নীলফামারীর সৈয়দপুরের আকাশে কুয়াশার কারণে উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। আজ রোববার সকালের ফ্লাইটগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা দেরিতে আসা-যাওয়া করছে। ফলে অনেকে জরুরি কাজে ঢাকা যেতে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেছেন।

সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লোকমান হাকিম জানান, শীতের মৌসুম শুরু হয়েছে। আকাশে কুয়াশা থাকায় এবং তাপমাত্রা কম থাকায় ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

মমতা বেগম নামের এক যাত্রী বলেন, জরুরি কাজে আজ বেলা ১১টার মধ্যে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা। নভোএয়ারে তাঁর সকাল সাড়ে নয়টার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। ইউএস–বাংলা আধা ঘণ্টা বিলম্বে ৯টা ২৪ মিনিটে সৈয়দপুরে আসে। সব ফ্লাইট প্রায় আধা ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করবে বলে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক এ কে এম বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বলেন, কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি। আকাশ একটু পরিষ্কার হলে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: স য়দপ র ফ ল ইট চল চল

এছাড়াও পড়ুন:

যে আমানত আকাশ, পৃথিবী ও পাহাড় বহন করতে অস্বীকার করেছে

আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় আমি আকাশমণ্ডল, পৃথিবী ও পর্বতসমূহের কাছে আমানত পেশ করেছিলাম। অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং সে বিষয়ে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিঃসন্দেহে সে ছিল অতিশয় জালিম (স্ব-অত্যাচারী) ও অজ্ঞ।” (সুরা আহযাব, আয়াত: ৭২)

কোরআন মাজিদের এই আয়াতটি সৃষ্টির ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছে—যখন আকাশ, পৃথিবী এবং সুউচ্চ পর্বতমালা যে গুরুদায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছিল, সেই দায়িত্ব মানুষ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিল।

এই ‘আমানত’ কী ছিল? কেনই বা মানুষ এটিকে গ্রহণ করল, আর কেনই বা তাকে 'জালিম ও অজ্ঞ' বলে আখ্যায়িত করা হলো?

আমানতের অর্থ ও তাৎপর্য

এই আয়াতে উল্লিখিত ‘আমানত’-এর ব্যাখ্যা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে বহু আলোচনা রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, এই আমানত বলতে মূলত শরীয়তের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ বোঝানো হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাধীনতার সঙ্গে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা, যা ঐচ্ছিকতা বা ‘ইখতিয়ার’ নামে পরিচিত।

১. ঐচ্ছিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা: আমানতকে বহন করার অর্থ হলো, এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রয়েছে পুরস্কার (সাওয়াব) এবং অবহেলার ক্ষেত্রে রয়েছে কঠিন শাস্তি (আযাব)। এই জবাবদিহিতা তখনই সম্ভব, যখন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তার সৃষ্টজীবকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

অন্যান্য সৃষ্টি—আকাশ, পৃথিবী, পর্বতমালা—তারা সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে পরিচালিত। তারা আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে না। তাদের মাঝে আনুগত্য ও অবাধ্যতার ধারণা প্রযোজ্য নয়।

কিন্তু মানুষ! মানুষ সেই স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই স্বাধীনতা তাকে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে সক্ষম করে। এই কারণে, আল্লাহ তায়ালার এই সৃষ্টিজগতে বসবাস করার এবং বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক এই দুই বিপরীতমুখী উপাদানের মাঝে সমন্বয় সাধন করার জন্য মানুষই ছিল সবচেয়ে যোগ্য সৃষ্টি। (মুহাম্মদ আল-শাওকানি, ফাতহুল কাদীর, ৪/৩২০, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, ১৯৯৮)

হাদিস কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ আদমকে (আ.) বলেন, “হে আদম, আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার কাছে আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে পারেনি। তুমি কি তা বহন করবে, যা তার মধ্যে রয়েছে?”

আদম (আ.) বললেন: “হে রাব্বুল আলামিন! তার মধ্যে কী আছে?” আল্লাহ বললেন: “যদি তা বহন করো, পুরস্কার পাবে; আর যদি তা নষ্ট করো, শাস্তি পাবে।” তখন আদম (আ.) সেই আমানত বহন করলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩০৯৬)

২. মানুষের প্রতি সম্মান: ইমাম শাওকানি (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ যখন আনুগত্যশীলদের পুরষ্কার ও অবাধ্যদের শাস্তির বর্ণনা শেষ করলেন, তখন শরীয়তের দায়িত্বের বিশালতা ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এই আয়াতটি নাজিল করেন ((মুহাম্মদ আল-শাওকানি, ফাতহুল কাদীর, ৪/৩২১, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, ১৯৯৮)

আল্লাহ তাআলা এই আমানত গ্রহণে মানুষকে নির্বাচন করে তাকে সম্মানিত করেছেন।

আরও পড়ুনআমানত রক্ষা করা ইসলামের সামাজিকতার সৌন্দর্য০৪ আগস্ট ২০২৫আকাশ ও পৃথিবীর অপারগতা

আল্লাহর এই আমানত পেশ করা নিয়ে আলেমগণ তিনটি প্রধান ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

ক. রূপক অর্থে পেশ করা: কেউ কেউ মনে করেন, এই 'পেশ করা' রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, আমানতের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, যদি আকাশ বা পৃথিবীর মতো বিশাল ও শক্তিশালী সৃষ্টিও তার ভার বুঝতে পারত, তবে তারা তা নিতে অস্বীকার করত।

