উজবেকিস্তানে জন্মানো রুশভাষী ইসরায়েলি লেখক দিনা রুবিনা রাশিয়া সরকারের বিরোধী গ্রুপগুলোর পরিচালনা করা চ্যানেল রেইন টিভিকে গত জুলাইয়ে একটি সাক্ষাৎকার দেন।

ওই সাক্ষাৎকার রুশভাষী বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে রুবিনা বলেন, গাজায় কোনো ‘শান্তিপ্রিয় বাসিন্দা’ নেই। তিনি বলেন, ‘গাজাকে সাফ করে পার্কিং লটে পরিণত করার’ অধিকার ইসরায়েলের আছে’। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের ‘হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলতে হবে।’

রাশিয়া থেকে পালিয়ে নির্বাসিত জীবন বেছে নেওয়া সাংবাদিক ও অনুষ্ঠান প্রযোজক মিখাইল কোজিরেভ রুবিনার সাক্ষাৎকারটি নেন।

কোজিরেভ রুবিনার বক্তব্যের অংশগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এটিকে ‘সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে জটিল অংশ’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি যদিও রুবিনার ‘গাজায় কোনো শান্তিপ্রিয় বাসিন্দা নেই’ দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং এটিকে তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধে রুশদের সম্মিলিত দায়ের সঙ্গে তুলনাও করেছিলেন; কিন্তু তিনি রুবিনার দাবিকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করেননি।

সাক্ষাৎকারের পুরো সময়জুড়ে কোজিরেভ স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের পক্ষেই ছিলেন।

আরও পড়ুনরাশিয়া-ইসরায়েল তিক্ত সম্পর্ক দুর্ভোগ ডেকে আনবে মধ্যপ্রাচ্যে০১ সেপ্টেম্বর ২০২২

যদিও অনেক রুশভাষী ব্যক্তি রুবিনার বক্তব্যে নিন্দা জানিয়েছেন। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় তাঁর বইয়ের আলোচনা সভা বাতিল করা হয়েছে। তবে রাশিয়ার রাজনৈতিক নির্বাসিতদের মধ্যে অনেকেই তাঁকে সমর্থন করেছেন।

এটি নতুন কিছু না। রাশিয়ার উদারবাদী বিরোধীরা (যাঁরা এখন প্রধানত নির্বাসনে বসে পুতিনবিরোধী কার্যক্রম চালান) সাধারণভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করেন।

রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদকে তাঁরা যে সমর্থন দিয়ে এসেছেন এবং শ্বেতাঙ্গ পশ্চিমা বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বকে তাঁরা যে স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছেন, তারই স্বাভাবিক ফল হলো তাঁদের এই ফিলিস্তিনবিরোধী অবস্থান।

রাশিয়ার বিরোধীদের তীব্র ফিলিস্তিনবিরোধিতার উদাহরণ প্রচুর আছে। নির্বাসিত অবস্থায় থাকা বিশিষ্ট কলাম লেখক ইউলিয়া লাতিনিনা ফিলিস্তিনিদের ‘বর্বরদের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনিরা ‘বিকশিত সভ্যতাকে ধ্বংস করছে’।

গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের তিনি ‘অকর্মা ও মূর্খ’ বলেছেন।
অধুনালুপ্ত ‘গণতন্ত্রপন্থী’ সংগঠন ওপেন রাশিয়ার সাবেক পরিচালক আন্দ্রে পিভোভারভ গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘একদম ঠিক আছে’ বলে রায় দিয়েছেন।

তিনি রাশিয়ায় কারাগারে ছিলেন এবং গত বছর পশ্চিমের সঙ্গে বন্দিবিনিময়ের সুবাদে তিনি মুক্তি পান।

দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে দিনা রুবিনা বলেন, গাজায় কোনো ‘শান্তিপ্রিয় বাসিন্দা’ নেই। তিনি বলেন, ‘গাজাকে সাফ করে পার্কিং লটে পরিণত করার’ অধিকার ইসরায়েলের আছে’।.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ইসর য় ল র ত নব র ধ

এছাড়াও পড়ুন:

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের গৃহঋণ পরিশোধে অযাচিত চাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন মফিজ উদ্দীন আহমেদ। তিনি রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের মে মাসে ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। কিন্তু ব্যাংকের এককালীন ঋণ পরিশোধের অযাচিত চাপ, হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ ও নিয়মবহির্ভূত আচরণের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন বলে জানান এই অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।

বিষয়টি রূপালী ব্যাংক থেকে শুরু হয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ হয়ে অর্থ বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের গৃহঋণ গ্রহণপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রণীত গৃহনির্মাণ নীতিমালা অনুযায়ী, মফিজ উদ্দীন আহমেদের ২০ বছরে মোট ২৪১ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের কথা। ঋণ নেওয়ার পর নিজস্ব অর্থ যোগ করে তিনি ঢাকায় দেড় কোটি টাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে কিস্তি পরিশোধ করে আসছেন।

