ক্ষুদ্রঋণদাতা এনজিওতে বসবে স্বতন্ত্র পরিচালক
Published: 14th, October 2025 GMT
ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস, বুরো বাংলাদেশ, উদ্দীপনসহ বড় আকারের ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলো এত দিন নিজেদের পর্ষদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছিল। সরকার এখন এসব এনজিওতে দুজন করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার বিধান করতে যাচ্ছে।
ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে সদস্যসংখ্যা এখন ৫ থেকে ১০। নতুন বিধান কার্যকর হলে বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক।
কোনো প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। আর প্রতিটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য পান ১০ হাজার টাকা। যদিও ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা কী ভূমিকা রাখতে পেরেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, স্বতন্ত্র পরিচালকেরা অনিয়মের সহযোগী হয়েছেন।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বিধান এত দিন ছিল না। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের স্বতন্ত্র পরিচালক বসবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও নামে ডাকা হয়। তবে এগুলো মূলত মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন বা এমএফআই। তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। এর চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
আরও পড়ুনএনজিওর নিবন্ধন সহজ হলো ২২ এপ্রিল ২০২৫কোনো প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বিধান এত দিন ছিল না। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের স্বতন্ত্র পরিচালক বসবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে।এমআরএ সূত্রে জানা গেছে, তারা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের শর্তসংবলিত আইন ও বিধিমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ নানা বিষয় রয়েছে। মূলত এমআরএর ক্ষমতা বাড়ানো ও ক্ষুদ্র ঋণদাতাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথাই রয়েছে খসড়ায়। এ ধরনের নিয়মকানুন করার বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে সালেহউদ্দিন আহমেদ এখন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। জানতে চাইলে গত রাতে তিনি মুঠোফোনে একটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি এখন মন্তব্য করতে পারছেন না। এমআরএ ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি কী আলোচনা করেছে, তা তাঁকে জানতে হবে।
এদিকে এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাস্তব অবস্থা অনুধাবন ছাড়াই এ ধরনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপ আরও প্রকট হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহজাত কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুনএনজিও হবে কোম্পানি, বাড়বে কর১৮ জুন ২০২৩এমআরএ সূত্রে জানা গেছে, তারা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের শর্তসংবলিত আইন ও বিধিমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ নানা বিষয় রয়েছে। মূলত এমআরএর ক্ষমতা বাড়ানো ও ক্ষুদ্র ঋণদাতাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথাই রয়েছে খসড়ায়।কত প্রতিষ্ঠানে বসবে স্বতন্ত্র পরিচালকএমআরএর ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি ৭২৪টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দিয়েছে, যাদের মোট গ্রাহক ৪ কোটি ১৫ লাখ। এ খাতে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার লোক কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ক্ষুদ্রঋণ খাতে আদায় না হওয়া ঋণের হার খুবই কম।
এমআরএর খসড়া বিধি বলছে, স্বতন্ত্র পরিচালক বসবে শুধু মাঝারি ও প্রতিষ্ঠানে। অর্থাৎ যাদের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ৫০ কোটি টাকার বেশি। কয়টি প্রতিষ্ঠানের ৫০ কোটি টাকার বেশি বিতরণকৃত ঋণ আছে, সে হিসাব এমআরএর কাছে নেই। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশে ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
এমআরএর প্রস্তাব হচ্ছে, দুজন করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো চারজন করে নাম এমআরএর কাছে পাঠাবে। এর মধ্যে দুজনের ব্যাপারে অনাপত্তিপত্র দেবে এমআরএ। তবে শর্ত আছে কিছু। প্রথম শর্ত হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কোনো পর্ষদ সদস্যের সঙ্গে পিতা-মাতা, সহোদর ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক থাকা কোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র সদস্য হতে পারবেন না।
