম্বর ভারতের গুরুদেব এক্সপোর্টস করপোরেশন থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি টন চালের দাম ঠিক হয় প্রায় ৩৫৭ মার্কিন ডলার। তাতে প্রতি কেজি চালের দাম পড়ে ৪৩ টাকা ৫৩ পয়সা। এর সঙ্গে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ হবে।
মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম লায়েক আলী প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে, এটা ঠিক। দেশেও উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে দাম কমার কথা। কিন্তু তদারকির অভাবে বাজারে এমন পরিস্থিতি চলছে। এখন সব পর্যায়ে দামের চালান আছে। মিল কম বা বেশি দামে বিক্রি করলে তা যাচাই করতে পারে সরকার।
লায়েক আলী বলেন, বাজারে দাম বেশি থাকলেও এখন চালের উৎপাদন পর্যায়ে দাম কমেছে। ধানের দামও মণপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা কমেছে। এ কারণে এখন মিলগুলো কম দামে বাজারে চাল ছাড়ছে। রাজধানীর বাজারে চড়া দামে চাল বিক্রি হওয়ার বিষয়টিতে তদারকির অভাব।
বিগত বছরগুলোতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাঁর অনুমান হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমিষ গ্রহণ কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ভাত খাওয়া, যা চালের চাহিদা বাড়িয়েছে।সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ৫৫% ব্যয় খাবারের পেছনেদেশের স্বল্প আয় ও দরিদ্র মানুষের আয়ের বড় অংশ চলে যায় চাল কেনার পেছনে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, জাতীয় গড় অনুযায়ী একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ৫৫ শতাংশের মতো যায় খাবার কেনার পেছনে।
দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, কর্মসংস্থানে গতি নেই। এ সময় মূল্যস্ফীতিও সেভাবে কমছে না। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এখন চালের বাজার নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা দরকার। সে অনুযায়ী নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই সুফল পায়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাঁর অনুমান হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমিষ গ্রহণ কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ভাত খাওয়া, যা চালের চাহিদা বাড়িয়েছে। উৎপাদনের যে হিসাব, সেটাও আস্থা রাখার মতো নয়। চালের বাজারে সীমিতসংখ্যক বড় ব্যবসায়ীর ওপর সরকারের নজরদারিতে ঘাটতি আছে।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এসব নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার, যা ভবিষ্যতে বাস্তবানুগ নীতিসিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: চ ল আমদ ন র ব শ বব জ র র দ ম কম দ ম কম ছ ব সরক র র পর য র অন ম ন পর য পর য য় ল র পর
এছাড়াও পড়ুন:
চালের দাম বিশ্ববাজারে সর্বনিম্ন, দেশে চড়া
বিশ্ববাজারে চালের দাম ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিকারক দেশগুলোতে আমদানির চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশেও উৎপাদন বেড়েছে বলে সরকারি হিসাবে উঠে এসেছে। কিন্তু দাম সেভাবে কমছে না; বরং তা সর্বোচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে চালের গড় দাম এখন পর্যন্ত ৩১ শতাংশ কমেছে। ২০২৬ সালে আরও ১ শতাংশ কমতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। খোলাবাজারে চাল বিক্রি অব্যাহত আছে। বাজারে দাম না কমলে প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।এফপিএমইউ মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানবাংলাদেশের সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত ১ জানুয়ারি মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকা, যা এখন ৫৪-৬০ টাকা। সরু চালের দাম জানুয়ারিতে ছিল ৭০-৮০ টাকা, যা এখন ৭০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর বিশ্ববাজারে চালের দাম ৩১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে কমেনি, বরং বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখন নিয়মিত চাল আমদানি করছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। আর গত জুলাই থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫ লাখ টন।
চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। মূল্যস্ফীতিতে চালের দামের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে গত এক বছরে ধানের দাম ১১ শতাংশ, সরু চালের দাম ১১ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ১৩ শতাংশ ও মোটা চালের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে চালের দাম কমেছে ৩৬-৩৭ শতাংশ।ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ফেলেছে। তবে বাংলাদেশে এখনো মূল্যস্ফীতির হার চড়া, ৮ শতাংশের বেশি। অবশ্য এ হার আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে ওই অনুপাতে দাম কমেনি, এটা তাঁরাও অনুধাবন করেছেন। কিছুদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মাহবুবুর রহমান বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। খোলাবাজারে চাল বিক্রি অব্যাহত আছে। বাজারে দাম না কমলে প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।
রাজধানীর বাজারে চড়া দামে চাল বিক্রি হওয়ার বিষয়টিতে তদারকির অভাব।বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম লায়েক আলী চালের চাহিদা ও উৎপাদন২০২০ সালের পর থেকেই দেশের বাজারে চালের দাম চড়া। টিসিবির হিসাবে, ওই বছরের শুরুতে মোটা চালের কেজি ছিল ৩০-৩৫ টাকা। এর পর থেকেই দর বাড়ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দাম কমাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে স্বস্তিকর পরিস্থিতির পরও দাম কমছে না।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে চাল উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি। যদিও এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে গত এক বছরে ধানের দাম ১১ শতাংশ, সরু চালের দাম ১১ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ১৩ শতাংশ ও মোটা চালের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে চালের দাম কমেছে ৩৬-৩৭ শতাংশ।
বিশ্ববাজার থেকে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের দাম ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় সমস্যা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডলারের দাম ১২২ টাকার আশপাশেই আছে। ফলে ডলারের কারণে খরচ বেড়েছে, তা বলা যাবে না।
অন্যদিকে সরকার চাল আমদানি শুল্ক–কর প্রায় পুরোটাই তুলে নিয়েছে। তবে আমদানি উন্মুক্ত নয়। চাল আমদানির জন্য আবেদন করতে হয়। সরকার অনুমতি দিলেই কেবল আমদানি করা যায়।
দেশে উৎপাদন বেশি, বিশ্ববাজারে দাম কম, তারপরও কেন চালের দর কমছে না, জানতে চাইলে ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মিল পর্যায়ে চালের দাম কমেনি। তাই তাঁরাও আগের দামেই বিক্রি করছেন।
বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে কত খরচ পড়ছে, তা দেখা যায় সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ১৬ নভেম্বর ভারতের গুরুদেব এক্সপোর্টস করপোরেশন থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি টন চালের দাম ঠিক হয় প্রায় ৩৫৭ মার্কিন ডলার। তাতে প্রতি কেজি চালের দাম পড়ে ৪৩ টাকা ৫৩ পয়সা। এর সঙ্গে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ হবে।
মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম লায়েক আলী প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে, এটা ঠিক। দেশেও উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে দাম কমার কথা। কিন্তু তদারকির অভাবে বাজারে এমন পরিস্থিতি চলছে। এখন সব পর্যায়ে দামের চালান আছে। মিল কম বা বেশি দামে বিক্রি করলে তা যাচাই করতে পারে সরকার।
লায়েক আলী বলেন, বাজারে দাম বেশি থাকলেও এখন চালের উৎপাদন পর্যায়ে দাম কমেছে। ধানের দামও মণপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা কমেছে। এ কারণে এখন মিলগুলো কম দামে বাজারে চাল ছাড়ছে। রাজধানীর বাজারে চড়া দামে চাল বিক্রি হওয়ার বিষয়টিতে তদারকির অভাব।
বিগত বছরগুলোতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাঁর অনুমান হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমিষ গ্রহণ কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ভাত খাওয়া, যা চালের চাহিদা বাড়িয়েছে।সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ৫৫% ব্যয় খাবারের পেছনেদেশের স্বল্প আয় ও দরিদ্র মানুষের আয়ের বড় অংশ চলে যায় চাল কেনার পেছনে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, জাতীয় গড় অনুযায়ী একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ৫৫ শতাংশের মতো যায় খাবার কেনার পেছনে।
দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, কর্মসংস্থানে গতি নেই। এ সময় মূল্যস্ফীতিও সেভাবে কমছে না। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এখন চালের বাজার নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা দরকার। সে অনুযায়ী নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই সুফল পায়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাঁর অনুমান হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আমিষ গ্রহণ কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ভাত খাওয়া, যা চালের চাহিদা বাড়িয়েছে। উৎপাদনের যে হিসাব, সেটাও আস্থা রাখার মতো নয়। চালের বাজারে সীমিতসংখ্যক বড় ব্যবসায়ীর ওপর সরকারের নজরদারিতে ঘাটতি আছে।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এসব নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার, যা ভবিষ্যতে বাস্তবানুগ নীতিসিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।