প্রায় এক শতাব্দী ধরে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে মার্কিন ডলার। ডলার ঘিরে মার্কিন বন্ডসহ বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক ভান্ডার হিসেবে কাজ করছে বছরের পর বছর। তবে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, সামরিক ও বাণিজ্যিক যুদ্ধ, মারণাস্ত্রের বেসামাল প্রয়োগসহ পরাশক্তি দেশগুলোর নানা হুমকি ও পদক্ষেপে ডলারের আধিপত্য খানিকটা চাপের মুখে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ এই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

কানাডাভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল গভর্নেন্স ইনোভেশনের (সিআইজিআই) গবেষকরা বলছেন, ২০০৮ সালে  বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দায় একবার সংকটে পড়েছিল ডলার। বর্তমানে ডিজিটাল মুদ্রার উত্থান ও ভূরাজনীতির বহুমেরূকরণে ডলারের আধিপত্য নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। 

ডিজিটাল ইউয়ান, ইউরো ও পাউন্ডের বিপরীতে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তারকে উৎসাহিত করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওইসব মুদ্রা ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, কৌশলগত বিটকয়েন রিজার্ভ তৈরি করা এখন জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির (ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন) ব্যবহারও বাড়াতে চায় দেশটি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনা মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করতে পারে, আবার দুর্বলও করে তুলতে পারে। তাছাড়া অফশোর (দেশের বাইরের) আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। বিশেষ করে দেশে দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির অনুমোদন যত বেশি পাচ্ছে, ততই মার্কিন ডলার হুমকির মুখে পড়ছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ ক্রিপ্টোকারেন্সির অনুমোদন দিয়েছে। অতিসম্প্রতি জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দাম ১ শতাংশ কমেছে। ডলারের বিপরীতে ইউরোর ০.

৮ শতাংশ, পাউন্ড ১ শতাংশ ও স্টার্লিং ০.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যযুদ্ধে বদলে যাচ্ছে আর্থিক লেনদেন 

২০২৫ সালে এসে বিশ্বের আঞ্চলিক, সামরিক জোটগুলো নানামাত্রিক সংকটে পড়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই অবস্থায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশ চীন ডলারের পরিবর্তে নিজস্ব অর্থের লেনদেন শক্তিশালী করছে। দেশে দেশে পণ্য ও অর্থনৈতিক খাতে নতুন চুক্তি হচ্ছে। অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করেছে। বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইউরো ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করেছে। 

মার্কিন ডলারের বড় সংকট হলো- বর্তমানে ইউরো, পাউন্ড, কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান ডলারের নতুন রিজার্ভ তৈরি হচ্ছে। যেন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমে। তাছাড়া ইউরোপ চিন্তা করছে, কীভাবে দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা যায়। 

সিআইজিআই সতর্ক করেছে, ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্র দেশগুলোরও টানাপোড়েন শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সমন্বয়মূলক চুক্তিতে আসতে চাইবে। এসব পদক্ষেপে আস্তে আস্তে ডলারের প্রভাব খর্ব হতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক আরোপ বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান হুমকিতে বাজারে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে পড়ে যাচ্ছে মার্কিন ডলারের দাম। 

লন্ডনের ব্রাউন ব্রাদার্স হ্যারিম্যানের সিনিয়র বাজার কৌশলবিদ ইলিয়াস হাদ্দাদ বলছেন, মার্কিন নীতিতে  আস্থা হারানোর বিষয়টিই এই মুহূর্তে ডলারের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ। 

কানাডিয়ান বহুজাতিক বিনিয়োগ ও আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান টিডি সিকিউরিটিজের গ্লোবাল ফরেক্স স্ট্র্যাটেজিস্ট জয়তি ভরদ্বাজ ইকোনমিক টাইমসকে বলেন, এই বছরের শেয়ারবাজার মার্কিন মুদ্রার ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। ডলারের সঙ্গে তারল্যের সম্পর্কও ভেঙে গেছে, যা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে। 

চীন-রাশিয়ার ডলারবিরোধী অর্থ ব্যবস্থা   

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ডলারবিরোধী সহযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। উভয় দেশই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থায় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে ‘আধিপত্যবাদী হুমকি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে দেশ দুটি ইউয়ান ও রুবলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনা করছে। 

আফ্রিকায়ও পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা চীন-রাশিয়া ডলারবিরোধী জোটে জ্বালানি যোগাচ্ছে। এতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য চাপের মুখে পড়েছে।  

সৌদি আরব, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ আরও কয়েকটি দেশ চীনের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। 

সৌদি আরব গত নভেম্বরে বেইজিংয়ের সঙ্গে তিন বছরের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মূল্য ৬.৯৩ বিলিয়ন ডলার। 

ব্রাজিল, ইরান, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা ও তুরস্কের মতো দেশও আরও ইউয়ানে বাণিজ্য পরিচালনা করতে সম্মত হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করার কারণে ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অংশ ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। 

এশিয়া প্যাসিফিক আঞ্চলিক ফোরামের সাবেক সহসভাপতি রমেশ বৈদ্যনাথন বিশ্বাস করেন, ব্রিকসের পেমেন্ট সিস্টেম বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর একটি রূপান্তরমূলক প্রভাব ফেলবে, যা মার্কিন ডলারের আধিপত্য হ্রাস করবে। 

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের (এসডব্লিউপি) সিনিয়র ফেলো হ্যানস গুন্থার হিলপার্ট ডিডব্লিউকে বলেন, গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল) অনেক দেশ রাশিয়ান রিজার্ভ অবরুদ্ধ করার পশ্চিমা পদক্ষেপ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। তারা ভাবছে, হয়তো ভবিষ্যতে তাদের রিজার্ভও অবরুদ্ধ করা হতে পারে। এজন্য দেশগুলো ডলার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। 

সূত্র: কানাডিয়ান থিংক ট্যাংক সিআইজিআই, ইকোনমিক টাইমস, ডিডব্লিউ  

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: য ক তর ষ ট র আর থ ক ব যবস থ পদক ষ প ল নদ ন র ওপর বছর র

এছাড়াও পড়ুন:

দ. এশিয়ায় বাংলাদেশে জিডিপির সবচেয়ে কম বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশে জিডিপির সবচেয়ে কম শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিশুর সার্বিক উন্নতিতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশিষ্টজন। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের বাজেট কমিয়ে এ খাতে কিভাবে বরাদ্দ দিতে হবে তার রোডম্যাপ করাও জরুরি বলে মনে করেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ে এক মিডিয়া ওরিয়েন্টেশনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট : শিশুদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান প্রবণতা এবং তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিশু-সম্পর্কিত সমস্যা এবং শিশুর বিকাশের ওপর বাজেট বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

এতে ইউনিসেফ, বাংলাদেশের সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড ইকোনমিক স্পেশালিস্ট মো. আশিক ইকবাল তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, ‘ইউনিসেফ মূলত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। শিশু অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমাদের মূলত প্রয়োজন বাজেট। বাজেট বরাদ্দ ছাড়া আমরা তা করতে পারব না। এবার কোনো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় না থাকায় আশা করা যায়, বাজেটে কিছুটা ভিন্নতা থাকবে। বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় না। সেই সুযোগটি এবার তৈরি হয়েছিল। অন্যান্য দেশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যেভাবে বরাদ্দ দেয়, সেখান থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। 

প্রবন্ধে বলা হয়, সোশ্যাল খাতে আমাদের যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, সেগুলো গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের তুলনায় অনেক কম। গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। আমাদের দেশে বাজেটের মাত্র ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছর শিক্ষা খাতে জিডিপির ১ দশমিক ৬ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়। 

সম্পর্কিত নিবন্ধ