ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি ছাড়া প্রতিটিতেই বিএনপির প্রার্থী নিয়ে একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ঘোষিত চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। দুটি আসন যুগপৎ আন্দোলনের দুই শরিক দলকে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা রয়েছে রাজনীতির মাঠে। অন্যদিকে আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারে আছে জামায়াতে ইসলামী।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও সদরসহ কয়েকটি আসনে দলটির নেতারা তৎপর আছেন। এককভাবে প্রতিটি আসনে প্রচারণা চালাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তিনটিতে এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিসহ দুজন দুটি আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে একসময় আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল। ৫ আগস্টের পর দলটির নেতা-কর্মীদের অধিকাংশই আত্মগোপনে। একইভাবে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে। জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক নাসির আহমেদ খান বলেন, নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস পেলে প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর)

এই আসনটিতে আগে জিততে পারেনি বিএনপি। ১৯৭০ সালের পর আওয়ামী লীগ আটবার, জাপা দুবার, ন্যাপ একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুবার জয়ী হয়েছেন। এবার নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো.

আবদুল হান্নানকে মনোনয়ন দিয়েছে দল।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, মনোনয়ন না পেয়ে অনেকে অনেক কিছু বলতে পারেন। এতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। দিন শেষে তারেক রহমানের ডাকে সবাই মূলস্রোতে ফিরে আসবেন।

বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নিয়মিত সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি করছেন জামায়াতের প্রার্থী এ কে এম আমিনুল ইসলাম। তিনি উপজেলা জামায়াতের আমির। ভোটের মাঠে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের উপজেলা সভাপতি মাওলানা হুসাইন আহমেদ আলী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাইদুল্লা বিন আনসারী মাঠে আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ)

এই আসনে বিএনপি ছয়বার, জাপা তিনবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার জয়ী হয়েছেন। এখানে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। আসনটি শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যেও কোন্দল চাঙা। এখানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলার আমির মোবারক হোসেনকে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে সক্রিয় সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা। এ ছাড়া জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শেখ মো. শামীম, জেলা বিএনপির সদস্য আহসান উদ্দিন খান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব এস এন তরুণ দে, সরাইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিসুল ইসলাম ঠাকুর, সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লস্কর, আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান সিরাজ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী।

গত শনিবার আশুগঞ্জে শাহজাহান সিরাজকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তাঁর সমর্থকেরা।

বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আনিসুল ইসলাম ঠাকুর বলেন, ‘এই আসন বিএনপির ঘাঁটি। আমরা চাই, দল থেকে ধানের শীষ প্রতীকের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হোক।’

এখানে জোটের প্রার্থী হিসেবে হেফাজতে ইসলামের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব জুনাইদ আল হাবিবকে মনোনয়ন দেওয়ার আলোচনা আছে।

আসনটিতে দীর্ঘদিন ধরে গণসংযোগ করছেন জামায়াত নেতা মোবারক হোসেন আকন্দ। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের আশুগঞ্জ উপজেলার সহসভাপতি নেছার আহমদ আন-নাছিরী, বাংলাদেশ খেলাফত মসজিসের মাওলানা মনিরুল ইসলাম খন্দকার, সিপিবির সরাইল উপজেলা সভাপতি দেবদাস সিংহ রায় ও এনপিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ মাহদী প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনায আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর)

১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আসনটিতে বিএনপি জয় পেয়েছিল। এবার কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুবকে (শ্যামল) মনোনয়ন দিয়েছে দল। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ নেই।

খালেদ হোসেন মাহবুব বলেন, ‘সর্বত্রই এখন ভোটের আমেজ। জনগণ বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব আসনে বিএনপি জয়ী হবে।’

জামায়াতে ইসলামী এখানে দলের জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি মো. জোনায়েদ হাসানকে প্রার্থী করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। মাঠে দৌড়ঝাঁপ করছি। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে।’

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা গাজী নিয়ামুল করিম, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কুমিল্লা বিভাগের সমন্বয়ক মো. আতাউল্লাহ এবং জেলার সমন্বয়ক আজিজুর রহমান আলোচনায় আছেন। মো. আতাউল্লাহ বলেন, জেলার প্রতিটি আসন থেকে এনসিপির চার থেকে পাঁচজন দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। দ্রুত মনোনয়ন চূড়ান্ত করে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা ও আখাউড়া)

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মুশফিকুর রহমানকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়ার পর দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী আবদুর রহমানের (সানি) বড় ভাই ও জেলা বিএনপির সদস্য কবির আহমেদকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি উঠতেই পারে। তবে আমার মনে হয় না এতে কিছু হবে।’

আসনটিতে জামায়াত ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারকে প্রার্থী করেছে। আতাউর রহমান বলেন, ‘২ জুন থেকে প্রচারণা শুরু করেছি। পরিবর্তনের হাওয়া এখানে পড়েছে। জনগণ নতুন নেতৃত্ব চাচ্ছে।’

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলা শাখার উপদেষ্টা মুফতি জসিম উদ্দিন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা কাজী মইনুদ্দীন তৎপর আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর)

নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবদুল মান্নানকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এতে দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা অসন্তুষ্ট। তাঁরা জেলা বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক কাজী নামজুল হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে নানা কর্মসূচি করছেন। কাজী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘দিন শেষে যত কিছুই হোক, ধানের শীষকে জয়ী করার চেষ্টা করতে হবে। দল এখানে প্রার্থী পুনর্বিবেচনা করে এমন একজনকে মনোনয়ন দেবে, যিনি আসনটি তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারবেন।’

আবদুল মান্নান বলেন, ‘মান-অভিমান তো থাকতেই পারে। মনোনয়ন পাওয়ার পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী সবার সঙ্গে দেখা করেছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

আসনটিতে আইনজীবী আবদুল বাতেনকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। এ ছাড়া এনসিপির জেলার সংগঠক এ বি এম কবির আলম, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা আবদুল কাইয়ুম ফারুকী, সিপিবির উপজেলা সাধারণ সম্পাদক শাহিন খান ও গণসংহতি আন্দোলনের নাহিদা সাহান মাঠে আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর)

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এই আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। জোট হলে আসনটি সাকিকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

গুঞ্জন থাকায় স্থানীয় বিএনপিতে কিছু অসন্তোষ আছে। এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ খালেক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী হাসান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিক সিকদার ও জিয়াউদ্দিন, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাইদুর রহমান উল্লেখযোগ্য।

এম এ খালেক বলেন, ‘জোট থেকে প্রার্থী দিলে কতটুকু সাফল্য পাবে, জানি না। দল এমন সিদ্ধান্ত নিলে মেনে নিতে হবে।’

এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দেওয়ান নকিবুল হুদা, ইসলামী আন্দোলনের উপজেলার সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা আবদুল মজিদ, সিপিবির জেলার সাবেক সভাপতি সৈয়দ মো. জামাল ও এনসিপির উপজেলার প্রধান সমন্বয়ক মো. মাইন উদ্দিন প্রার্থী হবেন বলে আলোচনা আছে।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ছ ন ব র হ মণব ড় য় ব এনপ র স র উপদ ষ ট সমন বয়ক অসন ত ষ র সদস য র উপজ ল ল ইসল ম এনস প র র রহম ন আসনট ত এই আসন কম ট র উদ দ ন ন বল ন আবদ ল

এছাড়াও পড়ুন:

বিএনপির মনোনীত নেতারা প্রচারে, পিছিয়ে নেই জামায়াত

সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রথমে তিনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল বিএনপি। সম্প্রতি বাকি দুটি আসনেও প্রার্থী ঘোষণা করায় জমে উঠেছে জেলার নির্বাচনী রাজনীতি। এর মধ্যে তিনটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। প্রতিদিনই নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীদের গণসংযোগের পাশাপাশি দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ করছেন।

এদিকে জেলার পাঁচটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। মাঠের প্রচারে বেশি জোর দিচ্ছে দলটি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাঁচজন প্রার্থী ঘোষণা হলেও নির্বাচনী মাঠে তাঁদের তৎপরতা তুলনামূলক কম। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। ভোটের মাঠে তাদের তৎপরতা না থাকলেও তারা দল গোছানোর চেষ্টা করছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা সভাপতি মুফতি শহীদুল ইসলাম পলাশী প্রথম আলোকে বলেন, সুনামগঞ্জে সব আসনেই তাঁদের প্রার্থীরা তৎপর আছেন, প্রচার চালাচ্ছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ-১, সুনামগঞ্জ-৩ ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনে তাঁদের অবস্থা ভালো, অন্য দুটিতে কিছু দুর্বলতা আছে। তাঁরা সব কটিতে ভালো করার চেষ্টা করছেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে। জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যক্রম স্থবির। নেতা-কর্মীদেরও তেমন তৎপরতা নেই। তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে বলে দাবি জেলা জাপার সদস্যসচিব নাজমুল হুদার।

হাওর–অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চারটিতে এবং একটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারটিতে আওয়ামী লীগ এবং একটিতে জোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে একটিতে জাতীয় পার্টি এবং চারটিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব কটিতে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

তবে গত চারটি নির্বাচনে নানা কারণে আলোচনায় ছিল সুনামগঞ্জ-৪ আসনটি। এটি জেলার সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই আসন আর ছাড় দেয়নি আওয়ামী লীগ। জেলা সদরের আলোচিত এই আসনে এবার বিএনপি প্রার্থী করেছে দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য আইনজীবী নুরুল ইসলামকে।

সুনামগঞ্জে সব আসনেই প্রার্থীরা তৎপর আছেন, প্রচার চালাচ্ছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ-১, সুনামগঞ্জ-৩ ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনে তাঁদের অবস্থা ভালো, অন্য দুটিতে কিছু দুর্বলতা আছে। তাঁরা সব কটিতে ভালো করার চেষ্টা করছেন।মুফতি শহীদুল ইসলাম পলাশী, জেলা সভাপতি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর)

