Prothomalo:
2025-11-29@04:04:55 GMT

ধর্মীয় সংহতির নৈতিক ভিত্তি

Published: 13th, October 2025 GMT

পবিত্র কাবাঘর ঘিরে হারাম শরিফের প্রাঙ্গণে কাবার ছায়াতলে অনুষ্ঠিত ‘মক্কার সনদ সম্মেলনে’ ইসলামি উম্মাহর বিশিষ্ট আলেমরা উপস্থিত হয়েছেন, যাঁদের অগ্রভাগে রয়েছেন প্রধান মুফতিগণ। তাঁরা গভীরভাবে অনুধাবন করেন সেই মহান প্রতিধ্বনি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবের, যা বহন করে ‘মদিনা সনদ’।

মহানবী (সা.) চৌদ্দ শতাব্দী আগে এটি প্রণয়ন করেছিলেন বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বর্ণের অধিকারী উপাদানগুলোর সঙ্গে তাঁর আলোকিত নগরী মদিনায়। সেটা ছিল একটি সাংবিধানিক চুক্তি, যা মানবসমাজের উপাদানগুলোর মধ্যে সহাবস্থানের মূল্যবোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আল-মক্কা আল-মুকাররমা সনদ হলো একটি ইসলামি দান, যার আলোকশিখা সেই অমর সনদ থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি ইসলামি উম্মাহর বিশিষ্ট আলেমদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যাঁরা তাঁদের কিবলাতল থেকে পুরো পৃথিবীকে পথপ্রদর্শন করছেন। এই সনদের ঐতিহ্য আজও চলমান—পঞ্চদশ হিজরি শতাব্দী ও একবিংশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

এই সনদ প্রকাশিত হয়েছে প্রাচীন ঘরের প্রাঙ্গণ থেকে, যা মুসলিমদের হৃদয়ে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসলামি বিশ্বের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, যেখানে কিবলা এবং মুসলিমরা অবস্থিত।

এই সনদের প্রণয়ন এমন সময় ও স্থানে অনুষ্ঠিত হয় যা ইতিহাসের গৌরবময়। তাঁরা উপস্থিত ছিলেন পবিত্র ঘরের প্রাঙ্গণে, রমজানের শেষ দশকে এবং এ সময় তাঁরা জোর দিয়ে ঘোষণা করেন যে: তারা সভ্যতার সঙ্গে আন্তসম্পর্কযুক্ত এই বিশ্বের অংশ।

এটি পরিষ্কারভাবে প্রদর্শন করে যে এই সনদ ইসলামের এবং মুসলিমদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোক উৎস, যা মক্কা শরিফের পবিত্র প্রাঙ্গণ থেকে সমগ্র বিশ্বের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মান এবং ইসলাম, মুসলিম ও মানবতার জন্য তাদের মহান সেবার স্বীকৃতি প্রদান করে।

যখন মুসলিমরা এই মক্কার সনদ প্রকাশ করেন, তাঁরা নিজেদের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই সনদের প্রণয়ন এমন সময় ও স্থানে অনুষ্ঠিত হয় যা ইতিহাসের গৌরবময়। তাঁরা উপস্থিত ছিলেন পবিত্র ঘরের প্রাঙ্গণে, রমজানের শেষ দশকে এবং এ সময় তাঁরা জোর দিয়ে ঘোষণা করেন যে: তারা সভ্যতার সঙ্গে আন্তসম্পর্কযুক্ত এই বিশ্বের অংশ।

তাদের লক্ষ্য হলো: মানবজাতির কল্যাণ অর্জন করা, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে উন্নীত করা, ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কের সেতু নির্মাণ, অন্যায়, সভ্যতাগত সংঘাত এবং ঘৃণার যেকোনো কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা।

এ ছাড়া সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন যে এই ঐতিহাসিক সনদ আগের শিক্ষা ও নিম্নলিখিত নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করে।

 ১.

মানুষ তার গঠনগত ভিন্নতার পরও এক মূল থেকেই উদ্ভূত এবং তারা তাদের মানবীয় মর্যাদায় সমান। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয়ের থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে প্রার্থনা করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককে অবহেলা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা তত্ত্বাবধানকারী।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১)

এবং আল্লাহর প্রদত্ত সম্মান তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করেছে । আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, তাদের স্থলে ও সমুদ্রে বহন করেছি, তাদের উত্তম জিনিস হতে রিজিক দিয়েছি এবং আমি তাদের আমার সৃষ্ট বহু কিছুর ওপর স্পষ্টভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭০)

আরও পড়ুনজাতীয় ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত মদিনা সনদ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪

২. জাতিগত কথাবার্তা ও স্লোগান পরিত্যাগ করা। সেই জঘন্য শ্রেষ্ঠত্ববাদী দাবির নিন্দা করা—যা কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রান্ত ধারণাকে অলংকৃত করে। মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পরহেজগার।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চেনো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক পরহেজগার। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে অবহিত।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত: ১৩)

তদ্রূপ, মানুষের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সর্বাধিক উপকারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সেই, যে মানুষের জন্য সর্বাধিক উপকারী।’ (আল-মুজাম আত-তাবারানি)

আর যদি আপনার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই তিনি মানুষকে একটিমাত্র উম্মত করে দিতেন। কিন্তু তারা সর্বদা ভিন্নমতাবলম্বী হয়েই থাকবে।সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮

৩. জাতিগুলোর মধ্যে নিহিত বিশ্বাস, সংস্কৃতি, স্বভাব এবং চিন্তাধারার ভিন্নতা আল্লাহর উচ্চ হিকমতের প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত। পৃথিবীর এই অমোঘ নীতি স্বীকার করা এবং বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে এমনভাবে আচরণ করা, যা ঐক্য মানবিক প্রশান্তি দিকে নিয়ে যায়—এটি এর বিরোধিতা বা সংঘাতের চেয়ে শ্রেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি আপনার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই তিনি মানুষকে একটিমাত্র উম্মত করে দিতেন। কিন্তু তারা সর্বদা ভিন্নমতাবলম্বী হয়েই থাকবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮)

আর যে ব্যক্তি সত্যের দিকে পরিচালিত হয়, তার দায়িত্ব এটি মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।

৪. মানবসমাজে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কোনোভাবেই সংঘাত বা বিরোধের কারণ হতে পারে না; বরং এটি এক গঠনমূলক ও সভ্য ইতিবাচক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। এই বৈচিত্র্য হওয়া উচিত পারস্পরিক সংলাপ, বোঝাপড়া ও সহযোগিতার সেতু—যা সবার কল্যাণে নিবেদিত থাকে।

এটি মানুষকে মানবসেবায় ও মানবকল্যাণে প্রতিযোগিতা করতে, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও অভিন্ন মূল্যবোধ অন্বেষণ করে তা কাজে লাগাতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মূল্যবোধসম্পন্ন, সর্বজনীন নাগরিক রাষ্ট্র নির্মাণে উৎসাহিত করে। এই রাষ্ট্র বৈধ স্বাধীনতা, ন্যায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সর্বজনীন কল্যাণচেতনার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

৫. আসমানি ধর্মের মূল উৎস এক ও অভিন্ন, আর তা হলো আল্লাহর প্রতি ইমান, যিনি একক ও অতুলনীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তবে এসব ধর্মের আইনব্যবস্থা (শরিয়ত) ও পদ্ধতিগত অনুশীলনে (মানহাজ) বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে দ্বীন (ধর্ম) ও তার অনুশীলন—এই দুটিকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা কখনোই সমীচীন নয়।

৬. সভ্যতার সংলাপই পারস্পরিক বোঝাপড়া, অভিন্ন মূল্যবোধ উপলব্ধি, সহাবস্থানের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং এ-সংক্রান্ত নানা সংকট উত্তরণের সর্বোত্তম পথ। এ ধরনের সংলাপ অন্যের অস্তিত্ব ও তার বৈধ অধিকারের প্রতি সক্রিয় স্বীকৃতি প্রদান করে; ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠা করে, যা পরস্পরের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বকে সম্মানিত করে।

