ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং একবার বলেছিলেন, অধিকাংশ প্রদেশেই মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হিন্দুরা। মুসলমানদের মধ্য থেকে কেন বড় মাপের নেতা উঠে আসছেন না, তা ভেবে দেখা দরকার। উত্তর প্রদেশের উদাহরণ দিয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলেছিলেন, এই রাজ্যের মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা এখন মুলায়ম সিং যাদব। হেমবতীনন্দন বহুগুণা ও বীরবাহাদুর সিংকেও মুসলমানরা আঁকড়ে ধরেছিলেন। কারণ, তাঁরা দাঙ্গা হতে দিতেন না।

এখন দাবি, নরেন্দ্র মোদিই মুসলমান সমাজের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী। মুসলমানদের ভালোমন্দের ‘দায় ও দায়িত্ব’ নাকি তাঁরই। গাঁক গাঁক করে সেই প্রচার চলছে। নিরন্তর। যেমন তিন তালাক নিষিদ্ধ করে মোদিই মুসলমান নারীর মুক্তি ও কল্যাণের দরজা খুলে দিয়েছেন! পশ্চাৎপদ ‘পসমন্দা’ মুসলমানদের এগিয়ে আসতে সাহায্য করছেন! ওয়াক্‌ফ আইনও সংশোধন করা হয়েছে গরিব ও সাধারণ মুসলমানদের হিতে! ওয়াক্‌ফর অধীন বিপুল ভূসম্পত্তি ঠিকভাবে কাজে লাগালে বছরে কম করে হলেও ১২ হাজার কোটি রুপি আদায় হবে, যা গরিব মুসলমানদের কল্যাণে খরচ হতে পারে। ২০ বছর আগে সাচার কমিটির রিপোর্ট এই হিসাব দিয়েছিল। সরকারের দাবি, ওই টাকায় মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভাবনা একমাত্র মোদিই ভাবলেন।

অর্থাৎ মোদিই ভারতীয় মুসলমানদের মসিহা। সংসদের দুই কক্ষে ওয়াক্ফ বিল পাস করার সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে এই ন্যারেটিভই খাড়া করা হয়েছে।

অথচ দেশের মুসলমান সমাজ ও বিরোধী মহল এই সরকারি তত্ত্ব বিলকুল খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র যুক্তিতে চলে না। চলে গরিষ্ঠের মতে। শাসককুল সেই জোরেই সংসদে বিল-বৈতরণি পেরিয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা বহুবিভক্ত বিরোধীদের জোটবদ্ধ করে দিয়েছে। ছন্নছাড়া ‘ইন্ডিয়া’ জোট পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেছে ওয়াক্‌ফ বিলকে কেন্দ্র করে। হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কত দিন জোটবদ্ধ থাকবে, তা অবশ্য পরের কথা।

জোটবদ্ধতার ছবি বিল নিয়ে ভোটাভুটির সময় যেমন ছিল, বিল পাস হওয়ার পরও তেমনই রয়েছে। একে একে সবাই দ্বারস্থ হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের। কংগ্রেসের মহম্মদ জাভেদ ও এআইএমআইএমের আসাউদ্দিন ওয়েইসি আলাদাভাবে মামলা করেছেন। দুজনেই বিল নিয়ে গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটির (জেপিসি) সদস্য ছিলেন। মামলা করেছেন আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা আমানুল্লা খানও। মামলা আরও হবে; যদিও কবে এই বিতর্কের আইনি অবসান ঘটবে, বিচারপতিরাই তা জানেন। 

এতকাল ওয়াক্‌ফ-সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী ছিল মুসলমান সমাজ। সেই অধিকারে ভাগ বসানোর কাজটা নতুন আইন করে দিয়েছে স্রেফ গরিষ্ঠতার জোরে। তা করতে গিয়ে লঙ্ঘিত হয়েছে মুসলমানদের জন্য সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই দাবি বিল নিয়ে আলোচনার সময় জেপিসিতেও বিরোধীরা তুলেছিলেন। কিন্তু যে কমিটির চেয়ারম্যান বিজেপির, ৩১ জন সদস্যের মধ্যে ২০ জন শাসক দলের, সেখানে বিরোধী মত গুরুত্ব পাবে, তা-ও এই জমানায়, ভাবাই বাতুলতা। বিরোধীরা বিলে ৪৪টি সংশোধনী জমা দিয়েছিলেন। একটাও গ্রাহ্য হয়নি। সরকারপক্ষ থেকে জমা পড়েছিল ২৬টি। ১৪টি সংশোধনী গৃহীত হয় এবং দুই কক্ষে বিলটি পাস হয়। 

