এই রচনা লেখার আইডিয়াটা আমার মনে এসেছে প্রথম আলোতে আমাদের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর দুটি বক্তব্য পড়ে।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরে তালিকাভুক্ত এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি গ্রন্থাগারের তালিকা ও তথ্য নিয়ে একটি সফটওয়্যারের উদ্বোধন করতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, সাংস্কৃতিক বিরোধ থাকলে রাজনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য। অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—দুটি ক্ষেত্রেই সমতা না এলে দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু কোনো সরকারই সংস্কৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। বাজেটে এ খাতে বার্ষিক বরাদ্দই তার প্রমাণ।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জাতীয় চলচ্চিত্র সম্মেলন ২০২৫-এ আরেকটি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়গুলো অদ্ভুতভাবে ভাগ করা হয়েছে। কলোনিয়াল দেশগুলোতে এটা দেখবেন। কোরিয়া, ইরান, ইতালিতে সংস্কৃতি ও ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় আলাদা নয়; একসঙ্গে রয়েছে। আমাদেরও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন পুরো কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিকে আনা দরকার।’

ফারুকী ঠিক বলেছেন, নাকি ভুল বলেছেন, তা নিয়ে আমার আজকের কথা নয়; বরং তাঁর কথার সূত্র ধরে এ লেখার অবতারণা।

সংস্কৃতি বলতে আমি বুঝি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন। শুধু সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্র নয়। তিনি যখন অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে দুটি খাত হিসেবে দেখছেন, তা নিয়ে একটু আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।

আমার কাছে শুধু শিল্প-সাহিত্যই সংস্কৃতি নয় এবং সংস্কৃতির একমাত্র ধারক ও বাহক নয়; বরং আমরা বাংলাদেশি হিসেবে যা শিখি, করি এবং আমাদের কর্মে দেশে ও বিদেশে যা প্রতিফলিত হয়, সেটাই আমাদের সংস্কৃতি, যাকে ইংরেজিতে কালচার বলা যায়। আমরা রাস্তায় থুতু ফেলছি, নাক ঝাড়ছি, কোনায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছি, ট্রাফিক আইন মানছি না, ঘুষ খাচ্ছি, চুরি করছি, একে অপরকে ঠকাচ্ছি, গরিব মানুষদের ক্ষ্যাত মনে করে দাবিয়ে রাখছি—এ সবই আমাদের সংস্কৃতি, কালচার।

আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গেল সাড়ে পনেরো বছর ব্যাংক ডাকাতি একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। ব্যাংকিং খাত আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যানেল। আমার কাছে মনে হয় অর্থনীতিও একরকমের সংস্কৃতি। আমি কেমন অর্থনীতি চাই বা চাই না, তার ওপর নির্ভর করে আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা একটা গোষ্ঠীকে অতি ধনী হওয়ার অনুমতি দিয়ে দিচ্ছি, আপামর জনতাকে সারা জীবন গরিব থাকতে বাধ্য করছি এবং মধ্যবিত্তের দিন-এনে-দিন-খাওয়া জীবনকে গ্রহণ করে নিয়ে সেটাই বাস্তব বলে মেনে নিয়ে নির্বিকার দিনাতিপাত করে চলেছি। এটাই আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কৃতি।

আমাদের সরকার সংস্কৃতি বলতে যা বোঝে বা জনমানুষদের যা বোঝা, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা কী খাই, কী পরি, কী করি, যা করি তা আইন মেনে করি কি না, নাকি বিশৃঙ্খল পদ্ধতিতে করি—এসবই পরিশেষে এক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। একটি দেশ বা সমাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে অনেক বছর ধরে। আমাদের জন্য পঞ্চাশ বা পঁচাত্তর বছর কি কোনো এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট ছিল না? ইতিহাসের প্রবাহে সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য অনেক স্তম্ভ থাকে; আমাদেরও ছিল—১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪। আমরা কোন সংস্কৃতি গড়তে পেরেছি বা পারব?

তাই শুধু সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্র খাতকে সংস্কৃতি বা কালচার মনে করা ঠিক হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভাবার জন্য সবাইকে অনুরোধ করছি। সংস্কৃতি আরও অনেক বড় এবং এর বিস্তার সর্বব্যাপী। আমাদের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যদি শুধুই সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্র বা পর্যটনের দেখভাল করার জন্যই কাজ করতে চায়, তাহলে আমাদের এই মন্ত্রণালয়ের নাম নিয়ে আরেকবার ভাবতে হবে।

আসুন ভুটানের উদাহরণ দেখি। এই দেশটি জিডিপির হিসাব করে না, এরা সুখের সূচকের হিসাব করে। এটা তাদের সংস্কৃতি। তাদের সংবিধানে বনায়নের কথা বলা রয়েছে এবং তারা তাদের সংবিধান মেনে বনায়ন বাড়িয়েই চলেছে। এই সংস্কৃতি তাদের সরকার সজ্ঞানে এক কৌশলপত্রে পরিণত করে দেশের মানুষদের সেভাবেই জীবন যাপন করতে উৎসাহিত করছে। আমেরিকার সংস্কৃতি কী? আমেরিকান ড্রিম। তাদের সরকার জনগণদের বলে—তুমি যা হতে চাও, হও। কিন্তু তারা কি যেকোনো উপায়ে তাদের স্বপ্ন পূরণ করে। আইন-আদালত আছে, তা মেনেই স্বপ্ন পূরণ করতে হয়। এদের মতো আরও অনেক দেশ আছে, শহর আছে, যাদের আলাদা আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং তা দেশ গড়ায় অবদান রাখছে।

সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্রের চর্চা অবশ্যই সব দেশের সংস্কৃতিতে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। সেটা পুরো সংস্কৃতির একটি অংশ মাত্র। তাই শুধু শিল্প ও সাহিত্যকে সংস্কৃতি বলা ঠিক হবে কি না, ভেবে দেখা দরকার।

আমাদের সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্রকে যদি একটি ইন্ডাস্ট্রি ধরে নিই, যা আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতিতে অবদান রাখে, তাহলে সেই ইডাস্ট্রির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী? এই ইন্ডাস্ট্রি জাতীয় জীবনে কী দিতে চায়? এই ইন্ডাস্ট্রির সৃজনশীলতাকে কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি সৃজনশীল মানুষদের কল্পনার দ্বার উদাম করে দেব? উপদেষ্টা আসলেই ঠিক বলেছেন—কোনো সরকারই সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। আমাদের উপদেষ্টা আরও একটা উচিত কথা বলেছেন, বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার প্রয়োজন আছে।

তবে আমাদের সরকার সংস্কৃতি বলতে যা বোঝে বা জনমানুষদের যা বোঝা, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা কী খাই, কী পরি, কী করি, যা করি তা আইন মেনে করি কি না, নাকি বিশৃঙ্খল পদ্ধতিতে করি—এসবই পরিশেষে এক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। একটি দেশ বা সমাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে অনেক বছর ধরে। আমাদের জন্য পঞ্চাশ বা পঁচাত্তর বছর কি কোনো এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট ছিল না? ইতিহাসের প্রবাহে সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য অনেক স্তম্ভ থাকে; আমাদেরও ছিল—১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪। আমরা কোন সংস্কৃতি গড়তে পেরেছি বা পারব?

আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলা যায় যে সংস্কৃতি একটি দেশ বা জনগোষ্ঠীর ব্র্যান্ডিং। ব্র্যান্ডিং কী? ধরুন আপনি একটা ক্যাফেতে গিয়ে এক কাপ কফি চাইলেন। কফি বানাতে কফির দানা, দুধ বা ক্রিম ও চিনি মিলিয়ে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কফির কাপটা আপনার সামনে এল। সেখান থেকে অদ্ভুত এক সুগন্ধ বেরোচ্ছে, যা আপনার মন জুড়িয়ে দিচ্ছে—সেটাই ব্র্যান্ডিং।

সংস্কৃতি হচ্ছে, সেই ব্র্যান্ডিং।

ইকরাম কবীর গল্পকার

ই–মেইল: [email protected].

