উন্নত খাদ্য ও টেকসই কৃষিতে স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ
Published: 16th, October 2025 GMT
আজ ১৬ অক্টোবর আমরা উদ্যাপন করছি বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫। খাবার কেবল পেট ভরানোর উপকরণ নয়; এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার এক অমূল্য বিনিয়োগ। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘হাতে হাত রেখে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত ভবিষ্যতের দিকে’ স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; খাদ্যের মান, পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতিজাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৬৭ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য না পেয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ছিল। আফ্রিকায় প্রতি পাঁচজনের একজন ক্ষুধার্ত—যা প্রায় ৩০ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করছে। পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় চার কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছেন না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখনো প্রায় ৩২ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যের অভাবে শিশুর পুষ্টির ঘাটতি, নারী ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর শারীরিক দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা, নীতি প্রণয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান অপরিহার্য। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের আলোকে দেখা যায়, বাংলাদেশেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতিবাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভর করছে পর্যাপ্ত কৃষি উৎপাদন, পশুপালন, মৎস্য চাষ এবং সুষ্ঠু বণ্টনের ওপর। ২০২৩ সালে দেশে মোট দানাদার খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ৪৩ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ধান ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন। বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছিল ২ কোটি ১০ লাখ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম। তবে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; খাদ্যের পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে শিশু ও নারীর ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে প্রায় পাঁচ কোটি গবাদিপশু রয়েছে, যা দুধ ও মাংস উৎপাদনের মূল উৎস। ২০২৩-২৪ সালে দেশীয় দুধের মোট উৎপাদন প্রায় ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন এবং মাংসের উৎপাদন প্রায় ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন টন। সঠিক লালন-পালন ও খাওয়াদাওয়া নিশ্চিত করলে দেশের প্রোটিনের চাহিদার বড় অংশ পূরণ সম্ভব।
২০২৪ সালে দেশীয় মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন এবং সমুদ্রপথ থেকে ২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন আহরণ করা হয়েছে। মৎস্য ও সবজি রপ্তানিও বৃদ্ধি পেয়েছে; ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ৫৮ হাজার মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় তিন গুণ বেশি। বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা মানেই শুধু পরিমাণ নয়, সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খাবার মানেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কার্যকর খাদ্যের গুরুত্বআজকের দিনে খাদ্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে। শুধু পেট ভরানো নয়, খাদ্যের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। এই ধারণার ভিত্তিতে এসেছে কার্যকর খাদ্য বা ফাংশনাল ফুডের গুরুত্ব। উদাহরণস্বরূপ দইয়ের প্রোবায়োটিকস অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়, টমেটোর লাইকোপেন ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক এবং দুধের ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড় মজবুত রাখে। কার্যকর খাদ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—প্রাকৃতিক খাদ্য যেমন দই, মাছ, শাকসবজি, টমেটো এবং ফর্টিফায়েড (প্রযুক্তিনির্ভর) খাদ্য, যেমন ভিটামিন–সমৃদ্ধ দুধ, ক্যালসিয়ামযুক্ত ফলের রস বা ওমেগা-৩ মিশ্রিত তেল।
বিশ্ববাজারে স্বাস্থ্য সচেতনতার বৃদ্ধির কারণে কার্যকর খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে এর বাজারমূল্য প্রায় ২৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। দুগ্ধজাত খাদ্য যেমন দুধ, দই, পনির ও ছানায় রয়েছে হুই প্রোটিন, ল্যাকটোফেরিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোবায়োটিকস। এগুলো শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, ক্রীড়াবিদদের পেশি গঠন ও পুনর্বাসনে সহায়তা করে, প্রবীণদের হাড় মজবুত রাখে এবং সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ন্যানো টেকনোলজি ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যের সম্ভাবনা আরও প্রসারিত করেছে। এই কার্যকর খাদ্যের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করি।
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকিজলবায়ু পরিবর্তন আজ খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা ধান, সবজি, পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি গবাদিপশু দেশীয় দুধ, মাংস ও গোবর উৎপাদনের প্রধান উৎস। খরা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে খাদ্য ও পানিসংকট তৈরি হয়, যা গরুর দুধ উৎপাদন ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমাতে পারে।
ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) প্যারিস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমতে পারে। জাপানে তারা তাপসহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং নির্ভুল কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। পশুপালনে গরু ও ছাগলের জাত পরিবর্তন এবং ছায়া ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও লবণাক্ত ও তাপসহনশীল ফসলের জাত, পশুপালনে ছায়া ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই খাদ্য ও পানিপ্রযুক্তি গ্রহণ জরুরি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ ও কৃষি হলো খাদ্যনিরাপত্তার মূল হাতিয়ারকৃষি নেই তো খাদ্য নেই, খাদ্য নেই তো জীবন নেই। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে তরুণদের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি এবং সম্প্রতি প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ তরুণ কৃষি বা খামারে কাজ করছেন। তরুণেরা ডিজিটাল মার্কেটিং, স্মার্টফোন অ্যাপ, ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সহজ করছেন, পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, রপ্তানি ও খামার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করছেন।
তাদের পথে চ্যালেঞ্জ রয়েছে—আর্থিক ঝুঁকি, আয়ের অস্থিরতা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের অভাব, ঋণ প্রাপ্তি জটিলতা, জমি ও কৃষিব্যবস্থার সংস্কার, দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সামাজিক স্বীকৃতির ঘাটতি। সমাধান হিসেবে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা, আর্থিক সহায়তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, সরাসরি বাজারজাত এবং শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়ন। তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কেবল খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি প্রচলনও সম্ভব।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিবর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য পরিবেশবান্ধব কৃষি অপরিহার্য। পরিবেশবান্ধব কৃষির কিছু কার্যকর পদ্ধতি: রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে কম্পোস্ট ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার। শস্য পর্যায়ক্রমিক চাষ, ইন্টারক্রপিং ও কভার ক্রপ ব্যবহার। নো-টিল পদ্ধতি, ড্রিপ ইরিগেশন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি–পদ্ধতি এবং মৌমাছি, প্রজাপতিসহ উপকারী পোকামাকড়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশ; সৌরশক্তি ও বায়োগ্যাসের ব্যবহার; জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ।এসব পদ্ধতি দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।
এখনই কী করতে পারিটেকসই খাদ্য ভবিষ্যৎ গড়তে ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করতে হবে—স্থানীয় কৃষক ও উৎপাদকদের সহায়তা, খাবারের অপচয় রোধ, শিশু ও প্রবীণদের পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি উদ্যোগে খাদ্য বিতরণ, সামর্থ্য অনুযায়ী দান ইত্যাদি।
পরিশেষে, প্রাচীন প্রবাদ যেমন মনে করায়, ‘খাদ্যই ঔষধ, ঔষধই খাদ্য।’ আজ উন্নত খাদ্য ও টেকসই কৃষিই সেই কথার বাস্তবতা প্রমাণ করছে। স্থানীয় কৃষক, তরুণ উদ্যোক্তা ও সক্রিয় সম্প্রদায় একসঙ্গে হাতে হাত রেখে এগিয়ে এলে আমরা গড়ে তুলতে পারি নিরাপদ, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ।
• ড.
এ কে এম হুমায়ুন কবির অধ্যাপক ও গবেষক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। [email protected]
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ক র যকর খ দ য ও ট কসই ক ষ ম ল য ন টন ন শ চ ত কর ব যবস থ ব যবহ র স রক ষ পর ব শ দশম ক উৎপ দ জলব য
এছাড়াও পড়ুন:
ইউক্রেনে মিসাইলে, ভূমধ্যসাগরে জলদস্যুদের গুলিতে আমরা মরবই?
১৭ নভেম্বর প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার একটি খবরের শিরোনাম হলো, ‘লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর উপকূলে নৌকা ডুবে ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু’। আল–জাজিরার সূত্রে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ১৩ নভেম্বর রাতে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দিতে যাওয়া দুটি নৌকা লিবিয়ার উপকূলে ডুবে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় বাংলাদেশ থেকে আসা ২৬ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন মারা যান। অন্যদের উদ্ধার করা হয়।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের লাওখণ্ডা গ্রামে। দুজনেই তরুণ। এনামুল শেখের বয়স ২৭ আর আনিস শেখের বয়স ২৫। গত ১০ অক্টোবর তাঁরা বাংলাদেশ ছাড়েন। চার ভাইয়ের মধ্যে এনামুল ছিলেন সবার ছোট। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতেই তাঁর এই অগস্ত্যযাত্রা। আর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন নার্সের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আনিসের। তাঁদের সংসারে সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে।
