মাদারীপুরে ভেলা প্রতিযোগিতায় দর্শনার্থীদের ভীড়
Published: 4th, October 2025 GMT
মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদে শনিবার (৪ অক্টোবর) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ভেলা প্রতিযোগিতা। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে নদীর দুই তীরে হাজারো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শনিবার বিকেলের পর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ ভেলা প্রতিযোগিতা দেখতে আসেন। নদীপাড়ে যেন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। দর্শনার্থীদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
আরো পড়ুন:
নড়াইলে নৌকাবাইচ দেখতে হাজারো দর্শনার্থীর ভীড়
গাইবান্ধায় ২ দিনব্যাপী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শুরু
২০ জন প্রতিযোগী কলা গাছের তৈরি ভেলা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এদের মধ্যে ইয়াসিন সরদার প্রথম, জাফর বেপারী দ্বিতীয় ও রাশেদ শেখ তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা শেষে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। তবে এই আয়োজন ব্যাতিক্রম। এখানে ভেলা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি এখন ধুরাইলসহ আশপাশের এলাকাবাসীর এক আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ। তিনি বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।
এ সময় তিনি বলেন, “গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিনোদন নয়, ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীকও বটে।”
ঢাকা/বেলাল/মেহেদী
.উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
ঢাকায় বুদ্ধদেব বসুর শেষ সফর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বৃত্তের বাইরে—তাঁদের সমসাময়িক অথচ অব্যবহিত পরবর্তী—বাংলা সাহিত্যে ‘তিরিশের কবি’ বলে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) স্থান জীবনানন্দ দাশের পরেই এবং তিনি বহুমুখী ও বহুপ্রসূ। বুদ্ধদেবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল লেখক আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আরও অনেকে আছেন, কিন্তু তাঁর কাজ বিস্তৃত সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়: কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, সাহিত্য-সমালোচনা, সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ, আত্মজীবনীমূলক রচনা, ভ্রমণকাহিনি, নাটক, কাব্য-নাটক প্রভৃতি। সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও তিনি বিশিষ্ট। মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী কবি হিসেবে খ্যাত, তাঁর বোদলেয়ার ও হোয়েল্ডারলিনের কবিতার অনুবাদ প্রশংসিত হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সাহিত্যসংগঠক। বুদ্ধদেব ছিলেন তরুণ লেখক-কবিদের অকৃত্রিম বন্ধু। শেষ জীবনে তিনি আধুনিক তরুণ কবিদের একজন স্নেহশীল অথচ দায়িত্ববান অভিভাবকে পরিণত হন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি ছিলেন কলকাতার তরুণ লেখকদের অন্যতম প্রধান প্রেরণাদাতা।
খাঁটি পূর্ব বাংলার অধিবাসী বুদ্ধদেবের জন্ম কুমিল্লায়, পৈতৃক বাড়ি বিক্রমপুরে এবং তাঁর শৈশব কাটে নোয়াখালীতে। কৈশোর ও প্রথম যৌবন ঢাকায় এবং গোটা শিক্ষাজীবন কাটিয়েছেন তিনি ঢাকা শহরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ইংরেজিতে এমএ পাস করে উনিশ শ ত্রিশের দশকের শুরুতে কলকাতায় কর্মজীবন শুরু করার পর ঢাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অত্যন্ত শিথিল হয়ে যায়। ১৯৪৭-এ দেশবিভাগের পর মাত্র একবার ছাড়া আর কোনো দিন ঢাকায় আসেননি। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তাঁর অনুরাগী, বন্ধুস্থানীয় ও গুণগ্রাহীরা তাঁকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানালেও তিনি অজ্ঞাত কারণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তার ভালোমন্দ সম্পর্কে তাঁর তেমন উৎসাহ ছিল না। যে ঢাকায় কাটে তাঁর জীবনের এক অমূল্য সময়, সেই ঢাকা—সেই পুরানা পল্টন—দেখার তাঁর কোনোই আগ্রহ ছিল না। আমরা বুদ্ধদেবের পক্ষ সমর্থন করে বলতে পারি, তাঁর সেই স্মৃতির পুরানা পল্টনের অস্তিত্ব পঞ্চাশ বছর পর আর ছিল না বলেই হয়তো তিনি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বর্তমান পুরানা পল্টনের হতশ্রী অবস্থা দেখতে চাননি। কিন্তু পূর্ব বাংলাকে তিনি কেন ভুলে যেতে চাইলেন এবং ভুলে গেলেনও—সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। এর মধ্যে ১৯৭৪-এর ১৮ মার্চ আকস্মিকভাবে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুর দুই দিন আগে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, ‘রাণুর জন্য আমাকে আরও দশ বছর বাঁচতে হবে।’ রাণু, অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী প্রতিভা বসু, কথাশিল্পী, তিনিও ছিলেন ঢাকারই বাসিন্দা।
১৯৭০-এ আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এক কথিকায় বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন:
স্বাধীনতা-লাভের পরের বছর আমি একবার একদিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম, আমার প্রথম যৌবনের বিচরণ-ভূমিতে। তার পরে আর যাওয়া হয়নি। কিন্তু—আমি সাহিত্যিক বলে—পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ ছিল আমার; ঢাকার তরুণ কবিরা প্রায়ই লেখা পাঠাতেন ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য, চিঠি লিখতেন; পত্রিকা বেরোতে দেরি হলে গ্রাহকদের আগ্রহ-ভরা চিঠি আসত ঢাকা থেকে; আর মাঝে-মাঝে পেতাম আমার লেখার পক্ষপাতী কোনো পাঠকের প্রীতিপূর্ণ পত্র, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পাঠিকা। ‘কবিতা’ এখন আর বেরোয় না, তবু মাঝে-মাঝে আসে চিঠি, কোনো পত্রিকা বা নতুন বই এসে পৌঁছায়; আমি বুঝতে পারি, দুই দেশের মধ্যে বাংলা ভাষা একটি সেতুর মতো কাজ করছে, কিংবা বলা যায় পদ্মার এপারে-ওপারে বয়ে চলেছে একটি অন্তঃশীল স্রোত, তার নাম বাংলা সাহিত্য।
এখানে প্রথম বাক্যটিতে—অসাবধানতাবশত হোক, স্মৃতিভ্রম থেকে থেকে অথবা ইচ্ছাকৃত হোক—তথ্যবিভ্রাট ঘটেছে। ‘স্বাধীনতা-লাভের পরের বছর’ বলতে ১৯৪৮-কেই বোঝায় এবং ‘এক দিনের জন্য’ও নয়, আড়াই দিনের জন্য তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। প্রকৃত ঘটনা হলো, তিনি এসেছিলেন ১৯৫০-এর ১৩ আগস্ট দুপুরে এবং কলকাতায় ফিরে যান ১৫ আগস্ট দুপুরে। সেটাই ছিল তাঁর শেষ ঢাকা সফর। এবং পরবর্তী ২৪ বছরে আর কখনো ঢাকায় আসা না হলেও ঢাকার লেখকদের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে ও অন্যান্যভাবে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল আমৃত্যু। বাস্তবিক পক্ষেই বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য ছিল সেই যোগাযোগের অনন্য সেতু।
