কৃষ্ণসাগরে জ্বালানিবাহী জোড়া ট্যাংকারে ইউক্রেনের হামলা
Published: 30th, November 2025 GMT
কৃষ্ণসাগর অতিক্রম করার সময় রাশিয়ার কথিত ‘ছায়া নৌবহরের’ জ্বালানি তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে ইউক্রেনের নৌবাহিনী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন।
বিবিসির পক্ষ থেকে এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে দেখা গেছে, ইউক্রেনের ড্রোনগুলো দ্রুতগতিতে ট্যাংকারে প্রবেশ করে। এরপর বিস্ফোরণ ঘটতে, আগুন জ্বলতে ও কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
আরও পড়ুনইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক রুশ হামলা, ৬ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন১২ ঘণ্টা আগেতুরস্কের উপকূলে গত শুক্রবার ওই দুটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আক্রান্ত ট্যাংকার দুটির নাম ‘কায়রোস’ ও ‘বিরাট’। দুটি ট্যাংকারই গাম্বিয়ার পতাকাবাহী।
গতকাল শনিবার ‘বিরাট’ নামের ট্যাংকারে আরেক দফা হামলার খবর পাওয়া যায়। যদিও এসব হামলায় হতাহতের কোনো খবর জানা যায়নি।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বেছে বেছে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের রাজস্বের উৎসগুলোয় হামলা চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলা জোরদার করা হয়েছে। কেননা এসব উৎস ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের পেছনে অর্থায়নের বিষয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার দুটি রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর পুরোদস্তুর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে পশ্চিমারা। এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে এমন শত শত নৌযান ব্যবহার করে মস্কো। এগুলোকে রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহর’ বলা হয়।
আরও পড়ুনখারাপ চুক্তি, নয়তো আরও যুদ্ধ—মহাসংকটে জেলেনস্কি২৮ নভেম্বর ২০২৫সাধারণত ‘ছায়া নৌবহরে’ বেশ পুরোনো ট্যাংকার ব্যবহার করা হয়। এসব নৌযানের প্রকৃত মালিকানা, এমনকি বিমা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে।
এর মধ্যে কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘কায়রোস’ ট্যাংকারটি হামলার শিকার হয়েছে। আর ‘বিরাট’ লক্ষ্যবস্তু হয়েছে কৃষ্ণসাগরের আরও পূর্ব দিকের অঞ্চলে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, দুটি ট্যাংকারই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বিবিসিকে জানায়, ইউক্রেনের নৌবাহিনী এসব হামলায় ‘সি বেবি ড্রোন’ ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিষেবা এসব নৌ ড্রোন তৈরি করেছে, যা এসবিইউ নামে পরিচিত।
আরও পড়ুনইউক্রেনকে ছাড় দেবে না রাশিয়া ২৭ নভেম্বর ২০২৫.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ইউক র ন র আরও প ন বহর
এছাড়াও পড়ুন:
রাশিয়াকে ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য যে মূল্য দিতে হবে
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের চতুর্থ বর্ষপূর্তি ঘনিয়ে আসছে; কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখনো সেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়নি যা ইউক্রেনের পরিস্থিতিতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারত। সেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি হলো, রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনকে সাহায্য করা। এই সম্পদ ব্যবহার করা গেলে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে ইউরোপের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হবে।
এ সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জানান, ইউক্রেনের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টি ইইউ দেশগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত করবে।
রাশিয়া ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের বাড়িঘর, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থা, ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ—সবই হামলার শিকার হচ্ছে। তাই আর্থিক সহায়তা তাদের এখন খুবই দরকার।
যুদ্ধ যদি ২০২৬ সালে শেষ হয়ও এবং পুনর্গঠনের বিশাল খরচ (যা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অনেক বেশি) বাদও দেওয়া হয়, তারপরও অন্যান্য সহায়তার বাইরে শুধু যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ক্ষতির জন্য ইউক্রেনের আগামী দুই বছরে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার লাগবে।
