আশির দশকের জীবন যাত্রার উপযোগী এমন কিছু পেশা ছিলো যা এখন আর নেই। অথবা একেবারেই বিলুপ্তির পথে। সভ্যতা ও সমাজ গ্রহণ করে নিয়েছে অনেক নতুন পেশা। হারিয়ে যাওয়া সেই সব পেশা নিয়ে এই আয়োজন।

মাইঠাল: মাইঠালদের কাজ ছিলো মাটি কাটা। আগে বর্ষার দিনে বৃষ্টি এবং বন্যার পানি থেকে ঘর-বাড়ি রক্ষা করার জন্য প্রত্যেকটা বাড়ির ভিটা খুব উঁচু করা থাকতো। মাটি ফেলে প্রত্যেকটা বাড়ি ফসলের জমিন থেকে অনেক উঁচু করা হতো। যে কারণে বর্ষায় বৃষ্টিতে যে পরিমাণ মাটি ধুয়ে জলাশয়ে চলে যেত, প্রতি বছর ওই পরিমাণ বা তার বেশি মাটি তুলতে হতো। তা নাহলে বর্ষায় প্রত্যেকটা বাড়ি ডুবে যেত। অর্থাৎ বাড়িগুলো যাতে না ডোবে এজন্য প্রত্যেক বছরই প্রত্যেক বাড়িতেই মাটি ফেলতে হতো। এই কারণে সে সময় একটি পেশাজীবী শ্রেণি ছিলো, যাদেরকে স্থানীয় ভাষায় মাইঠাল বলা হতো। তাদের কাজ ছিলো মাটি কেটে বাঁশের ঝাকায় ভরে বাড়ির ভিটায় ফেলা। শীতকালে যখন জলশয় শুকিয়ে যেত তখন মাইঠালদের কাজ শুরু হতো এবং মোটামুটি বর্ষার আগ পর্যন্ত এই কাজ চলতো। তারা খুব ভোর বেলায় কাজ শুরু করতো। মোটামুটি সূর্য ওঠার পরেই মাটি কাটা বন্ধ করে দিত। আবার পরের দিন আসতো। গেরস্থের সঙ্গে তাদের একটা কন্ট্রাক থাকতো। এবং সেখানে একটা মাপ থাকতো-কোয়া অর্থাৎ কয় কোয়া মাটি কেটেছে সেই হিসেবে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো।  মাটি কাটার জায়গায় একটা ঢিবির মতো থাকতো, তারা কত সময় কাজ করবে-সেই বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা এই রোদের মধ্যে সাধারণত মাটি কাটতো। অনেক সময় ফজরের আজানের আগেই চলে আসতো। পূর্ণিমা থাকলে অনেক সময় রাতের বেলায়ও কাজ করতো। 

করাতি: এখন যেমন স’মিল হইছে, তখনতো স’মিল ছিলো না। এই কাঠ কাটা এবং চেরাই করার জন্য পেশাজীবীরা ছিলো, তাদেরকে বলা হতো করাতি। তাদের কাছে বড় বড় করাত থাকতো। উপরে একজন আর নিচে দুইজন থাকতো-দেড় মিটার লম্বা এবং ধারালো। যিনি ওই কাঠের মালিক বা যিনি ওই কাঠ দিয়ে কাজ করবেন-সেই সূত্রধরের সঙ্গে আলাপ করে-তার চাহিদা অনুযায়ী কাঠ চেরাই করে দিতো। পরিমাপ ঠিক রাখার জন্য এক ধরণের কালো সুতা তেল আর কায়লা দিয়ে কালো রং বানিয়ে সেই রঙে সুতা চুবিয়ে তুলতো। এরপর সুতা ধরে টাস করে ছেড়ে দিতো। তখন একটা দাগ পড়ে যেত। তখন ওই দাগ বরাবর তারা কাঠ কাটতো। এদের জীবনযাপন খুব কঠিন ছিল। এরা গেরস্থ বাড়িতে কাজ করার সময় চিড়া-মুড়ি খেতো। এরা বেশিরভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক।

আরো পড়ুন:

বর্ষায় প্রাকৃতিক উপায়ে ঠোঁটের আদ্রতা ধরে রাখার ৪ উপায়

বাঁশ গাছ কতদিন বাঁচে?

সূত্রধর বা সুতার: একজন সুতার কোনো কোনো সময় একই বাড়িতে টানা একমাস, দেড় মাস কাজ করতো। দেখা যেত যে, আজ একটু কাজ করলো আবার পরের দিন আসলো, তখন আবার আরেকটু করতো। এই করতে করতে দেখা যেত যে একটা আলমারি বানালো বা একটা ড্রেসিং টেবিল বানালো। যার যেটা দরকার।

নাপিত: এখন যত সেলুন আছে, তখন এতো সেলুন বা পার্লার ছিলো না। যাদের চুল কাটা দরকার বা সেভ করা দরকার তাদের চুল কেটে দিতো বা সেভ করে দিতো। বিশেষত বিশেষত বাচ্চাদের চুল কাটার জন্য নাপিত বাড়িতে যেত। বাড়ির সব বাচ্চাদের সিরিয়াল দিয়ে বসিয়ে সবার চুল কেটে দিত। এই নাপিতরা অনেক সময় টাকাও নিতো আবার অনেক সময় ধানের মৌসুমে ধান নিতো। 

বেহারা: যারা পালকি বহন করতো তাদেরকে বেহারা বলা হতো। বড় পালকির জন্য চারজন থাকতো। ছোট পালকি বা ডুলির জন্য দুইজন থাকতো। এরাতো এখন হারিয়ে গেছে।

