ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কি ‘অকার্যকর’ প্রমাণিত হচ্ছে
Published: 30th, November 2025 GMT
ভারত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি রাশিয়া, চীন এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের আতিথ্য দিচ্ছে। বিষয়টি দেশটির দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতিকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ডিসেম্বরে ভারতে সফর করার কথা রয়েছে, যা হবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তাঁর প্রথম ভারত সফর। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আগামী বছর ভারতে আসতে পারেন, যখন দেশটি ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক হবে। কোয়াড নিরাপত্তা সংলাপের এ বছরের সম্মেলনটি এ মাসে ভারতে হওয়ার কথা থাকলেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অবনতির কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকটি যদি আগামী বছরে পুনর্নির্ধারিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতে সফর করতে পারেন।
তবে এই বয়ানের একটি উল্টো দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব বজায় রাখা পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় দূরত্বপূর্ণ বা উদাসীন হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প ভারতকে শাস্তি দিতে বাণিজ্য বৈষম্য এবং রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।
এদিকে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বজায় রাখে বা রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল, সেসব দেশকে একই মাত্রায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্ব (যেমন চীন) অথবা যুক্তরাষ্ট্রের জোটভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানের (যেমন জাপান, তুরস্ক) কারণে সেটা করা হয়নি।
ভিন্নতর আচরণটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের কৌশলগত অপরিহার্যতার অভাবই প্রতিফলিত হয়। ভারতের জন্য একটি মূল শিক্ষা হলো—নিষ্ক্রিয় নয় বরং আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলা।
জুন মাসে মোদি ও ট্রাম্প ফোনালাপ করেন, যেখানে ট্রাম্প মোদি ও মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। মোদি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং বিশেষত কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অনীহা রয়েছে। এরপর দুই নেতা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর কথা বলেননি, যা সম্পর্কের শীতলতার ইঙ্গিত দেয়।
২.২০২৫ সাল সম্ভবত ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য সবচেয়ে কঠিন পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বছর। এপ্রিল মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে এক সন্ত্রাসী হামলার পর মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাত ঘটে। সংক্ষিপ্ত হলেও এই সংঘাত ছিল দশকের মধ্যে দুই দেশের সবচেয়ে শত্রুতাপূর্ণ সময়।
ভারত-পাকিস্তান এ সংঘাত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতিরও উদ্দীপক হয়ে ওঠে। কারণ, ট্রাম্প দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার এ শত্রুতা অবসানের কৃতিত্ব দাবি করেন, যা নয়াদিল্লি খণ্ডন করলেও ইসলামাবাদ তা সানন্দে প্রতিধ্বনিত করে। অপমানের ওপর অপমান যোগ করে, সংঘর্ষের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়, যেখানে হোয়াইট হাউস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনিরকে দুবার আমন্ত্রণ জানায়।
জুন মাসে মোদি ও ট্রাম্প ফোনালাপ করেন, যেখানে ট্রাম্প মোদি ও মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। মোদি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং বিশেষত কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অনীহা রয়েছে। এরপর দুই নেতা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর কথা বলেননি, যা সম্পর্কের শীতলতার ইঙ্গিত দেয়।
আরও পড়ুনভারত–পাকিস্তানের রাজধানীতে ‘বিরল’ বিস্ফোরণ কী বার্তা দিল১৫ নভেম্বর ২০২৫এ সময়ের মধ্যে দুই দেশ দ্রুত অবনতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রবেশ করে। কারণ, আগস্টে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তারা কোনো বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি এবং এরপর ভারত ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ শুল্কের ‘শিকার’ হয়। ‘মৃত’ অর্থনীতি হিসেবে ভারতকে ট্রাম্পের অবমাননা করা এবং তাঁর বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর ‘ক্রেমলিনের লন্ড্রি’ বলে ভারতকে অভিহিত করা—দ্বিপক্ষীয় আস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দুই নেতার সাম্প্রতিক আপসসূচক বক্তব্য উত্তেজনা প্রশমনের এবং শেষ পর্যন্ত একটি বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে নয়াদিল্লির আগের অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস, যেমন ভারতীয়দের মধ্যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে অধিক ইতিবাচক মনোভাব ম্লান হয়েছে।
একইভাবে ম্লান হয়েছে মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ বা সুবিধাপ্রাপ্ত সম্পর্ক থাকার দাবি। মোদি তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গর্ব করতেন, যেখানে তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন। তবে এটি ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির ক্রোধ থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি।
আরও পড়ুনভারত ও পাকিস্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খেলা০৬ আগস্ট ২০২৫আরও মৌলিকভাবে বললে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সামনে থাকা বিস্তৃত চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে। ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এক বোঝা। একদিকে এটি ভারতকে নমনীয়তা দেয়। এটি স্পষ্ট হয় যখন ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীন-ভারত সম্পর্কে অবনতি ঘটে। নয়াদিল্লি এর জবাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা গভীর করে, যার প্রমাণ কোয়াডে ভারতের সম্পৃক্ততা এবং যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে তার গভীরতর সংযুক্তি।
এই বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য সুবিধা এনে দিচ্ছে। কারণ, এটি কোনো এক দেশের প্রতি বাধ্য নয়। ২০২৪ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মন্তব্য করেন, ভারতকে প্রশংসা করা উচিত তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বহুবিধ বিকল্প’ বজায় রাখার জন্য।
তবে গত বছরের ঘটনাবলি এই অবস্থানের ঔদ্ধত্যকে তুলে ধরে, যখন ভারতকে প্রধান শক্তিগুলোর মধ্য থেকে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়; তখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। এটাই ঘটে যখন ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করে; ইউক্রেনে শান্তিচুক্তি করতে মস্কোর ওপর চাপ প্রয়োগের একটি উপায় হিসেবে। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে নয়াদিল্লির সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কও ওয়াশিংটনের অধিকতর নজরদারিতে আসে।
আরও পড়ুনট্রাম্প আবার যেভাবে মোদিকে ধোঁকা দিলেন২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫৩.কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের শিকড় শীতল যুদ্ধকালীন নিরপেক্ষতার ধারণায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে যোগ দেওয়ার পর ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে কোনো জোটে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে তোলে, যা দেশের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারত। মূলত নিরপেক্ষতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সব প্রধান প্রভাবকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নমনীয়তা ধরে রাখা।
নিরপেক্ষতা সব সময় বাস্তবে কার্যকর হয়নি। শীতল যুদ্ধকালে অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়লে ভারতের কৌশলগত নমনীয়তা ক্ষয়ে যায় এবং দেশটি সমর্থনের জন্য দুই পরাশক্তির একটির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। এটি স্পষ্ট হয় ১৯৬২ সালে, যখন চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমর্থনে ঝুঁকে পড়ে।
আবার ১৯৭১ সালে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। সে সময় পাকিস্তান চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
শীতল যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বাধ্যবাধকতা ভারতকে নিরপেক্ষতার নীতি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও পণ্য বিনিময় চুক্তি হারানোর ফলে নয়াদিল্লি উপলব্ধি করে যে তাকে তার বৈদেশিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে হবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তবে সর্বমুখী বা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত থাকে।
আরও পড়ুনশেষ হাসি কে হাসবেন, মোদি নাকি ট্রাম্প১৪ আগস্ট ২০২৫৪.যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কের অবনতি দেখায় যে ভারতের আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন অংশীদারির চুক্তি নয়াদিল্লির এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে যে দেশটি বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হতে চায়, পশ্চিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে চায় এবং উভয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে চায়।
মোদি সরকার ভারতকে ‘বিশ্বমিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু দুনিয়ার বন্ধু হওয়া এবং দুনিয়াকে পরস্পরের বন্ধু বানাতে সাহায্য করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা সত্ত্বেও ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে উত্তেজনা প্রশমনে নয়াদিল্লির ভূমিকা সীমিত ছিল (কাতার, তুরস্ক, ব্রাজিল, এমনকি চীনের মতো দেশগুলোর ভূমিকার বিপরীতে)।
ভারত যদি এমন ভূমিকা পালন করত, তবে তা সেই গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো, যা দেশটি একসময় পালন করেছিল; তখন ভারত ছিল আরও দুর্বল শক্তি। ১৯৫০-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে তাইওয়ান প্রণালি সংকট পর্যন্ত বহু বৈশ্বিক সংঘাতে ভারত ছিল একটি প্রধান কণ্ঠ।
একটি ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিশ্বে ভারতকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এ বছরের ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে ভারতের ধারণাগত নিশ্চয়তাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।এসবের পরিবর্তে ভারত দূরত্ব বজায় রাখার পথ বেছে নিয়েছে। এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে অক্টোবর মাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মোদির অনুপস্থিতি। প্রথমটি শারম আল-শেখে গাজা শান্তি সম্মেলন এবং দ্বিতীয়টি কুয়ালালামপুরে পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। উভয় ক্ষেত্রেই আমন্ত্রণ পেলেও মোদি অংশ নেননি।
যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো—উভয় বৈঠকই অনুষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য), যাকে ভারত তার ‘বিস্তৃত প্রতিবেশ’ বলে। এতে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির উদাসীনতা ফুটে ওঠে।
ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান আরও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় একটি শিক্ষা দেয়। ইসলামাবাদ তার নিজস্ব ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অনুশীলন করছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে।
যেখানে নয়াদিল্লি ভূরাজনৈতিক উত্তপ্ত অঞ্চলগুলো থেকে দূরে থাকতে চায়, সেখানে ইসলামাবাদ আগ্রহভরে এগিয়ে আসে; ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টিতে সহায়তা করা থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়া, ২০০০-এর দশকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যকে সমর্থন করা পর্যন্ত।
আরও পড়ুনমোদি কোন বিশ্বাসে চীনের দিকে ঝুঁকলেন ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫পাকিস্তান এটি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা আরেক প্রশ্ন, যদি বিবেচনা করা হয় তাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলোকে; যেমন—চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই বন্দর প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া। অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তবর্তী অস্থিরতাগুলো বিবেচনায় নিলে ইসলামাবাদ কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিস্তৃত প্রতিরোধ ক্ষমতা দেওয়ার আশা করে? তবু এটি দেখায় কীভাবে নয়াদিল্লির তুলনায় আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অনুশীলন করা যেতে পারে।
একটি ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিশ্বে ভারতকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এ বছরের ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে ভারতের ধারণাগত নিশ্চয়তাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভারতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়ছে, যার থেকে দেশটি এত দিন বিরত থেকেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে নিজেকে কৌশলগতভাবে আরও অপরিহার্য করে তোলা ট্রাম্প অথবা অন্য যেকোনো দেশের খামখেয়ালিপনা নেতার থেকে ভারতের ঝুঁকি কমাবে।
গ্লোবাল ফোরামগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুপস্থিতি এবং কখনো কখনো অস্থিতিশীল ভূমিকা বৈশ্বিক নেতৃত্বে একধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। ভারতের এগিয়ে আসার এর চেয়ে উপযুক্ত মুহূর্ত আর হতে পারে না।
● চিতিজ বাজপেয়ী চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো
ফরেন পলিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: য ক তর ষ ট র র স ত র পরর ষ ট নয় দ ল ল র স প ট ম বর ইসল ম ব দ র ক শলগত প রস ত ব ব যবস থ ন শ চয়ত ঘন ষ ঠ র জন য শ সন র বছর র ভ রতক র একট র ওপর
এছাড়াও পড়ুন:
রাষ্ট্র সংস্কার কি সরকারের কাছে শুধুই ফাঁকা বুলি, প্রশ্ন টিআইবির
‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন করায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি কি না, এ প্রশ্নও তুলেছে টিআইবি।
আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত দুদকের উত্তরণের লক্ষ্যে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সুপারিশ বাদ দেওয়া শুধু হতাশাজনক নয়, সরকারের অভ্যন্তরে প্রায় সব ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী মহলের ষড়যন্ত্রের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্টের জিম্মিদশারও পরিচায়ক।
জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতির পরও চূড়ান্ত অধ্যাদেশে এই সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের অনাগ্রহের ইঙ্গিত বলে মনে করে টিআইবি।
দুদককে প্রকৃত অর্থে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এই কৌশলগত সুপারিশটি অনুধাবনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বলে উল্লেখ করে টিআইবি আরও বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের জন্য এটি স্ববিরোধী ও সংস্কারপরিপন্থী নজির।
ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ও ১১টি সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা দুদককে জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলসহ দেশবাসীকে কি এই বার্তা দিতে চাইছেন যে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি—এ প্রশ্নও বিবৃতিতে তুলেছে টিআইবি।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা, অংশীজনদের মতামত, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় দুদক যাতে ক্ষমতাসীনদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে চলমান না থাকে, সে লক্ষ্যে দুদক সংস্কার কমিশন ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে দুদক যেভাবে জন–আস্থার সংকটে ভুগছে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রীড়নক হিসেবে ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা আর প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রস্তাবটি করা হয়েছিল।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে অন্তত সাতজন উপদেষ্টা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাঁরা জানেন যে এই প্রস্তাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। জুলাই সনদ লঙ্ঘনের এরূপ উদাহরণ সৃষ্টি করার আগে সরকার কেন ভাবছে না যে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলকে তারা নিজেরাই জুলাই সনদ লঙ্ঘনে উৎসাহিত করছে? তাহলে কেন এত রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ? দুর্নীতির কার্যকর নিয়ন্ত্রণের উপায় রুদ্ধ করে কীসের রাষ্ট্র সংস্কার?’
অধ্যাদেশটির যে খসড়াটি টিআইবির দেখার সুযোগ হয়েছিল, তা অনেকাংশে বিদ্যমান আইনের তুলনায় উন্নত মানের হওয়ায় টিআইবি সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যানুযায়ী, চূড়ান্ত অধ্যাদেশে উল্লিখিত বিষয়টির পাশাপাশি আরও কিছু ঐকমত্য-অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের অভ্যন্তরে স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতি-সহায়ক ও সংস্কার-পরিপন্থী অবস্থান ছাড়া আর কিছু হতে পারে না বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।