যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি আরও বেড়েছে
Published: 10th, July 2025 GMT
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় কম। তবে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বেশি। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে পিছিয়ে বা ঘাটতিতে আছে যুক্তরাষ্ট্র। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।
এই বাণিজ্যঘাটতি বিবেচনায় এনে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর গত ২ এপ্রিল ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল দেশটি। তবে আলোচনার সুযোগ রেখে তিন মাস শুল্ক কার্যকর পিছিয়ে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। সে জন্য গত তিন মাসে আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি কমানোর নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল সরকার। তবে অর্থবছর শেষে সরকারের এসব উদ্যোগ বাণিজ্যঘাটতি কমায়নি, উল্টো দেশটি থেকে আমদানি কমে ঘাটতি আরও বেড়েছে।
শুল্কছাড়ের চেয়ে নীতিসহায়তা দেওয়া হলে বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ত। যেমন নীতিসহায়তা না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন বীজ আমদানি কমে গেছে।আমিরুল হক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেল্টা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজজাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের হিসাবে, সদ্য বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের হাতে বাড়তি রয়েছে ৬২৬ কোটি ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৭৬৭ কোটি ডলার। দেশটি থেকে আমদানি হয়েছিল প্রায় ২৬২ কোটি ডলার। তাতে ওই অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ছিল ৫০৫ কোটি ডলার।
দুই অর্থবছরের তুলনা করে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে এ সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। তার বিপরীতে দেশটি থেকে আমদানি কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হলেও ট্রাম্পের সূত্র উল্টো বিপাকে ফেলেছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের। কারণ, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে এই বাজারে রপ্তানি কমে যাবে।
ঘাটতি কমাতে সরকারের যা পদক্ষেপ
গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পর বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। সেখানে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।
আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি গত ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ১১০টি পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়, যা ওই দিনই কার্যকর হয়। সব দেশ থেকে আমদানিতে এই শুল্কহার প্রযোজ্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা পাবে এমন বিষয় বিবেচনা রেখে এই পদক্ষেপ নেয় সরকার। বেসরকারিভাবে আমদানি বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি কেনাকাটা বাড়ানোর কথাও বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকারি পদক্ষেপের প্রভাব কী
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধার কথা মাথায় রেখে যেকোনো দেশ থেকে ১১০টি পণ্য আমদানিতে কাস্টমস শুল্কছাড় দেওয়া হয়। শুল্কছাড় দেওয়ার পর মাত্র এক মাস সময় পেরিয়েছে। ফলে এই এক মাসে খুব বেশি প্রভাব পড়ার কথা নয়। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া প্রধান কয়েকটি পণ্যের আমদানির হিসাবে কিছু ধারণা পাওয়া যায়।
যেমন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় রড তৈরির কাঁচামাল পুরোনো লোহার টুকরা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই পণ্যটি আমদানি হয় প্রায় ৬৭ কোটি ডলারের। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে আমদানি হয় ৬৮ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। একইভাবে সয়াবিন বীজ আমদানি হয় ৩৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ডলারে। আবার ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তুলা আমদানি হয় ৩৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৫১ লাখ ডলারে।
আমদানি বৃদ্ধি বা কমার বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্পাত ও সয়াবিন বীজ খাতের দুজন উদ্যোক্তা প্রথম আলোকে বলেন, শুল্কহার সব দেশের জন্যই সমান। বাজেটে শুল্কছাড়ও সব দেশের জন্য একই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য শুল্কছাড় দেওয়া হলেও তাতে আমদানিতে মোটাদাগে প্রভাব পড়বে না। যে দেশ থেকে কম খরচে ভালো মানের পণ্য আমদানি করা যায় সেখান থেকেই ব্যবসায়ীরা আমদানি করেন।
তবে সয়াবিন বীজ মাড়াই করে প্রাণিখাদ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, শুল্কছাড়ের চেয়ে নীতিসহায়তা দেওয়া হলে বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ত। যেমন সয়াবিন বীজ থেকে দেশে সয়াবিন তেল ও সয়া কেক উৎপাদন হচ্ছে। সয়াবিন বীজ থেকে প্রস্তুত পণ্য সয়া কেক আমদানিতে শুল্ক নেই। এখন সরকার যদি সয়া কেক আমদানিতে ন্যূনতম শুল্ক কর আরোপ করত তাহলে সয়াবিন বীজ আমদানিও বাড়ত। মানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই সয়াবিন বীজ আমদানি বেশি হতো। নীতিসহায়তা না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই পণ্যটির আমদানি কমে গেছে।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: য ক তর ষ ট র র স য ক তর ষ ট র থ ক সরক র র আমদ ন ত পদক ষ প র জন য
এছাড়াও পড়ুন:
স্বাস্থ্যে প্রকল্প থেকে সরছে সরকার: ১৭ মাস বেতনহীন, চাকরি হারানোর শঙ্কা
