পাখি ও প্রজাপতির বিলুপ্তিতে রাসায়নিক কৃষির দায়
Published: 30th, November 2025 GMT
আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ আর আগের মতো সজীব নেই। যে রঙিন প্রজাপতিগুলো একসময় বাগানে বাগানে উড়ে বেড়াত, যে পাখিদের কলকাকলিতে ভোরবেলা জেগে উঠতাম আমরা, সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো দোয়েল, শালিক কিংবা বাবুই পাখির দেখা মেলে না। ফুলের বাগানে প্রজাপতির সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই বিষাদময় পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের।
একদিকে যেমন জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকেরা নানা রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই রাসায়নিকগুলো শুধু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেই মারছে না, উপকারী পতঙ্গ ও পাখি মারছে। এগুলো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি।
কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গরা। এই ছোট প্রাণীগুলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাপতি ও মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।
এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফলমূল ও শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু যখন কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন সেই বিষ প্রজাপতি ও মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় তারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, আবার কখনো বিষক্রিয়ায় তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। প্রজাপতির বিভিন্ন প্রজাতি এখন আর চোখে পড়ে না, যেগুলো একসময় সচরাচর দেখা যেত।
পাখিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। গ্রামীণ এলাকায় যেসব পাখি একসময় খুব সহজেই দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন বিলুপ্তির পথে। শালিক, দোয়েল, বাবুই, চড়ুই এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এর পেছনেও রাসায়নিক কীটনাশকের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।
কিন্তু যখন সেই পোকামাকড়ের শরীরে কীটনাশকের বিষ থাকে, তখন পাখিরা সেই বিষযুক্ত খাবার খেয়ে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রজাপতির মতোই অনেক সময় তারা সরাসরি মারা যায়, আবার কখনো তাদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া অনেক পাখি প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের চারপাশের লতাপাতা ও ঝোপঝাড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পাখিদের বাসা বানানো ও আশ্রয়ের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।
রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পাখি ও প্রজাপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। যখন পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যায়, তখন ফসলের উৎপাদনও কমে যায়। যখন পাখি কমে যায়, তখন পোকামাকড়ের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এতে আবার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় এবং এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হতে থাকে। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ও মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীবদের মেরে ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কৃষিতে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। জৈব কৃষি বা অর্গানিক ফার্মিং এর একটি ভালো বিকল্প। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক সার, জৈব কীটনাশক ও ফসলের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা ঠিক নয়। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং জৈব কৃষিতে ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে হবে।
কারণ, একটি সুস্থ পরিবেশ ছাড়া মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। তাই কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি। সবাই মিলে এই ছোট্ট প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে সুন্দর, সবুজ ও প্রাণবন্ত একটি পৃথিবী।
তামান্না ইসলাম শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
গ্রামে চলে না কোনো গাড়ি, তবে সেই গ্রামে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ‘কেব্ল কার’
ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের একটি পাহাড়ি গ্রাম মারেন। মধ্যযুগীয় এ গ্রাম অনেক দিনই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। গ্রামটিতে যাওয়ার জন্য প্রচলিত কোনো যানবাহন নেই। তবে এখন কেব্ল কারের বদৌলতে ভ্রমণকারীরা ৪৩০ জন বাসিন্দার ওই গ্রামে পৌঁছাতে পারছেন। এগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঢালু পথের কেব্ল কার। গত বছরের শেষের দিকে ভ্রমণবিষয়ক সাংবাদিক শিখা শাহ ওই গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিবিসিতে একটি ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন তিনি।
বছরের শেষের দিকে তীব্র শীতের দিনে জেনেভা থেকে তিন ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা করে লাউটারব্রুনেনে পৌঁছান শিখা। এটি মধ্য সুইজারল্যান্ডের ইন্টারলাকেন ও জুংফ্রাউ পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত এক গ্রাম। এখান থেকেই শুরু মারেন নামের পাহাড়ি গ্রামের পথে যাত্রা।
শিখা লিখেছেন, স্টেচেলবার্গ গাড়ি পার্কিং এলাকায় পৌঁছানোর পরপরই তাঁকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে কাচ দিয়ে ঘেরা কেবিনে (কেব্ল কার) তুলে নেওয়া হয়। কেব্ল কারে বসে নিচের দিকে থাকা কটেজগুলোকে গল্পের বইয়ের মতো লাগছিল। চারপাশটা পাহাড় ও তুষারময় পাইনগাছে ঘেরা।
মারেনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, একসময় গ্রামের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য তিন ঘণ্টা পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হতো। এরপর জিনিসপত্র নিয়ে তাঁরা আবার ওপরে উঠে আসতেন। ১৮৯১ সালে একটি সরু রেলপথ চালু হয়। রেলপথটি মারেনকে কাছের পাহাড়ি গ্রাম গ্রুটশালপ এবং লাউটারব্রুনেনের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৬৫ সালে একটি সিঙ্গেলট্র্যাক কেব্লওয়ে চালু হয়। ওই পথে বাসিন্দারা গাড়িবিহীন আরেক নিরাপদ গ্রাম গিমেলওয়াল্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন।
মারেনে কয়েকটি ছোট ছোট রাস্তা আছে। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি অতিথিশালা ও রেস্তোরাঁ। সেখানে বিখ্যাত চিজ-ড্রাই সসেজসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া সেখানকার কিছু ছোট ছোট দোকানে বিক্রি হয় পোস্টকার্ড, উন্নত মানের সুইস চকলেট, ঘড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্মারক।তবে এখন সুইজারল্যান্ডের বার্নিজ ওবারল্যান্ড অঞ্চলে অবস্থিত ছোট গ্রামটির সঙ্গে বহির্বিশ্ব এবং নিচের দিকের উপত্যকার সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ঢালু কেব্ল কার শিলথর্নবান চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে ভ্রমণপিপাসুরা এখন সেখানে যেতে পারছেন। এই কেব্ল কার মাত্র ৪ মিনিটে যাত্রীদের ৭৭৫ মিটার ওপরে নিয়ে যায়। আর যাত্রাপথে সুইস আল্পসের চমকপ্রদ সব দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
মারেন ১৩ শতকের পুরোনো একটি গ্রাম। এখানে আছে পাথর ও কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সব কটেজ। তাকালে মনে হয়, গ্রামটি যেন পাহাড়ের প্রান্তভাগে ঝুলছে। এর এমন অনন্য অবস্থানের কারণে প্রকৌশলীরা কখনো এটিকে সড়কের মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেননি।
মারেনের স্থানীয় বাসিন্দা মাইকেল আবেগলেন বলেন, ‘স্কুলে যেতে কেব্ল কার ব্যবহার করাকে অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু আমার জন্য এটি দৈনন্দিন এক অভ্যস্ততার বিষয় ছিল। সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিস ও পরিষেবাগুলোর বেশির ভাগই অবশ্য মারেনে পাওয়া যায়। কিন্তু যখনই আমাদের চিকিৎসক, নাপিত বা দন্তচিকিৎসকের প্রয়োজন হয়, তখন আমাদের নেমে উপত্যকার দিকে যেতে হয়, সেখানে অনেকের গাড়ি পার্ক করা থাকে।’
আবেগলেনের মতে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য যে কজন সারা বছর ধরে ওই গ্রামে থাকেন, তাঁরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এখানে যাঁরা বেড়ে ওঠেন, তাঁদের প্রায় সবার সঙ্গেই পরিচয় হয়ে যায়। এখানে খুব ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী একটি সম্প্রদায় রয়েছে।
আবেগলেন আরও বলেন, ‘কিছু কিছু অতিথি তো প্রায় স্থানীয়দের মতোই। কারণ, তাঁরা প্রতিবছরই মারেনে বেড়াতে আসেন।’
মারেনে কয়েকটি ছোট ছোট রাস্তা আছে। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি অতিথিশালা ও রেস্তোরাঁ। সেখানে বিখ্যাত চিজ-ড্রাই সসেজসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া সেখানকার কিছু ছোট ছোট দোকানে বিক্রি হয় পোস্টকার্ড, উন্নত মানের সুইস চকলেট, ঘড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্মারক।
মারেনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো হোটেল মারেন প্যালেস। ১৮৭৪ সালে তৈরি হওয়া এই ভবনকে ‘সুইজারল্যান্ডের প্রথম প্রাসাদ’ হিসেবে ডাকা হয়। এখানে একসময় স্কিয়িং জগতের বিভিন্ন তারকা এবং হলিউড অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থসহ বহু তারকাকে আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্য আর জাঁকজমকে ভরপুর এই হোটেলের বলরুমটি ২০ শতকে উচ্চবিত্ত সমাজের আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।মারেনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো হোটেল মারেন প্যালেস। ১৮৭৪ সালে তৈরি হওয়া এই ভবনকে ‘সুইজারল্যান্ডের প্রথম প্রাসাদ’ হিসেবে ডাকা হয়। এখানে একসময় স্কিয়িং জগতের বিভিন্ন তারকা এবং হলিউড অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থসহ বহু তারকাকে আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্য আর জাঁকজমকে ভরপুর এই হোটেলের বলরুমটি ২০ শতকে উচ্চবিত্ত সমাজের আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
আকারে ছোট হলেও মারেন গ্রামটি শীতকালীন এক বড় ক্রীড়াকেন্দ্র। একসময়ের নিস্তব্ধ এই গ্রাম ১৮০০-এর দশকের শেষ দিকে বদলে যায়। তখন ব্রিটিশ স্কিয়িং–জগতের মানুষেরা এই গ্রামে এসে এর প্রকৃতি আর স্কি ঢাল দেখে মুগ্ধ হন।
গ্রামের বাসিন্দা বার্নার্ড লান বলেন, তাঁর প্রপিতামহ হেনরি লান প্রথম ১৮৯০-এর দশকে মারেনে আসেন এবং এর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। এরপর তিনি সেখানকার সৌন্দর্য দেখাতে ব্রিটিশ পর্যটকদের সেখানে নিয়ে যান। আর্নল্ড লান এবং তাঁর স্ত্রী মেবেল সেখানে বসবাস শুরু করেন।
আর্নল্ডের আগমন ১৯২৪ সালে কান্দাহার স্কি ক্লাব গঠনের পথও খুলে দেয়। ১৯৩০ সালে দেশের প্রথম স্কি স্কুল মারেনে চালু হয়। এক বছর পর ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ছোট্ট গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আলপাইন বিশ্ব স্কি চ্যাম্পিয়নশিপ।
স্থানীয়রা বলছেন, মারেন শুধু স্কি করার জন্যই পরিচিত নয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই এলাকা জনপ্রিয় প্যারাগ্লাইডিং গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
বার্নার্ডের স্ত্রী জুলিয়া লান মারেনে বিভিন্ন পরিবার ও নারীদের পর্বতারোহণে নেতৃত্ব দেন। তাঁর মতে, মানুষ এখানে কেনাকাটা বা দর্শনীয় স্থান ঘুরতে আসেন না; বরং স্কিয়িং, হাইকিংসহ নানা কিছু করার মধ্য দিয়ে জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে আসেন।