সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক প্রকল্পের ঘোষিত উদ্দেশ্য যাহাই হউক, বাস্তবে উহা ছিল সরকারি অর্থ নয়ছয়ের ন্যক্কারজনক আয়োজন। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এতৎসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এহেন চিত্রই পরিস্ফুট। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ২০১০ সালের আগস্টে সূচিত কর্মসূচির অধীনে পরবর্তী ১৪ বৎসরে দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টিসহ ৫৮ জেলায় ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ৮৭ কোটির অধিক টাকা বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দের প্রায় ২৮ কোটি টাকা ছিল উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায়। তন্মধ্যে কতিপয় জেলা ঘুরিয়া প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতা হইল, প্রকল্পের সুবিধা লইয়াও অধিকাংশ ভিক্ষুক ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে স্থায়ী হইতে পারেন নাই। অঞ্চলগুলিতে ভিক্ষাবৃত্তি হ্রাসের বিপরীতে বরং নূতন ভিক্ষুকের আবির্ভাব দেখা গিয়াছে। তদুপরি, সরকারি নথির তথ্য উদ্ধৃত করিয়া তিনি জানাইয়াছেন, ভিক্ষুক পুনর্বাসনে ক্ষুদ্র ব্যবসা, গরু-ছাগল-ভেড়া, হাঁস-মুরগি ও সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। তবে বরাদ্দের বৃহদাংশ ৬৫ শতাংশ ব্যয় হইয়াছে জরিপ, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে। প্রশিক্ষণের নামে এই প্রকল্পে শুধু কাগজ-কলমে কর্মসূচি চলিবার কারণে সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীর পক্ষে কর্মদক্ষতা অর্জন সম্ভব হয় নাই। ফলে ‘পুনর্বাসিত’ ভিক্ষুকরা ফিরিয়া গিয়াছেন পুরাতন পেশায়। শুধু উহাই নহে; প্রকল্পের ‘উপকারভোগী’ সকলে বাস্তবে ভিক্ষুকও ছিলেন না। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেদনে বগুড়া সদরে প্রকল্পের উপকারভোগী ১০ জনের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন প্রকৃত ভিক্ষুক।
স্পষ্টত, প্রকল্পের উপকারভোগী বাছাই প্রক্রিয়াতেই গন্ডগোল ছিল, যাহার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপেক্ষা করিতে পারেন না। তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও এহেন অপকর্মে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, উহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। তাহারা যে কাঙালের ধনে ভাগ বসাইতেই এহেন ভুয়া উপকারভোগী বাছাই করিয়াছেন, তাহাও বলা বাহুল্য। প্রতিবেদনে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-বগুড়া জেলা শাখার সম্পাদক যথার্থই বলিয়াছেন, প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকিবার কারণে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি ফলপ্রসূ হইতেছে না। এই উপসংহারও টানা যায়, প্রকল্পটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পকেট ভরিয়াছে মাত্র।
আলোচ্য প্রতিবেদনটি উত্তরাঞ্চল বিষয়ে হইলেও সমকালে একই দিনে আরেকটি প্রতিবেদন ছাপা হইয়াছে, যাহার শিরোনাম– ‘ভিক্ষুকমুক্ত খুলনা শুধু নামেই’। উপরন্তু গত ১২ মার্চ কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় একই কর্মসূচির ব্যর্থতা লইয়া সমকালে আরেকটি প্রতিবেদন ছাপা হইয়াছিল। অর্থাৎ ভিক্ষাবৃত্তি হইতে দরিদ্র মানুষকে দূরে রাখিবার লক্ষ্যে গৃহীত সরকারি প্রকল্পটি শুধু উত্তরাঞ্চলেই নহে, প্রায় সর্বত্র ব্যর্থ হইয়াছে, যদিও প্রকল্প ‘সফল’ বলিয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদ্রূপ মুখে ফেনা তুলিতে কোনো লজ্জা পান নাই, তদ্রূপ সরকারি প্রতিবেদনেও কথিত সাফল্যের জন্য উহাদের বাহবা দান আটকায় নাই। সরকারি প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থ নয়ছয়ের বহু নজির আমরা বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। উক্ত প্রকল্প সেই ক্ষেত্রেও নূতন নজির স্থাপনা করিল।