আরও পড়ুনইউক্রেন জয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই পুতিনের১৮ নভেম্বর ২০২৫ইউক্রেন এখনো সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ করছে। অসীম শক্তিধর আক্রমণকারীকে তারা প্রায় স্থবির করে রেখেছে। রাশিয়ার হতাহতের সংখ্যা (মৃত ও আহত মিলিয়ে) ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। এত মানুষের প্রাণহানির পরও রাশিয়া খুব সামান্যই লাভ করেছে। যুদ্ধ শুরুর সময় যে কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর কথা রাশিয়া জানিয়েছিল, তার কোনোটিই তারা পূরণ করতে পারেনি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পরপরই পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটকে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে জি-৭ দেশগুলো একটি ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি রেভিনিউ অ্যাকসেলারেশন’ (ইআরএ) কর্মসূচি শুরু করে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে পাওয়া সুদ দিয়ে ইউক্রেনকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ ঋণ দেওয়া সেই দিকেই একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ, যা আমেরিকার অংশগ্রহণ ছাড়াই ইউরোপ করতে পারে। এই পথ অনুসরণ না করা নৈতিকভাবে ভুল হবে। ইউক্রেনে যে হত্যাযজ্ঞ রাশিয়া চালিয়েছে, তার দায় রাশিয়ার।এই ঋণ ইউক্রেনকে ফেরত দিতে হবে না, যতক্ষণ না রাশিয়া ইউক্রেনকে সব ক্ষতিপূরণ দেয়। আর মূল পার্থক্য হলো, ইউরোক্লিয়ার আগের মতো ইসিবির অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না রেখে এখন সেই অর্থ কমিশনের সবচেয়ে নিরাপদ (এএএ রেটেড) বন্ডে বিনিয়োগ করবে। রাশিয়া চাইলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর আবার এই সম্পদের মালিকানা ফিরে পেতে পারে। অর্থাৎ ঋণটি অস্থায়ী ও ফেরতযোগ্য।
আমরা আগেও বলেছি, এটিকে ‘সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা’ বলে কেউ দেখবে না। যারা বলেছিল সম্পদ আটকে রাখলে বা ইআরএ কর্মসূচি চালু হলে নানা ক্ষতি হবে—তাদের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর একটিও সত্য হয়নি। ইউরো এখনো ডলারের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। আর ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ স্থান।
আরও পড়ুনইউক্রেন হেরে গেলে তারপর কী হবে...১৫ জুলাই ২০২৫আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম ভেঙে রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা–সংকট তৈরি করেছে; কিন্তু তবু তার সম্পদ ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের আইনি সুরক্ষা পাচ্ছে। আদতে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর সময় এখনই। তেল-গ্যাস থেকে আয় কমে যাওয়ায় রাশিয়ার পক্ষে এই যুদ্ধ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে তার প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে, আর উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি রুশ জনগণকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ফলে সবচেয়ে বড় আমদানিকারক ভারত রুশ তেলের আমদানি বন্ধ করেছে। চীনের চারটি বড় রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিও সাময়িকভাবে রুশ তেল না কেনার ইঙ্গিত দিয়েছে। রাশিয়ার তেলের ৮৫ শতাংশ বিক্রি হয় ভারত ও চীনে। এই বাজার হারালে রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতার ওপর বড় চাপ পড়বে। তাই রাশিয়া এখন দ্রুতই অনুকূল শর্তে যুদ্ধের ইতি টানতে চাইছে।
আরও পড়ুনইউক্রেন থেকে যেভাবে ফায়দা লুটছে আমেরিকা–ইউরোপ১২ জুলাই ২০২৫ক্ষতিপূরণ ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকি ভাগাভাগি করার জন্য বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট দে ওয়েভার চাইছেন, ইইউর অন্যান্য দেশ গ্যারান্টি দিক যেন রাশিয়ার পক্ষে কোনো মামলা জিতে গেলে বেলজিয়ামকে ক্ষতিপূরণ দিতে না হয়। তাই প্রতিটি দেশ তাদের মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে ঋণের একটি অংশের গ্যারান্টি দেবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তিগুলো বাতিল করা। এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। রাশিয়া তো ইতিমধ্যে অনেক ইউরোপীয় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ইউরোপের বহু নেতা স্বীকার করেন, ইউরোপকে (যুক্তরাজ্য ও নরওয়েসহ) নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ ঋণ দেওয়া সেই দিকেই একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ, যা আমেরিকার অংশগ্রহণ ছাড়াই ইউরোপ করতে পারে। এই পথ অনুসরণ না করা নৈতিকভাবে ভুল হবে। ইউক্রেনে যে হত্যাযজ্ঞ রাশিয়া চালিয়েছে, তার দায় রাশিয়ার।
জোসেফ ই. স্টিগলিৎস নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
অ্যান্ড্রু কোসেনকো মারিস্ট কলেজের স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত