জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় কীভাবে আওয়ামী লীগ সরকার নজরদারি ও দমন–পীড়নের কাজটি করত, সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় গতকাল সোমবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দ্বিতীয় দিনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নজরদারি করতে ফোনে আড়ি পাতার পাশাপাশি ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত (লোকেশন ট্র্যাকিং) করা হতো। ড্রোন ব্যবহার করেও নজরদারি হতো তখন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের মাঠপর্যায়ের ক্যাডার বাহিনীকেও কাজে লাগানো হয়েছিল। এসব তথ্যের আলোকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষ করে পুলিশ ও র‍্যাব আন্দোলনকারীদের ওপর বল প্রয়োগ করত। এ জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ আসত।

দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুরুতেই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ওপর ডেইলি স্টার–এর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র ট্রাইব্যুনাল কক্ষে দেখানো হয়। এরপর শেখ হাসিনা ও একজন সেনা কর্মকর্তার মধ্যে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড শোনানো হয়। এ ছাড়া প্রয়াত লেখক-গবেষক বদরুদ্দীন উমর এবং আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকার একাধিক শিরোনাম (ওই সময়ের) ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনান।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছিল

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের এক পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে এক নজিরবিহীন দমন অভিযান পরিচালনা করে। এখানে ছিল পুলিশ, র‍্যাব, এপিবিএন, আনসার ব্যাটালিয়ান, বিজিবি, সশস্ত্র বাহিনীর কিছু সদস্য, ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি, সোয়াত, সিটিটিসি ও ডিবির মতো গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে দেশব্যাপী ছাত্র ও নাগরিকদের ওপর সহিংসতা চালানো হয়। এতে আওয়ামী লীগ–যুবলীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, হেলিকপ্টার, ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এপিসি (সাঁজোয়া যান) ব্যবহার করা হয়েছে। লেথাল উইপন (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করা হয়েছে। রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে।

গণ–অভ্যুত্থানের সময় পদ্ধতিগত আক্রমণ হয়েছিল উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার। তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চান। তিনি প্রতিপক্ষকে রাখবেন না। একদলীয় শাসন থাকবে।

‘এবার শুরুতে দিবা’

নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সময় শেখ হাসিনা ও একজন সেনা কর্মকর্তার কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে শোনান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত বছরের ১৯ জুলাইয়ের কথোপকথন এটি। শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলা সেনা কর্মকর্তার নাম কর্নেল রাজীব। তিনি এখন বাংলাদেশের বাইরে আছেন। তিনি ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি অব প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন।

অডিও কথোপকথনে শোনা যায়, কর্নেল রাজীব বলছেন, ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার।’

তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওরা কিন্তু জায়গায় জায়গায় এখন জমা হতে শুরু করছে। মিরপুর ১০ নম্বরে, উত্তরা, তারপরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

এবং বিভিন্ন জায়গায়।…ওই শুরুতেই কিন্তু ইয়ে করতে হবে।’

এ সময় কর্নেল রাজীব বলেন, ‘ঠিক আছে স্যার।’

এরপরই শেখ হাসিনা আবার বলেন, ‘.

..শুরুতেই।’

তখন কর্নেল রাজীব বলেন, ‘ঠিক আছে।’

এর পরের কথোপকথন স্পষ্ট বোঝা যায় না। পরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এবারে কোনো কথা নাই। এবার শুরুতে দিবা।’

তখন কর্নেল রাজীব বলেন, ‘ঠিক আছে স্যার।’

‘মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় কলেজছাত্র মো. হৃদয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি ভিডিও দেখান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের কয়েকজন সদস্য হৃদয়কে আটক করেছেন। রাস্তার ওপর পুলিশের সদস্যরা হৃদয়কে ঘিরে আছেন। এর মধ্যে পুলিশের এক সদস্য হৃদয়কে গুলি করেন। হৃদয় মাটিতে পড়ে যান। এরপর পুলিশের সদস্যরা চলে যান। পরে পুলিশের দু-তিনজন সদস্য এসে হৃদয়কে টেনে নিয়ে যান।

টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আলমনগর গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে হৃদয় কোনাবাড়ী এলাকায় থাকতেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি অটোরিকশা চালাতেন।

ভিডিও দেখানো শেষে ট্রাইব্যুনালে তাজুল ইসলাম বলেন, এই গুলি যে পুলিশ সদস্য করেছেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মরদেহ গাড়িতে তুলে নিয়ে রাতে ব্রিজের ওপর থেকে কড্ডা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত স্বীকারোক্তি আছে। তাঁর মরদেহ উদ্ধারের জন্য তদন্ত সংস্থা ডুবুরি নামিয়েছিল। যেহেতু এক বছর পরে এবং সেখানে স্রোত আছে, মরদেহ পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার ওই কনস্টেবলের নাম মো. আকরাম হোসেন (২২)। তিনি গাজীপুর শিল্প পুলিশে কর্মরত ছিলেন।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ব যবহ র কর ন র সময় নজরদ র হয় ছ ল আওয় ম সদস য হ দয়ক মরদ হ র ওপর

