ভোলার ঐতিহ্যবাহী বাংলা স্কুল পুকুর ভরাট করে বানানো হচ্ছে বহুতল ভবন
Published: 15th, October 2025 GMT
ভোলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দুই শতাধিক বছরের পুরোনো বাংলা স্কুলের পুকুর দখল ও ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০ বছর ধরে সচেতন নাগরিক সমাজ পুকুর ও এর তীর দখলমুক্ত করার আন্দোলন করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।
গত বছরের ৫ আগস্টের পরেও পুকুরের তীর ভরাট করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।
এই পুকুরের পানি শহরের মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে। অগ্নিকাণ্ডের সময় এখানকার পানি দিয়েই আগুন নেভানো হয়। কিন্তু পুকুরটি এখন প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে। নিয়মিত দখল ও ভরাটের হুমকিতে জলাশয়টি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, এটি শুধু একটি জলাশয় নয়, ভোলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক, যা এখন ধ্বংসের মুখে।
ভোলা শহরের মাঝখানে অবস্থিত শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়ের পুকুরটি স্থানীয়ভাবে ‘বাংলা স্কুল পুকুর’ নামেই পরিচিত। একসময় এটি ছিল শহরের সবচেয়ে বড় ও গভীর জলাশয়। দুই পাশে পাকা ঘাট, পরিষ্কার পানি, সকাল-বিকেলে সাঁতার—সব মিলিয়ে পুকুরটি ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখন সেই চিত্র বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পুকুরের চারপাশে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও অফিস গড়ে উঠেছে। কেউ ইজারা নিয়ে, কেউ প্রভাব খাটিয়ে দখল করে পুকুর দূষিত করছে।
ভোলা পৌর ভূমি কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে চরজংলা মৌজার ১৬৪ নম্বর খতিয়ানের ছয়টি দাগে ১ একর ৩৫ শতাংশ জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ‘ক’ তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্যে একটি দাগে পুকুরের জমি ছিল ৯৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং দুটি দাগে তীরে আরও ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ জমি। পুকুর ও তীর মিলে মোট আয়তন ছিল ১ একর ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমি দখল বা ভরাট হয়ে গেছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময় প্রথম আমেনা প্লাজা নির্মাণের মাধ্যমে দখল শুরু হয়। পরে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভবনের কিছু অংশ ভাঙা হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে দক্ষিণ ও পশ্চিম তীর দখল করে একাধিক বহুতল ভবন তোলা হয়। সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সার্ভেয়ার একাধিকবার সীমানা নির্ধারণ করে লাল পতাকা পুঁতলেও অদৃশ্য কারণে সেই সীমানা অতিক্রম করে ভবন উঠে গেছে। সচেতন সমাজের কিছু অংশ দখলদারদের সঙ্গে সমঝোতায় গেলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এই পুকুরের পানি শহরের মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে। অগ্নিকাণ্ডের সময় এখানকার পানি দিয়েই আগুন নেভানো হয়। কিন্তু পুকুরটি এখন প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
চিত্রা নদী দখল করে পৌরসভার ভবন, এবার নির্মাণ হচ্ছে সীমানাপ্রাচীর
নদীর জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে পৌরসভা ভবন। এখন ভবনের এক পাশে খানিকটা বাড়িয়ে নদীর মধ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে সীমানাপ্রাচীর। কাজটি করছে যশোরের বাঘারপাড়া পৌরসভা।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০ অনুযায়ী, নদীর দুই ধারের যে অংশ শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে এবং বর্ষায় ডুবে যায়, তা নদীতট বা ফোরশোর হিসেবে গণ্য। এই জায়গায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা স্থাপনা করার অধিকার নেই। কেউ দখল করলে তিনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু এ আইনও মানেনি বাঘারপাড়া পৌরসভা।
২০২০ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রকাশিত নদী দখলদারদের তালিকায় চিত্রা নদীর ব্যাপক দখলের কথা উল্লেখ করা হয়। বাঘারপাড়া এলাকায় নদীর জায়গায় পৌরসভার শৌচাগার, দলীয় কার্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, পুকুর, দোকানপাট ও বসতবাড়ি গড়ে তোলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আংশিক তালিকায় ৪১ জন দখলদারের নাম থাকলেও পরে পাঠানো পূর্ণাঙ্গ তালিকায় ১২৬ জন অবৈধ দখলদার অন্তর্ভুক্ত হয়।
এ সম্পর্কে বাঘারপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব এবং পৌরসভার প্রশাসক মাহির দায়ান আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত অর্থবছরে পৌরসভার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি অর্থবছরে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আমি সম্প্রতি বদলি হয়ে এসেছি। বিষয়টি জানতাম না। খোঁজ নিচ্ছি।’
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় সূত্র জানায়, বাঘারপাড়া মৌজায় চিত্রা নদীর দাগ নম্বর ১৭৩৩। ২০০২ সালে ৩০ অক্টোবর বাঘারপাড়া পৌরসভা ঘোষণা করা হয়। পৌরসভার অস্থায়ী কার্যালয় ছিল বর্তমানে উপজেলা সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। ২০১১ সালে চিত্রা নদীর জায়গা দখল করে পৌরসভা ভবন নির্মাণ করা হয়।
উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসা চিত্রা নদী হঠাৎ বাঁক নিয়ে পশ্চিমমুখী হয়েছে—জায়গাটিই বাঘারপাড়া। নদীর উত্তর পাশে বাঘারপাড়া থানা, দক্ষিণ পাশে পৌরসভা, তার পাশে উপজেলা পরিষদ। গতকাল শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভা ভবনের পশ্চিম পাশে নদীর ভেতর দক্ষিণ থেকে উত্তর এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী সীমানাপ্রাচীরের নির্মাণকাজ চলছে। নিচে লোহার রড বেঁধে কংক্রিট ঢালাই দেওয়া হয়েছে। কয়েক ফুট অন্তর উঁচু করে রাখা হয়েছে বাঁধাই করা রড।
পৌরসভা সূত্র জানায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় কাজটি করা হচ্ছে। বরাদ্দ ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সীমানাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১১৫ ফুট, উচ্চতা ৮ ফুট। কাজ করছে যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজ। গত ১ আগস্ট কাজ শুরু হয়েছে, ১২০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামাল হোসেন বলেন, ‘এক মাস আগে কাজ শুরু করেছি। মাঝে কয়েক দিন কাজ বন্ধ ছিল। আবার শুরু করেছি। আশা করছি দুই মাসের মধ্যে শেষ করতে পারব।’
বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ভুপালী সরকার ছুটিতে থাকায় তাঁর মতামত জানা যায়নি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং জেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব কমলেশ মজুমদার বলেন, ‘নদীর জায়গায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি।’
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে চিত্রা নদীর ৩৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। ধলগ্রাম থেকে দাইতলা অংশ পুনঃখনন পরিকল্পনাধীন।