সোনারগাঁয়ে গণধর্ষণসহ ১০ মামলার আসামি ব্লেড সজিব’ গ্রেপ্তার
Published: 12th, October 2025 GMT
সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত সজিব মিয়া ওরফে ব্লেড সজিবকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১১ একটি দল।
গত শনিবার রাতে বন্দর উপজেলার মদনপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তারে করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ছুরি, একটি সুইচ গিয়ার, একটি লেজার লাইট ও একটি ইলেকট্রিক শকার উদ্ধার করা হয়।
রবিবার দুপুরে এক র্যাব-১১ সিনিয়র এএসপি অপস অফিসার মো.
গ্রেপ্তারকৃত সজীব মিয়া ওরফে ব্লেড সজিব (২২) সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা এলাকার মো. শহিদুল্লাহর ছেলে তার বিরুদ্ধে সোনারগাঁ থানায় গণধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ ১০টি বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে।
জানা যায়, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারী মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বালুয়াকান্দি এলাকার এক নারী সন্ধ্যায় তার দেবরকে নিয়ে মদনপুর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বোনকে দেখতে যান।
পরে তার দেবর ও ওই নারী রাতে সিএনজিযোগে সোনারগাঁ পৌরসভার কৃষ্ণপুরা এলাকায় তার খালাতো ভাইয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিলারবাগ এলাকায় সজীব ওরফে ব্লেড সজিব নেতৃত্বে ৬-৭ জন সহযোগী নিয়ে তাদের বহনকারী সিএনজি গতিরোধ করে।
একপর্যায়ে তাদের দেশীয় অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ করে দৈলেরবাগ এলাকার একটি পরিত্যক্ত টিনশেড বাড়িতে নিয়ে যায়। তাদের মারধর করে নগদ টাকা এবং স্বর্ণের কানের দুল ছিনিয়ে নেয়।
পরবর্তীতে ছিনতাইয়ের পর সজিব ও তার সহযোগীরা মিলে ওই নারীর দেবরকে অন্য একটি কক্ষে আটকে রেখে নারীকে জোরপূর্বক পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ঘটনার পরদিন ভূক্তভোগী নারী সোনারগাঁ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকে সজিব মিয়া পলাতক থাকে।
পরে র্যাব তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার অবস্থানি নিশ্চিত হয়ে গত শনিবার রাতে মদনপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। রবিবার বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত সজিবকে সোনারগাঁ থানায় হস্তান্তর করেছে।
সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: রাশেদুল হাসান খান জানান, র্যাব-১১ এর একটি দল সজিবকে গ্রেপ্তার করে থানায় হস্তান্তর করেছে। সজিবের বিরুদ্ধে ডাকাতি, গণধর্ষণ ও অস্ত্র মামলাসহ ১০টি মামলা রয়েছে। ওই মামলায় গ্রেপ্তারে দেখিয়ে সোমবার আদালতে পাঠানো হবে।
উৎস: Narayanganj Times
কীওয়ার্ড: স ন রগ ও ন র য়ণগঞ জ অপর ধ এল ক র স ন রগ
এছাড়াও পড়ুন:
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে
সেদিন এক বন্ধু বললেন, বাংলাদেশের জনগণের নাকি উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বসবাস এখন সহ্য হয়ে গেছে। তিনি এটিও যুক্তি দিলেন যে জনগণের মাথাপিছু আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এই সহ্যের একটি অবলম্বন। তাঁর মতে, এত চাপের মধ্যেও মানুষ বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারছে বা বাজারে চাহিদা রয়েছে।
বাজারে ভিড় দেখেই তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মানুষ বুঝি সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বিগত সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তির মুখেও এ ধরনের বক্তব্য আমরা শুনেছি—‘মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও মানুষের আয় বেড়েছে, তাই চাপ ততটা নেই।’ কিন্তু বিষয়টি কি এতটা সরল?