এছাড়াও পড়ুন:

সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নজরদারিমূলক অভিযান

মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ওপর লক্ষ্য করে নজরদারি, তথ্য চুরি ও অ্যাকাউন্ট দখলের ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা দ্য ইউএস সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সাইসা)। সংস্থাটি বলছে, বাণিজ্যিক গুপ্তচর সফটওয়্যার ও রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান ব্যবহার করে দক্ষ সাইবার হামলাকারীরা সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যমে অনুপ্রবেশ করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরো মোবাইল ডিভাইস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে।

সাইসার তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় সামাজিক প্রকৌশল কৌশল, ব্যবহারকারীর অসতর্কতা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা তিনটিই সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ভুক্তভোগীর অ্যাপে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী ধাপে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রেরণ করা হয়, যার মাধ্যমে ডিভাইসের অভ্যন্তরের তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়।

চলতি বছরের শুরু থেকে এ ধরনের একাধিক অভিযান শনাক্ত হয়েছে। সিগন্যাল অ্যাপের ‘লিংকড ডিভাইস’ সুবিধার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘প্রোস্পাই’ ও ‘টু স্পাই’ নামের দুটি অ্যান্ড্রয়েড স্পাইওয়্যার প্রচারণায় সিগন্যাল ও টোটকের নকল সংস্করণ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। আরেকটি অভিযানে ‘ক্লের‍্যাট’ নামের অ্যান্ড্রয়েড গুপ্তচর সফটওয়্যার ব্যবহার করে রাশিয়ার ব্যবহারকারীদের নিশানা করা হয়। সেখানে টেলিগ্রাম চ্যানেল ও নকল ডাউনলোড সাইট ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটক ও গুগল ফটোজের মতো একই রকম দেখতে ভুয়া অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে ডেটা চুরি করা হয়।

একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপের দুটি নিরাপত্তা দুর্বলতার (সি–ভি–ই ২০২৫–৪৩৩০০ ও সি–ভি–ই ২০২৫–৫৫১৭৭) ত্রুটি ব্যবহার করে প্রায় ২০০ জনের কম ব্যবহারকারীকে লক্ষ্য করে আলাদা আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। আবার স্যামসাংয়ের নিরাপত্তা দুর্বলতা (সি–ভি–ই ২০২৫–২১০৪২) কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গ্যালাক্সি ডিভাইসে ‘ল্যান্ডফল’ গুপ্তচর সফটওয়্যার আক্রমণের ঘটনাও সাইসা নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, ডিভাইস লিংক কিউআর কোডের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট দখল, জিরো ক্লিক হামলা ও জনপ্রিয় অ্যাপের নকল সংস্করণ ছড়িয়ে ব্যবহারকারীকে ভুল পথে চালিত করার মতো কৌশল দেখা যাচ্ছে। এসব তৎপরতার মূল লক্ষ্য সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাগরিক সমাজের কর্মী এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

সাইসা বলছে, নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশনযুক্ত মেসেজিং ব্যবহার করা জরুরি। ফিশিং–প্রতিরোধী ‘ফাইডো’ পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবহার করতে হবে এবং মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনে এসএমএস–নির্ভরতা এড়িয়ে চলা উচিত। পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় আলাদা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার উপযোগী।

মোবাইল অপারেটর অ্যাকাউন্টে পিন চালু করা এবং ডিভাইস ও সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা নিরাপত্তা জোরদার করে। সাইসার মতে, সম্ভব হলে সবশেষ মডেলের ফোন ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত ভিপিএন ব্যবহার না করাই উত্তম। আইফোন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে লকডাউন মোড চালু রাখা, আইক্লাউড প্রাইভেট রিলে সক্রিয় রাখা এবং সংবেদনশীল অ্যাপের অনুমতি সীমিত রাখতে পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এনক্রিপশন সক্রিয় থাকলে তবেই আরসিএস ব্যবহার, গুগল ক্রোমে বাড়তি নিরাপত্তা সুরক্ষা চালু রাখা, গুগল প্লে প্রটেক্ট সচল রাখা ও নিয়মিত অ্যাপের অনুমতি পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র: দ্য হ্যাকার নিউজ

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • লাহারহাটের পথে নারী রিকশাচালকের সঙ্গে কথোপকথন
  • সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নজরদারিমূলক অভিযান