ভাঙা দেবী, রহস্যময় হাসি আর বুঁদ হয়ে থাকা এক দুপুর
Published: 9th, July 2025 GMT
প্যারিস– নামটি উচ্চারণ করলেই যেন এক মোহময় ধ্বনি বয়ে যায় হৃদয়ের ভেতর দিয়ে। এ শহর প্রেমের, শিল্পের, সভ্যতার। প্যারিসের ঠিক মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছে এক ইতিহাসের পাহারাদার– লুভর মিউজিয়াম। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বৃহৎ জাদুঘর এটি। যার প্রতিটি প্রাচীর যেন সময়ের পাতায় অক্ষরে অক্ষরে লেখা একেকটি গল্প। সেই গল্পের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম কয়েক শতাব্দী পেছনের কোনো পৃথিবীতে। লিখেছেন -অনিন্দ্য মামুন
সময়টা গ্রীষ্মকাল। তবে প্যারিসের আবহাওয়া তখন না গরম না ঠান্ডা। সেদিন প্যারিসের আকাশ ছিল নীলচে ধূসর। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসছিল একটা অলৌকিক আমন্ত্রণ– চলো সময়কে ছুঁয়ে দেখা যাক। সে আমন্ত্রণেই প্যারিসের মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা মেট্রো ধরে ছুটে চলা। কখনও হেঁটে, কখনও-বা মেট্রোতে চলার দারুণ অনুভূতি সামনে এসে দাঁড়ালাম লুভর পিরামিডের কাচ দিয়ে নির্মিত সেই জ্যামিতিক অলংকারের সামনে। যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া আর প্রাচীনতার বিশালতা একসঙ্গে মিলেমিশে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞান সৃষ্টি করেছে। পিরামিডের নিচের প্রবেশপথ দিয়ে যখন মিউজিয়ামের ভেতরে ঢুকি, মনে হয় কোনো সুড়ঙ্গপথে ঢুকেছি; যা আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল অতীতের মহাকাব্যে।
লুভর মিউজিয়াম যেন বহু শতাব্দীর বিবর্তনের গল্প। ১১৯০ সালে রাজা ফিলিপ অগাস্টাস এটি নির্মাণ করেন একটি সামরিক দুর্গ হিসেবে, প্যারিস শহরকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে। তখন শহরের সীমানা ছিল অনেক ছোট আর লুভর ছিল সেই প্রাচীরঘেরা শহরের রক্ষাকবচ। ১৫৪৬ সালে রাজা ফ্রাঁসোয়া প্রথম এ দুর্গকে রূপান্তর করেন রাজপ্রাসাদে। তিনিই প্রথম শুরু করেন শিল্প সংগ্রহ। ঠিক সেখান থেকেই জন্ম নেয় লুভরের ভবিষ্যৎ পরিচয়। এ রাজাই লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে ফ্রান্সে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করেন মোনালিসা। পরে ১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল সময়ে লুভর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তখন এর সংগ্রহ ছিল মাত্র ৫০০টির মতো; যা আজ দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্মে।
ভেতরে ঢুকেই চোখ ছানাবড়া। চারপাশে শুধু ছবি, মূর্তি, দেয়ালচিত্র, শিল্পকর্ম। মিসরের শবাধার, গ্রিক দেবতাদের ভাস্কর্য, রেনেসাঁ যুগের চিত্রকর্ম, ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, ভারতীয় মূর্তি– পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তের শিল্প যেন এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যেদিন দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’র সামনে দাঁড়ালাম, মনে হলো আমি সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। ওই রহস্যময় হাসি আমাকে চুপ করিয়ে দিল। শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরও যে ছবি লাখো-কোটি দর্শককে একসঙ্গে স্তব্ধ করে দিতে পারে– তা তো কেবল মোনালিসাই।
মোনালিসার পাশে হেঁটে গেলে আপনি দেখতে পাবেন আরেক বিস্ময়– ভেনাস দে মিলো। দুই হাত ভাঙা, তবু অপূর্ব নারীত্বে পূর্ণ এই গ্রিক দেবীর মূর্তি যেন এক শাশ্বত সৌন্দর্যের চিহ্ন। আবার সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ‘উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেস’, ডানাওয়ালা এক দেবী, যিনি যেন বিজয়ের অঙ্গভঙ্গিতে হাঁটছেন সময়ের বুকে।
একটি হলঘরে দেখলাম মিসরের এক ফেরাউনের মমি সংরক্ষিত আছে। তার চোখ দুটো বন্ধ, অথচ মনে হলো আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। পাশেই এক প্রাচীন স্ফিংক্স– মিসরের মরুভূমি পেরিয়ে এসে যেন এখানে বসে আছে ক্লান্ত হয়ে।
আরেক করিডোরে দেখি জ্যাক-লুই ডেভিডের বিশাল ক্যানভাস– ‘দ্য করোনেশন অব নেপোলিয়ন’, যেখানে সম্রাট নিজেই নিজের মুকুট পরাচ্ছেন। এ ছবির প্রতিটি চরিত্র যেন জীবন্ত, প্রতিটি দৃষ্টির ভঙ্গিতে গল্প। লুভরের সবচেয়ে মোহময় দিকটি ছিল এর স্থাপত্য। দৃষ্টিনন্দন দেয়াল, উঁচু ছাদ, ধ্রুপদি কারুকাজে পূর্ণ প্রতিটি করিডোর– প্রতিটি কোণেই যেন একেকটা জীবন্ত উপন্যাস। মিউজিয়ামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই যেন ইতিহাসের নানা চরিত্র সামনে এসে দাঁড়ায়। কারও হাতে রংতুলি, কেউ বর্ম পরে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে, কেউবা চুপচাপ বসে জীবনের দুর্বোধ্যতা আঁকছে ক্যানভাসে।
এই জাদুঘর শুধু জ্ঞান নয়, এক গভীর আবেগের আধার। শিল্পের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা এখানে এসে যেন আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক বিমূর্ত চিত্র পর্যন্ত– সবকিছুই মানুষ রেখে গেছে ভবিষ্যতের জন্য।
লুভরে হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল আমাকে। কারণ এত সৌন্দর্য, এত ইতিহাস দেখে প্রশ্ন জাগে– আমরা কী রেখে যাচ্ছি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য? এই বিশ্ব কি এখনও শিল্পের প্রতি ততটাই শ্রদ্ধাশীল আছে, যতটা ছিল দা ভিঞ্চির যুগে?তবে পরক্ষণেই মনে হলো, শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় প্রমাণই তো হলো দর্শক।
লুভর শুধু একটি মিউজিয়াম নয়, এটি এক চলমান ইতিহাসের মহাকাব্য। এখানে একটি ছবি মানে কেবল রং নয়, একটি মূর্তি মানে শুধু পাথর নয়, বরং একটি জাতির আত্মা, একটি সভ্যতার কল্পনা, একটি মানুষের অশ্রু, আনন্দ, ভালোবাসা।
ফিরে আসার সময় আমি আবার দাঁড়ালাম পিরামিডের নিচে। তখন সন্ধ্যা নামছে প্যারিসে। লুভরের চারপাশে হালকা হলুদ আলো জ্বলে উঠেছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি– শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ বসে আছে চুপচাপ, কেউ হয়তো ভালোবাসায় মুখ ডুবিয়েছে। আমি ভাবছি– লুভর হয়তো কোনোদিন আমায় ভুলে যাবে, কিন্তু আমি? আমি তো চিরকাল এ অভিজ্ঞতা বহন করব। কারণ, শিল্প একবার হৃদয়ে বাসা বাঁধলে তা আর কোনোদিন চলে যায় না।
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ভ রমণ
এছাড়াও পড়ুন:
কারো হৃদয়ভাঙা একদম পছন্দ নয়, এটাকে ঘৃণা করি: ইধিকা
দেশসেরা চিত্রনায়ক শাকিব খানের বিপরীতে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন ওপার বাংলার অভিনেত্রী ইধিকা পাল। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় অভিনয়ের পর ভারতীয় বাংলা সিনেমায় নাম লেখান।
‘খাদান’, ‘রঘু ডাকাত’ সিনেমার বদৌলতে ইধিকা এখন টলিউডের অন্যতম চর্চিত অভিনেত্রী। ফলে, কার সঙ্গে প্রেম করছেন অথবা কবে বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন তা নিয়ে জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইধিকা তার প্রেমজীবন নিয়ে কথা বলেছেন।