সুনামগঞ্জের আলোচিত এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিসুল হক। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছেন আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামরুজ্জামানের অনুসারীরা। প্রার্থী পরিবর্তন ও কামরুজ্জামানকে প্রার্থী করার দাবিতে প্রতিদিনই সংসদীয় আসনের কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ হচ্ছে। অন্যদিকে জোরেশোরে মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন আনিসুল হক। এখানে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুর রহমানও সক্রিয় আছেন।

বিএনপির প্রার্থী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দুর্দিনে নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলাম। কখনো মাঠ ছাড়িনি। আমাকে দল প্রার্থী করায় নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত।’ তবে কামরুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘোষিত প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা হতাশ। আশা করছেন দল মানুষের দাবি শুনতে পাবে।

বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আসনটিতে প্রচার চালাচ্ছেন জেলা জামায়াতের আমির তোফায়েল আহমদ খান। তিনি বলেন, ‘জনগণ সব দলকে দেখেছে। এবার তারা জামায়াতের মাধ্যমে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।’

এখানে ইসলামী আন্দোলনের ফখর উদ্দিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) চিত্তরঞ্জন তালুকদার নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা)

আসনটি প্রথমে ফাঁকা রেখেছিল বিএনপি। এখানে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাহির রায়হান চৌধুরী (পাভেল)। নাছির উদ্দিন চৌধুরী শারীরিক অসুস্থতার কারণে এত দিন মাঠে না থাকলেও সম্প্রতি দিরাই সদরে সমাবেশ করে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। ৪ ডিসেম্বর বিএনপি তাঁকে আসনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

চেষ্টা করছি মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার। হাওর এলাকা, অনেক সংকট। প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। মানুষের আগ্রহ আছে। এটি শেষ পর্যন্ত থাকলে আশা করি ভালো কিছু হবে। মোহাম্মদ শিশির মনির, সুনামগঞ্জ–২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী

এ আসনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মোহাম্মদ শিশির মনিরকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। তিনি মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন। শিশির মনির প্রথম আলোকে বলেন, ‘চেষ্টা করছি মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার। হাওর এলাকা, অনেক সংকট। প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। মানুষের আগ্রহ আছে। এটি শেষ পর্যন্ত থাকলে আশা করি ভালো কিছু হবে।’

আসনটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব শোয়াইব আহমদ। বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট হলে জমিয়তে উলামায়ে আসনটি চাইতে পারে বলে এলাকায় আলোচনা আছে। ইসলামী আন্দোলনের জেলা সেক্রেটারি সোহেল আহমদ, সিপিবির নিরঞ্জন দাস (খোকন) প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ)

বিএনপি এখানে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আসনটিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন এবং বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি সদস্য নাদীর আহমদ নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন। দুজনই দলীয় প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

নাদীর আহমদ বলেন, ‘আমি তো দীর্ঘদিন থেকে মাঠে। সবখানেই যাচ্ছি, মানুষের সাড়া পাচ্ছি।’ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছি। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও চান আমি নির্বাচন করি।’

জামায়াতের সিলেট মহানগর শাখার মজলিশে শুরা সদস্য মোহাম্মদ ইয়াসীন খানকে এখানে প্রার্থী করেছে দলটি। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীনুর পাশা চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি আবদুল হাই প্রার্থী হিসেবে মাঠে তৎপর আছেন।

সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর)

দ্বিতীয় ধাপে ৪ ডিসেম্বর এই আসনে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে। মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম। এ ছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চারবারের সাবেক চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবিদুল হক ও আবুল মনসুর মো. শওকত।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১৬ বছর হামলা-মামলা সহ্য করে নেতা-কর্মীদের আগলে রেখেছি। আমি কেন্দ্রের নির্দেশনায় মাঠে কাজ করছি।’

জামায়াত এখানে জেলার নায়েবে আমির মোহাম্মদ শামস্ উদদীনকে প্রার্থী করেছে। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সওগাত উছমানী চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি মুফতি শহীদুল ইসলাম পলাশী প্রার্থী হতে পারেন।

এনসিপির প্রার্থী হিসেবে জেলার আহ্বায়ক দেওয়ান সাজাউর রাজা চৌধুরীর (সুমন) নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও দল গোছানোর কাজ করছি।’

সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার)

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদকে (মিলন) প্রার্থী ঘোষণা করেছে দল। এখানেও প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবিতে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীর সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেছেন।

কলিম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি ২০১৮ সালে মনোনয়ন না পেয়ে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে দলের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে ছিলাম। এবার দল আমাকে প্রার্থী করেছে। ধানের শীষের পক্ষে এখানে সবাই ঐক্যবদ্ধ।’

জামায়াতের সিলেট মহানগর শাখার মজলিশে শুরা সদস্য আবদুস সালাম আল মাদানী এখানে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ২০০১ সালে ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে এখানে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান রেজাউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা পুরো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে আছি। ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকসহ নানা কর্মসূচি করেছি।’

ইসলামী আন্দোলন এখানে আলী আকবর সিদ্দিকীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বিএনপির মনোনীত নেতারা প্রচারে, পিছিয়ে নেই জামায়াত