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ন ত য ও চলচ চ ত র আম দ র স স ক ত এক স স ক ত দ র সরক র উপদ ষ ট চ ত রকল বল ছ ন র জন য আম র ক

এছাড়াও পড়ুন:

রাত্রিযাপনসহ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে সেন্ট মার্টিন

দীর্ঘ ১০ মাস পর আবারও পর্যটকদের জন্য রাত্রিযাপনসহ খুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। 

আগামীকাল সোমবার (১ ডিসেম্বর) থেকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট হয়ে দ্বীপমুখী জাহাজ চলাচল শুরু হবে। তবে পরিবেশ রক্ষায় সরকার ঘোষিত ১২ নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার শর্তে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি- এই দুই মাস প্রতিদিন দুই হাজার পর্যটকের রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের বুকে ৮ বর্গকিলোমিটারের এই অনন্য দ্বীপে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ ছিল। পরিবেশ প্রতিবেশ সংরক্ষণে গত বছর থেকে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালু করে সরকার। সেই নীতিমালার আওতায় এবারও নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সীমিত আকারে ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন দেশি–বিদেশি পর্যটকরা।

জাহাজ মালিক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘাতের কারণে ২০২৩ সাল থেকে টেকনাফের দমদমিয়া ঘাট দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরে ইনানীর নৌবাহিনীর জেটিঘাট হয়ে চলাচল শুরু হলেও গত বছর থেকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি থেকেই সেন্ট মার্টিনগামী জাহাজ পরিচালিত হচ্ছে।

সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর জানান, ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও রাতযাপনের অনুমতি না থাকায় পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যায়নি। ফলে জাহাজ চলাচল শুরু হয়নি। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে তারা আবারও যাত্রা শুরু করছেন। গত বছর এই দুই মাসে এক লাখের বেশি পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম জানান, এমভি কর্ণফুলি এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া, কেয়ারি সিন্দাবাদ ও কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন এই চারটি জাহাজকে সেন্ট মার্টিন-কক্সবাজার রুটে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মানতে হবে ১২ নির্দেশনা-
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপ ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

বিআইডব্লিউটিএ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান চলাচল করা যাবে না।
ট্যুরিস্টদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টাল থেকে অনলাইনে টিকিট কিউআর কোডসহ সংগ্রহ করতে হবে।
সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ বা বারবিকিউ পার্টি করা– নিষিদ্ধ।
কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ, প্রবাল, কাছিম, পাখি, রাজকাঁকড়া, শামুক–ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না।
সৈকতে মোটরসাইকেল, সি–বাইকসহ মোটরচালিত যেকোনো যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নেওয়া যাবে না; ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল বহনেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

এদিকে রাত্রিযাপনসহ পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত করে দেওয়ায় উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে ওই দ্বীপে। 
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘‘দীর্ঘ ১০ মাস পর আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছি। ১ ডিসেম্বর থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আমাদের সেন্ট মার্টিন আসবেন। তাদের বরণে প্রস্তুত রয়েছি আমরা।’’

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘‘রাত্রিযাপনের সুবিধাসহ পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত করায় এখনকার অর্থনীতি একটু ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছি। আমরা চাই শুধু দুই মাস নয়, অন্তত চার মাস পর্যটকদের জন্য রাত্রিযাপনসহ উন্মুক্ত করা হোক দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন।’’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় জারি করা সব নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন মাঠে থাকবে।

ঢাকা/তারেকুর/এস

সম্পর্কিত নিবন্ধ