এর মাধ্যমে ইতিহাসের শত্রুতা, ঘৃণার অন্ধ তত্ত্ব, ষড়যন্ত্রমূলক ধারণা এবং কিছু ব্যক্তির বিচ্যুত আচরণের কারণে সমগ্র সম্প্রদায়কে দোষারোপ করার ভুল মানসিকতা থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

এটিও স্পষ্ট করা জরুরি যে ইতিহাস তার নিজস্ব ব্যক্তিদের দায়িত্ব, কেউ অন্যের অপরাধের ভার বহন করবে না; যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘ওরা এক জাতি, যারা অতীত হয়েছে; তাদের যা অর্জন, তা তাদের জন্য; আর তোমাদের যা অর্জন, তা তোমাদের জন্য; এবং তোমরা তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করবে না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৩৪)

আর আল্লাহ আরও বলেন: ‘(ফিরআউন বলল:) অতীত জাতিগুলোর কী হাল হয়েছে?’ তিনি (মুসা আ.) বললেন, ‘তাদের জ্ঞান আমার প্রভুর নিকটে এক গ্রন্থে সংরক্ষিত; আমার প্রভু কখনো ভুল করেন না, কখনো ভুলে যান না।’ (সুরা ত্বা-হা, আয়াত: ৫১-৫২)

মক্কা আল-মুকাররমা সনদের ইংরেজি সংস্করণের প্রচ্ছদ

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: আল ল হ ত আল র প র ঙ গণ ক ত কর র জন য ত হয় ছ বল ছ ন সনদ র ইসল ম উপস থ ই সনদ

এছাড়াও পড়ুন:

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ

বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধু শেরপুর জেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৮৪০, যাদের মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, হুদি, পাত্র, সৌরা, মসুর, মারমা, ম্রো, চাক, মাহালিসহ ১৬টিরও বেশি সম্প্রদায় রয়েছে। প্রতিটি গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা, যা তাদের অস্তিত্বের মূল পরিচয়।

আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত ভাষা ৩৫টির বেশি। এই ভাষাগুলো মূলত তিনটি বৃহৎ ভাষা পরিবারে বিভক্ত। তিব্বত-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি। এগুলো স্বরনির্ভর এবং প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রভাব বহন করে।

এদিকে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার করে সাঁওতাল, খাসি, মান্দি, ওঁরাও প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী। তাদের ভাষার শব্দভান্ডার প্রকৃতি, কৃষি, নদী-জঙ্গলকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে রোহিঙ্গা, কোচ, বেলে ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোয় আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব স্পষ্ট।

ব্রিটিশ শাসনামলে মিশনারি বিদ্যালয়গুলোয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ ছিল; অনেক ভাষার জন্য লিপিও উদ্ভাবন করা হয়েছিল। তবে প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে উর্দুর একক আধিপত্য তাদের ভাষাশিক্ষার সুযোগ ক্রমে সংকুচিত করে দেয়।

স্বাধীনতার পর ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অনেক জাতিগোষ্ঠী ভারত থেকে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় তারা আবার বাংলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ঘাটতি মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা-অবহেলা শিশুদের ভাষাগত চর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের। অনেকে মানসিক চাপ সইতে না পেরে পড়াশোনা কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

চাকমা, খুমি, খিয়াং, পনু, ম্রো, লুসাই, কচ, রং, পাংখোসহ বহু ভাষা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সংস্কৃতির স্বাদ, ইতিহাস, পরিচয় ও জীবনের নিজস্ব অর্থ। এ দেশের মানুষ ভাষার মর্যাদার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধা যদি আজ বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা আমাদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।

বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনে অনুবাদক নিয়োগ, সমাজে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ, লিখিত রূপ তৈরি, ভাষার সমান অধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। আর উন্নতির সেই যাত্রায় ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় ও মর্যাদার বাহক। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লাবনী আক্তার শিমলা শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