আরও পড়ুনএত উন্নয়নের পরও কেন ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে আমাদের তরুণেরা২৬ আগস্ট ২০২৩ভাগ্য ফেরাতে ইতালি যাওয়ার জন্য তাঁরা মাদারীপুরের একজন দালালকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। লিবীয় রেড ক্রিসেন্টের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো মৃতদেহ গাড়িতে তোলা হচ্ছে। প্রিয়জনদের লাশ দেশে কবে ফিরবে, শেষ দেখাটা দেখতে পাবেন কি না, সেটাই এখন স্বজনদের একমাত্র আর্তনাদ।
মাদারীপুরের টগবগে তরুণ মুন্না তালুকদার। মাত্র ১৯ বছরে থেমে গেছে তাঁর জীবন। সাড়ে ২২ লাখ টাকায় বডি কন্ট্রাক্ট বা শরীর চুক্তি করে ইতালি পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই বডিটাই এখন মায়ের কাছে ফিরবে কি না, সেটাই বড় সংশয়। দালালেরা বলেছে, জলদস্যুদের গুলিতে রাজৈর উপজেলার বায়েজিদ শেখ নামের আরেক তরুণের সঙ্গে মুন্না গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে মুন্নার মা রাবেয়া বেগমের সেই আর্তিই শোনা যাচ্ছে: ‘দালাল আমার বাবারে বডি কন্ট্রাক্ট (শরীর চুক্তি) কইরা নিছে। বলছে, য্যামনে হোক, ইতালি লইয়া যাইবে। সাড়ে ২২ লাখ টাকা লইয়া ভাগছে। ওরা আমার বাবারে খারাপ নৌকায় দিয়া মাইরা ফালাইছে। দয়া কইরা আমার বাবার বডি (শরীর) আম্মেরা আইনা দেন। আম্মেগো পায় ধরি, আমার বাবার লাশটা আইনা দেন।’ (আম্মেগো পায় ধরি, আমার বাবার লাশটা আইনা দেন’ ১৯ নভেম্বর, ২০২৫)
সাড়ে ১৫ বছর বলি, আর ৫৪ বছর বলি, এতগুলো বছরের জঞ্জাল দেড় বছরে ধুয়ে–মুছে ফেলা অসম্ভব। যে তরুণদের কর্মসংস্থানের বঞ্চনা নিয়ে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সূচনা, তাঁদের কর্মসংস্থান, জীবনমান পাল্টানোর দৃশ্যমান কোনো প্রচেষ্টা, উদ্যোগ কোথাও দেখা যায়নি। বরং নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আবির্ভাব হতে দেখছি। আর ধীরে ধীরে বাদ পড়ে গেছেন শ্রেণি–পেশা–জাতি–লিঙ্গ নির্বিশেষে অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীরা।প্রথম আলোর মাদারীপুর প্রতিনিধি অজয় কুণ্ডুর একই প্রতিবেদনে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ইতালিযাত্রার একটা পথরেখা জানা যায়। ১২ অক্টোবর ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়েন মুন্না। প্রথমে তাঁকে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। পরে ওমরাহ হজ করতে যান মুন্না। হজ শেষে তাঁকে কুয়েত নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন রেখে নেওয়া হয় মিসরে। তারপর উড়োজাহাজে লিবিয়ার বেনগাজিতে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে লিবিয়ার মিসরাতা শহরের নেওয়া হয়। ১ নভেম্বর মুন্নাকে লিবিয়ার উপকূল থেকে নৌকায় ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়। একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অন্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মুন্নাকে তুলে দেয় দালাল চক্র। মুন্নাকে বহন করার নৌকাটি ভূমধ্যসাগরের কিছু দূর যাওয়ার পরই মাফিয়াদের (জলদস্যুদের) হামলার শিকার হয়।’
ভাগ্য বদলাতে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথে বাংলাদেশি তরুণদের এই আত্মহনন নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নৌকা ডুবে ৮ বাংলাদেশি মারা যান। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোটের হস্তক্ষেপে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। এর পর থেকে দেশটি দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে লিবিয়া হয়ে ওঠে বিশ্বের সংঘাতকবলিত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম ট্রানজিট রুট।
আরও পড়ুনটাইটানের ধনী অভিযাত্রীরা বনাম ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির হতভাগারা২৩ জুন ২০২৩আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার বরাতে ২০২৪ সালের মে মাসে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৪-২০২৪ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত অন্তত ২৮৩ জন বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে জীবন হারিয়েছেন। লিবিয়ায় অভিবাসী ও শরণার্থীদের আটকে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও নিয়মিত। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশি তরুণেরা কেন এমন মরিয়া হয়ে বডি কন্ট্রাক্ট করছেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপযাত্রা সবচেয়ে বিপজ্জনক রুটগুলোর একটি। ২০১৪-২০২৪—এই ১০ বছরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই পথে পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
বাংলাদেশি তরুণদের জীবন বাজি রেখে ভাগ্য ফেরানোর এই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের ২৫ বছরের যুবক আকরাম হোসেন ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মিসাইলের আঘাতে নিহত হওয়ার পর সবার নজরে আসে। ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শিখে তিনি রাশিয়ায় যান। কিন্তু দালালেরা তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে ‘চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা’ হিসেবে নিয়োগ করে। ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় ইউক্রেনে। গত ১৪ এপ্রিল সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ধারদেনা করে সাত লাখ টাকা জোগাড় করে পরিবার তাঁকে পাঠিয়েছিল রাশিয়ায়।
অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা যাচ্ছেন অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী। এমন ঘটনা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশিদের নামও উঠে আসছে প্রায় সময়।