Prothomalo:
2025-12-09@07:22:53 GMT

সাইবেরিয়ান হাঁস

Published: 17th, November 2025 GMT

১.

নদীকে স্ফীত করে ফেলে যে কুয়াশা, তার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। তার গায়ের রং মেঘের মতোই ধোঁয়াশা সাদা। চোখ থেকে ঝরে পড়ছিল বৃষ্টি শেষের রোদ্দুর। আমি তার ছবির গ্রাহক। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার সব ছবিই কুয়াশায় আচ্ছন্ন কেন?

‘আমি এক সন্তানহারা রমণীর গল্প ফেরি করি আর ভালোবাসি কুয়াশা’; সে বলেছিল আমাকে উদ্দেশ করে।

এ কথার উত্তরে আমাকে বোবা হয়ে যেতে দেখে সে স্বগতোক্তির মতো করে বলে, ‘আমার মা ছিল সাইবেরিয়ান শীতের জমাট কুয়াশা, আর বাবা ছিল আটলান্টিক ওশানের আইসি ওয়াটার। আমি আর কীই–বা করতে পারতাম, বলো?

ওয়েল, ‘তুমি চাইলে অনেক কিছুই হতে পারতে।’

‘আমার ইচ্ছা ছিল সাইবেরিয়ান হাঁস হব। কুয়াশার ওপর দিয়ে মেঘের সাথে উড়ে বেড়াব। কিন্তু আমি হয়েছি আটলান্টিক স্যামন। আইসি ওয়াটারে সাঁতার কাটাই যার নিয়তি।’

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ছবিটা বগলদাবা করে হাঁটা দিলাম। ওর কথায় চারদিক থেকে কুয়াশা নেমে আসতেছিল।

২.

জিপসি মেয়ের কাছ থেকে আনা ছবিটা আমার পড়ার ঘরের দেয়ালে টাঙালাম। সেটা থেকে কুয়াশা ঝরে পড়ছে। দৃষ্টিতে শীতলতা নিয়ে আমি তার ওম দেখি।

মেয়েটির নাম জানা হয়নি। ওর নামটা কি স্নো পড়া শুভ্রতাকে মনে করিয়ে দেবে? কেন যে আমি আর একটু থাকলাম না ওর সাথে, কেন আরও কিছু কথা শুনলাম না, কেন যে!

এর কয়েক দিন পর এক সাইবেরিয়ান রমণীর সাথে দেখা। তার কাছে শুনলাম জিপসি মেয়েটির নাম ক্যাথিয়া। তার মায়ের নাম তাতিয়া আর বাবা ভ্লাদ। ওরা সাইবেরিয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, পথই ওদের দেশ। অবিরাম চলতে থাকা তাতিয়া আর ভ্লাদ পথের পাশেই একদিন কুড়িয়ে পেয়েছিল ক্যাথিয়াকে। ক্যাথিয়া নামটা তাতিয়া বহু বছর আগেই ঠিক করে রেখেছিল। সে জানত, লাল টুকটুকে জামা পরা একটা মেয়েকে সে কোনো একদিন রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পাবে। ও মেয়েটির নাম দেবে ক্যাথিয়া। দেশে দেশে, পথে পথে লাগাতার সাত বছর ওরা খুঁজে বেড়াবে ক্যাথিয়ার মা-বাবাকে, কিন্তু পাবে না। সাত বছর পর এই মেয়েটি ওর হবে। এই স্বপ্নই তাতিয়াকে পথে নামিয়েছিল। ক্যাথিয়া তার স্বপ্নের রাজকন্যা, তাকে বাস্তাবে পাওয়া যাবে কি না, তার তা জানা নাই।

আমি যতই তাতিয়ার কথা শুনছিলাম, ততই কুয়াশার ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম।

অবিরাম চলতে থাকা তাতিয়া আর ভ্লাদ পথের পাশেই একদিন কুড়িয়ে পেয়েছিল ক্যাথিয়াকে। ক্যাথিয়া নামটা তাতিয়া বহু বছর আগেই ঠিক করে রেখেছিল। সে জানত, লাল টুকটুকে জামা পরা একটা মেয়েকে সে কোনো একদিন রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পাবে।৩.

আগের দিনের যে কুয়াশাকে আমি রোমান্টিসাইজ করতেছিলাম, পরের দিনে সকালে তা–ই ভাসিয়ে দিচ্ছিল আমার পড়ার ঘর। দরজা খুলতেই গলগল করে কুয়াশা বের হয়ে রওনা করেছে ড্রয়িংরুমের দিকে।

আমি তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিলাম। কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থেকে টের পাচ্ছিলাম একটা মনোরম ওম, যা হাঁসের পাখার নিচে লুকিয়ে থাকে।

আমি জানি, আমার বউ এই সব দেখলে রাগারাগি করবে। এমনকি ছবিটা গ্যারেজে নিয়েও রেখে দিতে পারে বা দিয়ে দিতে পারে সালভোসের অপ সপে। এর আগেও এমন হয়েছে।

একটা ছবি আমি কিনে এনেছিলাম ভিক্টোরিয়া রাজ্যের একদম শেষ প্রান্তের একটা ছোট্ট শহর মৌলামাইন থেকে। ছবিটা ছিল খুবই অর্ডিনারি, দিনের আলোতে সে খুবই নিরীহ একটা অতি সাধারণ ছবি।

কিন্তু রাতের বেলায় আবছা আলোতে সে জীবন্ত হয়ে উঠত। শোনা যেত শোঁ শোঁ, সাঁই সাঁই বাতাসের শব্দ, ঢেউ ভাঙার গর্জন। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর মনোযোগটা টেনে নেওয়ার পর শুরু হতো উথালপাতাল ঢেউয়ের সাথে ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব। আমাদের ঘরটা তখন হয়ে যেত উত্তাল সমুদ্রে ঝড়ে পড়া ডিঙি। আর আমরা হয়ে যেতাম সেই ছবির মধ্যে নৌকায় টলমল করতে থাকা তিনজন যাত্রী; যারা নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।

দুই–তিনবার এমন হওয়ার পর আমি আর ছবিটাকে রক্ষা করতে পারি নাই। কিছুদিন গ্যারেজে থাকার পর একদিন আমার বউ তাকে হার্ড রাবিশের সাথে রাস্তায় রেখে আসে।

আমি সারাক্ষণ চোখ রাখতেছিলাম, কে নেয় ছবিটা দেখার জন্যে। কিন্তু কখন যে ছবিটা উধাও হয়ে গেল; কে যে নিল, তা কিছুতেই খেয়াল রাখতে পারলাম না।

ছবিটার জন্যে এখনো আমার মন খারাপ হয়। মনে হয়, আমাদের বিদেশ–বিভুঁইয়ে, এই নিস্তরঙ্গ জীবনে সেটা ছিল একমাত্র আলোড়নের সম্ভাবনা। ছিল জাগতিক ভয়ের ঊর্ধ্বে ঐশ্বরিক এক শিহরণের স্বর্গীয় সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখার অবলম্বন। কিন্তু আমার বউ তা বুঝল না। এবারও সে বুঝবে না এবং আমার এই ক্রমাগত কুয়াশা বিচ্ছুরণের নিষ্পাপ উৎসকে কালিমা লেপে বাতিল করার ষড়যন্ত্রে উঠে–পড়ে লাগবে। আমি জানি, ও লাগবেই।

৪.

জিপসি মেয়েটাকে কীভাবে খুঁজে পাব, তার কোনো দিশা আমি ঠিক করতে পারতেছিলাম না। ওর সাথে দেখা হয়েছিল সানডে মার্কেটে। আমি ভিক্টোরিয়া রাজ্যের সানডে মার্কেট কখন কোথায় হয়, দেখতে গিয়ে দেখি, প্রায় গোটা বিশেক সানডে মার্কেট, মেলবোর্নের আশপাশেই বসে। আবার সময়েরও হেরফের আছে। কোনো মার্কেট হয়তো মাসের প্রথম সপ্তাহে বসে আর কোনোটা দ্বিতীয়, কোনোটাবা মাসের চতুর্থ সপ্তাহে।

কোনটা দিয়ে শুরু করব বুঝতেছি না।

আবার ও তো একটা মার্কেটে দুইবার বসে না। প্রতি সানডেতে সে একটা নতুন এলাকায় চলে যায় এবং সেখানকার সানডে মার্কেটে বসে। এটা খুবই হতে পারে যে ও যে মার্কেটে বসতেছে, সেখান আমি যাচ্ছি না। আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে সে নাই। একটা গোলকধাঁধার ভেতর ঢুকে যাচ্ছি, নিয়ন্ত্রণহীন, হাওয়ার ভেসে বেড়ানো বেলুনের মতো।

দিনের আলোতে সে খুবই নিরীহ একটা অতি সাধারণ ছবি। কিন্তু রাতের বেলায় আবছা আলোতে সে জীবন্ত হয়ে উঠত। শোনা যেত শোঁ শোঁ, সাঁই সাঁই বাতাসের শব্দ, ঢেউ ভাঙার গর্জন। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর মনোযোগটা টেনে নেওয়ার পর শুরু হতো উথালপাতাল ঢেউয়ের সাথে ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব।৫.

লাগাতার কয়েক মাস সানডে মার্কেটে ঘোরাঘুরির পর একদিন তাতিয়াকে পেয়ে যাই। তাতিয়া তামা বা রুপার তার দিয়ে গহনা বানায়। সেগুলো সে কার্নিভ্যালে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে আর যখন কার্নিভ্যাল থাকে না, তখন সানডে মার্কেটে।

‘তুমি লাল জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছ কি মেয়েদেরকে হর্নি করার জন্যে?’ তাতিয়া আমাকে বলে। আমি লজ্জায় আরও একটু লাল হয়ে ওরে জিজ্ঞেস করি, ‘লাল জামা কি হর্নি করে নাকি?’

‘হ করে তো,’ ও বলে।

‘মেয়েরা কি এই জন্যেই লাল জামা পরতে পছন্দ করে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

ও বলে, ‘না। মেয়েরা লাল জামা তখনই পরে, যখন সে তার মা ও মাটিকে মিস করে। একটা নস্টালজিক মুগ্ধতার ভেতর থাকে তারা, সে সময়।’

‘রিয়েলি!’ আমি বলি।

তাতিয়া আমার দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন সে কুয়ায় পড়ে যাওয়া কোনো বালককে দেখার চেষ্টা করতেছে।

আমার চোখ ওর চোখ থেকে সরিয়ে নিই। দেখি, দোকানে সাজিয়ে রাখা গয়নার ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা শূন্যতাকে। আর বলি, ‘তোমার গয়নাগুলো সুন্দর। আমার কেউ নাই, থাকলে আমি একজোড়া কিনে নিতাম।’

‘তুমি গয়না কিনতে আসো নাই, আমি জানি।’

আমার নীরবতা ওর কথাকে আর আগাতে দেয় না।

আমি চলে আসার মুহূর্তে তাতিয়া আমাকে বলে, ‘ক্যাথি আর ভ্লাদ বিয়ে করেছে। ওরা এখন অন্য শহরে থাকে।’

তাতিয়া এমন বাড়তি নির্লিপ্ততার সাথে কথাগুলো বলল, যেন কথা বলছে না, উগরে দিচ্ছে কতগুলো পরিত্যক্ত লোহালক্কড়। আর তারপরই দৃঢ় পদে আমার সামনে থেকে একজন কাস্টমারকে উদ্দেশ্য করে হেঁটে গেল, ওর দৃঢ়তা এবং স্থিরতা আমাকে পাহাড় ডিঙানো মহিষের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে কুয়াশায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া পথহীন একটা দুনিয়ার পথ ধরে মহিষের মৌনতা নিয়ে হাঁটতে থাকি।

৬.

বাড়ি এসে আমি নিজেই ছবিটা সালভোসের অপ সপে দিয়ে আসতে যাই। ছবিটা থেকে এখন আর কুয়াশা ঝরছে না, যেন মৃত কুয়াশাকে কবর দেওয়ার জন্যে তাতিয়া নিয়ে যাচ্ছে গোরস্তানে। একটা লাশ বহনকারী গাড়ির পেছন পেছন আমি হাঁটি। একটা দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমণের পর সালভোসের দোকানে পৌঁছাই।

দোকানে গিয়ে দেখি, ক্যাথিয়ার আরও একটা ছবি সেখানে রাখা।

ছবিটার নিচের দিকে কুয়াশার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে হাজার হাজার মাকড়সার বাচ্চা, সেই মাকড়সার চেইন দিয়ে লেখা হয়েছে দুইটা লাইন:
‘তোমার অপেক্ষা বিফলে যাবে,
দমকা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাবে নিস্ফলা গাছের শেষ পাতাটি।’

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: আর ভ ল র জন য র ভ তর একদ ন

এছাড়াও পড়ুন:

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের গৃহঋণ পরিশোধে অযাচিত চাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন মফিজ উদ্দীন আহমেদ। তিনি রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের মে মাসে ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। কিন্তু ব্যাংকের এককালীন ঋণ পরিশোধের অযাচিত চাপ, হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ ও নিয়মবহির্ভূত আচরণের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন বলে জানান এই অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।

বিষয়টি রূপালী ব্যাংক থেকে শুরু হয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ হয়ে অর্থ বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের গৃহঋণ গ্রহণপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রণীত গৃহনির্মাণ নীতিমালা অনুযায়ী, মফিজ উদ্দীন আহমেদের ২০ বছরে মোট ২৪১ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের কথা। ঋণ নেওয়ার পর নিজস্ব অর্থ যোগ করে তিনি ঢাকায় দেড় কোটি টাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে কিস্তি পরিশোধ করে আসছেন।

এক বছরের অবসর-উত্তর ছুটি শেষে এ বছরের ১ জুলাই তিনি অবসরে যান। কিন্তু দুই মাসের মাথায়ই গত ৩ সেপ্টেম্বর রূপালী ব্যাংকের করপোরেট শাখা তাঁকে উপস্থিত হতে বলে। সেখানে গিয়ে তিনি যে চিঠি পান, তাতে বলা হয়, ৪৭ লাখ টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে, বাকি টাকা কিস্তিতে দেওয়া যাবে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী হিসেবে গ্রাহক হিসেবে এই চাপকে মফিজ উদ্দীনের কাছে অবোধ্যই মনে হয়।

মফিজ উদ্দীন আহমেদ বিস্মিত হয়ে বিষয়টি লিখিতভাবে অর্থ বিভাগকে জানান। অভিযোগ পর্যালোচনা করে স্পষ্ট হয়, রূপালী ব্যাংকের এ পদক্ষেপ সরকারি কর্মচারীদের জন্য গৃহনির্মাণ ঋণ নীতিমালা ২০১৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নীতিমালায় উল্লেখ আছে, অবসরের পর কিস্তি বকেয়া থাকলে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক বজায় রেখে পুনঃ তফসিল করা যাবে, কিন্তু এককালীন টাকা আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।

পরিস্থিতি জটিল হয় গত ২৬ অক্টোবর। নিজের বাসার কাছে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে নিজের জমা টাকার অর্ধেক তুলতে গেলে চেক ডিজঅনার, মানে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তাঁকে ওই শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক জানান, ‘ওপরের নির্দেশে’ হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অথচ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার সুযোগ নেই—এটি নিয়মবহির্ভূত পদক্ষেপ।

মফিজ উদ্দীন আহমেদ জানান, পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী একজন গ্রাহককে কেন এমন অযাচিত চাপ দেওয়া হলো?

অর্থ বিভাগকে মফিজ উদ্দীন আহমেদ জানান, যেখানে সাধারণ ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশের ওপরে ওঠায় অনেক বেসরকারি ব্যাংক ভালো গ্রাহকের পেছনে ছুটছে, সেখানে ৫০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা রূপালী ব্যাংক কেন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী গ্রাহককে তাড়িয়ে দিতে চাইছে, তা তাঁর কাছে বোধগম্য নয়। তাঁর ভাষায়, ঘটনাটি রূপালী ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপেশাদারত্ব ও অদক্ষতার প্রতিফলন।

এদিকে মফিজ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থ বিভাগ ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। রূপালী ব্যাংকও দুঃখ প্রকাশ করেছে। এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না।’

অন্য ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু রূপালীই নয়, সরকারি কর্মচারীদের গৃহঋণ কার্যক্রমে যুক্ত অনেক ব্যাংকের বিরুদ্ধেই গ্রাহকেরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ তুলছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা।

গৃহঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, যেখানে সরকার ভর্তুকি দেয় ৫ শতাংশ; গ্রাহক বহন করেন মাত্র ৪ শতাংশ। কিন্তু অন্যান্য সাধারণ ঋণে সুদের হার বাড়ায় ব্যাংকগুলো এখন গৃহঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ফলে নানা রকম অজুহাত তুলে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের পদক্ষেপ

১১ নভেম্বর অর্থ বিভাগ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহনির্মাণ ঋণ কার্যক্রমে যুক্ত রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি খাতের ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের চিঠি পাঠিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি), ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক ও ডিবিএইচ ফাইন্যান্স।

চিঠিতে বলা হয়, গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া ঋণ পুনঃ তফসিল করা যাবে না। অবসরের পর কিস্তি বকেয়া থাকলে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান করতে হবে। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করতে হবে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঋণগ্রহীতাদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি দলিলমূলে বন্ধক থাকে, ফলে এ ঋণ সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই সরকারি কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ার পর তাঁদের ওপর ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আংশিক বা সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা অনভিপ্রেত।

জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের এমডি ওয়াহিদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা এহতেশামুজ্জামান জানান, এমডি তাঁকে বলতে বলেছেন যে ঘটনাটি ‘মিটমাট হয়ে গেছে’।

কত সরকারি কর্মচারী গৃহঋণ পেয়েছেন

‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান নীতিমালা-২০১৮’ প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই। এতে সর্বোচ্চ ঋণসীমা ৭৫ লাখ এবং সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নীতিমালাটি অবশ্য পরে কয়েক দফা সংশোধনও করা হয়।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ১৯৪ জনের নামে ঋণ মঞ্জুর হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ১৬৪ জন সাময়িক এবং ৪ হাজার ৩০ জন চূড়ান্ত মঞ্জুরি পেয়েছেন। চূড়ান্ত মঞ্জুরি পাওয়া ব্যক্তিরাই ভর্তুকি পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত কোষাগার থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ১৮৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