পদ্মার চরে সক্রিয় ১১টি বাহিনী, ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইটে’ গ্রেপ্তার ৫৮: পুলিশ
Published: 9th, November 2025 GMT
পদ্মার চরে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন সদস্যদের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইটে’ মোট ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র। রাজশাহীর বাঘা, পাবনার বেড়ার আমিনপুর ও ঈশ্বরদী, নাটোরের লালপুরে পদ্মার চরে আজ রোববার ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়।
অভিযান শেষে বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শকের (ডিআইজি) সম্মেলনকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন হয়। সেখানে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, পদ্মার চরে কাকন বাহিনীসহ মোট ১১টি বাহিনী সক্রিয় আছে। এই অভিযানে তাদের সদস্যদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা চরের সক্রিয় সন্ত্রাসী ছিলেন। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিমের ১ হাজার ২০০ সদস্য অভিযানে অংশ নেন।
সম্প্রতি পদ্মার চরকেন্দ্রিক অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে ‘কাকন বাহিনী’র নাম আসে। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কথায় কথায় গুলি করে, মানুষ হত্যা করে, চরের বালু ও ফসল লুট করে, অপহরণ ও চাঁদাবাজি করে।
শেষ গত ২৭ অক্টোবর চরে ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে ‘কাকন বাহিনী’র গুলিতে তিন কৃষক নিহত হন। এ ঘটনায় বাহিনীর প্রধান হাসিনুজ্জামান কাকনসহ কয়েকজনের নামে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় একটি মামলা হয়। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় মোট ছয়টি মামলা হয়েছে এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে।
সক্রিয় ১১টি বাহিনী
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আপনারা জানেন যে সাম্প্রতিকালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পদ্মার চরাঞ্চল বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করছে, এ রকম একটা অভিযোগ ছিল। আমরা চেষ্টা করেছি সেই অভিযোগ খণ্ডন করার জন্য।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা বাহিনীগুলোর নাম উল্লেখ করে বলেন, হাসিনুজ্জামান কাকন ইঞ্জিনিয়ার কাকন হিসেবে পরিচিত। তাঁর বাহিনীর নির্মমতায় চরাঞ্চলবাসী উদ্বেগ–উৎকণ্ঠায় আছেন। এই চরে আরও যেসব বাহিনী আছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাইদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরিফ তাগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, শুকচাঁদ ও গাহারুর বাহিনীসহ মোট ১১টি।
আরও পড়ুনচার জেলায় পদ্মার চরে হঠাৎ কেন দেড় হাজার পুলিশের বিশেষ অভিযান৭ ঘণ্টা আগেনাম কেন ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’
অভিযানের নামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ডিআইজি বলেন, তাঁরা রাতে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু চরে নামেননি। ভোরের দিকে আকাশে যে আলো দেখা দেয়, তখন অভিযান শুরু করেছেন। এই আলো সকালকে ডাকে, মানুষের জন্য স্বপ্ন হয়ে আসে। সে জন্য তাঁরা অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’। তিনি মনে করেন, এই অভিযানের মাধ্যমে ওই এলাকার মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে।
অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল রাজশাহী, নাটোর ও পাবনার বিস্তীর্ণ পদ্মা চরের বাসিন্দাদের বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতনের হাত থেকে নিরাপত্তা দিতে কাজ করা। এটা শেষ নয়, শুরু। তিন জেলায় মোট গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৮ জন। এ ছাড়া ১০টি অস্ত্রসহ গুলি, হাঁসুয়া, ডেগার, ছোরা, চাকু, রামদা, চাইনিজ কুড়াল, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাজা, মোটরসাইকেল, লোহার পাইপ, টিউবওয়েল জব্দ করার তথ্য জানান তিনি।
কুষ্টিয়ায় গ্রেপ্তার আরও ৯
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরেও পদ্মার চরে পুলিশ পৃথক অভিযান চালায়। বিকেল চারটার দিকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস্) ফয়সাল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ৩১৫ জন পুলিশ সদস্য ১০ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। চরের গভীর থেকে দুটি অস্থায়ী তাঁবু, একটি স্পিডবোট, দুটি নৌকা, তিনটি মোটরসাইকেল, তিনটি মুঠোফোন ও অস্ত্র রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি দুটি চেম্বার উদ্ধার করা হয়।
এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার মো.
এদিকে কুষ্টিয়ার অভিযান সম্পর্কে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, গতকাল শনিবার রাতে একই সময়ে কুষ্টিয়া জেলায় এ রকম একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। যেহেতু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্য দৌলতপুর, কুষ্টিয়া জেলার একটি থানা; তাই সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে।
আরও পড়ুনকথার আগে গুলি চালায় ‘কাকন বাহিনী’, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল৩১ অক্টোবর ২০২৫উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
এভারকেয়ারের সামনে কড়া নিরাপত্তা, বিএনপি নেতা–কর্মীদের ভিড় নেই
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় হাসপাতালের সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে প্রথম কয়েক দিনের মতো হাসপাতালের সামনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীদের তেমন ভিড় নেই।
আজ বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে অবস্থান করে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাসপাতালের সামনের সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। আশপাশে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও এসএসএফের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছিলেন।
শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিলে গত ২৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে দ্রুত এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দেশজুড়ে বিএনপি নেতা–কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে প্রতিদিন তাঁর খোঁজ নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করতেন নেতা–কর্মীরা। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সামনে ভিড় না করতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ বিএনপির একাধিক নেতা–কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে নেতা–কর্মীদের হাসপাতালের সামনে ভিড় না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নেতা–কর্মীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় দোয়া ও অন্যান্য কর্মসূচি পালন করছেন।
খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার পর বেশ কয়েকবার তাঁর খোঁজ নিতে এসেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশন ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে নিজ অবস্থানে থেকে ম্যাডামের সুস্থতা কামনায় দোয়া করি।’
মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম আরও বলেন, ‘সব নেতা–কর্মী হাসপাতালের সামনে ভিড় করলে জটলা তৈরি হয়। অনেক সময় গণমাধ্যমে ভুল তথ্যও যায়। তাই নির্দেশনা অনুযায়ী নিজ অবস্থান থেকে দোয়া করছি।’
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সার্বিক তত্ত্বাবধানে যুক্ত আছেন তাঁর পুত্রবধূ ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রায় প্রতিদিনই তিনি হাসপাতালে আসা–যাওয়া করছেন।
খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রার জন্য উপযুক্ত নয়, বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা বেশ জটিল পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুসের সমস্যাও অপরিবর্তিত। তাঁকে ঢাকায় রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিদিনই ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে তাঁকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে বিএনপি বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নতুন কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। কাতারের আমিরের পক্ষ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর প্রক্রিয়াটিও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। মেডিকেল বোর্ডের অধীন দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থাকে ‘গুরুতর’ হিসেবেই দেখছেন এবং কিডনির কার্যক্ষমতা স্থিতিশীল হওয়াকে সার্বিক উন্নতির জন্য জরুরি বলে মনে করছেন।