রাজশাহীতে কোচিং সেন্টারে ‘মব’, শিক্ষককে চড়-থাপ্পড়
Published: 14th, October 2025 GMT
রাজশাহীর তানোরে কোচিং সেন্টারে গিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন কয়েকজন যুবক। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কোচিং সেন্টারের ছাত্রীদের হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর বার্তা পাঠান। তবে, এ অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ।
তানোরের মুণ্ডুমালায় ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার। সোমবার (১৩ অক্টোবর) একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, কোচিংয়ের শিক্ষক রোকনুজ্জামান রোকন তার চেয়ারে বসে আছেন। কয়েকজন যুবক তাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিচ্ছেন। একপর্যায়ে মো.
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুণ্ডুমালা বাজারে অবস্থিত অ্যাডভান্স কোচিং সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে। এখানে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোচিং করানো হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষকের নাম রোকনুজ্জামান রোকন। মুণ্ডুমালা পৌরসভার মোহাম্মদপুর মহল্লায় তার বাড়ি। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও কোচিং সেন্টারের পরিচালক।
অভিযুক্ত শাকিবের বাড়ি পৌর এলাকার কাদিপুর মহল্লায়। ভিডিও ভাইরালের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই। কোচিং সেন্টারও বন্ধ আছে। শতাধিক শিক্ষার্থী এ কোচিং সেন্টারে পড়েন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক রোকনুজ্জামান রোকন বলেছেন, “আমরা কয়েকজন মিলে কোচিং সেন্টারটি চালাই। মুণ্ডুমালায় আরো কয়েকটি কোচিং সেন্টার থাকলেও আমাদেরটি ভালো চলত। সেজন্য ষড়যন্ত্র করে আমাদের কোচিং সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমি নাকি ছাত্রীদের হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর ম্যাসেজ দিয়েছি। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। এই ছেলেগুলো আগে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ করত। ৫ আগস্টের পর তারা বিএনপি-যুবদল হয়ে গেছে। তারা মব সৃষ্টি করে আমাকে মারধর করে এবং কোচিং সেন্টারটি বন্ধ করে দেয়। আসলে তাদের অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তাহলে মারধরের সময় তো মেয়েরাও থাকত। সেখানে কোনো মেয়ে ছিল না।”
তিনি আরো বলেন, “যখন আমাকে মারধর করা হয়, তখনো তিনজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছিলেন। তারা মুণ্ডুমালা পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। পুলিশ এসে আমাকে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। কিন্তু, অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি বলে আমাকে ছেড়ে দেয়। এখন আমি আমার ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে মামলা-মোকদ্দমা করতে যাইনি। ভয়ে কোচিং সেন্টারও খুলতে পারছি না।”
মুণ্ডুমালা পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রেজাউল ইসলাম বলেছেন, “রোকনুজ্জামান আমার পরিচিত। তাকে ভালোই মনে হয়। কেন এ ঘটনা ঘটল, তা জানি না। যারা ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিএনপি বা যুবদলে কোনো পদ নেই। এমনিই তারা ওঠা-বসা করতে পারে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাকিবকে কয়েক দফায় ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তার বাবা মো. ভুট্টু বলেছেন, “ঘটনার ব্যাপারে লোকমুখে শুনেছি। কী হয়েছে, সঠিক বলতে পারছি না। যারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিল, তারাই বলতে পারবে। আমার ছেলে তো নাই। সে রাজশাহীতে আছে।”
মুণ্ডুমালা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ কমলেশ হেমব্রম বলেছেন, ‘রোকনুজ্জামান মব জাস্টিসের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ গিয়ে তাকে নিরাপদে বের করে এনেছে। আপাতত কোচিং সেন্টার বন্ধ আছে। তবে, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার সত্যতা আমরা পাইনি। এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ অভিযোগও করেনি। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা/কেয়া/রফিক
উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
পাখি ও প্রজাপতির বিলুপ্তিতে রাসায়নিক কৃষির দায়
আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ আর আগের মতো সজীব নেই। যে রঙিন প্রজাপতিগুলো একসময় বাগানে বাগানে উড়ে বেড়াত, যে পাখিদের কলকাকলিতে ভোরবেলা জেগে উঠতাম আমরা, সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো দোয়েল, শালিক কিংবা বাবুই পাখির দেখা মেলে না। ফুলের বাগানে প্রজাপতির সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই বিষাদময় পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের।
একদিকে যেমন জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকেরা নানা রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই রাসায়নিকগুলো শুধু ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেই মারছে না, উপকারী পতঙ্গ ও পাখি মারছে। এগুলো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি।
কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গরা। এই ছোট প্রাণীগুলো আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাপতি ও মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।
এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফলমূল ও শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু যখন কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন সেই বিষ প্রজাপতি ও মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে। অনেক সময় তারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, আবার কখনো বিষক্রিয়ায় তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে। প্রজাপতির বিভিন্ন প্রজাতি এখন আর চোখে পড়ে না, যেগুলো একসময় সচরাচর দেখা যেত।
পাখিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। গ্রামীণ এলাকায় যেসব পাখি একসময় খুব সহজেই দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন বিলুপ্তির পথে। শালিক, দোয়েল, বাবুই, চড়ুই এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এর পেছনেও রাসায়নিক কীটনাশকের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।
কিন্তু যখন সেই পোকামাকড়ের শরীরে কীটনাশকের বিষ থাকে, তখন পাখিরা সেই বিষযুক্ত খাবার খেয়ে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রজাপতির মতোই অনেক সময় তারা সরাসরি মারা যায়, আবার কখনো তাদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া অনেক পাখি প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের চারপাশের লতাপাতা ও ঝোপঝাড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পাখিদের বাসা বানানো ও আশ্রয়ের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।
রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পাখি ও প্রজাপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। যখন পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যায়, তখন ফসলের উৎপাদনও কমে যায়। যখন পাখি কমে যায়, তখন পোকামাকড়ের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়। এতে আবার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় এবং এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হতে থাকে। কারণ, রাসায়নিক সার মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ও মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীবদের মেরে ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কৃষিতে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। জৈব কৃষি বা অর্গানিক ফার্মিং এর একটি ভালো বিকল্প। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক সার, জৈব কীটনাশক ও ফসলের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা ঠিক নয়। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং জৈব কৃষিতে ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে হবে।
কারণ, একটি সুস্থ পরিবেশ ছাড়া মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। তাই কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি। সবাই মিলে এই ছোট্ট প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে সুন্দর, সবুজ ও প্রাণবন্ত একটি পৃথিবী।
তামান্না ইসলাম শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়