আলীকদম সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে মিয়ানমারের নাগরিক নিহত
Published: 14th, October 2025 GMT
বান্দরবানের আলীকদম সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন মিয়ানমারের নাগরিক নিহত ও একজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির লাশ ঘটনাস্থলেই রয়েছে, আর আহত ব্যক্তি বাড়ি ফিরেছেন। গতকাল সোমবার দুপুরে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে বিজিবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
এর এক দিন আগে, রোববার নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে একজন বিজিবি সদস্য আহত হন। ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই আলীকদম সীমান্তে নতুন করে হতাহতের ঘটনা ঘটল। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, এর আগে এ এলাকায় মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি।
কক্সবাজারের রামু ৩০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কাজী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, নিহত মেনথাং ম্রো (৪০) এবং আহত মাংছার ম্রো (৩০) ৫৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের পশ্চিম পাশে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হটাও মগপাড়া এলাকায় জুম দেখার জন্য যাচ্ছিলেন। পথে মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মেনথাং ম্রো মারা যান। তিনি মিয়ানমারের নতুনপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর লাশ এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছে। আহত মাংছার ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের গর্জনপাড়া এলাকায়। তিনি আহত অবস্থায় ফিরেছেন এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে মেনথাং ম্রোর পরিবার সীমান্তঘেঁষা ইয়ংরিংপাড়ায় সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। তিনি মাংছার ম্রোকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের নিজের জুমঘর থেকে ধান আনতে গিয়েছিলেন। পথে মাইন বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন। তাঁর লাশ উদ্ধারে ইয়ংরিংপাড়ার লোকজন চেষ্টা করছেন। আহত মাংছার ম্রো পেটে আঘাত পেয়েছেন, তবে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়।
চেয়ারম্যান ক্রাতপুং আরও বলেন, কুরুকপাতা ইউনিয়নের ইয়ংরিংপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থিত। স্থানীয় লোকজন সীমান্তের উভয় পাশে জুমচাষ করেন এবং মিয়ানমারের ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।
আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর্জা জহির উদ্দিন বলেন, মাইন বিস্ফোরণে একজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তি মিয়ানমারের এবং আহত ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। তবে সীমান্ত এলাকা দুর্গম হওয়ায় ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন।
আরও পড়ুননাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বিজিবি সদস্য আহত১২ অক্টোবর ২০২৫.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
সবাই আস্থা পায় এমন বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবাই আস্থা পায়। ঢাকার একজন ফেরিওয়ালা বা খুলনার একজন পোশাকশ্রমিকও যেন বলতে পারেন, আদালতের প্রতি ভরসা আছে। সিলেটের একজন রিকশাচালকও যেন নিশ্চিন্তে বলেন, আমরা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখি।’
আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় বিচারকদের উদ্দেশে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এ কথা বলেন। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের উদ্যোগে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের সহযোগিতায় ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ: গুম-সংক্রান্ত ঘটনায় বিচার বিভাগের ভূমিকা’ শীর্ষক চতুর্থ এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ন্যায়বিচারের সর্বোত্তম নিশ্চয়তা নির্ভর করে বিচারকদের ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা, সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার ওপর। একজন বিচারককে প্রতিটি মামলা সমান উদ্যম, কঠোরতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে বিচার করতে হবে। প্রতিদিন সকালে যখন বিচারকেরা তাঁদের পোশাক পরিধান করবেন, তখন তাঁদের সংবিধানের কথাগুলো স্মরণ করা উচিত।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের দপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান হুমা খান বলেন, বিচারকদের নিরপেক্ষতা, পেশাদারত্ব ও দায়িত্বশীলতা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। গুমের ভুক্তভোগীদের করুণ পরিণতি এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।
হুমা খান বলেন, ‘আমি যেসব ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অধিকাংশই সামাজিক চাপ ও মানসিক কষ্টে ভুগছে। মামলা পরিচালনায় ভয়ভীতি, তদন্ত জটিলতা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে।’ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে কাজ পরিচালনার জন্য গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সার্বিক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন তিনি।
কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী বলেন, গুম-সংক্রান্ত মামলাগুলোর কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। কমিশন ইতিমধ্যে বিদ্যমান আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে গুম-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের প্রস্তাব প্রস্তুত করছে।
এ সময় কমিশনের সদস্য মো. নূর খান বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও ভুক্তভোগীদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
কর্মশালার ওয়ার্কিং সেশন পরিচালনা করেন কমিশনের সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন। এই পর্বে গুম-সংক্রান্ত মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ, মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রয়োগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার জবাবদিহি নিশ্চিতের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কর্মশালাটি পরিচালনা করেন গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। দেশের বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে কর্মরত বিচারকসহ প্রায় ৯০ জন প্রশিক্ষণার্থী এতে অংশ নেন। কমিশন আয়োজিত চারটি কর্মশালার আজ ছিল শেষ পর্ব।
শেষ পর্বের আলোচনায় গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগের আওতায় স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা, গুম-সংক্রান্ত মামলার জটিলতা নিরসনে মনিটরিং সেল গঠনের কথা উঠে আসে। এ সময় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বিচারকদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ আয়োজন, ভুক্তভোগীদের মানসিক ও আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
কর্মশালার আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) সহজীকরণ, চিহ্নিত মামলাগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিষ্পন্ন করা, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে ভুক্তভোগীদের সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটদের মিথ্যা মামলা নিরসনসংক্রান্ত ক্ষমতা প্রদান এবং বিচার বিভাগ ও কমিশনের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে আসে কর্মশালার শেষ পর্বের আলোচনায়।