নতুন হুজুগ ‘ইউপিএসসি জিহাদ’! মুসলমানরা নাকি শিক্ষিত ও সংগঠিত হচ্ছেন আমলাশাহির দখল নিতে! ভারতের একমাত্র মুসলমানপ্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের চরিত্র বদল ও দ্বিখণ্ডীকরণের কারণও হিন্দু আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। নতুন ওয়াক্‌ফ আইন এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী টোটাল কন্ট্রোলেরই আরেক অধ্যায়। 

প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মতো দৃঢ়তা বর্তমান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দেখাবেন, সেই বৃথা আশা বিরোধীরা করেননি। বিনা বাক্যেই রাষ্ট্রপতি সই করেছেন ‘ইউনিফায়েড ওয়াক্‌ফ ম্যানেজমেন্ট, এমপাওয়ারমেন্ট, এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিল’-এ। এখন তা আইন। 

কিন্তু তা করতে গিয়ে লঙ্ঘিত হলো সংবিধানের ১৪তম অনুচ্ছেদ, যা সমতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ২৫তম অনুচ্ছেদ দিয়েছে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা। ২৬তম অনুচ্ছেদ ধর্মীয় বিষয় পরিচালনার স্বাধীনতা দিয়েছে। ২৯তম অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩০তম অনুচ্ছেদ দিয়েছে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তির অধিকার। প্রতিটিই লঙ্ঘিত হলো।

এই মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২৬তম অনুচ্ছেদ, যা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও দাতব্য বিষয়ে সংস্থা গড়া ও তার ব্যবস্থাপনার অধিকার দিয়েছে। সেই সংস্থা বা সংগঠনের জন্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনা বা গ্রহণের অধিকারও দেওয়া হয়েছে। আর দেওয়া হয়েছে তা পরিচালনার দায়িত্ব। এই আইন মুসলমানদের এতগুলো মৌলিক অধিকার হরণ করলেও সরকার দ্বিধাহীন চিত্তে এগিয়ে গেছে থোড়াই কেয়ার করে। 

ফলে ফুটে উঠেছে বৈষম্য। শুধু মৌলিক অধিকার হরণ নয়, এই আইন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে ওয়াক্‌ফ কাউন্সিল ও বোর্ড গঠনের সময় ভিন্ন ধর্মের এমপি, বিচারপতি ও বিশিষ্টজনদের অন্তর্ভুক্ত করার অধিকারও সরকারকে দিয়েছে। এই অধিকার অন্য কোনো ধর্মীয় সংস্থায় নেই। হিন্দুদের ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অহিন্দুদের কোনো ভূমিকাই নেই। খ্রিষ্টান, শিখ বা বৌদ্ধধর্মেও ভিনধর্মীদের ভূমিকা নেই। 

এই বিতর্ক চলাকালে অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু এমন প্রস্তাবও দিয়েছেন, তিরুপতি দেবস্থানের পরিচালনায় কোনো অহিন্দুকে চাকরি দেওয়া উচিত নয়। ব্যতিক্রম শুধু মুসলমানদের ওয়াক্‌ফ বোর্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে। যদিও সরকারের দাবি, এটা নাকি ধর্ম পরিচালনায় হস্তক্ষেপ নয়। 

সরকার কেন ওয়াক্‌ফ দখলে এতটা উন্মুখ? প্রশ্নটির উত্তর রয়েছে সারা দেশে ওয়াক্‌ফর অধীন থাকা সম্পত্তির বহরে। রেল ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর ভারতে সবচেয়ে বেশি স্থাবর সম্পত্তির মালিক ওয়াক্‌ফ বোর্ড। আনুমানিক ৯ লাখ ৪০ হাজার একর জায়গাজুড়ে ৮ লাখ ৭০ হাজার সম্পত্তি রয়েছে তাদের হাতে। অভিযোগ, বিজেপি সরকার এই বিপুল সম্পত্তির দখল ও পরিচালন ভার হাতে নিতে উৎসুক। তাই বোর্ডে অমুসলিমদের রাখা হয়েছে। দান করা সম্পত্তির চরিত্র নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা শাসককে। কে মুসলমান, কে নন, তা নির্ধারণের মানদণ্ডও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে এই আইনে। বলা হয়েছে, মুসলমান তিনিই, যিনি ৫ বছর ইসলাম পালন করছেন। ওয়াক্‌ফে দানের অধিকার থাকবে তাঁরই। 

বিজেপির দাবি, এই আইন মুসলমান নারীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। কাউন্সিল ও বোর্ডে মুসলমানদের মধ্যে দুজন নারী সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক। বলা হয়েছে, ওয়াক্‌ফে দান করার আগে সম্পত্তিতে বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী ও অনাথদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতার স্বার্থে ওয়াক্‌ফে দান করার ছয় মাসের মধ্যে সম্পত্তির বিবরণ কেন্দ্রীয় পোর্টালে নথিভুক্ত করতে হবে।

যেভাবে ওয়াক্‌ফে সরকারের কর্তৃত্ব কায়েম হয়েছে, সেভাবে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগেও সরকার অংশীদার হতে আগ্রহী। সুপ্রিম কোর্টের আপত্তিতে এখনো সফল হয়নি। পাল্টা আঘাতে নির্বাচন কমিশনারদের নিযুক্তি কমিটি থেকে সরকার সরিয়ে দিয়েছে প্রধান বিচারপতিকে। কেন্দ্রশাসিত রাজ্যের উপরাজ্যপালের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়েও বেশি। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং আতিশি মারলেনাকে প্রতি পদে বাধা দিয়েছেন অনির্বাচিত উপরাজ্যপাল। তেমনই সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরেও। কংগ্রেসের এক নেতার কথায়, মোদির বিজেপিতে ইকুইটির কোনো ভাগ নেই। তারা শতভাগ ইকুইটির দাবিদার। টোটাল কন্ট্রোলে বিশ্বাসী। 

সেই কন্ট্রোল পেতে মুসলমান সমাজকে বশ করা জরুরি। প্রয়োজনে ভয় দেখিয়েও। জীবন ও সম্পত্তিহানির ভয় দেখাচ্ছে বুলডোজার নীতি। ধর্মস্থান আইনের তোয়াক্কা না করে দাবি উঠছে মসজিদ খোঁড়ার। এনআরসি, সিএএ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির একমাত্র লক্ষ্য মুসলমানদের কোণঠাসা করা। ‘লাভ জিহাদের’ মোকাবিলা করছে নীতি পুলিশ। আসাম ও ঝাড়খন্ডে জিগির উঠেছে ‘ল্যান্ড জিহাদের’। মুসলমানরা নাকি জবরদস্তি করে হিন্দুদের জমি লিখিয়ে নিচ্ছেন। 

নতুন হুজুগ ‘ইউপিএসসি জিহাদ’! মুসলমানরা নাকি শিক্ষিত ও সংগঠিত হচ্ছেন আমলাশাহির দখল নিতে! ভারতের একমাত্র মুসলমানপ্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের চরিত্র বদল ও দ্বিখণ্ডীকরণের কারণও হিন্দু আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। নতুন ওয়াক্‌ফ আইন এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী টোটাল কন্ট্রোলেরই আরেক অধ্যায়। 

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: র ম সলম ন অন চ ছ দ একম ত র ব চ রপত ও সরক র র সময়

এছাড়াও পড়ুন:

ছয় কোটি শ্রমিক রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে

দেশের মোট শ্রমিকের ৮৪ দশমিক ১ শতাংশের কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না রাষ্ট্র । শ্রমিক হিসেবে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। কোনো রকম আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নেই। কর্মস্থলের পরিচয়পত্র নেই। কাজের ক্ষেত্রে অন্যায়ের শিকার হলে তাদের শ্রম আদালতে মামলা করার সুযোগও নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী,  অপ্রাতিষ্ঠানিক এই শ্রমিকের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার।

বিশালসংখ্যক শ্রমিকের প্রতি রাষ্ট্রের এ রকম অবহেলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে গত ২১ এপ্রিল পেশ করা কমিশনের ২৫ সুপারিশের মধ্যে প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা ও স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। 

দেশের শ্রম খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং শ্রমিকের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিশনপ্রধান ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। জানতে চাইলে গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমরা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছি। শ্রম আইনে অন্য সব শ্রমিকের মতো একই অধিকার এবং সুযোগসুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছি। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় তাদের জন্য ভাতার কথা বলেছি। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের জন্য এ সুবিধার সুপারিশ করা হয়নি। কারণ, তারা চাকরি শেষে কমবেশি কিছু আর্থিক সুবিধা পান।’ 

কমিশনের এ সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে নিয়মিত নজরদারি রাখার কথাও জানান তিনি। 

এ বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার মহান শ্রমিক দিবস পালন করা হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটি থাকবে। এ দিনও কাজ করতে হবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দিবসটি পালনের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘শ্রমিক মালিক এক হয়ে, গড়ব এ দেশ নতুন করে’। 

বিবিএসের গত নভেম্বরে প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১২ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার। তাদের মধ্যে শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার। মোট শ্রমশক্তির ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। 

দেশে শ্রমশক্তি বলতে ১৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের মধ্যে যারা কর্মে নিয়োজিত এবং বেকার জনগোষ্ঠীর সমষ্টিকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা–আইএলওর মানদণ্ড অনুযায়ী, যারা সাত দিনে কমপক্ষে ১ ঘণ্টার বেতন, মজুরি বা মুনাফার বিনিময় অথবা পরিবারের নিজস্ব ভোগের জন্য পণ্য উৎপাদনের কাজ করেছেন জরিপে তাদের কর্মে নিয়োজিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আবার যারা কর্মক্ষম কিন্তু কোনো কাজে নিয়োজিত নন, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ খুঁজে বেড়ান এবং ওই সময়ে কাজের সুযোগ পেলে সে কাজ করতে প্রস্তুত তাদের বেকার বলা হয়েছে। এ হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখ ৬০ হাজার। 