‘ভিক্ষাবৃত্তি’ শব্দটি শ্রবণে একটা পেশা মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে উহা কোনো সম্মানজনক পেশা নহে। বাংলাদেশের ন্যায় অচিরেই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তালিকায় স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হইবার পথে থাকা রাষ্ট্রের জন্যও উহা আদৌ সম্মানজনক নহে। সুতরাং ভিক্ষাবৃত্তির অবসান শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্য শোভন ও মর্যাদাবান জীবন নিশ্চিত করিবার জন্যই নহে, জাতীয় স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। ইহাও সত্য, কেবল সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির সাফল্যই এহেন অবমাননাকর বৃত্তির অবসান ঘটাইতে পারে না; অন্তত দারিদ্র্যমুক্ত বলিয়া পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিক্ষুকের উপস্থিতিই উহার সপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। অতএব, ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে পৃথক কর্মসূচির যৌক্তিকতা অস্বীকারের উপায় নাই। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটি বাস্তবানুগ ও টেকসই হইতে হয়– ইহাও অনস্বীকার্য।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: প রকল প র র জন য হইয় ছ সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
সাকিবের পথে হাঁটছেন মিরাজ
সাকিব আল হাসানের সঙ্গে নিজের তুলনাকে মেহেদী হাসান মিরাজ হয়তো উপভোগই করেন। কারণ, তাঁর স্বপ্ন সাকিবের মতো বিশ্বনন্দিত অলরাউন্ডার হয়ে ওঠা। সেই পথে বোধ হয় গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে টেস্টে দেশে-বিদেশে সম্প্রতি ভালো করছেন। পাকিস্তানে দারুণ প্রশংসিত ছিলেন অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই টেস্টের হোম সিরিজে উভয় টেস্টে নিজেকে ছাপিয়ে গেলেন। সিলেটের হারের ম্যাচেও ১০ উইকেট ছিল তাঁর। চট্টগ্রামে সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট নিয়ে সাকিব ও সোহাগ গাজীর কাতারে নাম লেখালেন। মূলত মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ইনিংস ব্যবধানে টেস্ট জেতা সম্ভব হয়।
গতকাল শতকের ঘরে যেতে কম কসরত করতে হয়নি তাঁর। নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে তো অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিলেন হাসানের আউটের শঙ্কায়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় দ্বিতীয় শতকের দেখা পান তিনি। ২০২১ সালে এই চট্টগ্রামেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি ছিল মিরাজের। গতকালের পারফরম্যান্স নিয়ে টাইগার এ অলরাউন্ডার বলেন, ‘ব্যাটিংয়ের সময় চেষ্টা করেছিলাম ২ রান নিয়ে ১০০ রানে যেতে। সেভাবে দৌড় দিয়েছিলাম। কিন্তু ফিল্ডারের হাতে বল চলে গিয়েছিল (হাসি)। তার পর তো আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। হাসান অনেক ভালো সাপোর্ট দিয়েছে। তানজিমও ভালো সাপোর্ট দিয়েছে। তাইজুল ভাইও। এই তিনজনকেই অনেক অনেক ধন্যবাদ। কারণ, ওদের জন্যই আমি ১০০ রান করতে পেরেছি।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করা সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট প্রাপ্তিকে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দাবি মিরাজের, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ১০০ করেছিলাম, ৩ উইকেট নিয়েছিলাম। অল্পের জন্য ৫ উইকেট হয়নি। হলে ভালো লাগত। ওই ম্যাচ হেরেছিলাম এই মাঠে। সে জিনিসটা মাথায় ছিল। ভালো লাগছে ম্যাচটি জিতেছি।’ মিরাজ ১৬২ বলে ১১টি চার ও একটি ছয় মেরে ১০৪ রান করেন। ২১ ওভারে ৩২ রান দিয়ে নেন পাঁচ উইকেট।
টেস্টে এ রকম অলরাউন্ড পারফরম্যান্স বাংলাদেশে আর দু’জনের আছে। সাকিব আল হাসান দু’বার ম্যাচে সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট পেয়েছেন ২০১১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরে আর ২০১৪ সালে খুলনায়। সোহাগ গাজী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট শিকার করেন চট্টগ্রামে। সেই মাইলফলক ছোঁয়া মিরাজকে সম্প্রতি অলরাউন্ডার ক্যাটেগরিতে ফেলা হয়। সাকিবের বিকল্প ভাবা হয় তাঁকে এখন।
এ ব্যাপারে মিরাজের অভিমত, ‘দেখেন একটা জিনিস, যখন সাকিব ভাই ছিলেন, ভিন্ন রোল ছিল। এখন ভিন্ন রোল। যেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট, সবাই ব্যাটিংয়ে আস্থা রাখে। আমিও ভেবেছি আমার ব্যাটিংটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন হয়তো আমি লিডিং রোল প্লে করছি, আগে সাকিব ভাই করত। এখন আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি।’
সিলেটে দুই ইনিংসে পাঁচ উইকেট করে নিয়েও দলকে জেতাতে পারেননি মিরাজ। চট্টগ্রামে সাদমান, তাইজুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ম্যাচ জয়ের নায়ক হন। এই সাফল্য নিয়ে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, প্রথম ম্যাচ হারার পর যেভাবে কামব্যাক করেছি, এটা খুবই দরকার ছিল। আমাদের সবাই ভেবেছিল, আমরা ভালো করব।’ মিরাজ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কোচিং স্টাফ ও সতীর্থের কাছে। আর তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা পুরো দলের।