এটি অনেকটা এ কথা বলার মতো যে, “আমি উটের উপর বোঝা তুলে দিলাম, কিন্তু সে তা নিতে অস্বীকার করল”—এর অর্থ হলো তার ক্ষমতা বোঝার চেয়ে কম ছিল। (ইবনে কাসির, তাফসির আল-কোরআন আল-আযীম, ৬/৪৪৯, দার আল-ফায়হা, দামেস্ক, ২০০০)

এটি আমানতের আজমত বা বিশালতা বোঝানোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত।

খ. বাস্তব অর্থে পেশ করা: হাসান বসরী (রহ.) সহ অনেকে বিশ্বাস করেন, আল্লাহ তায়ালা বাস্তবিকই তাদের সামনে আমানতের গুরুভার, অর্থাৎ এর সঙ্গে জড়িত সাওয়াব ও শাস্তি উভয়কেই উপস্থাপন করেছিলেন। সৃষ্ট বস্তু হলেও আল্লাহ তাদেরকে সেই সময় উপলব্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমানত নষ্ট করার ঝুঁকির কারণে তারা তা গ্রহণে ভয় পেয়েছিল। (ইবনে কাসির, তাফসির আল-কোরআন আল-আযীম, ৬/৪৫০, দার আল-ফায়হা, দামেস্ক, ২০০০)

তারা আল্লাহর আদেশের অনুগত, কিন্তু এই আমানতের বোঝা তাদের জন্য অতিরিক্ত ছিল। আল্লাহ যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, আর তা ছিল ধূম্রপুঞ্জ। অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আসো। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১১)

গ. দৃষ্টান্ত পেশ করা: অনেক আলেম এটিকে একটি উপমা বা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন। যেমন আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেছেন, “যদি আমি এই কোরআন কোনো পর্বতের ওপর নাজিল করতাম, তবে তুমি দেখতে যে তা আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বিদীর্ণ হয়ে যেত।” (সুরা আল-হাশর, আয়াত: ২১)

এখানেও আল্লাহ আমানতের বিশালতাকে প্রকাশ করার জন্য আকাশ ও পৃথিবীর মতো শক্তিশালী সৃষ্টির উদাহরণ দিয়েছেন, যাতে মানুষ এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।

আরও পড়ুন‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না’১২ নভেম্বর ২০২৫মানুষ কেন 'জালিম ও অজ্ঞ'?

মানুষ যখন আমানত গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাকে “ইন্নাহু কানা জালুমান জাহুলা” (নিঃসন্দেহে সে ছিল অতিশয় জালিম ও অজ্ঞ) বলে আখ্যায়িত করলেন। এটি কি মানুষের প্রতি অসম্মান?

আলেমদের মতে, এই বর্ণনাটি আমানত গ্রহণের ফলে সৃষ্ট মানুষের সেই দুর্বলতাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, যা তাকে আমানত রক্ষা করতে বাধা দেয়:

জালিম (স্ব-অত্যাচারী): মানুষ যখন জেনে-বুঝে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্বের সীমালঙ্ঘন করে বা তার বিরুদ্ধে চলে যায়, তখনই সে নিজের প্রতি জুলুম করে। সে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগায় না।

অজ্ঞ (জাহুল): মানুষ প্রায়শই তার দায়িত্বের গুরুত্ব বা তার পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। হয় সে আমানতের হক সম্পর্কে উদাসীন, অথবা প্রবৃত্তির তাড়নায় সে তার করণীয় ভুলে যায়। এই অজ্ঞতাও আমানত নষ্ট করার একটি কারণ।

ইমাম ইবন আশুর (রহ.) বলেন, এই বাক্যটি মানুষের আমানত গ্রহণের ফলেই সৃষ্টি হওয়া অবস্থার বর্ণনা। মানুষ যখন আমানত বহন করে, তখন সে তার দুর্বলতার কারণে এতে ত্রুটি করে। সে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটি করে, তবে সে ‘জালিম’; আর যদি মনোযোগের অভাব বা গাফিলতির কারণে করে, তবে সে ‘অজ্ঞ’। (আল-তাহরির ওয়া আল-তানভির, ২২/১৪১, দার আল-সাসসুন, কাতার, ১৯৯৫)

কিন্তু এটি মনে রাখা জরুরি যে, এই 'জালিম ও অজ্ঞ' শব্দটি মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তিকে নির্দেশ করে। কারণ এমন মানুষও আছে, যারা আমানত রক্ষায় সফল। আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দাদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই কৃতজ্ঞ।” (সুরা সাবা, আয়াত: ১৩)।

এই আমানত গ্রহণ করে মানুষ সৃষ্টিজগতের অন্য সকল সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। সে এখন পরীক্ষার সম্মুখীন। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

আমানত বহন করার মাধ্যমে মানুষ চূড়ান্ত সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তবে এর ব্যর্থতা তাকে কঠিন শাস্তির দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

এই আয়াতটি আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, মানব জীবন শুধু ভোগ-বিলাসের জন্য নয়, বরং এই আমানতের গুরুভার বহন করা এবং আল্লাহর দেওয়া স্বাধীন ইচ্ছাকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুনইসলামে আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব২২ জুলাই ২০২২

সম্পর্কিত নিবন্ধ