আমরা তো দুই বছর ধরে ১১-১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়াচ্ছি। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিবিএসের অফিশিয়াল হিসাবের চেয়ে বাস্তব বাজারদর অন্তত আরও ৬-৭ শতাংশ বেশি ছিল। বেশ কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের দামে ২০ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে।
তুলনা করতে গেলে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কা কিংবা তুরস্কে মূল্যস্ফীতি ৫০–৬০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সেখানে কৃচ্ছ্রসাধন, কঠোর রাজস্ব ও ব্যয় সংকোচন এবং সুসংহত জন-অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার ফলে আবার তা কমতেও শুরু করেছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার অপ্রতিরোধ্য সংকট থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
আরও পড়ুনমূল্যস্ফীতি কমানো কীভাবে সম্ভব১৭ অক্টোবর ২০২৪ভারতের নামও আলোচনায় আসে। ভারত তাদের খুচরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সফলতা দেখিয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের তথ্যমতে, অক্টোবর মাসে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে, অর্থাৎ ১ শতাংশেরও নিচে। এটি তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশের চেয়েও অনেক কম। লাগাতার ৭ মাস মূল্যস্ফীতি আরবিআইয়ের সহনসীমার নিচে থাকায় এবং বাজারের পূর্বাভাসের (শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ) অনেক নিচে নেমে আসায় এটিকে ঐতিহাসিক সাফল্য বলা হচ্ছে।
খাদ্যদ্রব্যের মূল্যপতন, শুল্কছাড় এবং কিছু নিত্যপণ্যে কর হ্রাস—এ সব মিলিয়ে ভারতের ঘরোয়া চাহিদা এখন আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আরবিআই আগামী মাসেই নীতি সুদ কমাতে পারে, এমন প্রত্যাশাও করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে এটি সামান্য কমে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ হলেও সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ১০ শতাংশের ঘর থেকে নেমে এলেও ৮ শতাংশের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আনতে পারছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো দামই বাস্তবে আগের অবস্থায় ফিরছে না। বরং বাজারে একধরনের নতুন ‘স্বাভাবিকতা’ তৈরি হয়ে গেছে—উচ্চ দামের মধ্যেই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এটাই হয়তো আমার বন্ধুটির পর্যবেক্ষণের সত্যতা, তবে এর পেছনের বাস্তবতা আরও গভীর।
সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর অস্ত্র বাংলাদেশে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির কারণ ‘হেথা নয়, হেথা নয়—অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ তাই প্রকৃত সমাধানও অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। কিন্তু সুদ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমবে—এ তত্ত্ব অন্তত আমাদের বাস্তবতায় কার্যকর হয়নি। কারণ, আমাদের মূল্যস্ফীতির মূল উৎস চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা, বাজার সিন্ডিকেট এবং দুর্বল বাজার তদারকি। ফলে সুদ বাড়ালে ঋণের প্রবাহ কমে যায়, বিনিয়োগ শ্লথ হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়; কিন্তু মূল্যস্ফীতির মূল সমস্যায় তেমন আঘাত লাগে না।
পত্রিকান্তরে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সবাই নীতি সুদ কমানোর পক্ষেই মত দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সুদ বাড়াতে বাড়াতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এমন জায়গায় নেমে এসেছে যে অর্থনীতিতে কার্যকর গতি ফিরিয়ে আনতে এখন উল্টো সুদ কমানোই জরুরি। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ অপরিবর্তিত রেখেছে, যদিও বাজারের বেশির ভাগ ব্যাংক আমানতের সুদ কমিয়ে ফেলেছে। আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কিন্তু অর্থনীতির কোথাও তার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুনমূল্যস্ফীতি নাহয় ঠিক হবে, কিন্তু মনঃস্ফীতি ঠিক করবে কে১৭ জানুয়ারি ২০২৪এখন প্রশ্ন—মূল্যস্ফীতি কমাতে আসলে কী করতে হবে? বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বিত রাজস্বনীতি প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর ও শুল্কভার কমিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, অযৌক্তিক মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা—এসব না করলে মুদ্রানীতি একা কিছুই করতে পারবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি এবং সঠিক চাহিদা-উৎপাদন তথ্যের অভাব আজও দূর হয়নি। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও বলা যায় না পরিসংখ্যানের প্রতি জনসাধারণের আস্থাহীনতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে।
আরও একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন, এমনকি জমিজমা বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছেন। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই আয়বৈষম্য আরও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতার সরাসরি সূচক। অন্যদিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় দুর্নীতিও কমেনি। বরং অনেকে বলছেন, পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এটি আরও বেড়ে গেছে।
আগেও বলেছি, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর অস্ত্র বাংলাদেশে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির কারণ ‘হেথা নয়, হেথা নয়—অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ তাই প্রকৃত সমাধানও অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।
মোদ্দাকথা, উৎপাদন বাড়াতে হবে, বিশেষ করে খাদ্য ও শিল্পপণ্য। সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নত করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান বহুমুখী করতে হবে, আমদানি-রপ্তানি নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় ভেঙে না পড়ে। আর প্রয়োজনে বাজারে অরাজকতা সৃষ্টি করা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কোনো স্বাভাবিকতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের গঠনতান্ত্রিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এটাকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, এবং আজ না হলে কাল আমাদের শক্তিশালী বাজার সুশাসনের দিকে এগোতেই হবে।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক।