শেরপুরে একই দিনে তিন ছাত্রের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় স্বজনেরা
Published: 2nd, August 2025 GMT
গত বছরের ৪ আগস্ট শেরপুরের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল তিন তরুণের রক্তে। সবুজ মিয়া (১৮) নামের একজন গুলিতে এবং মাহবুবুর রহমান (২১) ও শারদুল আশিষ (২১) গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন। গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত আজও দগদগে। তবে এক বছরেও এসব ঘটনার বিচার হয়নি। জড়িতদের শাস্তি ও নিরপরাধ আসামিদের মুক্তির বিনিময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছে নিহত তরুণদের পরিবারগুলো।
সেদিন নিহত তিনজনই ছাত্র ও পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। সবুজ মিয়া শ্রীবরদী উপজেলার বাসিন্দা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী; মাহবুবুর রহমান শেরপুর সদর উপজেলার চৈতনখিলা এলাকার বাসিন্দা ও শেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এবং শারদুল আশিষ ঝিনাইগাতী উপজেলার বাসিন্দা ও সেকান্দর আলী ডিগ্রি কলেজের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঘটনার দিন দুপুরের পর থেকেই শেরপুর শহর উত্তাল হতে শুরু করে। খড়মপুর সড়কে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে থাকেন। তাঁদেরই একজন শ্রীবরদীর বাসিন্দা সবুজ মিয়া। এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতেই শহরে গিয়েছিলেন।
শেরপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আওয়ামী লীগের একটি মিছিল থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বুলেট সবুজের মাথার ডান পাশে লাগলে মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাঁকে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। বাবার অসুস্থতার কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি ওষুধের দোকানে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছিলেন সবুজ।
সেদিনের ঘটনার কথা স্মরণ করে সবুজের মা সমেলা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী লোকজন আমার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। এখন আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই, দ্রুত বিচার চাই।’
সবুজের মৃত্যুর আধঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে খড়মপুর সড়কে আবার মিছিল বের করেন ছাত্র-জনতা। মিছিলের পেছন দিক থেকে অতর্কিতে ছুটে আসে ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যবহৃত একটি গাড়ি। মুহূর্তেই সেটি পিষে দেয় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাহবুবুর ও শারদুল। তাঁদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি কাউকে।
মাহবুব পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন। অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়াতে ফ্রিল্যান্সিং করে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। তাঁর মা মাহফুজা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীরা শাস্তি পাক, তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন সাজা না পায়। আমি ন্যায়বিচার চাই।’
মাহবুবের মতোই ফ্রিল্যান্সিং করতেন শারদুল। গ্রামের বাড়িতে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে শহরের মেসে থাকতেন। তাঁর বাবা সোহরাব হোসেন ঘটনার বিচার চেয়ে বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো দল করত না। মিছিলে দাঁড়িয়েছিল মাত্র। পেছন থেকে আসা গাড়িটা তাঁকে পিষে দিল। এখন শুধু বিচার চাই।’
এসব হত্যার ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছিল। সবুজের বড় ভাই সাদ্দাম মিয়া ঘটনার দিনই একটি মামলা করেন। আর ১২ আগস্ট শারদুলের বাবা সোহরাব হোসেন ও মাহবুবের মা মাহফুজা খাতুন পৃথক দুটি মামলা করেন। চলতি বছরের ৩০ জুন পুলিশ এই তিন মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয়, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান–সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে প্রথম অভিযোগপত্র। তবে সবুজের হত্যায় অনেক অপরাধীর নাম না থাকা এবং নিরপরাধ ব্যক্তির নাম থাকার অভিযোগ তুলে চলতি বছরের ১৬ জুলাই মাহবুবের মা আদালতের কাছে সময় চেয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) শেরপুর জেলার আহ্বায়ক মামুনর রহমান ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগের লোকজন ছিল। মূলত তাঁদের মিছিল থেকেই ওই দিন গুলিতে সবুজের প্রাণ গেছে। আর বাকি দুজন সরকারি গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই। এ ছাড়া কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন এ মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটাও চাই।’
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ম হব ব র ন রপর ধ সব জ র ঘটন র
এছাড়াও পড়ুন:
ফাউন্টেনপেন, কালি ও দোয়াতের প্রদর্শনীতে ইতিহাসের রেখাপাত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের নামের সঙ্গে মিশে আছে ফাউন্টেনপেন বা ঝরনাকলমের নাম। ফাউন্টেনপেনে লিখেছেন আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ। দোয়াত ও কালি দিয়ে লেখা হতো ফাউন্টেনপেনে। কিন্তু বলপয়েন্টের প্রচলনের পর ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে ফাউন্টেনপেন।
দেশের একদল সংগ্রাহক ফাউন্টেনপেনের ইতিহাসকে জাগরূক রাখতে চান। সেই চাওয়া থেকে তাঁরা হারিয়ে যাওয়া ফাউন্টেনপেন, দোয়াত ও কালির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। এই আয়োজনে এসে অনেকেই ফিরে গেলেন এমন এক সময়ে, যা এখনকার আলোচনা থেকে হারিয়ে গেছে।
১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফাউন্টেনপেন আবিষ্কার হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশেও এর বহুল প্রসার ঘটতে থাকে। বাংলাদেশে ফাউন্টেনপেন এসেছিল ইংরেজদের হাত ধরে। এই কলমকে বাংলায় ‘ঝরনাকলম’ নামে নামকরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নানা ধরন ও দামের ফাউন্টেনপেন বাজারে এসেছিল। পার্কার, শেফার্ড, ওয়াটারম্যান, সোয়ান ও পাইলটের ফাউন্টেনপেন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব কলমে ছিল রকমারি ও টেকসই নিব ও হ্যান্ডেল। শৌখিন ও ধনী ব্যক্তিদের জন্য হীরা বসানো হতো কোনো কোনো কলমে। কখনো সোনা, প্লাটিনাম ইত্যাদি দিয়ে মুড়ে দেওয়া হতো ফাউন্টেনপেনকে।
বাংলাদেশ পেন ক্লাবের আয়োজনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে দুই দিনব্যাপী ‘ঢাকা পেন শো’র শেষ দিন ছিল শনিবার। প্রদর্শনীর পাশাপাশি এদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ক্যালিগ্রাফি বা অক্ষরশিল্প নিয়ে একটি কর্মশালারও আয়োজন করেছিল পেন ক্লাব।
প্রদর্শনীতে নানা রঙের ফাউন্টেনপেন বা ঝরনাকলম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