বাংলাদেশে ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও এখন জনপ্রিয় ধারার কনটেন্ট। অনেক ভ্লগার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ক্যামেরায় বন্দি করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য, তুলে ধরছেন স্থানীয়দের জীবনাচার, জানাচ্ছেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। ট্রাভেল ভ্লগারদের এই ভিড়ে কিছু মুখ আলাদা করে চোখে পড়ে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন সালাহউদ্দিন সুমন।

ভ্রমণ, ইতিহাস আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প যেভাবে তিনি উপস্থাপন করেন, তা তাকে এই প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ ডকুমেন্টরি নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে।

সাংবাদিকতা ছেড়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে ওঠা 
সুমনের যাত্রা শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। মাঠে-ময়দানে ছুটে বেড়ানো, খবর সংগ্রহ, মানুষের সমস্যার মুখোমুখি হওয়া—এসবই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। এর পাশাপাশি আরেকটি আগ্রহ হৃদয়ে নীরবে জায়গা করে নেয়—দেশের ইতিহাস, অজানা গ্রাম, পুরনো নির্মাণ, নদীপথের গল্প ইত্যাদি।

এই আগ্রহ ধীরে ধীরে এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, একসময় মনে হতে থাকে, শুধু টেলিভিশনের খবর তার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি নিজের দেখা, শোনা, অনুভব করা গল্পগুলো সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান আরো সাবলীলভাবে ও স্বাধীনভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় তার ভ্রমণকেন্দ্রীক কাজ। একপর্যায়ে সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোদমে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সুমন, যা তাকে মানুষের মনে আলাদা একটি স্থান তৈরি করে দিয়েছে, করে তুলেছে জনপ্রিয়। 

দেখানোর পাশাপাশি জানানো—অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি
সুমনের ভিডিও দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে তার পর্যবেক্ষণ শক্তি। তিনি কোথাও গেলে কেবল দৃশ্য দেখান না; খুঁজে বের করেন সেই জায়গার পেছনের ইতিহাস, মানুষের জীবনযাত্রা, সময়ের পরিবর্তন আর স্থানটির বিশেষত্ব। একটি ভাঙা মসজিদ বা অবহেলিত শিলালিপিও তার বর্ণনায় নতুন অর্থ পায়। একটি গ্রামের কৃষকের সঙ্গে দুই মিনিটের কথোপকথনেও উঠে আসে জীবনবোধ। সহজ কিন্তু গভীর গল্প বলার ধরনই তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে।

দেশকে দেখানোর নতুন আয়োজন
বাংলাদেশে ভ্রমণ মানে অনেকের কাছে শুধু পাহাড়-সমুদ্র—এই সীমাবদ্ধতা সুমন ভেঙেছেন। তিনি তুলে এনেছেন ভুলে যাওয়া মঠ, প্রাচীন নদীঘাট, অপেক্ষাকৃত অজানা দুর্গ, প্রত্যন্ত গ্রামীণ সংস্কৃতি, সীমান্ত অঞ্চলের বহু বর্ণের জীবন। 

অনেক দর্শক মন্তব্য করেন, “জায়গাটার নাম কখনো শুনিনি, সুমনের ভিডিও দেখে প্রথম জানলাম।” এসব তথ্যনির্ভর কনটেন্ট দেশের ভ্রমণপিপাসুদেরকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

দেশের বাইরে গিয়ে আরো বিস্তৃত দৃষ্টি
দেশের মতো বিদেশেও তার কাজ সমান মনোযোগ পায়। তিনি এরইমধ্যে কয়েকটি দেশ ঘুরে অসংখ্য ভ্রমণবিষয়ক কন্টেন্ট তৈরি করেছেন। সৌদি আরবে গিয়ে তুলে ধরেছেন ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ট্রেনে চেপে নিষিদ্ধ নগরী লাসায় গিয়ে জানিয়েছেন অজানা তথ্য। তিব্বত মালভূমি ভূ-প্রকৃতি কিংবা মঙ্গোলীয়ার বিস্তৃর্ণ তৃণভূমিতে যাযাবরদের জনজীবন তুলে ধরেছেন পরম মমতায়। 

অপরিচিত শহর, ভিন্ন সংস্কৃতি, নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ—সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে নেন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার দিক।

সুমনের ভিডিওতে শুধু ‘কি সুন্দর’ এটা থাকে না, থাকে ‘মানুষগুলো এমন কেন?’, ‘এ সংস্কৃতির শেকড় কোথায়?’, ‘আমরা এখান থেকে কী শিখতে পারি?। এমন সব মানবিক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অন্যরকম ভ্রমণ-কথ্যকার করে তুলেছে।

জনপ্রিয়তা নয়, আন্তরিকতাই মূল শক্তি
সুমন নিজে খুব সাদামাটা। ক্যামেরার সামনে অতিরঞ্জিত আবেগ দেখান না, নিজের উপস্থিতিকে বড় করে তোলেন না। তার ভিডিওতে জায়গার গুরুত্ব বেশি, নিজের কম। দর্শক তাই খুব সহজেই তার সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পান। এই স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতাই তার জনপ্রিয়তার মূল পুঁজি।

স্বীকৃতি ও অর্জন: পরিশ্রমের প্রাপ্য ফল
দীর্ঘদিনের ধৈর্য ও গবেষণাভিত্তিক কনটেন্ট তাকে এনে দিয়েছে স্বীকৃতি। দেশি-বিদেশি প্ল্যাটফর্ম তার কাজকে প্রশংসা করছে। সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। তবে, সংখ্যার চেয়ে বড় কথা তিনি এখন দেশের ভ্রমণ-ডকুমেন্টারি ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করে তোলার পথিকৃৎদের একজন।

ভ্রমণ থেকে উদ্যোগে
সম্প্রতি সুমন শুধু ভিডিও নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি ভ্রমণেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মানুষের সঙ্গে সরাসরি পথচলার অভিজ্ঞতা ভাগ করছেন। এভাবে তার কাজ আরো বাস্তব ও প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।

আগামী দিনের দিকনির্দেশনা
সুমনের কনটেন্ট দেখলে মনে হয় এই পথ চলা কেবল শুরু। তার গল্প বলার ধরন, পর্যবেক্ষণশক্তি এবং মানুষের প্রতি টান তাকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাবে। হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি, বই বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সিরিজের দিকে। বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরার আরো অনেক সুযোগ তার সামনে অপেক্ষা করছে।

আস্থা ও অনুপ্রেরণার এক নাম
সালাহউদ্দিন সুমন শুধু ভ্রমণ ভিডিও নির্মাতা নন; তিনি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের গল্পকে নতুনভাবে সামনে আনার একটি নীরব শক্তি। তার কাজ প্রমাণ করেছে— ভ্রমণ শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়, মন দিয়ে বোঝার বিষয়ও।

এ কারণেই ভ্রমণপিপাসু ও অনুসন্ধিৎসু মানুষের কাছে এক আস্থা ও অনুপ্রেরণার নাম সালাহউদ্দিন সুমন।

ঢাকা/রফিক

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর কনট ন ট জনপ র য় র গল প স মন র ভ রমণ

এছাড়াও পড়ুন:

জুটির হাহাকার, তাওহীদের আর্তনাদ

‘একটা বড় জুটি হলেই হতো’ - বারবার তাওহীদ হৃদয় এই কথাটাই বোঝাতে চাচ্ছিলেন একাধিক প্রশ্নে। ১৮২ রানের লক্ষ‌্য তাড়া করতে নেমে ৩৯ রানে ম‌্যাচ হারের পর দলের সেরা ব‌্যাটসম‌্যান বোঝাতে চাইলেন, ‘একটা বড় জুটি হলেই খেলাটা অন‌্যরকম হতে পারত।’ 

শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়া তাওহীদ ৫০ বলে ৮৩ রানে অপরাজিত থাকেন। ৭ চার ও ৩ ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি তার ক‌্যারিয়ার সেরা। তবে, দিন শেষে হাসিটা মুখে রাখতে পারেননি ডানহাতি ব‌্যাটসম‌্যান। স্কোরবোর্ড, উইকেট, লক্ষ‌্য, শিশির, কোনো কিছুই বাংলাদেশের জন‌্য জটিল ছিল না। কিন্তু শীর্ষে থাকা ৪ ব‌্যাটসম‌্যান ম‌্যাচকে উপহার দিয়ে আসেন আয়ারল‌্যান্ডকে। 

আরো পড়ুন:

খই খই এখন দ্যুতি ছড়াচ্ছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে

দারুণ জয়ে ক্রিকেট কার্নিভালের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়ালটন

পাওয়ার প্লে’র ৬ ওভারে বাংলাদেশের ৪ ব‌্যাটসম‌্যান সাজঘরে। রান মাত্র ২০। প্রথম বাউন্ডারি পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয় ২৮তম বল পর্যন্ত। এমন হতশ্রী শুরুর পর জয়ের আশা করা কঠিন। তবুও তাওহীদ চেষ্টা চালিয়ে যান। 

ম‌্যাচ নিয়ে তাওহীদের মূল‌্যায়ন, ‘‘যদি আমাদের একটা বড় পার্টনারশিপ হতো, তাহলে খেলাটা অন্যরকম হতো। আমরা বেশি রানে, বেশি ব্যবধানে হারিনি। একটা পার্টনারশিপ, আমি আর জাকের যখন ব্যাটিং করছিলাম, তখনও যদি আমাদের একটা পার্টনারশিপ ৭০-৮০ পার্টনারশিপ হতো, তাহলে হয়তোবা অন্যরকম একটা সিনারিও হতে পারতো।’’ 

পঞ্চম উইকেটে জাকের ও তাওহীদ দলের হাল ধরেন। তাওহীদ নিজের সহজাত খেলাটা খেলতে পারলেও জাকের সময় নিয়েছেন। পরে তা পুষিয়ে দিতে বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে শট খেলেন। তাতেই ডেকে আনেন বিপদ। ৩৪ বলে ৪৮ রান আসে তাদের জুটিতে। এছাড়া, নবম উইকেটে শরিফুল ও তাওহীদের জুটি আছে সমান ৪৮ রান। ক‌্যারিয়ারের সপ্তম টি-টোয়েন্টি ফিফটির ইনিংসটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পারেননি তাওহীদ। তা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ আছে তার। 

তবে দলের পরাজয়ের পেছনে তার মাথায় কেবল ঘুরছে, একটি বড় জুটি না আক্ষেপ, ‘‘অবশ্যই উইকেট অনেক ভালো। ওরা ভালো খেলেছে, আমরা ভালো করতে পারিনি। উইকেটের কোনো এখানে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা নিজেরাই আমাদের এক্সিকিউশনটা ভালো করতে পারিনি। আর্লি কিছু উইকেট পড়েছে। যখন আমরা খেলাটা ধরেছিলাম, আমি আর জাকের যখন ব্যাটিং করছিলাম, ওই সময় যদি আরেকটু খেলাটা টেনে নেওয়া যেত তাহলে ভালো হতো।”

স্কোরবোর্ড যতই বড় হোক, প্রতিপক্ষ যতই কঠিন হোক নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখার কথা বললেন তাওহীদ, ‘‘আমাদের নিজেদের উপরে সেই বিশ্বাসটা রাখতে হবে এবং আমরা অবশ্যই সবাই জিততে চাই। এক্সিকিউশন হচ্ছে না। এজন‌্য আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে।’’

গতকাল টপ অর্ডারের ব‌্যাটিং ভালো যায়নি। মিডল অর্ডারেও রয়েছে জটিলতা। তাওহীদ উন্নতির ‍উপর জোর দেওয়ার কথা বললেন, ‘‘শুধু মিডল অর্ডার না। শুধু টপ টু বটম সব জায়গায় উন্নতির জায়গা আছে আমাদের। যখন ইম্প্রুভমেন্টটা হবে, তখন আমরা ভালো কিছু করব।’’

ঢাকা/ইয়াসিন

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • জুটির হাহাকার, তাওহীদের আর্তনাদ