বুদ্ধদেব বসু এসেছিলেন ১৯৫০-এর ১৩ আগস্ট দুপুরে এবং কলকাতায় ফিরে যান ১৫ আগস্ট দুপুরে। সেটাই ছিল তাঁর শেষ ঢাকা সফর। এবং পরবর্তী ২৪ বছরে আর কখনো ঢাকায় আসা না হলেও ঢাকার লেখকদের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে ও অন্যান্যভাবে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল আমৃত্যু।সে সময় কলকাতা থেকে আর একজন তরুণ লেখক এসেছিলেন, তিনি শিবনারায়ণ রায়। তিনি এসেছিলেন ট্রেনে, বুদ্ধদেব বিমানে। শিবনারায়ণ তখন ছিলেন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা এবং পরে নয়া-মানবতাবাদী এম এন রায়ের অনুরাগী। বুদ্ধদেব ও শিবনারায়ণের মধ্যে মিল ছিল এইটুকু যে, তাঁরা উভয়েই ছিলেন অবিচল মার্কিনপন্থী ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির সমর্থক এবং সাবলীলভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী।
বুদ্ধদেব রাজনীতিবিমুখ ছিলেন, বলা চলে অ্যাপলিটিক্যাল, বস্তুত তিনি ছিলেন কমিউনিস্টবিরোধী শিবিরের মানুষ। তবে তিরিশের দশকের শেষ দিকে পরিস্থিতির কারণে তিনি প্রগতি লেখক সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৪২-এ ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘেরও সদস্য হয়েছিলেন আরও কয়েকজন অ-মার্ক্সবাদী লেখকের মতো। আমেরিকানদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ স্থাপনে অন্যান্যের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে, তার নাম ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিট—একটি মার্কিন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব ফ্রেন্ডস অ্যাম্বুলেন্স ইউনিট এবং আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি একত্রীকরণের মাধ্যমে ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিট গঠিত হয়। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে ছিল এটির প্রধান কার্যালয়। কলকাতায় এর অফিস ছিল সাহেবপাড়ায় ১ নম্বর আপার উড স্ট্রিটে এবং ঢাকার অফিস ছিল কায়েতটুলীর ৭ বরোদা গাঙ্গুলি লেনে এক বিরাট বাড়িতে।
সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘ঢাকার বুদ্ধদেব বসু’ বইটি অর্ডার করতে ক্লিক করুন
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে আমেরিকার এই শান্তিবাদী স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ১৯৪৬-এ কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গা-উপদ্রুত এলাকায় দুর্গতদের মধ্যেও তারা কাজ করে। অবিভক্ত ভারতে রেডক্রসের সঙ্গে তারা কাজ করত—পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তা সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ সরকার যখন ভারতবাসীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে ১৯৪৭-এর আগস্টে চলে যায়, তখনো এই সংগঠন পূর্ববঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গে থেকে যায় এবং তখন থেকে শুধু সমাজসেবামূলক কাজ নয়, কমিউনিস্টবিরোধী উদার গণতন্ত্রমনস্ক লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তারা কাজ করতে থাকে। তখন তাদের প্রধান কাজ হয় সোভিয়েতবিরোধী, বিশেষ করে মার্কিনপন্থী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দেওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতা করা। কলকাতার পার্শ্ববর্তী সোদপুর খাদি আশ্রমের প্রধান, বিশিষ্ট গান্ধীবাদী নেতা ও সংগঠক সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল। গান্ধীবাদী সমাজসেবামূলক কাজেও তারা সহযোগিতা দিতে চেয়েছিল। তাদের লোক নোয়াখালী-চাঁদপুরে গান্ধীর সঙ্গে কাজও করেছে। বাংলায় এই সংগঠনের প্রধান গর্ডন এফ মুইরহেড-এর সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে চল্লিশের শেষ দিকে। সেই অন্তরঙ্গতা অক্ষুণ্ন ছিল অনেক দিন। তাঁদেরই আমন্ত্রণে তিনি ১৯৫০ সালের আগস্টে ঢাকায় এসেছিলেন তিন দিনের জন্য: সেটাই তাঁর ঢাকায় শেষ সফর। সাতচল্লিশের পর ফ্রেন্ডস সার্ভিস নিয়মিত ঢাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কবি জসীম উদ্দীন প্রমুখ তাদের আলোচনায় যোগ দিতেন।
ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিটের ঢাকা কেন্দ্রের প্রধান টোরেন্স মিউস বুদ্ধদেবকে আমন্ত্রণ জানান ১৯৫০-এর ১৪ আগস্ট—পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের ছুটির দিনে—ঢাকায় তাঁদের অফিসে এক ঘরোয়া সাহিত্য-বৈঠকে বক্তৃতা দিতে। বুদ্ধদেব খুব ব্যস্ত ছিলেন। তবু সম্মত হন, যখন আয়োজকেরা জানান যে এক দিনের বেশি তাঁকে ঢাকায় থাকতে হবে না এবং স্থলপথে নয়, তাঁর যাতায়াতের ব্যবস্থা হবে বিমানে।
এই সংগঠন (আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস) পূর্ববঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টবিরোধী উদার গণতন্ত্রমনস্ক লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কাজ করতে থাকে। তাদের প্রধান কাজ হয় সোভিয়েতবিরোধী, বিশেষ করে মার্কিনপন্থী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দেওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতা করা।মিউসের ওই সাহিত্য-আলোচনার বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য ঢাকার কয়েকজন তরুণ কবি ও লেখককেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী, কবি আবদুর রশীদ খান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ডন-এর সাংবাদিক ও লেখক মাহবুব জামাল জাহেদী, অধ্যাপক অজিত গুহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ। আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুর রশীদ খান প্রমুখ তখন ‘নতুন কবিতা’ নামে একটি সংকলন বের করে কবিদের এক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। বুদ্ধদেব ঢাকায় আসবেন শুনে তাঁরা কলকাতায় তাঁকে লেখেন যে ঢাকায় এলে তাঁকে নিয়ে তাঁরাও একটি বৈঠকে বসতে চান। তাঁরা প্রস্তাব করেন, ১৫ আগস্ট সকালে এক প্রাতরাশ বৈঠকে তাঁরা বুদ্ধদেবকে নিয়ে সাহিত্য-আলোচনায় বসবেন। সে আমন্ত্রণের উত্তরে ১০ আগস্ট ১৯৫০ বুদ্ধদেব ‘কবিতা ভবন’ থেকে এক চিঠিতে লেখেন:
কল্যাণীয়েষু,
তোমাদের প্রীতিপূর্ণ নিমন্ত্রণ পেয়ে খুশি হয়েছি। মুশকিল এই যে সোমবার [১৪ আগস্ট] এখানে আমার জরুরি কাজ আছে, তাই সেদিন সকালে ফিরতে হবে। রবিবার ১৩ তারিখ প্রায় পুরো দিনটা তোমাদের সঙ্গে আলাপে-আলোচনায় কাটাতে পারবো, সেই সময়টুকুর সদ্ব্যবহার হলে সাহিত্যের আলোচনার অনবকাশ হবার কথা নয়। এখানে Friends Service Unit-এর প্রতিনিধি আমাকে জানিয়েছেন যে কোনো বড় সভা হবে না—কেন না আমি একেবারেই বক্তা নই—ছোট ছোট ঘরোয়া বৈঠকের ব্যবস্থা হয়েছে, তাতে সাহিত্য বিষয়েই আলোচনা হবে। এ ব্যবস্থা আমার মনোঃপুত এবং এতে তোমাদেরও নিরাশ হবার কারণ নেই। আমি আশা করছি যে রবিবারের মধ্যেই তোমাদের সকলের সঙ্গে দেখাশোনা হতে পারবে, তাই সোমবার সকালে তোমাদের প্রস্তাবিত প্রাতরাশে যদি একান্তই না উপস্থিত হতে পারি তা হলে তোমরা আমাকে মার্জনা করো।
ঢাকার তরুণদের সঙ্গে পরিচয় হবে ভাবতে ভালো লাগছে। তোমাদের সকলকে আমার ধন্যবাদ ও শুভ-কামনা জানাই।
