মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রধান আতাউল্লাহ ওরফে আবু আম্মার জুনুনীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে কক্সবাজারের একটি আদালত।

আজ বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আসাফ উদ্দিন আসিফ উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে সংগঠিত চার রোহিঙ্গা খুনের মামলার শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আদালতে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিল।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো.

গোলাম জিলানী প্রথম আলোকে তিন দিনের রিমান্ডের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোলাগুলিতে চারজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছিল। ওই মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আরাসা প্রধান আতাউল্লাহ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কঠোর নিরাপত্তায় প্রিজন ভ্যানে আরাসাপ্রধানকে আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। বেলা দুইটার দিকে আদালত থেকে আবার কক্সবাজার জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আজ বিকেল থেকে আতাউল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে অবশিষ্ট মামলায় পুনরায় রিমান্ড চাওয়া হবে। আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে উখিয়া থানাতে তিনটি এবং নাইক্ষ্যংছড়ি থানাতে একটি হত্যা মামলা রয়েছে।

পুলিশ ও আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারের দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে চারজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে সিআইডির তদন্তে রয়েছে।

পুলিশ জানায়, চলতি বছরের ১৮ মার্চ রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনিসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাব। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করতে তারা গোপন বৈঠক করছিলেন।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে আতাউল্লাহসহ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম দফায় পাঁচ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর বান্দরবানসহ বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলায় আতাউল্লাহকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কক্সবাজারের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা থেকে তাকে কক্সবাজার আনা হয়।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৮ সালের দিকে উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরের নিয়ন্ত্রণে নেয় আরসা। তখন আরসাকে ঠেকাতে মাঠে নামে আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারেটি অর্গানাইজেশন ( আরআরএসও)। তখন রোহিঙ্গাদের নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহর সঙ্গে বিরোধে জড়ায় আরসা। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করে আরসা সন্ত্রাসীরা। এই মামলায় আতাউল্লাহকে আসামি করা হয়। এক মাস পর উখিয়ার আরেকটি আশ্রয়শিবিরে ছয়জন রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করে আরসা। সে মামলার আসামি আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ।

২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের কাছে মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানের সময়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রিজওয়ান রুশদী। এই মামলাতেও আসামি আরসার প্রধান।

সীমান্তের একাধিক সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের সিকদারপাড়ায় আতাউল্লাহর বাড়ি। ১৯৬০ সালের দিকে তাঁর বাবা পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। সেখানেই জন্ম আতাউল্লাহর। তিনি পড়াশোনা করেন সৌদি আরবের মক্কায়।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: জ জ ঞ স ব দ র জন য ল ল হক

এছাড়াও পড়ুন:

বাংলাদেশ কীভাবে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকদের ‘কাঁদাচ্ছে’

ভারতের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম তলানিতে ঠেকেছে। তারপরও দেশটির পেঁয়াজ রপ্তানি স্থবির। সরকারি কর্মকর্তারা পেঁয়াজ রপ্তানির এই দুরবস্থা দেখে হতবাক হলেও তার পেছনের কার হচ্ছে কৃষিপণ্যটি উৎপাদনে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ভারতের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তান ও চীন থেকে পণ্যটি সংগ্রহ করা। এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে মূলত নয়াদিল্লি বারবার অস্থায়ীভাবে পেঁয়াজ রপ্তানির বন্ধ করার কারণে।

ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একসময় ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া পেঁয়াজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। তবে গত আট মাসে বাংলাদেশ ভারত থেকে খুবই সামান্য পরিমাণ পেঁয়াজ কিনেছে। যদিও ঢাকার বাজারে দাম ভারতের স্থানীয় বাজারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। অন্যদিকে সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে খুব কম পরিমাণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি করেছে।

এদিকে ভারতের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ বেআইনিভাবে রপ্তানি হচ্ছে। সেই বীজই ভারতের পেঁয়াজের ঐতিহ্যবাহী ক্রেতাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে, যা কিনা পণ্যটির বাণিজ্যে ভারতের বহুদিনের আধিপত্যকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

হর্টিকালচার প্রোডিউস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এইচপিইএ) সাবেক প্রধান ও অভিজ্ঞ পেঁয়াজ রপ্তানিকারক অজিত শাহ বলেন, ‘আমরা আমাদের গুণমানের জন্য অতিরিক্ত দাম নিতে পারতাম। যখন আমরা দীর্ঘদিন বাজারে ছিলাম না, তখন আমাদের গ্রাহকেরা বিকল্প সরবরাহকারীর খুঁজে নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন তারা (ভারতীয় পেঁয়াজের ক্রেতা) আর গুণমান তুলনা করে না; বরং আমাদের প্রতিযোগীদের সঙ্গে দামের তুলনা করে।’

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তার আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ছয় মাসের জন্য এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ মাসের জন্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশের বাজারগুলোয় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়।

২০২০ সালে, ঘন ঘন পেঁয়াজ রপ্তানির নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে ভারতকে একটি কূটনৈতিক নোটও পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশের কৃষকদের সুরক্ষা ও স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে না।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ কিনেছিল বাংলাদেশ। ওই অর্থবছরে ভারত থেকে মোট পেঁয়াজ রপ্তানি হয়েছিল ১৭ লাখ ১৭ হাজার টন। তার মানে বাংলাদেশ একাই আমদানি করেছিল ৪২ শতাংশ পেঁয়াজ। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে মাসে ভারত থেকে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে বাংলাদেশ।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, ঢাকায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ কম। তবে রপ্তানিকারকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, রপ্তানির নীতি ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলেই (যা মূলত স্থানীয় বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত হয়) ভারতের পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অন্যত্র কেনাকাটা করতে বাধ্য হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বোর্ড অব ট্রেডের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য পাশা প্যাটেল বলেন, ‘আমরা কেবল আমাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক ক্রেতাকে হারাইনি, তারা ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজে স্বাবলম্বী হতেও শুরু করেছে।’

রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় পেঁয়াজ কিনছে না। সরকার যখন রপ্তানিকারকদের কাছে জানতে চায়, তখন তাঁরা বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আমদানি অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এইচপিইএ সরকারকে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা ইয়েমেন ও ইরান থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে পেঁয়াজ কিনছে। এ ছাড়া স্থানীয় ফসল থেকেও তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে। এমনকি ফিলিপাইনসও চীন থেকে না পেলে তবেই ভারতীয় পেঁয়াজ কেনে।

২০২০-২১ অর্থবছরে ভারত সৌদি আরবে ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল, যা পরবর্তী বছরগুলোয় কমতে কমতে থাকে। চলতি অর্থবছর এখন পর্যন্ত মাত্র ২২৩ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করেছেন সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে ক্রমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। এ কারণে রপ্তানিকারকেরা হর্টিকালচার কমিশনারের কাছে প্রতিযোগী দেশগুলোয় পেঁয়াজের বীজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছেন।

এইচপিইএর সহসভাপতি বিকাশ সিং বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অন্য প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে পেঁয়াজ উৎপাদন করছে। এই প্রবণতা ভারতীয় কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বীজ চীন ও পাকিস্তানেও ভারতীয় পেঁয়াজের বড় ধরনের চাহিদা রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বাংলাদেশ কীভাবে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকদের ‘কাঁদাচ্ছে’
  • সৌদি আরব কেন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে না, অন্যান্য মুসলিম দেশের অবস্থান কী