চিত্রা নদী দখল করে পৌরসভার ভবন, এবার নির্মাণ হচ্ছে সীমানাপ্রাচীর
Published: 30th, November 2025 GMT
নদীর জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে পৌরসভা ভবন। এখন ভবনের এক পাশে খানিকটা বাড়িয়ে নদীর মধ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে সীমানাপ্রাচীর। কাজটি করছে যশোরের বাঘারপাড়া পৌরসভা।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০ অনুযায়ী, নদীর দুই ধারের যে অংশ শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে এবং বর্ষায় ডুবে যায়, তা নদীতট বা ফোরশোর হিসেবে গণ্য। এই জায়গায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা স্থাপনা করার অধিকার নেই। কেউ দখল করলে তিনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু এ আইনও মানেনি বাঘারপাড়া পৌরসভা।
২০২০ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রকাশিত নদী দখলদারদের তালিকায় চিত্রা নদীর ব্যাপক দখলের কথা উল্লেখ করা হয়। বাঘারপাড়া এলাকায় নদীর জায়গায় পৌরসভার শৌচাগার, দলীয় কার্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, পুকুর, দোকানপাট ও বসতবাড়ি গড়ে তোলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আংশিক তালিকায় ৪১ জন দখলদারের নাম থাকলেও পরে পাঠানো পূর্ণাঙ্গ তালিকায় ১২৬ জন অবৈধ দখলদার অন্তর্ভুক্ত হয়।
এ সম্পর্কে বাঘারপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব এবং পৌরসভার প্রশাসক মাহির দায়ান আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত অর্থবছরে পৌরসভার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি অর্থবছরে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আমি সম্প্রতি বদলি হয়ে এসেছি। বিষয়টি জানতাম না। খোঁজ নিচ্ছি।’
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় সূত্র জানায়, বাঘারপাড়া মৌজায় চিত্রা নদীর দাগ নম্বর ১৭৩৩। ২০০২ সালে ৩০ অক্টোবর বাঘারপাড়া পৌরসভা ঘোষণা করা হয়। পৌরসভার অস্থায়ী কার্যালয় ছিল বর্তমানে উপজেলা সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। ২০১১ সালে চিত্রা নদীর জায়গা দখল করে পৌরসভা ভবন নির্মাণ করা হয়।
উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসা চিত্রা নদী হঠাৎ বাঁক নিয়ে পশ্চিমমুখী হয়েছে—জায়গাটিই বাঘারপাড়া। নদীর উত্তর পাশে বাঘারপাড়া থানা, দক্ষিণ পাশে পৌরসভা, তার পাশে উপজেলা পরিষদ। গতকাল শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভা ভবনের পশ্চিম পাশে নদীর ভেতর দক্ষিণ থেকে উত্তর এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী সীমানাপ্রাচীরের নির্মাণকাজ চলছে। নিচে লোহার রড বেঁধে কংক্রিট ঢালাই দেওয়া হয়েছে। কয়েক ফুট অন্তর উঁচু করে রাখা হয়েছে বাঁধাই করা রড।
পৌরসভা সূত্র জানায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় কাজটি করা হচ্ছে। বরাদ্দ ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সীমানাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১১৫ ফুট, উচ্চতা ৮ ফুট। কাজ করছে যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজ। গত ১ আগস্ট কাজ শুরু হয়েছে, ১২০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামাল হোসেন বলেন, ‘এক মাস আগে কাজ শুরু করেছি। মাঝে কয়েক দিন কাজ বন্ধ ছিল। আবার শুরু করেছি। আশা করছি দুই মাসের মধ্যে শেষ করতে পারব।’
বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ভুপালী সরকার ছুটিতে থাকায় তাঁর মতামত জানা যায়নি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং জেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব কমলেশ মজুমদার বলেন, ‘নদীর জায়গায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি।’
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে চিত্রা নদীর ৩৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। ধলগ্রাম থেকে দাইতলা অংশ পুনঃখনন পরিকল্পনাধীন।
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
বাংলাদেশ কীভাবে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকদের ‘কাঁদাচ্ছে’
ভারতের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম তলানিতে ঠেকেছে। তারপরও দেশটির পেঁয়াজ রপ্তানি স্থবির। সরকারি কর্মকর্তারা পেঁয়াজ রপ্তানির এই দুরবস্থা দেখে হতবাক হলেও তার পেছনের কার হচ্ছে কৃষিপণ্যটি উৎপাদনে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ভারতের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তান ও চীন থেকে পণ্যটি সংগ্রহ করা। এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে মূলত নয়াদিল্লি বারবার অস্থায়ীভাবে পেঁয়াজ রপ্তানির বন্ধ করার কারণে।
ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একসময় ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া পেঁয়াজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। তবে গত আট মাসে বাংলাদেশ ভারত থেকে খুবই সামান্য পরিমাণ পেঁয়াজ কিনেছে। যদিও ঢাকার বাজারে দাম ভারতের স্থানীয় বাজারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। অন্যদিকে সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে খুব কম পরিমাণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি করেছে।
এদিকে ভারতের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ বেআইনিভাবে রপ্তানি হচ্ছে। সেই বীজই ভারতের পেঁয়াজের ঐতিহ্যবাহী ক্রেতাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে, যা কিনা পণ্যটির বাণিজ্যে ভারতের বহুদিনের আধিপত্যকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হর্টিকালচার প্রোডিউস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এইচপিইএ) সাবেক প্রধান ও অভিজ্ঞ পেঁয়াজ রপ্তানিকারক অজিত শাহ বলেন, ‘আমরা আমাদের গুণমানের জন্য অতিরিক্ত দাম নিতে পারতাম। যখন আমরা দীর্ঘদিন বাজারে ছিলাম না, তখন আমাদের গ্রাহকেরা বিকল্প সরবরাহকারীর খুঁজে নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন তারা (ভারতীয় পেঁয়াজের ক্রেতা) আর গুণমান তুলনা করে না; বরং আমাদের প্রতিযোগীদের সঙ্গে দামের তুলনা করে।’
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তার আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ছয় মাসের জন্য এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ মাসের জন্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশের বাজারগুলোয় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়।
২০২০ সালে, ঘন ঘন পেঁয়াজ রপ্তানির নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে ভারতকে একটি কূটনৈতিক নোটও পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশের কৃষকদের সুরক্ষা ও স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ কিনেছিল বাংলাদেশ। ওই অর্থবছরে ভারত থেকে মোট পেঁয়াজ রপ্তানি হয়েছিল ১৭ লাখ ১৭ হাজার টন। তার মানে বাংলাদেশ একাই আমদানি করেছিল ৪২ শতাংশ পেঁয়াজ। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে মাসে ভারত থেকে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে বাংলাদেশ।
যদিও কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, ঢাকায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ কম। তবে রপ্তানিকারকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, রপ্তানির নীতি ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলেই (যা মূলত স্থানীয় বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত হয়) ভারতের পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অন্যত্র কেনাকাটা করতে বাধ্য হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বোর্ড অব ট্রেডের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য পাশা প্যাটেল বলেন, ‘আমরা কেবল আমাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক ক্রেতাকে হারাইনি, তারা ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজে স্বাবলম্বী হতেও শুরু করেছে।’
রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় পেঁয়াজ কিনছে না। সরকার যখন রপ্তানিকারকদের কাছে জানতে চায়, তখন তাঁরা বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আমদানি অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
এইচপিইএ সরকারকে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা ইয়েমেন ও ইরান থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে পেঁয়াজ কিনছে। এ ছাড়া স্থানীয় ফসল থেকেও তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে। এমনকি ফিলিপাইনসও চীন থেকে না পেলে তবেই ভারতীয় পেঁয়াজ কেনে।
২০২০-২১ অর্থবছরে ভারত সৌদি আরবে ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল, যা পরবর্তী বছরগুলোয় কমতে কমতে থাকে। চলতি অর্থবছর এখন পর্যন্ত মাত্র ২২৩ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করেছেন সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে ক্রমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। এ কারণে রপ্তানিকারকেরা হর্টিকালচার কমিশনারের কাছে প্রতিযোগী দেশগুলোয় পেঁয়াজের বীজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
এইচপিইএর সহসভাপতি বিকাশ সিং বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অন্য প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজ উৎপাদন করছে। এই প্রবণতা ভারতীয় কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বীজ চীন ও পাকিস্তানেও ভারতীয় পেঁয়াজের বড় ধরনের চাহিদা রয়েছে।