ইকুয়েডরে মোরগ লড়াইয়ের সময় সেনাবাহিনীর সাজে বন্দুকধারীদের গুলি, নিহত ১২
Published: 20th, April 2025 GMT
লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে মোরগ লড়াইয়ের আয়োজনে বন্দুকধারীদের গুলিতে ১২ জন নিহত হয়েছেন। সামরিক বাহিনীর ভুয়া সাজপোশাকে ছিলেন ওই বন্দুকধারীরা। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে মানাবি প্রদেশের লা ভ্যালেন্সিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গত শুক্রবার তারা মানাবি থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার অভিযানের সময় অস্ত্র এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নকল পোশাক উদ্ধার করা হয়েছে। গুলির ঘটনায় একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, মোরগ লড়াইয়ের আয়োজনস্থলে ঢুকে বন্দুকধারীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকেন। এ সময় উপস্থিত দর্শনার্থীরা প্রাণ বাঁচনোর চেষ্টা করেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা একটি অপরাধী চক্রের সদস্য। তাঁদের প্রতিপক্ষের সদস্যরা মোরগ লড়াইয়ের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
ইকুয়েডরে প্রায় ২০টি অপরাধী চক্র সক্রিয় আছে বলে মনে করা হয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া বলেছেন, ইকুয়েডরের বিভিন্ন বন্দর ব্যবহার করে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ কোকেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হয়। এই কোকেন ইকুয়েডরে আসে প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া ও পেরু থেকে।
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
লিভ ইন রিলেশনশিপ
আমার ব্যাপারে মায়ের সবচেয়ে বড় কমপ্লেইন হচ্ছে আমি ডিজঅর্গানাইজড। গোছানো নই। আমি যে খানিক এলোমেলো স্বভাবের, সেটা আমাকে আলাদাভাবে বলে দিতে হয় না। আমি জানি। কারণ, আমার জ্যামিতিক ফর্মে ট্রায়াঙ্গুলার, রেকট্যাঙ্গুলার লাইফ ভালো লাগে না। লাইফ মানেই ওভার বাউন্ডারি। যেমন খুশি সাজো। তাতে লাইফে প্যারা থাকে না। ঝামেলা উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারে না।
এটা মাকে কে বোঝাবে! সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই চিৎকার শুরু করবে, ‘রাফি, ওঠো। দশটা বেজে পার হয়ে গেছে। সারা দিন ঘুমাবে নাকি!’
আমার নাম রাফিদ, রাফি নয়। আদর করে ডাকতে গিয়ে মা আমার নামের দ ঝেড়ে দিয়েছে। আদর বাড়লে মনে হয় ফি-ও চলে যাবে। আমি হয়ে যাব রা। আজ ছুটির দিন। পরীক্ষাও শেষ। সারা দিন ঘুমালে অসুবিধা কী! সারা রাত তো জেগে ছিলাম। অবশ্য জেগে কল অব ডিউটি খেলেছি। টিম ডেথম্যাচ। সুপার হাইপ গেম।
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা যেদিন শেষ হয়েছে, সেদিন থেকে মা নতুন যন্ত্রণা শুরু করেছে। বাংলাদেশে যত কোচিং সেন্টার আছে, সবগুলোর কাগজপত্র জোগাড় করে ফেলেছে। কবে থেকে কোচিং শুরু, কোচিং ফি কত, কত দিনের কোর্স। মা আমাকে দিয়ে ভার্সিটি, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং—সব কোচিং করাবে। আমার নিজের যেন কোনো ইচ্ছা নেই! আমার চেয়ে লেগুনার হেলপার অনেক স্বাধীন। চিল করে। মা যদি আমাকে ইজিবাইক চালানোর কোচিংয়ে ভর্তি করে দিত, তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম।
আমি খুশি হতে পারিনি। মা আমাকে উদ্ভাসে কোচিং করার জন্য পাঠিয়েছে। এখানে নিয়মিত আসতে হয়। অবশ্য প্রথম দিকে আসতে বিরক্ত লাগলেও এখন ভালো লাগে। ভালো লাগার কারণ কোচিংয়ের পড়াশোনা নয়, হিমি। আ’ম টোটাল সিম্প ফর হার। হলিক্রস থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। আমাদের সঙ্গে কোচিং করছে। প্রতিদিন জানালার পাশে বসে। একই জায়গায় কেমন করে সব দিন বসার সিট পায়, সেটাও বিস্ময়। এটা তো ইশকুল নয় যে জোর করে সিট দখল করে রাখবে। আর হিমিকে দেখে জোর করে কিছু করার মতো মেয়েও মনে হচ্ছে না। চুপচাপ শান্ত টাইপের মেয়ে। এই কয় দিন একসঙ্গে কোচিং করছি, কোনো দিন তার গলার আওয়াজ শুনিনি। সে কোনো কথা বলে না। স্থির চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। হিমির দিকে তাকালে মনে হয় শর্ষের তেলভরা স্বচ্ছ বোতলে সূর্যের আলো পড়েছে। হিমির গায়ের রং সে রকম। তাকে দেখে আমার মাথা নষ্ট অবস্থা। এত সুন্দর মানুষ হয়!
প্রথম দিকে আসতে বিরক্ত লাগলেও এখন ভালো লাগে। ভালো লাগার কারণ কোচিংয়ের পড়াশোনা নয়, হিমি। আ’ম টোটাল সিম্প ফর হার। হলিক্রস থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। আমাদের সঙ্গে কোচিং করছে। প্রতিদিন জানালার পাশে বসে।অবাক ঘটনা হচ্ছে, কেউ হিমিকে খেয়াল করে না। এমন অপূর্ব দেখতে একজন মানুষকে কেউ ইগনোর করতে পারে, সেটা ভাবাই যায় না। একদিন শুধু শামীম ভাই ক্লাস নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘ইউ মেয়ে, তুমি কি আমার কথা শুনছ? জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কী দেখছ? এদিকে তাকাও।’
হিমি কিছু বলেনি। কেবল জানালার দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে শামীম ভাইয়ের দিকে তাকিয়েছিল। তা–ও অল্প সময়ের জন্য। খানিক বাদে আবার মাথা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিল।
হলিক্রস কলেজ থেকে পরীক্ষা দেওয়া আরও দুজন মেয়ে আসে হিমির সঙ্গে। তারা যখন নাম ধরে ডেকেছে, তখন জেনেছি ওর নাম হিমি।
মায়ের ভাষায় অগোছালো, এলোমেলো, বোহেমিয়ান আমাকে হিমি অর্গানাইজড করে দিল। কোচিং শেষ করে গ্রিনরোড থেকে ফার্মগেটে এসেছি মেট্রো ধরব বলে। আমি শেওড়াপাড়ায় থাকি। ফার্মগেট থেকে মেট্রোরেল ধরে শেওড়াপাড়া স্টেশনে নামি। তারপর রিকশায়, না হলে হেঁটে বাসায় চলে যাই। সেদিন ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে এসে দেখি হিমি। সে যাচ্ছে উত্তরা উত্তরে। একবার ভাবলাম গিয়ে কথা বলি। কেন জানি যেতে পারলাম না। হিমিকে একা দেখলাম। তার সঙ্গে হলিক্রসের যারা কোচিংয়ে যায়, তারা নেই। তারা হয়তো অন্যদিকে থাকে। মেট্রোরেলে যাতায়াত করে না। হিমি প্রতিদিন মেট্রোরেলে যাতায়াত করে কি না জানি না। আগে খেয়াল করিনি। ওই দিন প্রথম দেখলাম।
দুজন আলাদা কম্পার্টমেন্টে উঠেছি। শেওড়াপাড়ায় নেমে চারপাশে তাকালাম, হিমি আছে কি না। হিমি নেই। সে তাহলে আগে কোনো স্টপেজে নেমে গেছে অথবা পরে নামবে। ট্রেনের ভেতর খুঁজতে খুঁজতে ট্রেন হুশ করে স্টেশন ছেড়ে বের হয়ে গেল।
পরদিন কোচিং শেষ করে এসে ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে হিমিকে দেখলাম। ব্যাপারটা তখন নোটিশ করেছি। কোচিং শেষ করে আমরা একই সময় একই ট্রেনে বাড়ি ফিরি। ট্রেন আসে বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে। তার পরের দিন বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটের ট্রেন ধরার জন্য এসেছি। এসে দেখি, স্টেশনে হিমি দাঁড়িয়ে আছে।
অবাক ঘটনা হচ্ছে, কেউ হিমিকে খেয়াল করে না। এমন অপূর্ব দেখতে একজন মানুষকে কেউ ইগনোর করতে পারে, সেটা ভাবাই যায় না। একদিন শুধু শামীম ভাই ক্লাস নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘ইউ মেয়ে, তুমি কি আমার কথা শুনছ? ’হিমির সঙ্গে আমার কথা হয় না, তবে বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটের ট্রেনে বাড়ি ফেরা আমার ফিক্সড হয়ে গেল। হুট করেই আমি অর্গানাইজড হয়ে গেলাম। টাইম মেইনটেন করে ট্রেন ধরি। কোচিংয়ে আসার সময় খেয়াল করি, কোন ড্রেস পরে যাচ্ছি। পরপর দুই দিন একই ড্রেস পরি না। কেন জানি মনে হলো হিমি আমাকে খেয়াল করে। সে কেন আমাকে স্টক করছে বুঝতে পারলাম না। তবু মনে হলো। এখন আর মাকে জোরাজুরি করে ঘুম থেকে আমাকে ডেকে তুলতে হয় না। আমি নিজেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। অনলাইনে নতুন পারফিউম কিনেছি। ওপাল অরা থেকে। উড ফ্লোরাল মাস্ক অপেরা। হিমি কেমন পারফিউম পছন্দ করে জানি না। দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে বেসিনের সামনের গ্লাসের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। আমাকে আমার কাছে কেমন লাগছে বুঝতে চাইছিলাম। মুখের দাড়ি পুরো শেভ করে ফেলব নাকি ট্রিম করব, সেটা বুঝতে পারছিলাম না। মাকে ডাক দিলাম, ‘মা, ও মা, শোনো তো।’
মা অফিসে যাবে। রেডি হচ্ছে। ঘাড় ঝুঁকিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?’
বললাম, ‘দেখো তো ক্লিন শেভ করলে আমাকে ভালো লাগবে নাকি দাড়ি ট্রিম করব?’
মা অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কি কোথাও ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছ! ঘটনা কী হয়েছে, আমাকে বলো।’
ঘটনা কী হয়েছে, তা মাকে বলার রিস্ক নিলাম না। দাড়ি যত্ন করে ট্রিম করে নিলাম।
কোচিং শেষ করে ৫টা ১৭ মিনিটের ট্রেন মিস করেছি। মিস করিয়েছে ফাহাদ। দেরিতে এসেছে কোচিংয়ে। শুরুতে ভাইয়া কী পড়িয়েছে, সেসব আমার খাতা দেখে টুকে নিচ্ছিল। আমি যতই তাড়াতাড়ি করি, ফাহাদ যেন ততই দেরি করে। ঘড়িতে তখন সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে। তার মানে আজ ৫টা ১৭ মিনিটের ট্রেন মিস।
যখন মেট্রোরেল স্টেশনে এলাম, তখন ৫টা বেজে ২১ মিনিট হয়ে গেছে। ট্রেন চলে গেছে জেনেও ছুটে মেট্রোস্টেশনে ঢুকেছি। ঢুকে হকচকিয়ে গেছি। হিমি দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে। সে–ও কি আজ ট্রেন মিস করেছে! নাকি আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে! আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। তাহলে কি অন্য কারও জন্য দাঁড়িয়ে আছে! আমার সব তালগোল পাকিয়ে গেল।
পরের ট্রেন আসবে ৮ মিনিট পর। শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে হিমির পাশে দাঁড়ালাম। নার্ভাস গলায় বললাম, ‘আমি রাফিদ। একই সঙ্গে কোচিং করি। ক্লাসে আপনাকে দেখেছি।’
দুজন আলাদা কম্পার্টমেন্টে উঠেছি। শেওড়াপাড়ায় নেমে চারপাশে তাকালাম, হিমি আছে কি না। হিমি নেই। সে তাহলে আগে কোনো স্টপেজে নেমে গেছে অথবা পরে নামবে। ট্রেনের ভেতর খুঁজতে খুঁজতে ট্রেন হুশ করে স্টেশন ছেড়ে বের হয়ে গেল।হিমি কিছু বলল না। থতমত খেয়ে গেছি। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য কিংবা নিজেকে খানিক স্মার্ট দেখানোর জন্য বললাম, ‘আপনি হিমি। আমি জানি।’
তবু হিমি কিছু বলল না। কী বলব বুঝতে পারছি না। হড়বড় করে বললাম, ‘আপনি তো হলিক্রস থেকে! আপনার দুজন বান্ধবী আসে দেখি। তারা কি কোচিং শেষ করে চলে যায়? আপনাকে সব সময় দেখি একা দাঁড়িয়ে আছেন।’
হিমির কী হলো বুঝলাম না। আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমাকে আস্ক করতেছেন! সব কোয়েশ্চেনের আনসার দেওয়া যায় না।’
অমনি আমার ভেতরে কেঁপে উঠল। কেন কেঁপে উঠল, জানি না।
তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। আমরা প্রতিদিন কোচিং শেষ করে মেট্রোস্টেশনে এসে ৫টা ১৭ মিনিটের ট্রেন ধরি। কখনো একই কম্পার্টমেন্টে উঠি, কখনো আলাদা কম্পার্টমেন্টে। ট্রেনে ওঠার আগে আমরা গল্প করি। আমাদের গল্প থেকে ‘আপনি’ সম্বোধন উঠে গিয়ে সেখানে ‘তুমি’ চলে এসেছে, ‘আমি শেওড়াপাড়ায় থাকি। তুমি কোথায় থাকো?’
‘আমি মিরপুর দশে নেমে যাই।’
‘মানে তুমি মিরপুর দশে থাকো না?’
‘নেমে কিছু দূর যেতে হয়। মিরপুর ছয়ে।’
‘শোনো, তুমি রাজি হলে আমিও একদিন মিরপুর দশে নামব। তোমার সাথে হেঁটে যাব। না-না, তোমার বাসায় যাব না। এমনি তোমার সাথে হাঁটব।’
হিমি হাসল। কেউ হাসলে তাকে এত বেশি সুন্দর দেখাতে পারে তা হিমি না হাসলে আমার জানা হতো না। হিমি হাসলেই মন ভালো হয়ে যায়। ভীষণ ভালো।
হিমি হাঁটতে রাজি হয়েছে।
আমরা মিরপুর দশের মেট্রোরেল স্টেশন থেকে বের হয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলাম।
হিমি বলল, ‘তুমি গল্পের বই পড়তে লাইক করো?’
গল্পের বই আমি পড়ি। কিন্তু হিমি যেভাবে জানতে চেয়েছে, সেভাবে পড়ি কি না বুঝতে পারছি না। বললাম, ‘পড়ি তো!’
‘কোনো বিশেষ লেখকের লেখা তোমার পছন্দ, এমন হয়েছে?’
‘ড্যান ব্রাউনের বই পড়তে ভালো লাগে। তারপর এডগার অ্যালান পোর লেখা। সত্যজিৎ রায়ের লেখা বই পড়েছি অনেকগুলো।’
‘তুমি তো দেখতেছি অনেক বই পড়ো। যারা বই পড়ে, তারা ভালো মানুষ হয়। তুমি ভালো মানুষ।’
বাড়ির কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন মাকে রেখে বাবা আরেকজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। মা আমাকে নিয়ে আছে। এসব বলতে ইচ্ছা হলো না। হিমির বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি।আমার ভালো লাগছে। বেশি ভালো। হিমির সঙ্গে হাঁটতেও ভালো লাগছে। মনে হলো হাঁটতে হাঁটতে এখুনি মিরপুর ছয় চলে আসবে আর হিমি বাসায় চলে যাবে। আমাকেও ফিরে যেতে হবে। তখন মন খারাপ হলো।
হিমি বলল, ‘তুমি আমার সব খবর নিছো। আমি হলিক্রস কলেজের স্টুডেন্ট। তিন বান্ধবী কোচিংয়ে আসি। তোমার কিছু জানা হয়নি।’
‘রেমিয়ান আমি। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র।’
এটুকু বলে থেমে গেছি। বাড়ির কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন মাকে রেখে বাবা আরেকজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। মা আমাকে নিয়ে আছে। এসব বলতে ইচ্ছা হলো না। হিমির বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি। ভদ্রতার জন্য হোক কিংবা আন্তরিকভাবে হোক, হিমি তাদের বাসায় যেতে বলল। আমার মন খারাপ লাগছিল। হিমির বাসায় গেলাম না। ফিরে এলাম।
রাতে ফেসবুকে হিমির ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর মেসেঞ্জারে মেসেজ পেয়ে চমকে উঠেছি। হিমি জিজ্ঞেস করেছে, ‘তুমি গান শুনো?’
লিখলাম, ‘মাঝে মাঝে।’
হিমি লিখল, ‘তুমি কি জানো গান হইতেছে এমন টাইম, যখন মানুষ ভীষণ অনেস্ট থাকে!’
হিমির কথা বুঝতে পারলাম না। তবে সিদ্ধান্ত নিলাম, এখন থেকে আরও বেশি বেশি গান শুনব।
হিমি লিখেছে, ‘তোমার সাথে হাঁটতে কোজি ফিলিং দিছে। কালো টি-শার্টে তোমাকে কুল ড্রিপ লাগতেছিল। কাল শেওড়াপাড়ায় নামব। তোমাদের ওখানে হাঁটার জায়গা আছে?’
আমার খুশি লাগছে। প্রচণ্ড খুশি। পরদিন আমরা শেওড়াপাড়ায় ফুটপাত ধরে হাঁটলাম। হিমিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্লাসে তুমি সব সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকো কেন?’
হিমি কিছু বলল না। চুপ করে আছে। বোকার মতো প্রশ্ন করে ফেলেছি, বুঝতে পারছি। অন্য কোনো প্রশ্ন করে বোকামি কাটাতে হবে। কী প্রশ্ন করা যায় ভাবছি। তখন শীতল গলায় হিমি বলল, ‘জানালার বাইরে যে আকাশ, তার কোনো সীমানা বেঁধে দেওয়া নাই। মানুষের জীবন সময় দিয়ে আটকানো। আমার ভেতর এখন আমি আটকে গেছি। আকাশ সব সময় মুক্ত।’
কিছু বুঝতে পারলাম না হিমির কথা। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। হিমি ফিসফিস করে বলল, ‘আমি আর বেশি দিন বাঁচব না।’
আচমকা থমকে গেছি। আমার সব উলটাপালটা বোধ হচ্ছে। হিমিকে খুব উইয়ার্ড লাগছে। বললাম, ‘মানে কী?’
হিমি বলল, ‘আমার হার্টে অদ্ভুত সমস্যা ধরা পড়ছে। ডাক্তার বলছেন কমপ্লিকেটেড। দেশে বা দেশের বাইরে এর কোনো ট্রিটমেন্ট নাই। তবু শিগগিরই ডাক্তার অপারেশন করবেন বলছেন।’
মনে হচ্ছে কোথাও কোনো শব্দ নেই। হিমি অমনি আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘শুনো না! আচ্ছা, আমি যদি অপারেশনের পর আর না থাকি, তুমি কি তখন আমার কথা ভাবতে ভাবতে মিরপুর আর শেওড়াপাড়ার ফুটপাত দিয়ে হাঁটবা!’আমার পায়ের নিচে দুলছে। মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হচ্ছে। এমন অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত নই। নিজেকে স্থির রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হিমি আমার গোটানো শার্টের আস্তিন ধরে টান দিয়ে বলল, ‘অ্যাই রাফিদ।’
আমি দাঁড়ালাম। হিমি বলল, ‘আমার বিলিভ, অপারেশনের পর আমি বেঁচে যাব।’
মনে হচ্ছে কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। সুনসান নিস্তব্ধ হয়ে আছে চারপাশ। হিমি অমনি আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘শুনো না! আচ্ছা, আমি যদি অপারেশনের পর আর না থাকি, তুমি কি তখন আমার কথা ভাবতে ভাবতে মিরপুর আর শেওড়াপাড়ার ফুটপাত দিয়ে হাঁটবা!’
আমার গলা শুকিয়ে এসেছে। ভীষণ পানি পিপাসা পাচ্ছে। মুখের ভেতর ভারী বোধ হচ্ছে। কথা বলতে পারছি না। হিমি হাসছে। রাস্তার মাঝখানে আমাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর শরীর বাঁকিয়ে হাসছে। হিমির হাসিতে চারপাশ আবার যেমন ছিল, তেমন হয়ে এসেছে। হাসতে হাসতে হিমি বলল, ‘তুমি পাগল। পাগল টু দ্য পাওয়ার এন। কেমন ঘাবড়ে গেছ! লিভ ইট। এবার স্ল্যাপ বা স্কিবিডি টাইপ কিছু বলো।’
হিমির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তোমাকে কোনো দিন হারিয়ে ফেললে আমার আকাশ হয়ে যাবে জানালার মাপে। তোমার মতো আমিও তখন জানালা দিয়ে আকাশ দেখব। হয়তো আমার জানালা দিয়ে কেবল ওই একটুখানি আকাশই দেখা যাবে। সে তুমি।’
হিমি আমার হাতে চাপড় দিয়ে বলল, ‘সেই হইছে। জোশ!’
হিমির অপারেশনের দিন হাসপাতালে গেলাম। বাসায় এসে মাকে হিমির কথা বলেছি। মা এসেছে হাসপাতালে আমার সঙ্গে। হিমির মাথায় হাত দিয়ে আদর করেছে। হিমির বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে।
হিমি বলল, ‘অ্যাই রাফিদ, তুমি ভয় পাইতেছ?’
হাসপাতালের বেডের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে হিমির মাথার কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। ইচ্ছা করছে হিমির কপালে হাত ছোঁয়াতে। কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে। কিছুই করতে পারছি না। স্থির হয়ে আছি।
হিমি আমার হাত ধরল। হিমির হাত বেশ গরম, নাকি আমার হাত ঠান্ডা হয়ে আছে—ধারণা করতে পারলাম না। হিমি আমার হাতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘আমি একটুও ভয় পাইতেছি না। কেন, জানো জানালার ওপাশে আকাশ আছে। যদি বেঁচে যাই, তখন জানালার বাইরে হাঁটব। যদি না বাঁচি, তবু আকাশ থাকবে। সেই আকাশ তুমি দেখবা।’
আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। দুই চোখ টানটান করে রেখেছি। হিমির সামনে কাঁদতে চাই না। চোখ জ্বালা করছে। নার্স এসে জানাল হিমিকে অপারেশনের জন্য নিয়ে যাবে। হিমির কাছ থেকে চলে এলাম। কেবিনের বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছে নিয়েছি।
মেসেজ এসেছে। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দেখি, হিমি মেসেজ পাঠিয়েছে। লিখেছে, ‘তুমি আমার জীবনের জানালা। তোমার সাথে দেখা না হলে জানতেই পারতাম না পৃথিবী এত কিউট। যদি আমি না থাকি, তুমি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবা। আমি থাকব আকাশে।’
হু হু করে কেঁদে ফেলেছি। আমার পাশ দিয়ে কখন হিমিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছে জানতে পারিনি। মা এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। থমকে গেল আমার পৃথিবী।
আবার পৃথিবী সচল হলো আড়াই ঘণ্টা পর। ডাক্তার জানিয়েছেন, তিনি দুর্দান্ত খুশি। মিরাকল কিছু ঘটেছে। অপারেশন সাকসেস হয়েছে।
তারপর হিমি পুরোপুরি সেরে উঠল।
আমরা এখন মিরপুর আর শেওড়াপাড়ার ফুটপাত ধরে হাঁটি। জানালা দিয়ে নয়, আমরা একসঙ্গে মুক্ত আকাশ দেখি।