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক কারা 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা–আইএলওর আন্তর্জাতিক শ্রম পরিসংখ্যানবিদের সম্মেলন ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব লেবার স্ট্যাটিসিয়ান্স–আইসিএলসির সংজ্ঞা অনুযায়ী, বেসরকারি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা খানামালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যেগুলোর আইনি সত্তা নেই, পরিপূর্ণ হিসাব নেই, উৎপাদনের হিসাব দিতে হয় না এবং বেসরকারি ও অনিবন্ধিত–এরকম খাতকে অনানুষ্ঠানিক খাত এবং এ খাতের শ্রমিকদের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক বলা হয়। 

মূলত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক বেশি। কৃষিতে ৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক। শিল্প খাতে ৮২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বড় অংশই গ্রামে থাকেন। 

বিবিএস বলছে, গ্রামের মোট শ্রমিকের ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সংখ্যায় তারা ৪ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার। শহরের শ্রমিকদের এ হার কিছুটা কম। ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সংখ্যায় এক কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার। নারী শ্রমিকদের ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে থাকেন।

শ্রম আইনে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ কমিশনের 

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহশ্রমিক, অভিবাসী, স্বনিয়োজিত শ্রমিকসহ সব শ্রমিকের জন্য শ্রম আইনে সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে শ্রমিকদের কাজের স্বীকৃতি, পরিচয়পত্র, নিরবচ্ছিন্ন কাজ এবং আয়ের নিশ্চয়তা, মর্যাদাকর শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, এসব শ্রমিকের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সব অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলাদা অফিস অথবা ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সব ধরনের তথ্য নিয়ে তথ্যভান্ডার করা, পরিচয়পত্র দেওয়া এবং অবসর ভাতা চালুসহ বেশ কিছু সুপারিশ করে কমিশন। 

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রবীণ শ্রমিকদের জন্য অসরকালীন ভাতার সুপারিশ 

রাষ্ট্রের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের আওতায় বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা। অবসরের পরও কিছু সুবিধা পান তারা। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সারা জীবন খাটুনির পর প্রবীণ বয়সে আরও কষ্টে থাকেন। কারণ সামান্যতম কোনো সুবিধা পান না তারা। এ বিবেচনা থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য অসরকালীন ভাতা বা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে কমিশন। তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণের কথা বলা হয় এতে। দরিদ্র বেকার শ্রমিকদের বয়স্কভাতা এবং তাদের প্রতিদিনের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও অন্যান্য চাহিদা বিবেচনায় বয়স্কভাতার পরিমাণ নির্ধারণের কথা বলেছে কমিশন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের পেশা ও খাত অনুযায়ী সংগঠিত হওয়া, প্রতিনিধিত্ব করা ও নিয়োগকারী, তাদের সমিতি করার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয় কমিশনের সুপারিশে। 

প্রাতিষ্ঠানিকের ৫৫ খাতেও ন্যূনতম মজুরি নেই 

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। এখনও অনেক শিল্প খাতকে ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর আওতায় আনা হয়নি। মালিকপক্ষ যা দেয়, তা মেনে নিয়ে কাজ করেন শ্রমিকরা। এরকম অন্তত ৫৫টি খাতে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়নি। 

শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের স্বীকৃত শিল্প আছে ১০২টি। 

টাইপ ফাউন্ড্রি শিল্পের মজুরি বোর্ড হয় সর্বশেষ ১৯৮৩ সালে। অর্থাৎ, গত তিন যুগ ধরে একই মজুরি চলছে এ খাতে। জানতে চাইলে সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা ইসলাম গতকাল সমকালকে বলেন, ন্যূনতম মজুরি কাঠামোতে বর্তমানে ৪৭টি শিল্প রয়েছে। নতুন করে দুটি শিল্পকে ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনা হবে। আরও ২০ শিল্পকে এর আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি জানান, পেট্রোল পাম্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনঃনির্ধারণে বোর্ড গঠন হয়েছে। মালিক পক্ষ এ-সংক্রান্ত সভায় আসছে না। এ অবস্থায় করণীয় জানতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ চেয়েছে মজুরি বোর্ড। 

টাইপ ফাউন্ড্রি শিল্পে তিন যুগ ধরে একই মজুরির বিষয়ে জানতে চাইলে রাইসা ইসলাম বলেন, টাইপ ফাউন্ড্রি শিল্পের আর অস্তিত্ব নেই। খাতটি হয়তো বিলুপ্ত ঘোষণা করা হবে। 

সম্পর্কিত নিবন্ধ