হাত পেতে নয়, ফেরি করে সংসার চালান অন্ধ মাবুদ
Published: 30th, November 2025 GMT
প্রবল মনোবল যে একজন মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল করে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ দিনাজপুরের আব্দুল মাবুদ। চোখে দেখতে পারেন না, তাতে কী; মনের চোখে পথ চলেন তিনি।
দিনাজপুরের হিলি পৌর শহরের ছোট ডাঙ্গা পাড়া গ্রামের এই বাসিন্দা পেশায় ফেরিওয়ালা। ভাঙারির বিনিময়ে বিক্রি করেন বাদাম, কটকটি আর মিঠাই। তাতে যেটুকু লাভ হয়, তা দিয়ে কষ্টে চলে সংসার।
৬৫ বছর বয়সী আব্দুল মাবুদ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। জন্মের পর থেকেই তিনি চোখে কম দেখতে পেতেন। এখন একেবারেই দেখতে পান না আব্দুল মাবুদ। তার সংসারে আছেন স্ত্রী। তারও বয়স হয়েছে। ছেলে সন্তান থাকলেও তিনি মা-বাবার ভরণ-পোষণ করেন না। তাই, বাঁচার তাগিদে এই অন্ধ বাবা বেছে নিয়েছেন ফেরিওয়ালার কাজ।
প্রতিদিন সকাল হলেই কাঁধে বাহক ঝুলিয়ে পণ্য নিয়ে বের হন অন্ধ আব্দুল মাবুদ। ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বুট, বাদাম আর মিষ্টি জাতীয় খাবার নিয়ে পৌর শহরের ডাঙ্গা পাড়া, মাঠ পাড়া, চার মাথা, মহিলা কলেজ আর চুড়িপট্টি এলাকায় ঘুরেন। বিভিন্ন ভাঙারি দ্রব্যের বিনিময়ে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি করেন তিনি। প্রায় প্রতিদিন দুপুরে হিলি থানায় নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মসজিদের বারান্দায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে দেখা এই বৃদ্ধকে। থানার অনেক পুলিশ সদস্য এই অসহায় মানুষটিকে সাহায্য করে থাকেন।
রফিকুল ইসলাম, জাহিদুল ও রাব্বানীসহ কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, প্রায় প্রতিদিন স্বামী-স্ত্রীকে বস্তা নিয়ে হেঁটে যেতে দেখি। তাদের দেখে খুব মায়া লাগে। সন্তান থাকতেও বৃদ্ধ মা-বাবা কেন এভাবে ঘুরে বেড়াবেন? তবে, আব্দুল মাবুদ কারো কাছে হাত পাতেন না। কর্ম করে খান। মাবুদ চোখে দেখতে পান না, মনের চোখ দিয়ে পথ দেখেন। কখনো পথ ভুল হলে কারো মাধ্যমে পথ চিনে নেন।
আব্দুল মাবুদের স্ত্রী বলেন, আমাদের জীবনটা আলাদা। কপালে কষ্ট আছে, তাই এই বয়সেও স্বামীকে নিয়ে কষ্ট করে চলতে হচ্ছে।
অন্ধ মাবুদ হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ছেলেটারে মানুষ করতে পারিনি। অনেক কষ্ট করেছি, নিজেরা না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াইছি। পড়ালেখা করিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। আজ সে আমাদের চেনে না, খোঁজও নেয় না। কথা পর্যন্ত বলে না। বাঁচতে তো হবে। তাই, বুড়ো বয়সেও কাজ করি। চোখেও দেখতে পাই না। তারপরও গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভাঙারি কিনি। এতে যেটুকু লাভ হয়, তা দিয়ে কোনোরকমে চলি। কষ্ট হলেও শান্তি, অন্যের কাছে হাত পাতি না।
হাকিমপুর (হিলি) থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হক জানিয়েছেন, প্রায়ই দেখি, আব্দুল মাবুদ থানা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বারান্দায় বিশ্রাম নেন। একদিন তার জীবনের গল্প শুনি। আসলেই দুনিয়ায় বিচিত্র মানুষ বসবাস করে। আমি তাকে সাহায্য করেছি। যেকোনো প্রয়োজনে আমরা যতটা পারি তার পাশে থাকব। আমি মনে করি, এমন অসহায় মানুষের পাশে এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সকলের উচিত।
তিনি বলেন, সচ্ছল সন্তান থাকা সত্ত্বেও বাবা-মাকে এভাবে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। এটি শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জাজনক। আজ আব্দুল মাবুদ দম্পতির লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অভাব সব সময় টাকার নয়, কখনো মানবিকতারও হয়।
ঢাকা/মোসলেম/রফিক
.উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে দলগতভাবে জড়িত আওয়ামী লীগ, মূল সমন্বয়কারী তাপস: তদন্ত কমিশন
বিডিআর বিদ্রোহে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন আজ রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত কমিশন বলেছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে দলগতভাবে জড়িত আওয়ামী লীগ। আর মূল সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস।
কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছে।
কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এই ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারও কারও ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি, অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করেছি।’
কমিশন প্রধান বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল, অ্যাকশন নিল না?
কমিশন প্রধান বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ সময় তদন্তে কী পাওয়া গেছে, তা নিয়ে কমিশন সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এই ঘটনার কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল।
জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। তিনি এই ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে বলেন, দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা।
জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার। ওই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেন, তাঁদের সঠিক নাম পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করে, যাতে করে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এই ঘটনার ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচার পায়।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।
মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান নেতৃত্বাধীন এ কমিশনের সদস্যরা হলেন মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক (অব.), মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, এম. আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।