১৩ আগস্ট দুপুরে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বুদ্ধদেব কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। সম্ভবত সেটাই তাঁর প্রথম বিমানভ্রমণ। তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিটের কর্মকর্তা মার্গারেট ব্রাডলি, ওই সংগঠনের বাঙালি কর্মকর্তা কেরামত আলী তালুকদার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক ও তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাপ্তাহিক সোনার বাংলার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কবি মনোজ রায়চৌধুরী, আশরাফ সিদ্দিকী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ। কোনো আবাসিক হোটেলের কামরায় নিঃসঙ্গ থাকা তিনি পছন্দ করেননি বলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ফ্রেন্ডস সার্ভিসেরই একটি কক্ষে। সেখানে অনুরাগী-পরিবেষ্টিত থাকাতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ অনুভব করেন। কারও বাড়িতে অতিথি হয়ে থাকাতেও ছিল তাঁর আপত্তি।
বিকেলে বুদ্ধদেবের সঙ্গে কায়েতটুলীতে গিয়ে দেখা করেন কবি-লেখক ও অধ্যাপকদের অনেকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জগন্নাথ কলেজের দর্শনের শিক্ষক রেবতীমোহন চক্রবর্তী, বাংলার শিক্ষক অজিত গুহ, ভবানীচরণ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অমিয় চক্রবর্তী, বাংলার মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা প্রমুখ। নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। বুদ্ধদেব ও অজিত গুহ কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কিছু একটা আলোচনা করেন। অন্যেরা তা উপভোগ করেন। বৈঠকে শিবনারায়ণ রায়ও ছিলেন।
১৩ আগস্ট দুপুরে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বুদ্ধদেব কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। সম্ভবত সেটাই তাঁর প্রথম বিমানভ্রমণ। তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিটের দুজন কর্মকর্তা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক ও তরুণ কবি-সাহিত্যিক।সাহিত্য-আলোচনার চেয়ে অজিত গুহ অধিকতর ব্যস্ত হয়ে পড়েন বুদ্ধদেবের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে। সে ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ফ্রেন্ডস সার্ভিসের কর্মকর্তা মিস মার্গারেট ব্রাউলি ও শ্রীমতী বাসন্তী গুহঠাকুরতা।
নির্ধারিত আলোচনা-বৈঠক শুরু হয় ১৪ আগস্ট সকালে। কোনো ভাড়া করা হল-ঘরে বড় সাহিত্য সভা নয়—ঘরোয়া বৈঠকের মতো। বসার ব্যবস্থা হয়েছিল ফ্রেন্ডস সার্ভিসের অফিসের একটি সুপরিসর ঘরের মেঝেতে ফরাশ বিছিয়ে। কোনো মাইকও ছিল না। কলেজে ক্লাস নেওয়ায় অভ্যস্ত বুদ্ধদেব বসুর তাতে অসুবিধা হয়নি।
শ্রোতা ছিলেন জনা পঁচিশ-তিরিশের মতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, শ্রোতাদের মধ্যে বুদ্ধদেবের শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও ড. কাজী মোতাহার হোসেনও ছিলেন। অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন, ডা. এম এন নন্দী, অজিত গুহ, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুর রশীদ খান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, তখনকার প্রতিভাবান তরুণ সাংবাদিক ও কবি মাহবুব জামাল জাহেদী, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, শামসুর রাহমান, কবি মোহাম্মদ মামুন প্রমুখ।
স্বাধীনতা-উত্তরকালের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা ও গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন বুদ্ধদেব। ঘণ্টা দেড়েক তিনি বক্তৃতা দেন, তারপর জবাব দেন শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের। পূর্ব বাংলার তরুণ কবি-লেখকদের তিনি পরামর্শ দেন পশ্চিমের, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার আধুনিকতম সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার।
সৈয়দ আবুল মকসুদ (২৩ অক্টোবর ১৯৪৬—২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১)