মানুষ স্বভাবতই বন্ধুবৎসল এবং সামাজিক প্রাণী। আমরা প্রিয়জনদের সঙ্গে থাকতে, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। তবে জীবনের যাত্রায় মাঝে মাঝে এমন মুহূর্ত আসে যখন একাকীত্বের ছায়া ঘনিয়ে আসে।

এই একাকীত্ব কখনো ক্ষণস্থায়ী, কখনো দীর্ঘস্থায়ী—কিন্তু এটি সর্বদা কষ্টকর নয়। অনেক সময়, ভিড়ের মাঝেও বা একই ছাদের নিচে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থেকেও অন্তরের গভীরে একঘেয়ে নীরবতা অনুভূত হয়।

সমাজতত্ত্ব এবং মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, একাকীত্ব প্রায়শই কষ্টদায়ক একটি অনুভূতি হিসেবে বিবেচিত হয়। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন (need to belong) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘমেয়াদি একাকীত্ব শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—যেমন, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, এমনকি হৃদরোগ এবং জ্ঞানীয় হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়।

একাকীত্ব সর্বদা নেতিবাচক নয়। ক্ষণিকের জন্য এটি আমাদের নিজেকে জানার, অন্তরকে শুদ্ধ করার এবং আধ্যাত্মিকভাবে গভীরতা লাভের সুযোগ দেয়।

একটি রিভিউতে দেখা গেছে যে, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে একাকীত্ব মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত। এছাড়া, একাকীত্ব মানসিক রোগ যেমন বিষণ্ণতা, অ্যালকোহল অপব্যবহার এবং ব্যক্তিত্ব-জনিত ব্যাধির কারণ হতে পারে। এমনকি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবনকাল কমিয়ে দিতে পারে।

আরও পড়ুনপার্থিব জাঁকজমক যেন আধ্যাত্মিকতার বাধা না হয়০৭ মে ২০২৫

তবু একাকীত্ব সর্বদা নেতিবাচক নয়। ক্ষণিকের জন্য এটি আমাদের নিজেকে জানার, অন্তরকে শুদ্ধ করার এবং আধ্যাত্মিকভাবে গভীরতা লাভের সুযোগ দেয়। বিশেষ করে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, একাকীত্বকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটি দরজা হিসেবে দেখা হয়।

মুফতি ইসমাইল মেন্‌ক বলেছেন, ‘আপনি যখন একাকীত্ব অনুভব করবেন তখন নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেবেন, আল্লাহ–তায়ালা অন্য সবাইকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন যেন তখন আপনার অন্তরে শুধু তিনিই থাকতে পারেন।’

দুনিয়ার চাকচিক্য এবং ব্যস্ততায় আমরা প্রায়ই প্রতিপালকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করি। হয়তো তাই আল্লাহ আমাদের একা করে দেন, যাতে আমরা তাঁর কাছে ফিরে আসি। একাকীত্বে নিজেকে জানা, অন্তরকে হালকা করা এবং প্রতিপালকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বিকল্প খুব কম।

পূর্বসূরিদের বিভিন্ন লেখায় ‘একা থাকা’কে অপ্রত্যাশিত ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।

পূর্বসূরিদের বিভিন্ন লেখায় ‘একা থাকা’কে অপ্রত্যাশিত ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।

কিছুকালের জন্য একাকীত্ব মোটেও খারাপ নয়—বরং এটি মহা সুফল বয়ে আনতে পারে। যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে, সে কখনো সত্যিকারের একাকীত্ব অনুভব করে না। একাকীত্বকে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলে অন্তরে শান্তি এবং তৃপ্তি আসে।

মুসলিম সমাজে একাকীত্ব মোকাবিলায় আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যেমন দোয়া এবং সাম্প্রদায়িক সংযোগ, একটি সমন্বিত পদ্ধতি হিসেবে সুপারিশ করা হয়।

আরও পড়ুনপবিত্র কোরআনের পাঁচটি আশার আলো ছড়ানো আয়াত২১ মে ২০২৫

একটি অন্তর শীতলকারী হাদিস এই একাকীত্বের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করে। আবু হুরায়রা (রা.

) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সেদিন (কিয়ামতের দিন) তাঁর ছায়ার নীচে আশ্রয় দেবেন; যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবে না। এর মধ্যে এক শ্রেণির মানুষ হচ্ছে—সে ব্যক্তি, যে একাকী অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে আর আল্লাহর ভয়ে তার দু’ চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,০৩১)

কিছুকালের জন্য একাকীত্ব মোটেও খারাপ নয়—বরং মহা সুফল বয়ে আনতে পারে। যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে, সে কখনো একাকীত্ব অনুভব করে না।

এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একাকীত্ব যদি আল্লাহর স্মরণে রূপান্তরিত হয়, তাহলে এটি কিয়ামতের দিনের ছায়ার মতো একটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

তো ভয় কী আর একা হতে! সবাই এসেছি একা, যেতে হবে তো একাই। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে একাকীত্বের স্বাদ নিন—সবার মাঝে থেকেও একা হয়ে যান। তখনই আপনি অনুভব করবেন আল্লাহর সান্নিধ্যে অন্তরের কতটা শান্তি।

হে আল্লাহ, আপনার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার জন্য একাকীত্বকে আমাদের জন্য প্রশান্তিকর করে দিন। আমরা যেন এই একাকীত্বকে কষ্টের পরিবর্তে আপনার নৈকট্যের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আমিন।

আরও পড়ুনমাতৃত্বের কষ্ট সহ্য করা ইবাদত২২ জুন ২০২৫

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: এক ক ত ব ম আল ল হ আম দ র র জন য

এছাড়াও পড়ুন:

পাখি ও প্রজাপতির বিলুপ্তিতে রাসায়নিক কৃষির দায়

আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ আর আগের মতো সজীব নেই। যে রঙিন প্রজাপতিগুলো একসময় বাগানে বাগানে উড়ে বেড়াত, যে পাখিদের কলকাকলিতে ভোরবেলা জেগে উঠতাম আমরা, সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।

গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো দোয়েল, শালিক কিংবা বাবুই পাখির দেখা মেলে না। ফুলের বাগানে প্রজাপতির সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই বিষাদময় পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের।

একদিকে যেমন জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকেরা নানা রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই রাসায়নিকগুলো শুধু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেই মারছে না, উপকারী পতঙ্গ ও পাখি মারছে। এগুলো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি।

কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গরা। এই ছোট প্রাণীগুলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাপতি ও মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।

এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফলমূল ও শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু যখন কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন সেই বিষ প্রজাপতি ও মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় তারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, আবার কখনো বিষক্রিয়ায় তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। প্রজাপতির বিভিন্ন প্রজাতি এখন আর চোখে পড়ে না, যেগুলো একসময় সচরাচর দেখা যেত।

পাখিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। গ্রামীণ এলাকায় যেসব পাখি একসময় খুব সহজেই দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন বিলুপ্তির পথে। শালিক, দোয়েল, বাবুই, চড়ুই এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এর পেছনেও রাসায়নিক কীটনাশকের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।

কিন্তু যখন সেই পোকামাকড়ের শরীরে কীটনাশকের বিষ থাকে, তখন পাখিরা সেই বিষযুক্ত খাবার খেয়ে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রজাপতির মতোই অনেক সময় তারা সরাসরি মারা যায়, আবার কখনো তাদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া অনেক পাখি প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের চারপাশের লতাপাতা ও ঝোপঝাড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পাখিদের বাসা বানানো ও আশ্রয়ের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।

রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পাখি ও প্রজাপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। যখন পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যায়, তখন ফসলের উৎপাদনও কমে যায়। যখন পাখি কমে যায়, তখন পোকামাকড়ের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এতে আবার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় এবং এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হতে থাকে। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ও মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীবদের মেরে ফেলে।

এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কৃষিতে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। জৈব কৃষি বা অর্গানিক ফার্মিং এর একটি ভালো বিকল্প। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক সার, জৈব কীটনাশক ও ফসলের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা ঠিক নয়। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং জৈব কৃষিতে ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে হবে।

কারণ, একটি সুস্থ পরিবেশ ছাড়া মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। তাই কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি। সবাই মিলে এই ছোট্ট প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে সুন্দর, সবুজ ও প্রাণবন্ত একটি পৃথিবী।

তামান্না ইসলাম শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত নিবন্ধ