আরো পড়ুন:
শাকিবের নায়িকা রহস্য
বৃদ্ধাশ্রমে বুবলীর জন্মদিন
এ আলাপচারিতায় ইধিকার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কখনো মন ভেঙেছিল কি না? জবাবে এ অভিনেত্রী বলেন, “হ্যাঁ। ভেঙেছিল।” পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছিলেন? সঞ্চালকের এ প্রশ্নের উত্তরে ইধিকা পাল বলেন, “কারো মন ভাঙা আমার একদম পছন্দ নয়। সবাই বলে এটা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। কিন্তু আমি এটা চাই না; এটাকে ঘৃণা করি।”
এটা কী কলেজ জীবনে ঘটেছিলে? ইধিকা বলেন, “হ্যাঁ, কলেজ লাইফে মন ভেঙেছিল। পছন্দ না করলেও কিছু করার নেই। সবসময় সঠিক মানুষের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। সবসময় সঠিক মানুষটাকে বেছে নিতে পারব সেটাও সম্ভব না। আবার সবসময় এটাও সঠিক নয় যে, উল্টো দিকের মানুষটা খারাপ। সে হয়তো তার জায়গায় ঠিক, আমি হয়তো আমার জায়গায় ঠিক। কিন্তু দুজন একসঙ্গে ঠিক না। দুজন ভালো মানুষও একসঙ্গে নাই থাকতে পারেন।”
“যাইহোক, তখনকার পরিস্থিতি তখনকার মতো সামলেছিলাম। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে, যারা সবসময় আমার পাশে থাকে। কখনো দুঃখ হলে তাদের ডাকি, তারা আমার হিউম্যান ডক্টর আরকি! তাদের সাথে আইসক্রিম খাই, ঠিক হয়ে যায়।” বলেন ইধিকা।
অল্প বয়সে প্রেম করে হৃদয় ভাঙলেও সম্পর্কে এখনো বিশ্বাস করেন ইধিকা। সম্পর্কের ভিত্তি বলতে তিনটি বিষয়কে বুঝেন এই অভিনেত্রী। তার ভাষায়, “সম্পর্কের ভিত্তি হলো—সম্মান, বিশ্বাস, ভালোবাসা।”
২৭ বছরের ইধিকা এখন একা। এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া অন্য একটি সাক্ষাৎকারে বিয়ের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন ইধিকা পাল। তার মতে, “এই মুহূর্তে বিয়ে নিয়ে ভাবছি না। বিয়ে মানেই প্রচুর দায়িত্ব, তাই এখন বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা নেই। সেই চিন্তা-ভাবনা এখন অনেক দূর।”
বিয়ে নয়, কাজে ডুব দিতে চান ইধিকা। তার ভাষায়—“আগামী ১০ বছরে অনেক অনেক কাজ করতে চাই। একজন ভীষণ ব্যস্ত অভিনেত্রী হতে চাই, যার সারাটা বছর কাজ নিয়ে কেটে যাবে। এখন আমার মূল উদ্দেশ্য নিজের কাজে ফোকাস করা। এছাড়া ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এখন চিন্তা করার সময় নেই।”
কলকাতার মডেল ও টিভি অভিনেত্রী ইধিকা পালের নৃত্যশিল্পী হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে। তার অভিনীত প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘কপালকুণ্ডলা’। স্টার জলসায় প্রচারিত এ ধারাবাহিকে ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান।
পরবর্তীতে ‘রিমলি’ ধারাবাহিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। তা ছাড়াও দুটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকে খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইধিকা। তবে ২০২৩ সালে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে গিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
গত বছর ‘খাদান’ সিনেমার মাধ্যমে ভারতীয় বাংলা সিনেমায় অভিষেক ঘটে ইধিকার। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন টলিউড সুপারস্টার দেব। এরপর একই নায়কের বিপরীতে ‘রঘু ঢাকাত’ সিনেমায় অভিনয় করেন এই অভিনেত্রী। ‘প্রজাপতি টু’ ও ‘কবি’ নামে দুটো সিনেমার কাজ এখন ইধিকার হাতে রয়েছে।
ঢাকা/শান্ত