আরও পড়ুনবাতিলের ঝুঁকিতে ২৫৮ এনজিও১৯ জানুয়ারি ২০২১বাস্তব অবস্থা অনুধাবন ছাড়াই এ ধরনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপ আরও প্রকট হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহজাত কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।হোসেন জিল্লুর রহমান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাকেন এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য এমআরএর পর্ষদ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচালকের বিষয়টি এসেছে। স্বতন্ত্র পরিচালক প্রতিষ্ঠানগুলোই নিয়োগ দেবে। এমআরএ শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়মকানুন ঠিক করে দেবে। কেউ যদি পরপর কয়েকবার অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করে, সরকার তখন বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেবে। সরকারের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
অধ্যাপক হেলাল আরও বলেন, ব্যাংকের মতো ক্ষুদ্রঋণ খাতে একধরনের পরিবারতন্ত্র জেঁকে বসেছে। সরকার এই খাত করমুক্ত রেখেছে প্রান্তিক মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে অনেকে অযৌক্তিকভাবে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেন। এসব কাজ আর চলতে দেওয়া ঠিক হবে না।
এমআরএর এ উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ক্ষুদ্র অর্থায়ন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একমাত্র নেটওয়ার্কিং সংস্থা ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। উদ্যোগটিকে ‘ক্ষতিকর, বেআইনি ও অপ্রয়োজনীয়’ আখ্যা দিয়ে ফোরামটি ৬ অক্টোবর অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে তাঁর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুনএকটি এনজিওর ডিজিটাল যাত্রার গল্প০৫ জানুয়ারি ২০২৩এমআরএর খসড়া বিধি বলছে, স্বতন্ত্র পরিচালক বসবে শুধু মাঝারি ও প্রতিষ্ঠানে। অর্থাৎ যাদের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ৫০ কোটি টাকার বেশি। কয়টি প্রতিষ্ঠানের ৫০ কোটি টাকার বেশি বিতরণকৃত ঋণ আছে, সে হিসাব এমআরএর কাছে নেই।এদিকে উদ্যোগটি হুবহু বাস্তবায়ন না করার দাবি জানিয়ে এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের কাছে আলাদা আবেদন করেছে ক্ষুদ্র ঋণদাতা এনজিওগুলোর সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অব অল্টারনেটিভ ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস (ইনাফি)।
ইনাফির সদস্যদেশের অন্যতম ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এমআরএ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও সিইও নিয়োগে এমআরএর অনুমোদনের যে শর্ত আসছে, তা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’ তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ যে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হবে না, তা আমরা কীভাবে বুঝব? ব্যাংক খাতে এত বছর তো ধ্বংসলীলা হয়েছে। এমআরএর এ উদ্যোগ এখন ভালো থাকা ক্ষুদ্রঋণ খাতের জন্যও অশুভ বার্তা বয়ে আনতে পারে।’
আরও পড়ুনবৈদেশিক অনুদানে ২ হাজার ৬১২টি এনজিও চলছে০৫ মার্চ ২০২৪ক্ষুদ্রঋণ খাতটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য এমআরএর পর্ষদ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচালকের বিষয়টি এসেছে। স্বতন্ত্র পরিচালক প্রতিষ্ঠানগুলোই নিয়োগ দেবে। এমআরএ শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়মকানুন ঠিক করে দেবে।মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যানকারা হবেন স্বতন্ত্র পরিচালকখসড়া বিধি অনুযায়ী, স্বতন্ত্র পরিচালক হতে গেলে কাউকে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ বা স্বশাসিত সংস্থায় প্রথম শ্রেণির চাকরির কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রাধান্য দেওয়া হবে তাঁদেরই, যাঁদের আর্থিক খাতের কাজের অভিজ্ঞতা থাকবে। বয়স হতে হবে ৩৫ থেকে ৭০ বছর। তবে একই সময়ে একই ব্যক্তি একাধিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর মাধ্যমে মূলত সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদে বসানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অবসরের পর তাঁদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে সরকারি কর্মকর্তারা পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। ঋণের নামে লুটপাট তাঁরা ঠেকাতে পারেননি। বরং ব্যাংকগুলো থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কারও কারও বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুনক্ষুদ্রঋণের সামনে নতুন তিন চ্যালেঞ্জ১৭ অক্টোবর ২০২৪এমআরএর এ উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ক্ষুদ্র অর্থায়ন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একমাত্র নেটওয়ার্কিং সংস্থা ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। উদ্যোগটিকে ‘ক্ষতিকর, বেআইনি ও অপ্রয়োজনীয়’ আখ্যা দিয়ে ফোরামটি ৬ অক্টোবর অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে তাঁর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।এদিকে এমআরএ বলছে, কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি, জালিয়াতি বা আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তি এবং নিজে বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে খেলাপি হয়ে গেছে, এমন কোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না। আর ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ সভায় স্বতন্ত্র পরিচালকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। পর্ষদের চলমান মেয়াদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ পাবেন, তবে এমআরএ চাইলে তাঁকে পরের এক মেয়াদের জন্যও নিয়োগ দিতে পারবে।
ইনাফি বলছে, সাধারণ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ সদস্যরা বর্তমানে স্বতন্ত্রই। নতুন করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতন্ত্র অরাজনৈতিক চরিত্রের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ পেলে রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি অযাচিত তদবির অর্থাৎ চাকরি, গাড়ি ব্যবহার, ব্যক্তি সুবিধার জন্য সামাজিক খাতে ব্যয়, নিজের পছন্দের ব্যাংকে আমানত রাখা ইত্যাদি তদবির বেড়ে যেতে পারে।
সিডিএফের চেয়ারম্যান ও পপির নির্বাহী সচিব মুরশেদ আলম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, আইনের শিকল নয়, দরকার হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যমী করে গড়ে তোলার নীতি অবলম্বন করা।
আরও পড়ুনপাঁচ বছরে দ্বিগুণ ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ২৯ জানুয়ারি ২০২৫কিছু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এমআরএ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও সিইও নিয়োগে এমআরএর অনুমোদনের যে শর্ত আসছে, তা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’আসিফ সালেহ, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকসিইও নিয়োগের শর্তবিদ্যমান এমআরএ আইন, ২০০৬ অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ একজন করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা নির্বাহী পরিচালক (ইডি) নিয়োগ করে থাকে। এ নিয়োগে নতুন শর্ত যুক্ত করে এমআরএ বলছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সিইও বা ইডি নিয়োগ করে এক মাসের মধ্যে এমআরএর অনাপত্তিপত্র নেবে। তবে ৪০ বছরের কম বয়সী কেউ সিইও হতে পারবেন না এবং ৬৫ বছর বয়স হয়ে গেলে কেউ সিইও পদে থাকতে পারবেন না।
এমআরএ বলছে, সিইও বা ইডি নিয়োগ পাবেন পাঁচ বছরের জন্য। তবে তিনি পুনর্নিয়োগ পেতে পারেন। সিইওর দায়িত্ব পালনকালে তিনি অন্য কোনো ব্যবসায় বা পেশায় নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। পর্ষদে তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যও থাকতে পারবে না।
এ ছাড়া সিইও হতে গেলে কমপক্ষে পাঁচ বছরের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসহ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁকে হতে হবে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিষয়ে উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি থাকবে তাঁর। আর কর্মক্ষম থাকা সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠাতারা প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত।
সিডিএফ এসব বিষয়ে লিখিত মতামত দিয়ে অর্থ উপদেষ্টাকে জানিয়েছে, সিইও নিয়োগের পর আবার এমআরএর অনাপত্তি নেওয়ার প্রস্তাব অযৌক্তিক। সিইও হওয়ার জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হওয়ারও দরকার নেই, স্নাতক পাসই যথেষ্ট।
এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গত রাতে দাবি করেন, স্বতন্ত্র পরিচালক ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মত হয়েছে। তবে একাধিক এনজিও বলছে, সব বিষয়ে তারা সম্মতি দেয়নি।
আরও পড়ুননারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে২৫ আগস্ট ২০২৪কোনোভাবেই ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। আবার এগুলোতে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাও দরকার। অন্য খাতের মতো এখানেও অনিয়ম-দুর্নীতি আছে। ফলে দরকার হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কঠোর করার নীতি প্রণয়ন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মডেল যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ খাতে একই মডেল কতটা কাজে দেবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।ইফতেখারুজ্জামান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক‘কতটা কাজে দেবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ’ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকেরা মুনাফার ভাগ পান না। তাঁরা ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকও নন। অন্যদিকে ব্যাংকের পরিচালকেরা মূলত ব্যাংকের মালিক (স্বতন্ত্র পরিচালক বাদে)। তাঁরা মুনাফার ভাগ পান। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। ব্যাংক চলে মানুষের আমানতের টাকায়।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ব্যাংক ও এনজিওর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার ধরন একই বিবেচনা করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের কথা বলছে এমআরএ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, কোনোভাবেই ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। আবার এগুলোতে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাও দরকার। অন্য খাতের মতো এখানেও অনিয়ম-দুর্নীতি আছে। ফলে দরকার হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কঠোর করার নীতি প্রণয়ন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মডেল যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ খাতে একই মডেল কতটা কাজে দেবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে দলীয় রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং এ খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
আরও পড়ুনব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনীহা, ভরসা এখন এনজিও১৭ ডিসেম্বর ২০২০.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: স ল হউদ দ ন আহম দ ক ষ দ র ঋণদ ত ক ষ দ রঋণ খ ত র স বতন ত র প রথম আল ক র প রস ত ব উদ য গ ন য় এমআরএ স প রব ন ন র জন ত ক সরক র র ব যবস থ এ ধরন র ত ম লক স ড এফ ৫০ ক ট র পর ব র জন য র অর থ র ওপর সদস য বছর র আরও প দরক র র খসড় এনজ ও
এছাড়াও পড়ুন:
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে
সেদিন এক বন্ধু বললেন, বাংলাদেশের জনগণের নাকি উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বসবাস এখন সহ্য হয়ে গেছে। তিনি এটিও যুক্তি দিলেন যে জনগণের মাথাপিছু আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এই সহ্যের একটি অবলম্বন। তাঁর মতে, এত চাপের মধ্যেও মানুষ বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারছে বা বাজারে চাহিদা রয়েছে।
বাজারে ভিড় দেখেই তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মানুষ বুঝি সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বিগত সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তির মুখেও এ ধরনের বক্তব্য আমরা শুনেছি—‘মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও মানুষের আয় বেড়েছে, তাই চাপ ততটা নেই।’ কিন্তু বিষয়টি কি এতটা সরল?
আমরা তো দুই বছর ধরে ১১-১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়াচ্ছি। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিবিএসের অফিশিয়াল হিসাবের চেয়ে বাস্তব বাজারদর অন্তত আরও ৬-৭ শতাংশ বেশি ছিল। বেশ কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের দামে ২০ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে।
তুলনা করতে গেলে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কা কিংবা তুরস্কে মূল্যস্ফীতি ৫০–৬০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সেখানে কৃচ্ছ্রসাধন, কঠোর রাজস্ব ও ব্যয় সংকোচন এবং সুসংহত জন-অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার ফলে আবার তা কমতেও শুরু করেছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার অপ্রতিরোধ্য সংকট থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
আরও পড়ুনমূল্যস্ফীতি কমানো কীভাবে সম্ভব১৭ অক্টোবর ২০২৪ভারতের নামও আলোচনায় আসে। ভারত তাদের খুচরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সফলতা দেখিয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের তথ্যমতে, অক্টোবর মাসে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে, অর্থাৎ ১ শতাংশেরও নিচে। এটি তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশের চেয়েও অনেক কম। লাগাতার ৭ মাস মূল্যস্ফীতি আরবিআইয়ের সহনসীমার নিচে থাকায় এবং বাজারের পূর্বাভাসের (শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ) অনেক নিচে নেমে আসায় এটিকে ঐতিহাসিক সাফল্য বলা হচ্ছে।
খাদ্যদ্রব্যের মূল্যপতন, শুল্কছাড় এবং কিছু নিত্যপণ্যে কর হ্রাস—এ সব মিলিয়ে ভারতের ঘরোয়া চাহিদা এখন আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আরবিআই আগামী মাসেই নীতি সুদ কমাতে পারে, এমন প্রত্যাশাও করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে এটি সামান্য কমে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ হলেও সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ১০ শতাংশের ঘর থেকে নেমে এলেও ৮ শতাংশের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আনতে পারছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো দামই বাস্তবে আগের অবস্থায় ফিরছে না। বরং বাজারে একধরনের নতুন ‘স্বাভাবিকতা’ তৈরি হয়ে গেছে—উচ্চ দামের মধ্যেই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এটাই হয়তো আমার বন্ধুটির পর্যবেক্ষণের সত্যতা, তবে এর পেছনের বাস্তবতা আরও গভীর।
সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর অস্ত্র বাংলাদেশে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির কারণ ‘হেথা নয়, হেথা নয়—অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ তাই প্রকৃত সমাধানও অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। কিন্তু সুদ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমবে—এ তত্ত্ব অন্তত আমাদের বাস্তবতায় কার্যকর হয়নি। কারণ, আমাদের মূল্যস্ফীতির মূল উৎস চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা, বাজার সিন্ডিকেট এবং দুর্বল বাজার তদারকি। ফলে সুদ বাড়ালে ঋণের প্রবাহ কমে যায়, বিনিয়োগ শ্লথ হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়; কিন্তু মূল্যস্ফীতির মূল সমস্যায় তেমন আঘাত লাগে না।
পত্রিকান্তরে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সবাই নীতি সুদ কমানোর পক্ষেই মত দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সুদ বাড়াতে বাড়াতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এমন জায়গায় নেমে এসেছে যে অর্থনীতিতে কার্যকর গতি ফিরিয়ে আনতে এখন উল্টো সুদ কমানোই জরুরি। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ অপরিবর্তিত রেখেছে, যদিও বাজারের বেশির ভাগ ব্যাংক আমানতের সুদ কমিয়ে ফেলেছে। আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কিন্তু অর্থনীতির কোথাও তার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুনমূল্যস্ফীতি নাহয় ঠিক হবে, কিন্তু মনঃস্ফীতি ঠিক করবে কে১৭ জানুয়ারি ২০২৪এখন প্রশ্ন—মূল্যস্ফীতি কমাতে আসলে কী করতে হবে? বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বিত রাজস্বনীতি প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর ও শুল্কভার কমিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, অযৌক্তিক মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা—এসব না করলে মুদ্রানীতি একা কিছুই করতে পারবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি এবং সঠিক চাহিদা-উৎপাদন তথ্যের অভাব আজও দূর হয়নি। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও বলা যায় না পরিসংখ্যানের প্রতি জনসাধারণের আস্থাহীনতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে।
আরও একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন, এমনকি জমিজমা বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছেন। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই আয়বৈষম্য আরও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতার সরাসরি সূচক। অন্যদিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় দুর্নীতিও কমেনি। বরং অনেকে বলছেন, পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এটি আরও বেড়ে গেছে।
আগেও বলেছি, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর অস্ত্র বাংলাদেশে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির কারণ ‘হেথা নয়, হেথা নয়—অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ তাই প্রকৃত সমাধানও অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।
মোদ্দাকথা, উৎপাদন বাড়াতে হবে, বিশেষ করে খাদ্য ও শিল্পপণ্য। সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নত করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান বহুমুখী করতে হবে, আমদানি-রপ্তানি নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় ভেঙে না পড়ে। আর প্রয়োজনে বাজারে অরাজকতা সৃষ্টি করা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কোনো স্বাভাবিকতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের গঠনতান্ত্রিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এটাকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, এবং আজ না হলে কাল আমাদের শক্তিশালী বাজার সুশাসনের দিকে এগোতেই হবে।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক।