আপনার শিশু কি কোল থেকে নামতেই চায় না
Published: 14th, October 2025 GMT
চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা ল্যাপটপে এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন আমার আড়াই বছরের কন্যা আমার কোলে। নিয়ম ভেঙে ওকে মুঠোফোনে কার্টুন দেখতে দিয়েছি। সেটি সে আমার কোলে বসেই দেখবে। বিছানায়, কার্টুন আঁকা নরম মাদুরে ছড়ানো–ছিটানো খেলনা; কিন্তু সে কোল থেকে নামবে না।
এক রাতে ঘুম ভেঙে বাথরুমে গেছি। দরজা খুলে রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। সামনে আমার কন্যা দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে। আমি ওর পাশ থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে আসায় সে-ও ওঠে, অল্প আলোয় মশারি থেকে বেরিয়ে বাথরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কন্যাকে নিয়ে যখন একটু হাঁটতে বের হই বা শপিংয়ে যাই, সে কোল থেকে নামবে না! জুতায় ময়লা লাগবে, নানা বাহানা। উপায় না দেখে ১০ কেজি অতিরিক্ত ওজন নিয়েই পথ চলি।
আরও পড়ুনশিশু ভারী ব্যাগ বহন করলে যেসব সমস্যা হতে পারে২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫খেলনা দিয়ে বসিয়ে কোনো কাজে গেলে কিছুক্ষণ পরই শুরু হয়, ‘মা, পা ব্যথা করে। মশা কামড় দিছে। পিঁপড়া কামড় দিছে। খাটের নিচে একটা ডায়নোসর। মা পেটু (পেট) ব্যথা। পানি খাব…এই দেখো, একটা টিকটিকি। এদিকে আসো…।’ এক কথায়, সে আমার উপস্থিতি আর সক্রিয় মনোযোগ চায়। সে চায় না আমি তাকে রেখে কিছু করি।
সেদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে দেখলাম, আমার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বান্ধবী মুক্তা লিখেছেন, ‘ঘণ্টাখানেক ঘাড়ে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ছোটবেলার সব মুখস্থ কবিতা পড়া শেষ করে, গুনগুনিয়ে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো থেকে ঘুমন্ত বাচ্চাকে বিছানায় “ল্যান্ড করানো” বড় চ্যালেঞ্জ। এই নিয়ে তিনবার শোয়ালাম।’
মানে হলো, শিশুটি একা শোবে না। পাশে মাকেও শুয়ে থাকতে হবে। সে মায়ের শরীরের ওমে ঘুমাবে। না হলে শোয়ানোমাত্র উঠে যাবে, কাঁদবে।
ভেলক্রো বেবিদের কোল থেকে নামালেই কাঁদতে থাকে.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: আম র ক
এছাড়াও পড়ুন:
পাখি ও প্রজাপতির বিলুপ্তিতে রাসায়নিক কৃষির দায়
আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ আর আগের মতো সজীব নেই। যে রঙিন প্রজাপতিগুলো একসময় বাগানে বাগানে উড়ে বেড়াত, যে পাখিদের কলকাকলিতে ভোরবেলা জেগে উঠতাম আমরা, সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো দোয়েল, শালিক কিংবা বাবুই পাখির দেখা মেলে না। ফুলের বাগানে প্রজাপতির সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই বিষাদময় পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের।
একদিকে যেমন জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকেরা নানা রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই রাসায়নিকগুলো শুধু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেই মারছে না, উপকারী পতঙ্গ ও পাখি মারছে। এগুলো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি।
কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গরা। এই ছোট প্রাণীগুলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাপতি ও মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।
এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফলমূল ও শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু যখন কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন সেই বিষ প্রজাপতি ও মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় তারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, আবার কখনো বিষক্রিয়ায় তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। প্রজাপতির বিভিন্ন প্রজাতি এখন আর চোখে পড়ে না, যেগুলো একসময় সচরাচর দেখা যেত।
পাখিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। গ্রামীণ এলাকায় যেসব পাখি একসময় খুব সহজেই দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন বিলুপ্তির পথে। শালিক, দোয়েল, বাবুই, চড়ুই এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এর পেছনেও রাসায়নিক কীটনাশকের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।
কিন্তু যখন সেই পোকামাকড়ের শরীরে কীটনাশকের বিষ থাকে, তখন পাখিরা সেই বিষযুক্ত খাবার খেয়ে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রজাপতির মতোই অনেক সময় তারা সরাসরি মারা যায়, আবার কখনো তাদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া অনেক পাখি প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের চারপাশের লতাপাতা ও ঝোপঝাড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পাখিদের বাসা বানানো ও আশ্রয়ের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।
রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পাখি ও প্রজাপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। যখন পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যায়, তখন ফসলের উৎপাদনও কমে যায়। যখন পাখি কমে যায়, তখন পোকামাকড়ের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এতে আবার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় এবং এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হতে থাকে। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ও মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীবদের মেরে ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কৃষিতে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। জৈব কৃষি বা অর্গানিক ফার্মিং এর একটি ভালো বিকল্প। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক সার, জৈব কীটনাশক ও ফসলের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা ঠিক নয়। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং জৈব কৃষিতে ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে হবে।
কারণ, একটি সুস্থ পরিবেশ ছাড়া মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। তাই কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি। সবাই মিলে এই ছোট্ট প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে সুন্দর, সবুজ ও প্রাণবন্ত একটি পৃথিবী।
তামান্না ইসলাম শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়