খাদ্য নিরাপত্তার মূল সমস্যা সুষম বণ্টনের অভাব। বিগত সরকারের লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে খাদ্যের যথাযথ বণ্টন ব্যাহত হয়েছে। উৎপাদন ও বণ্টনে সুষমতা নিশ্চিত করা গেলে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে একটি আইন প্রণয়ন জরুরি।

বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথাগুলো বলেন বক্তারা। ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নামের একটি নেটওয়ার্ক এই আলোচনার আয়োজন করে।
আলোচনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান। তিনি বলেন, বিগত গণ–অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সবার প্রত্যাশা ছিল অধিকারের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। এর মধ্যে সবার জন্য খাদ্য অধিকার বাস্তবায়ন ছিল অন্যতম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার মানও আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়নে খাদ্য অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে সহায়তা বাড়ানোর সুপারিশ করেন আসিফ মোহাম্মদ শাহান।

সভায় সম্মানীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ। তিনি বলেন, ক্ষুধা, খাদ্য ও পুষ্টির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার মূল সমস্যা সুষম বণ্টনের অভাব। বিগত সরকারের লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে খাদ্যের বণ্টনে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, উৎপাদন ও বণ্টনে সুষমতা এলেই খাদ্যে সবার অভিগম্যতা নিশ্চিত হবে। খাদ্য অধিকার নিশ্চিতে একটি আইন করা এখন জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে ‘খাদ্য অধিকার আইন’ প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে কাজ করছে। তিনি আইনটি দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সব পক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।

সভায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া, নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা, নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি, বিদ্যমান বৈষম্য হ্রাস করে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো ইত্যাদি।

ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক ও খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী কানিজ ফাতেমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শিলা রানী দাস, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক এস এম জুলফিকার আলী, ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুজহাত জাবিন ও ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফে বাংলাদেশের হেড অব প্রজেক্ট মো.

মামুনুর রশিদ।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: প রণয়ন

এছাড়াও পড়ুন:

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ

বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধু শেরপুর জেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৮৪০, যাদের মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, হুদি, পাত্র, সৌরা, মসুর, মারমা, ম্রো, চাক, মাহালিসহ ১৬টিরও বেশি সম্প্রদায় রয়েছে। প্রতিটি গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা, যা তাদের অস্তিত্বের মূল পরিচয়।

আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত ভাষা ৩৫টির বেশি। এই ভাষাগুলো মূলত তিনটি বৃহৎ ভাষা পরিবারে বিভক্ত। তিব্বত-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি। এগুলো স্বরনির্ভর এবং প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রভাব বহন করে।

এদিকে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার করে সাঁওতাল, খাসি, মান্দি, ওঁরাও প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী। তাদের ভাষার শব্দভান্ডার প্রকৃতি, কৃষি, নদী-জঙ্গলকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে রোহিঙ্গা, কোচ, বেলে ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোয় আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব স্পষ্ট।

ব্রিটিশ শাসনামলে মিশনারি বিদ্যালয়গুলোয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ ছিল; অনেক ভাষার জন্য লিপিও উদ্ভাবন করা হয়েছিল। তবে প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে উর্দুর একক আধিপত্য তাদের ভাষাশিক্ষার সুযোগ ক্রমে সংকুচিত করে দেয়।

স্বাধীনতার পর ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অনেক জাতিগোষ্ঠী ভারত থেকে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় তারা আবার বাংলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ঘাটতি মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা-অবহেলা শিশুদের ভাষাগত চর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের। অনেকে মানসিক চাপ সইতে না পেরে পড়াশোনা কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

চাকমা, খুমি, খিয়াং, পনু, ম্রো, লুসাই, কচ, রং, পাংখোসহ বহু ভাষা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সংস্কৃতির স্বাদ, ইতিহাস, পরিচয় ও জীবনের নিজস্ব অর্থ। এ দেশের মানুষ ভাষার মর্যাদার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধা যদি আজ বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা আমাদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।

বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনে অনুবাদক নিয়োগ, সমাজে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ, লিখিত রূপ তৈরি, ভাষার সমান অধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। আর উন্নতির সেই যাত্রায় ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় ও মর্যাদার বাহক। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লাবনী আক্তার শিমলা শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