প্রকল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। দুই হাজারের বেশি কর্মী ১৭ মাস বেতন–ভাতা পাচ্ছেন না। অনেকের চাকরিচ্যুতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এতে কিছু সেবা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৯৮ সালে সরকার স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (সেক্টর প্রোগ্রাম নামে পরিচিত) শুরু করেছিল। এ পর্যন্ত সরকারের চারটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। সর্বশেষ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। পরের মাস জুলাই থেকে পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল।
১৯৯৮ সালে সরকার ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ শুরু করেছিল। ৩০টির বেশি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। গত বছরের ৫ আগস্টের পর এ কর্মসূচি বন্ধ। অস্থায়ীভাবে থাকা অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাদ পড়ছেন। যাঁরা আছেন, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে অনেকের বেতন-ভাতাও বন্ধ।৩০টির বেশি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। অপারেশন প্ল্যানগুলো ছিল এক একটি পৃথক প্রকল্প। এসব প্রকল্পে বিভিন্ন দাতা সংস্থা তাদের সামর্থ্য ও স্বার্থ অনুযায়ী অর্থসহায়তা দিত। এসব প্রকল্পে স্বাস্থ্য বিভাগের নিজস্ব জনবল ছিল। পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী জনবলও ছিল।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় হঠাৎই অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। এ কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন অস্থায়ীভাবে থাকা অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাদ পড়ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে অনেকের বেতন–ভাতা বন্ধ। অন্যদিকে দাতা সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড অর্থসহায়তা কমিয়ে দেওয়ার কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে যুক্ত জনবলের একটি অংশ ৩১ ডিসেম্বরের পর আর চাকরিতে থাকতে পারবে না।
তবে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম চেষ্টা করছেন সেক্টর প্রোগ্রামে যাঁরা অস্থায়ী নিয়োগে চাকরি করতেন, তাঁরা যেন স্বাস্থ্য বিভাগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে কাজ করার সুযোগ পান।
গত ৯ অক্টোবর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, সেক্টর কর্মসূচি শেষে স্বাস্থ্য বিভাগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ডিপিপির (ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান বা বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা) প্রস্তাব করা হয়েছে। সেক্টর কর্মসূচিতে কাজ করা জনবলকে ডিপিপিতে ‘ক্যারিড ওভার’ করা হবে।
এমন পদক্ষেপ আগেও নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে পর্যায়ভিত্তিক নিয়োগ করা জনবল পরবর্তী প্রকল্পে অব্যাহত রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ, এইচআইভি-এইডস, পুষ্টিসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে শিথিলতা এসেছে। এতে রোগ বেড়ে যেতে পারে—এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।কেন সেক্টর কর্মসূচি বাদএকসময় স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচি ও এর অপারেশন প্ল্যানগুলোতে দাতা সংস্থার অর্থায়ন বেশি ছিল। এখন তা কমে এসেছে। স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচিতে এখন বেশির ভাগ অর্থায়ন সরকারের। তাই প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচি থেকে সরে এসে সব কর্মকাণ্ড স্বাস্থ্যের মূল কাঠামোতে যুক্ত করা প্রয়োজন মনে করছে সরকার।
৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সেক্টর কর্মসূচির দুর্বলতা ও এই কর্মসূচি থেকে সরে আসার যুক্তি তুলে ধরা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণীতে অন্তত সাতটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ আছে। এক, রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কাজের ডুপ্লিকেশন ও ওভারল্যাপিং হয়। দুই, স্থায়ী কাজ বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে উন্নয়ন বাজেটের কারণে। তিন, ২৬ বছর চলার পরও স্বাস্থ্য খাতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। চার. পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে ও শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ অনুভূত হয়নি। পাঁচ, দাতা সংস্থার অর্থায়নে অনেকে বেতন পায় বলে বেতনবৈষম্য তৈরি হয়েছে। ছয়, অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীনভাবে স্থাপনা তৈরি হলেও জনবল তৈরি ও সেবা চালু হয়নি। সাত, অনেক ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ, ইউএসএআইডি, জাইকা, ডিফিডসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেক্টর কর্মসূচিতে যুক্ত ছিল। বেশ কিছু দেশের দূতাবাস ছোট–বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। এ ছাড়া দেশের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় সেক্টর কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত ছিল। এদের কারও সঙ্গে আলোচনা না করে সরকার কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ২৬ নভেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এতকাল দাতাদের অর্থে, পরামর্শে চলেছে। এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দাতা সংস্থা, এমনকি দেশের জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়েরও প্রয়োজন বোধ করল না। এটা দুঃখজনক।’
ঢাকার আজিমপুরের এই শিশু বিকাশ কেন্দ্র আগে থেকে ধুঁকছিল। এখন টিকে থাকা নিয়েই সংশয়