চীন যেভাবে বিদেশে স্বৈরাচারী শাসন ‘রপ্তানি’ করছে
Published: 10th, November 2025 GMT
কিরগিজস্তানে ২০২০ সালের অক্টোবরে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের পর রাজধানী বিশকেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র চারটি পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত ভোটসীমা পেরোতে সক্ষম হয়। এই চার দলের তিনটির সঙ্গে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সোরনবাই জিনবেকভের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
কিরগিজস্তানের শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ চীন তখন এই অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় বেশ সংযম দেখিয়েছে। তবে সংযম তারা দেখিয়েছে এমনভাবে, যা ইঙ্গিত দেয়, গণতন্ত্র রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং বলেছেন, ‘চীন আন্তরিকভাবে আশা করে, কিরগিজস্তানের সব পক্ষ আইনের মাধ্যমে, সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে এবং যত দ্রুত সম্ভব স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।’
২০২২ সালের শুরুর দিকে কাজাখস্তানে বেসামরিক বিক্ষোভ দমনে সরকার যখন সহিংস পন্থা বেছে নেয়, তখন চীনের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। চীন প্রকাশ্যে কাজাখ প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ত তোকায়েভকে সমর্থন জানায় এবং তাঁর দাবির সঙ্গে একমত হয়ে ঘোষণা দেয়, ‘বিদেশে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা’ এই অস্থিরতার জন্য দায়ী।
তোকায়েভের কঠোর অবস্থানের কারণে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও চীন তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কেন চীন প্রতিবেশী দুই দেশে সংঘটিত দুই ধরনের গণ-অভ্যুত্থানে একটির ক্ষেত্রে সংযত ও অন্যটির ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল?
আমার সদ্য প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, আজকের বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রচারের একটি বিস্তৃত প্যাটার্নে এর উত্তর লুকিয়ে আছে।
গবেষকেরা সাধারণত ধরে নেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাগুলো একধরনের সুসংগঠিত মতাদর্শ বিদেশে ‘রপ্তানি’ করতে চায়, যেমনটি সোভিয়েত ইউনিয়ন শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিজম প্রচারের ক্ষেত্রে করেছিল। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম বিস্তার করতে চায়। তারা একদলীয় শাসন ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকে এমন এক মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, যা অন্য অনুগত সরকারগুলো গ্রহণ করতে পারে।
কিন্তু আজকের দিনে খুব কমসংখ্যক স্বৈরশাসকের একক মতাদর্শ আছে। তার বদলে, বেইজিংয়ের মতো দমনমূলক সরকারগুলো দেখাতে চায়, স্বৈরাচারী শাসনই বাস্তব জীবনের প্রশাসনিক সমস্যা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে যুক্তিসংগত সমাধান; অর্থাৎ তারা স্বৈরাচারকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন এটি স্বাভাবিক ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা।
এর পর থেকে কাজাখস্তানও তার স্বৈরাচারী পথে এগিয়ে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের এপ্রিলে সেখানে নতুন একটি গণমাধ্যম আইন কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় বিদেশি গণমাধ্যম ও তাদের প্রতিনিধিদের স্বীকৃতি বাতিল করার ক্ষমতা পায়।আমি একে বলি ‘স্বৈরাচার বাণিজ্যিকীকরণ’। যেমন কোনো পণ্য ভোক্তার পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী আলাদা উপায়ে বিপণন করা হয়, তেমনি চীনও বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে স্বৈরাচারী চর্চাকে উৎসাহিত করে।
কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তানের উদাহরণ এই গতিশীলতারই প্রতিফলন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে কিরগিজস্তানকে মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখা হতো। সেখানে সক্রিয় রাজনৈতিক বিরোধী দল, প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছিল।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, চীন সেখানে যা করছে, তাকে আমি আমার গবেষণায় ‘রক্ষণাত্মক যুক্তি’ বলেছি। এর অর্থ হলো, চীন কিরগিজস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্বৈরাচারী শাসনপদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক অস্থিরতা রোধের সম্ভাব্য প্রতিরোধক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া কিরগিজস্তানে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং দেশটি ক্রমে আরও গভীরভাবে স্বৈরাচারিতার দিকে নেমে গেছে।
২০২০ সালের অস্থিরতার সময় চীনা কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বারবার সতর্ক করেছিল যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে কিরগিজস্তানের উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র জন ত ক
এছাড়াও পড়ুন:
চট্টগ্রাম নগরের জনসংখ্যা আসলে কত লাখ, ৩২ নাকি ৬০
চট্টগ্রাম জেলার আয়তন সব মিলিয়ে ৩ হাজার ২৮২ বর্গমাইল। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকার আয়তন ৬০ বর্গমাইলের মতো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন—দুই সংস্থার হিসাবেই রয়েছে এমন তথ্য। তবে নগর বা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনসংখ্যা কত তা নিয়ে এই দুই সংস্থার হিসাবে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। সিটি করপোরেশনের হিসাবে যে সংখ্যক জনসংখ্যার কথা বলা হয়, তা পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নগরে জনসংখ্যা আনুমানিক ৬০ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৫০৭ জন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের হিসাব অবশ্য কোনো জরিপের ভিত্তিতে করা হয়নি, অনুমানের ভিত্তিতেই করা। উত্তর দিকে লতিফপুর-জঙ্গল সলিমপুর; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদী; পূর্ব দিকে কর্ণফুলী নদী থেকে হালদা, চিকনদণ্ডী এবং পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগর, ভাটিয়ারী ও জঙ্গল ভাটিয়ারী—কাগজে–কলমে এটিই চট্টগ্রাম নগরের সীমানা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সেখানে বসবাসকারী মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, জনসংখ্যার সঠিক হিসাব না থাকলে প্রকল্প পরিকল্পনা, বাজেট নির্ধারণ, অবকাঠামোর আকার, সেবাদানের সক্ষমতা—সবকিছুতেই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে সরকারি সম্পদের অপচয় হয় এবং জনগণ প্রত্যাশিত সেবা পায় না।
নথিপত্রে জনসংখ্যার হিসাব
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার জনসংখ্যা ৯১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৬৫। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং ১৫টি উপজেলা এলাকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে জনসংখ্যা দেখানো হয় আনুমানিক ৬০ লাখ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বলা হয় আনুমানিক ৭০ লাখ। অর্থাৎ করপোরেশন বলছে, তিন বছরে জনসংখ্যা ১০ লাখ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে জনসংখ্যা দেখানো হয় আনুমানিক ৬০ লাখ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বলা হয় আনুমানিক ৭০ লাখ। অর্থাৎ করপোরেশন বলছে, তিন বছরে জনসংখ্যা ১০ লাখ বেড়েছে।নগরে ৭০ লাখের মতো জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ভাসমান, এদের ভাসমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ ৫১ হাজার ৫২ জন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তাঁদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছে, মাত্র ছয় বর্গমাইল আয়তন নিয়ে ১৮৬৩ সালে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটি। ১৯৮২ সালে পৌরসভাকে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নামে যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে। কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরুর সময় জনসংখ্যা ছিল ২০ লাখ। যদিও বিবিএসের হিসাবে ১৯৯১ সালে সিটি করপোরেশনে জনসংখ্যা ১৩ লাখ ৬৬ হাজার।
চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত