ইজিবাইক-অটোরিকশায় ঠাসা সুনামগঞ্জ শহর, দমবন্ধ অবস্থা
Published: 13th, October 2025 GMT
একসময়ের শান্ত ও নিরিবিলি শহর সুনামগঞ্জ আজ আর আগের মতো নেই। সময়ের পরিক্রমায় বদলে গেছে শহরের চেহারা। শান্ত শহরের তকমা হারিয়ে এখন এটি পরিচিতি পাচ্ছে যানজট ও দুর্ঘটনার দুর্বিষহ নগরী হিসেবে। সুনামগঞ্জের সড়ক ঠাসা অগণিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকে। শহরের প্রায় প্রতিটি প্রধান সড়ক এখন এগুলোর দখলে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি শহরের অলিগলি, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও বাজার এলাকায় যাত্রীবাহী ইজিবাইক ও অটোরিকশার দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
এসব বাহনের কারণে নিত্যদিন জ্যামে নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে— হাঁটার জায়গাটুকুও প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন শহরবাসী। যানজট এতটাই প্রকট যে, অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, কেউই সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। শহরজুড়ে যেন দমবন্ধ অবস্থা। যান চলাচলে শৃঙ্খলা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। অথচ, এসব সমস্যা সমাধানে ও অভিযোগের জবাবে কর্তৃপক্ষ বারবার শোনাচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস। শহরবাসীর অভিযোগ, এই চরম দুর্ভোগের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দায়ী।
সুনামগঞ্জ শহরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, শহরটায় এমনিতেই একমুখি রাস্তা, দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই শহর থেকে বের হওয়ার। এখন শহরে যেভাবে অটোরিকশা চলছে, হঠাৎ করেই জ্যাম লেগে যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেরা এসব চালায়। এদের নেই প্রশিক্ষণ, নেই সিগন্যাল সম্বন্ধে ধারণা। এরা টাকা দিয়ে অটোর লাইন্সেন কিনে স্টিয়ারিংয়ে উঠে যায়। যখন-তখন দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শহরের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ—পথচারীরা রাস্তায় হাঁটতে পারছেন না। মোটরের রিকশাগুলো খুবই ডেঞ্জারাস। চালকরা রিকশায় উঠে মনে করে, যেন হেলিকপ্টার চালাচ্ছে। এটাকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
শহর ঘুরে দেখা গেছে, পুরাতন বাস স্টেশন এলাকা, কোর্ট পয়েন্ট, ষোলঘর, কাজির পয়েন্ট, উকিল পাড়া, ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকা, কালিবাড়ি পয়েন্ট, ওয়েজখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সকাল ও সন্ধ্যার দিকে যান চলাচল একপ্রকার থমকে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে যাচ্ছে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে যাচ্ছে যানজটে।
বেশিরভাগ সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে চলছে পার্কিং। যত্রতত্র যাত্রী ওঠা-নামা করানোর কারণে সড়কের প্রতিটি মোড়েই বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে দিন দিন জটিল করে তুলছে অবাধে চলাচলকারী এসব অটোরিকশা। সেগুলো এখন নগরজীবনের অন্যতম প্রধান দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আলম পিয়াল রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, সুনামগঞ্জ শহরে আগে এত যানজট ছিল না। ছোট একটা শহর, কোথাও যেতে চাইলে ৫ মিনিটে যাওয়া যেত। কিন্তু এখন অটোরিকশার কারণে যে অবস্থা! রাস্তার প্রতিটি পয়েন্টে জ্যাম থাকে। গাড়িতে ব্রেক নেই, রাতের বেলা চালালে তাদের লাইট নেই। এসব মিলিয়ে খুবই বাজে অবস্থা শহরের। আশা করি, প্রশাসন সুন্দর একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সুনামগঞ্জ ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের (প্রশাসন) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় নিবন্ধনধারী ইজিবাইকের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে প্রায় ১ হাজার ৩০০।
জেলা ট্রাফিক অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ ইজিবাইক ও অটোরিকশা বৈধভাবে চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, কেবল জেলা শহরেই বৈধ ও অবৈধ মিলে ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলছে ৫ হাজারের বেশি। দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এসব যানবাহন। হাজার হাজার রিকশা একসঙ্গে রাস্তায় নামায় শহরজীবন একপ্রকার অচল হয়ে পড়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা জিহান জুবায়ের এ প্রতিবেদককে বলেন, সুনামগঞ্জে অটোর পরিমাণ এত বেড়েছে যে, ফুটপাতেও হাঁটার মতো জায়গা নেই। দেখা যাচ্ছে, হাঁটার সময় এসব অটো আমাদের ওপরেই উঠে যাচ্ছে। আমি অনুরোধ করব প্রশাসনের কাছে, অটোরিকশাগুলোকে যেন একটা নিয়মের মধ্যে আনা হয়। চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যেন গাড়িতে উঠতে দেওয়া হয়।
নিরাপদ সড়ক চাই’র সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ওবায়দুল হক মিলন বলেছেন, সুনামগঞ্জে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের মারাত্মক অবস্থা। যাত্রীদের সাথে চালকরা সব সময় ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করে। ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা চায়। এই যে যাত্রীরা হয়রানির শিকার হন, এ বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষ দেখেও দেখে না। তারা ঘুমাচ্ছে আর যাত্রীরা অপদস্থ হচ্ছে রাস্তায়। এই পরিস্থিতি থেকে আমরা মুক্তি চাই।
শহরে অটোরিকশার সংখ্যা ও যানজট বৃদ্ধির জন্য সাবেক পৌর মেয়র নাদের বখতকে দায়ী করে সুনামগঞ্জ জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মো.
সুনামগঞ্জ শহরের বাসিন্দারা মনে করেন, এ অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা প্রতিদিনের এই রিকশা-জ্যাম সুনামগঞ্জবাসীর জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে তুলবে।
ঢাকা/রফিক
উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর স ন মগঞ জ শহর ব যবস থ র জন য বল ছ ন য নজট শহর র অবস থ
এছাড়াও পড়ুন:
জেগে উঠেছে চর্যাপদের গান
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিশ শতকের শুরুতে নেপালের রাজদরবারে ‘চর্যাপদ’–এর সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণায় এক নবযুগের সূচনা হয়। যেন হাজার বছর অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকা থাকা জাতির ‘আপন খবর’ হঠাৎ আলোয় ঝলমল করে ওঠে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সেই সন্ধানের পর বাঙালি বিদ্বৎসমাজে যে আত্ম-আবিষ্কারের জোয়ার উঠেছিল, তা আজও আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভিত হয়ে আছে।
নেপালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে বহুমূল্য পাণ্ডুলিপির সন্ধান পেয়েছিলেন, সম্পাদনা করে ১৯১৬ সালে তা ‘হাজার বছরের পুরাণ বঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। সে গ্রন্থের ভূমিকায় শাস্ত্রী এক বিস্ময়োক্তি লিপিবদ্ধ করেন, ‘১৯০৭ সালে নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে ও তাহার সংস্কৃত টিকা আছে। গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম চর্য্যাপদ।’ (শাস্ত্রী, ১৯১৬: ৪) অর্থাৎ প্রথম দর্শনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এগুলো ছিল গীতপদ। এ ছিল সংগীত, ছিল পরিবেশনা, ছিল ছন্দ ও তাল। সাহিত্যবেত্তাগণ এখন সর্বসম্মত যে চর্যাপদ কেবল গীতই হতো না, তা পরিবেশিত হতো বিবিধ ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনে।
শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশের চর্যাগানের আসরে আমেরিকান গবেষক কিথ ই. কান্তুর পরিবেশনা