চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বন্দরের সঙ্গে ডেনমার্কের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালসের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হবে আজ সোমবার। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এদিন সকালে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

একই দিন বিকেলে একই স্থানে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল নিয়েও চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর মেয়াদে পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএর হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হবে ৩৩ বছর মেয়াদি। এই মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকছে চুক্তিতে। এপিএম টার্মিনালস ডেনমার্কের মালিকানাধীন হলেও এটির নিবন্ধন নেদারল্যান্ডসে।

লালদিয়ার প্রকল্পে বাংলাদেশের পক্ষে মধ্যস্থতাকারী (ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার) বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) প্রতিবেদনে টার্মিনাল অপারেটরের (এপিএম টার্মিনালস) প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর চুক্তি পর্যন্ত কার্যক্রম শেষ করতে ৬২ দিন সময়সীমা ধরা হয়েছিল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক দ্রুততায় মাত্র দুই সপ্তাহে এই কার্যক্রম শেষ করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সে সময় তাড়াহুড়া ছিল না। স্বাভাবিক গতিতে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। তবে ৪ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার প্রস্তাব দাখিলের পরই অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেয় বন্দর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

লালদিয়া চুক্তি
৪ নভেম্বর: এপিএম টার্মিনালসের প্রস্তাব দাখিল।
৫ নভেম্বর: কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন।
৬ নভেম্বর: আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন।
৯ নভেম্বর: বন্দর ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে নেগোসিয়েশন। (৭–৮ নভেম্বর ছুটির দিনে নেগোসিয়েশন হয়েছে বলে অভিযোগ)
৯ নভেম্বর: বন্দর বোর্ড সভায় অনুমোদন।
১০–১১ নভেম্বর: নৌপরিবহন ও আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন।
১২ নভেম্বর: অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় অনুমোদনের সুপারিশ।
১৬ নভেম্বর: প্রধান উপদেষ্টার চূড়ান্ত অনুমোদন।
১৬ নভেম্বর: এপিএম টার্মিনালসকে লেটার অব অ্যাওয়ার্ড প্রদান
১৭ নভেম্বর: চুক্তির দিন।
পানগাঁও নৌ টার্মিনাল চুক্তি:
৬ নভেম্বর:
কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন জমা।
৯ নভেম্বর: আর্থিক মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন জমা।
১০ নভেম্বর: বন্দর থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
১৭ নভেম্বর: চুক্তির দিন।

বন্দরের বিষয়ে অভিজ্ঞ দুজন ব্যক্তি প্রথম আলোকে জানান, এই ধরনের চুক্তি খুব সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়। কারণ, চুক্তির কোনো শর্তের কারণে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত না হলে পরে তার খেসারত দিতে হতে পারে। যার বড় উদাহরণ রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার জিবুতিতে। সেখানে ২০০৪ সালে একটি টার্মিনাল নির্মাণে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জিবুতির যে চুক্তি হয়, তার শর্তগুলো ছিল অপারেটরের অর্থাৎ ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে। পরে জিবুতি সরকার চুক্তি বাতিল করলেও ডিপি ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত জিবুতি সরকারকে সুদসহ ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং স্বত্ব বাবদ আরও ১৪৮ মিলিয়ন ডলার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

যেভাবে অস্বাভাবিক দ্রুততায় চুক্তি

জানা গেছে, ৪ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালস কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। ৫ নভেম্বর প্রস্তাবের কারিগরি মূল্যায়ন করা হয়। আর ৬ নভেম্বর আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর ওই দিনই শুরু হয় দর–কষাকষি। বন্দর সূত্র জানায়, সরকারি ছুটির মধ্যে ৭ ও ৮ নভেম্বর শুক্র ও শনিবার দর–কষাকষি শেষ হয়। তবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ৯ নভেম্বর দর–কষাকষি শেষ হয়েছে।

একই দিন বন্দরের বোর্ড সভায় এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সভায় অনুমোদনের পর সারসংক্ষেপ একই দিন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরদিন তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আর ১২ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় এই প্রস্তাব তোলা হলে তা অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।

জানা গেছে, অর্থনৈতিক বিষয়–সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় অনুমোদনের সুপারিশে গতকাল রোববার চূড়ান্ত অনুমোদনে দেন প্রধান উপদেষ্টা। এরপর এপিএম টার্মিনালসের কাছে চুক্তির জন্য লেটার অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয় গতকালই। লেটার অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার পর চুক্তির জন্য সাধারণত দুই সপ্তাহ সময় থাকে। অথচ এ ক্ষেত্রে এক দিনের কম সময়ে চুক্তি হতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।

পানগাঁও চুক্তিও দ্রুত হচ্ছে

লালদিয়ার মতো পানগাঁও নৌ টার্মিনালের চুক্তিও দ্রুত সময়ে হচ্ছে। ৬ নভেম্বর পানগাঁও নৌ টার্মিনালের কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জমা দেয় এ–সংক্রান্ত কমিটি। এরপর ৯ নভেম্বর আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। পরদিন তা অনুমোদনের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গতকাল পর্যন্ত দরপত্রের অন্যান্য ধাপের প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। অর্থাৎ কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের এক থেকে দেড় সপ্তাহের মাথায় সব প্রক্রিয়া শেষ করে চুক্তি হচ্ছে।

এই টার্মিনাল পরিচালনার জন্য মেডলগ এসএ ১০৮ কোটি টাকার আর্থিক প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে দর-কষাকষিতে করে তা প্রায় ১২১ কোটি টাকায় চূড়ান্ত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ২০১৩ সালে ১৫৬ কোটি টাকায় এই টার্মিনাল গড়ে তোলে।

তাড়াহুড়ায় সন্দেহ

লালদিয়ার দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তির সব বিষয় প্রকাশ করার সুযোগ নেই। কারণ, এতে ‘নন–ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ অর্থাৎ গোপনীয়তা বজায় রাখার অংশ রয়েছে। চুক্তির কতটুকু প্রকাশ করা হবে আর কতটুকু প্রকাশ করা হবে না, তা জানা যাবে চুক্তির দিন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গোপনীয়তা ও তাড়াহুড়া করে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই চুক্তি জনগণের প্রতি গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া সরকারের চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলার মতো জরুরি বিষয় বাদ দিয়ে বন্দর নিয়ে সরকারের তাড়াহুড়া সন্দেহ তৈরি করে। এতে বোঝা যায়, বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা কমিশনভোগীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

অবশ্য চুক্তি নিয়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টা গত সপ্তাহে বন্দরে পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের ক্ষতি করে কাউকে বন্দরের কোনো টার্মিনাল দেওয়া হবে না। চুক্তির পর চুক্তির বিষয়ে জানা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: প রস ত ব দ প রক র য় উপদ ষ ট কম ট র শ ষ কর পর চ ল সরক র গতক ল

এছাড়াও পড়ুন:

গাজীপুরের মহাসড়কে নরকের সাজা কমানোর কেউ নেই?

ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি প্রথম আলো কৃতী শিক্ষার্থী উৎসবে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে বিভাগীয় শহরগুলোতে।

৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ছিল ময়মনসিংহ পর্ব। নগরের টাউন হলে কৃতী শিক্ষার্থীদের সমাবেশে যোগ দিয়ে অনেক আশা আর আনন্দ নিয়েই ফিরেছি।

শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে বুদ্ধির দীপ্তি, কথাবার্তায় মেধার ঝলক, পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাসের ছাপ।

হ্যাঁ, ওরা এখন ব্যস্ত আসন্ন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক, কেউ পড়তে চায় বিজনেস, কেউবা বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যেতে চায়। বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখে অনেকে।

এই ছেলেমেয়েরা প্রকৃতই মেধাবী, কারণ মাধ্যমিকের চেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, আর এবার তো বেশ কম। ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে ক্রিমগুলোকেই পাওয়া গেছে।

এই ধরনের সমাবেশে তিনটা গল্প বলেই থাকি।

১.

এ পি জে আবদুল কালামের (১৯৩১-২০২৫) বিমানবাহিনীর পাইলট হতে চাওয়া আর ব্যর্থতার গল্প। তিনি বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করেন। নেওয়া হবে আটজন। তিনি মন খারাপ করে নদীর ধারে বসে ছিলেন।

সেই সময় একজন সাধু তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার মন কেন খারাপ?’ তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ভেঙে গেছে, আমি বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে পারছি না।’

সাধু বলেন, ‘এই কথার একটাই মানে, নিয়তি তোমার জন্য বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়া নির্ধারণ করে রাখেনি। তুমি ওঠো, অন্বেষণ করো। নিয়তি তোমার জন্য কী ঠিক করে রেখেছে।’

এ পি জে আবদুল কালাম বাড়ি ফিরে গেলেন, পদার্থবিজ্ঞান পড়লেন, ভারতের নামকরা স্যাটেলাইট বিজ্ঞানী হলেন এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন। কাজেই ডাক্তার হতেই হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে, এই ধরনের ধনুর্ভঙ্গ পণ করে রাখার দরকার নেই।

২.

আমাদের এফ আর খানকে (১৯২৯-১৯৮২) বলা হয় আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং। শিকাগোতে সবচেয়ে উঁচু ভবনটা ছিল তাঁর ডিজাইন করা, সিয়ার্স টাওয়ার, যেটি এখন উইলিস টাওয়ার। এফ আর খানের একটা কথা সেই ভবনের নিচে এফ আর খান লেনে খোদিত ছিল।

কথাটা হলো, একজন প্রযুক্তিবিদের আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে জানতে হবে। আর জীবন হলো শিল্প, সংগীত, নাটক আর সবচেয়ে বড় কথা জীবন হলো মানুষ।

৩.

বিল গেটস বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল অনেক স্বপ্ন। এই সব স্বপ্ন আমি পেয়েছি বই থেকে। তোমরা যদি আমার ঘরে যাও, দেখবে আমার সঙ্গে আছে বই, আমি যখন অফিসে থাকি, আমার সঙ্গে থাকে বই, আমি যখন গাড়িতে থাকি, আমার সঙ্গে থাকে বই, আমি প্লেনে চড়ি যখন, আমার সঙ্গে থাকে বই।’

দুই.

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব কমবেশি ১২০ কিলোমিটার। কেউবা বলে ১২৫ কিলোমিটার। ৭৮ মাইল।

এই পথ, হাইওয়ে বা মহাসড়কে দুই ঘণ্টার বেশি লাগা উচিত নয়। কিন্তু আসার সময় বিকেল পৌনে চারটায় গাড়িতে উঠে ঢাকায় পৌঁছালাম রাত সোয়া নয়টায়। ১২৫ কিলোমিটার গাড়িতে আসতে সাড়ে ৫ ঘণ্টা লাগবে কেন?

হাইওয়ে বা মহাসড়ক হাইওয়ে নয়। এতে অনেক ধীরগতির যানও চলে। আমাদের দেশে সব মহাসড়কের পাশেই হাট-বাজার-গঞ্জ গড়ে ওঠে।

ওই সব এলাকায় এমনিতেই গাড়ি ধীর হয়ে যায়। তারওপর বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়েই যাত্রী ওঠানো-নামানোর কাজ সারে।

হাটবাজার, বন্দর-গঞ্জ ধরনের এলাকায় স্থানীয় যানবাহনগুলোও রাস্তা দখল করে রাখে। লোকজন রাস্তা পার হয়। রিকশা রাস্তায় ভিড় করে।

উন্নত দেশে হাইওয়েতে মানুষ চলবে, রাস্তা পার হবে, এটা অকল্পনীয়। আমাদের দেশে যেমনটা আছে পদ্মা সেতুমুখী হাইওয়েতে।

এর মধ্যে সমস্যা হলো ভাঙাচোরা রাস্তা। ভালুকার কাছে রাস্তায় নির্মাণকাজ চলছে। সেখানে একদিকে এক লেন খোলা। ওইখানে যানজট লেগে আছে।

সেটা এড়াতে উল্টোদিকে গাড়ি চলেছে। ফলে ওই জায়গায় যানজট লেগেই থাকে।

ওই একটা জায়গায় যানজটে পড়ে মনে হলো, এই দেশের মহাসড়কগুলোর কোনো অভিভাবক নেই। রাস্তায় কংক্রিট বসানো হচ্ছে, এটা তো রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে জেনেশুনেই করছে। তারা দুপাশে সুরকি ফেলে বিকল্প লেনগুলো আগে চালু করে নিল না কেন?

এইখানে অনেক ছোট-বড় যানবাহন উল্টোদিকে চলতে গিয়ে যানজট বাধায়, সেটাও তো জানা সবার। তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় পুলিশ, দরকার পড়লে আনসার, দরকার পড়লে স্থানীয়ভাবে নিয়োগকৃত কমিউনিটি পুলিশ রাখা হয় না কেন?

আরও পড়ুনবিআরটি ট্র্যাজেডি: জীবনের ঘণ্টাধ্বনি কি শুনতে পাও২৫ আগস্ট ২০২২তিন.

আরেকটা অমার্জনীয় অপরাধ আমরা করেছি ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের নামে। ২০১৩ সাল থেকে কাজ শুরু হয়েছে।

হাজার হাজার কোটি টাকা এর পেছনে ঢালা হয়েছে। নির্মাণের সময় দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

কিন্তু যেই পাপের ক্ষমা নেই, তা হলো গাজীপুর, ময়মনসিংহগামী কোটি কোটি মানুষকে বছরের পর বছর ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তেল পুড়েছে। কার্বন দূষণ ঘটেছে। নির্মাণকাজে দূষণ হয়েছে, বাতাস বালুকণায় থিকথিকে। মানুষের আকাশ ঢাকা পড়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের ধৈর্যশক্তি অসীম, এতটা বছর ধরে এটা সহ্য করে এসেছে। এইটা একটা ত্রুটিপূর্ণ নকশা, এটা এখন সবাই জানে। বাসের দরজা ডান পাশে লাগবে।

এক লেনের পথ, একটা বাস নষ্ট হলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল কুফল দেবে।
এই নকশা যাঁরা করেছেন, এই প্রকল্প যাঁরা অনুমোদন করেছেন, তাঁদের বিচার হওয়া উচিত। এবং প্রতীকী হলেও দণ্ড দেওয়া উচিত।

বছরের পর বছর কোটি কোটি মানুষের কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট করার যে দাম, তা দিয়ে অন্তত এক বছরের জাতীয় বাজেটের টাকা উঠে আসত বলে মনে করি।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরু শামীমুজ্জামান বসুনিয়ার মত তুলে ধরি।

তিনি অভিজ্ঞতার আলো শীর্ষক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছেন, প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে, ‘আমি তো গাজীপুরে যাই। গাজীপুরে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রিন্টিং প্রেস, সেটার একটা কাজ আমাদের দিয়ে দিয়েছে। আমি যাই তো সেখানে। দেখি তো কী কষ্ট! এটা (বিআরটি) আমার একেবারে চোখের কাঁটা! ইট শুড বি ইমিডিয়েটলি স্টপড। ইট শুড বি ইমিডিয়েটলি ব্রোকেন আউট। যা হওয়ার হয়েছে। আমরা তো বহু জায়গায় বহু টাকাপয়সা (নষ্ট) করছি।’ (প্রথম আলো ডটকম, ১০ অক্টোবর ২০২৫)

২০২২ সালে প্রথম আলোয় আনোয়ার হোসেন প্রতিবেদন লিখেছিলেন: ‘বিআরটি: একটি “মহাদুর্ভোগের” প্রকল্প।’

কর্তৃপক্ষ হতাশা প্রকাশ করেই দায় সারছে। প্রকল্পের পদে পদে অব্যবস্থাপনা। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

২০২২ থেকে ২০২৫। পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। লেনগুলো কোনো চিহ্ন ও সিদ্ধান্ত ছাড়া খুলে দেওয়া হয়েছে অথবা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

দুই পাশ থেকেই বাস, ট্রাক, গাড়ি, মোটরবাইক ছুটে আসে। কোনটা ওয়ান ওয়ে কোনটা টু ওয়ে কোনো চিহ্ন নেই, মা-বাপ নেই, সিদ্ধান্তও নেই।

যে বাস কেনার কথা, এই সরকার আর তাতে বরাদ্দ দেবে না বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে যা বানানো হয়েছে, তার একটা আশু সমাধান প্রস্তাব করি। ওই বিশেষায়িত লেনের মাঝখান বরাবর ডিভাইডার দিন।

আর দুই পাশে যে ডিভাইডারগুলো এই লেন দুটোকে আলাদা করেছে, সেগুলো ভেঙে দিন। মানে পুরো সুবিধাটা সব যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত করে দিন।

পুরো রাস্তা বা ফ্লাইওভার দুই ভাগে ভাগ করা থাকবে। গাড়িগুলো বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হতে থাকবে।

তারপর নতুন সরকার এসে যদি বিশেষায়িত বাস কিনে ওই প্রকল্প চালু করতে চায়, করবে। যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিনের কোটি শ্রমঘণ্টা অপচয় তো কমবে। মানুষের দুর্ভোগ কমবে।

এখন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাতায়াত করলে মনে হয় মহাসড়কে কোনো সরকার নেই। কর্তৃপক্ষ নেই। মা-বাপ নেই। আছে যে, সেটা দেখান।

আনিসুল হক প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও সাহিত্যিক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্পর্কিত নিবন্ধ