এক বছরের অবসর-উত্তর ছুটি শেষে এ বছরের ১ জুলাই তিনি অবসরে যান। কিন্তু দুই মাসের মাথায়ই গত ৩ সেপ্টেম্বর রূপালী ব্যাংকের করপোরেট শাখা তাঁকে উপস্থিত হতে বলে। সেখানে গিয়ে তিনি যে চিঠি পান, তাতে বলা হয়, ৪৭ লাখ টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে, বাকি টাকা কিস্তিতে দেওয়া যাবে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী হিসেবে গ্রাহক হিসেবে এই চাপকে মফিজ উদ্দীনের কাছে অবোধ্যই মনে হয়।

মফিজ উদ্দীন আহমেদ বিস্মিত হয়ে বিষয়টি লিখিতভাবে অর্থ বিভাগকে জানান। অভিযোগ পর্যালোচনা করে স্পষ্ট হয়, রূপালী ব্যাংকের এ পদক্ষেপ সরকারি কর্মচারীদের জন্য গৃহনির্মাণ ঋণ নীতিমালা ২০১৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নীতিমালায় উল্লেখ আছে, অবসরের পর কিস্তি বকেয়া থাকলে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক বজায় রেখে পুনঃ তফসিল করা যাবে, কিন্তু এককালীন টাকা আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।

পরিস্থিতি জটিল হয় গত ২৬ অক্টোবর। নিজের বাসার কাছে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে নিজের জমা টাকার অর্ধেক তুলতে গেলে চেক ডিজঅনার, মানে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তাঁকে ওই শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক জানান, ‘ওপরের নির্দেশে’ হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অথচ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার সুযোগ নেই—এটি নিয়মবহির্ভূত পদক্ষেপ।

মফিজ উদ্দীন আহমেদ জানান, পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী একজন গ্রাহককে কেন এমন অযাচিত চাপ দেওয়া হলো?

অর্থ বিভাগকে মফিজ উদ্দীন আহমেদ জানান, যেখানে সাধারণ ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশের ওপরে ওঠায় অনেক বেসরকারি ব্যাংক ভালো গ্রাহকের পেছনে ছুটছে, সেখানে ৫০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা রূপালী ব্যাংক কেন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী গ্রাহককে তাড়িয়ে দিতে চাইছে, তা তাঁর কাছে বোধগম্য নয়। তাঁর ভাষায়, ঘটনাটি রূপালী ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপেশাদারত্ব ও অদক্ষতার প্রতিফলন।

এদিকে মফিজ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থ বিভাগ ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। রূপালী ব্যাংকও দুঃখ প্রকাশ করেছে। এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না।’

অন্য ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু রূপালীই নয়, সরকারি কর্মচারীদের গৃহঋণ কার্যক্রমে যুক্ত অনেক ব্যাংকের বিরুদ্ধেই গ্রাহকেরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ তুলছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা।

গৃহঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, যেখানে সরকার ভর্তুকি দেয় ৫ শতাংশ; গ্রাহক বহন করেন মাত্র ৪ শতাংশ। কিন্তু অন্যান্য সাধারণ ঋণে সুদের হার বাড়ায় ব্যাংকগুলো এখন গৃহঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ফলে নানা রকম অজুহাত তুলে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের পদক্ষেপ

১১ নভেম্বর অর্থ বিভাগ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহনির্মাণ ঋণ কার্যক্রমে যুক্ত রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি খাতের ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের চিঠি পাঠিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি), ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক ও ডিবিএইচ ফাইন্যান্স।

চিঠিতে বলা হয়, গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া ঋণ পুনঃ তফসিল করা যাবে না। অবসরের পর কিস্তি বকেয়া থাকলে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান করতে হবে। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করতে হবে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঋণগ্রহীতাদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি দলিলমূলে বন্ধক থাকে, ফলে এ ঋণ সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই সরকারি কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ার পর তাঁদের ওপর ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আংশিক বা সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা অনভিপ্রেত।

জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের এমডি ওয়াহিদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা এহতেশামুজ্জামান জানান, এমডি তাঁকে বলতে বলেছেন যে ঘটনাটি ‘মিটমাট হয়ে গেছে’।

কত সরকারি কর্মচারী গৃহঋণ পেয়েছেন

‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান নীতিমালা-২০১৮’ প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই। এতে সর্বোচ্চ ঋণসীমা ৭৫ লাখ এবং সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নীতিমালাটি অবশ্য পরে কয়েক দফা সংশোধনও করা হয়।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ১৯৪ জনের নামে ঋণ মঞ্জুর হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ১৬৪ জন সাময়িক এবং ৪ হাজার ৩০ জন চূড়ান্ত মঞ্জুরি পেয়েছেন। চূড়ান্ত মঞ্জুরি পাওয়া ব্যক্তিরাই ভর্তুকি পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত কোষাগার থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ১৮৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