সাইকেল মেরামতকারী বা সাইকেল মেকার: আগেতো এখনকার মতো বাজার-ঘাট ছিলো না, বর্ষার সময় সাইকেলগুলোকে যখন তিন-চার মাসের জন্য ঘরে তুলে রাখতে হবে তার আগে এর আলাদা যত্ন প্রয়োজন হতো। বর্ষার আগে গ্রামে সাইকেল মেকাররা আসতো। এবং একটি গ্রামে যত সাইকেল আসতো, সবগুলো এক জায়গায় করতো। সাইকেলের পাটর্সগুলো খুলে, তেল-গ্রিজ লাগিয়ে দিতো। যাতে জং না ধরে। এবং পরবর্তীতে যাতে সাইকেল ব্যবহারের উপযোগী থাকে। দেখা যেত যে সাইকেল মেকাররা যেদিন যে গ্রামে যেত-সেদিন ওই গ্রামেই সারাদিন কাজ করতো। এমনকি ওই গ্রামের লোকজন তাকে খেতে দিতো। সারাদিনে সাইকেলগুলো ওয়েলিং করতো।

কোচোয়ান: কোচায়ানরা ঘোড়ার গাড়ি চালাতো। দুই ঘোড়ার গাড়িতেই কোচোয়ানরা বেশি থাকতো। ওগুলোকে টমটম নামেও ডাকা হতো।

সহিস: সহিস হচ্ছে যারা শখের ঘোড়া পালতো, সেই ঘোড়া দেখভাল করতো।

গাছি: এরা খেঁজুর গাছ কেটে রস বের করতো বা তাল গাছ কেটে রস বের করতো। সাধারণত খেঁজুর গাছের ক্ষেত্রে শীতের শুরুতে গাছের ডালপালা ছেটে, কাণ্ড চেছে এরপর চোঙ্গা লাগিয়ে দিতো। তার মুখে ঠিলা লাগিয়ে দিতো সন্ধ্যায়। সকালে রসভর্তি ঠিলা নামিয়ে আনতো। অনেক সময় কাঁচা রস বিক্রি করতো আবার অনেক সময় গুড় তৈরি করতো। 

হাজাম: এই হাজামরা তখন সুন্নতে খাতনা করাতো।  এখন যেমন ডাক্তারের কাছে নিয়ে কিশোরদের সুন্নতে খতনা করানো হয় ওই সময় এটা কোনোভাবেই করানো হতো না। সবারই হাজামের মাধ্যমে করানো হতো। তারা অনেক সময় বিনিময় হিসেবে টাকা নিতো। আবার লুঙ্গি, গামছা উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। সুন্নতে খাতনার পরে যখন অনুষ্ঠান করা হতো, ওই অনুষ্ঠানে সমাজের লোকজনের সঙ্গে হাজামকেও দাওয়াত দেওয়া হতো। 

ঢাকা/লিপি

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর অন ক সময় ক জ কর বর ষ র র জন য

এছাড়াও পড়ুন:

পাখি ও প্রজাপতির বিলুপ্তিতে রাসায়নিক কৃষির দায়

আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ আর আগের মতো সজীব নেই। যে রঙিন প্রজাপতিগুলো একসময় বাগানে বাগানে উড়ে বেড়াত, যে পাখিদের কলকাকলিতে ভোরবেলা জেগে উঠতাম আমরা, সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।

গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো দোয়েল, শালিক কিংবা বাবুই পাখির দেখা মেলে না। ফুলের বাগানে প্রজাপতির সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই বিষাদময় পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের।

একদিকে যেমন জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকেরা নানা রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই রাসায়নিকগুলো শুধু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেই মারছে না, উপকারী পতঙ্গ ও পাখি মারছে। এগুলো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি।

কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গরা। এই ছোট প্রাণীগুলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাপতি ও মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।

এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফলমূল ও শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু যখন কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন সেই বিষ প্রজাপতি ও মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় তারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, আবার কখনো বিষক্রিয়ায় তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। প্রজাপতির বিভিন্ন প্রজাতি এখন আর চোখে পড়ে না, যেগুলো একসময় সচরাচর দেখা যেত।

পাখিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। গ্রামীণ এলাকায় যেসব পাখি একসময় খুব সহজেই দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন বিলুপ্তির পথে। শালিক, দোয়েল, বাবুই, চড়ুই এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এর পেছনেও রাসায়নিক কীটনাশকের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।

কিন্তু যখন সেই পোকামাকড়ের শরীরে কীটনাশকের বিষ থাকে, তখন পাখিরা সেই বিষযুক্ত খাবার খেয়ে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রজাপতির মতোই অনেক সময় তারা সরাসরি মারা যায়, আবার কখনো তাদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া অনেক পাখি প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের চারপাশের লতাপাতা ও ঝোপঝাড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পাখিদের বাসা বানানো ও আশ্রয়ের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।

রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পাখি ও প্রজাপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। যখন পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যায়, তখন ফসলের উৎপাদনও কমে যায়। যখন পাখি কমে যায়, তখন পোকামাকড়ের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এতে আবার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় এবং এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হতে থাকে। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ও মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীবদের মেরে ফেলে।

এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কৃষিতে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। জৈব কৃষি বা অর্গানিক ফার্মিং এর একটি ভালো বিকল্প। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক সার, জৈব কীটনাশক ও ফসলের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা ঠিক নয়। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং জৈব কৃষিতে ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে হবে।

কারণ, একটি সুস্থ পরিবেশ ছাড়া মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। তাই কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি। সবাই মিলে এই ছোট্ট প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে সুন্দর, সবুজ ও প্রাণবন্ত একটি পৃথিবী।

তামান্না ইসলাম শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত নিবন্ধ