জুলাই অভ্যুত্থানের ভিডিওকে এখন আওয়ামী লীগের কর্মসূচি বলে প্রচার
Published: 11th, November 2025 GMT
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা ১৩ নভেম্বর ঢাকায় ‘লকডাউন’ কর্মসূচির আগে নানা ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে বিভ্রান্তিকর নানা দাবিও করা হচ্ছে। পুরোনো কর্মসূচির ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার ভিন্ন প্রসঙ্গের ঘটনাকেও আওয়ামী লীগের কর্মসূচি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১০ নভেম্বর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, রাস্তায় উত্তেজিত মানুষের সমাবেশ এবং সড়কের পাশে পড়ে থাকা একাধিক মোটরসাইকেল, যার কয়েকটিতে আগুন জ্বলছে।
লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে
ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘বরিশালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচি শুরু।’ অপর এক ফেসবুক আইডিতে একই ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘বরিশালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত লকডাউন কর্মসূচীর বিক্ষোভ শুরু’
লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে
ভিডিওটিতে একটি দোকানের ব্যানার দেখা যায়, যাতে লেখা রয়েছে ‘Classic & Rock, Barishal’। এই নামটি গুগলে সার্চ করলে হাসপাতাল রোড, বরিশাল ৮২০০ ঠিকানায় একটি দোকানের অবস্থান পাওয়া যায়। দোকানটি বাদ্যযন্ত্র বিক্রি ও মেরামত করে।
লিংক: এখানে
ঠিকানা ধরে ক্লাসিক অ্যান্ড রক-এর মালিক ফয়সাল আলম চৌধুরী মিন্টুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিডিওটি সাম্প্রতিক নয়। এটি গত বছরের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের সময়, ৪ আগস্ট দুপুরের পর ধারণ করা।’
ফয়সাল আলম চৌধুরী আরও বলেন, ‘তখন আমার দোকান ক্লাসিক এন্ড রক ছিল করিম কুটি মসজিদের উল্টো পাশে, এম এ জলিল সড়কে (নবগ্রাম)। ভিডিওটিতে যে বাইকগুলো পুড়তে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আমার দোকানের সামনে ছিল।’
প্রথম আলোর বরিশাল প্রতিনিধি জানান, ঘটনার ওই স্থান বরিশাল নগরের এম এ জলিল সড়কের (নবগ্রাম সড়ক) করিম কুটির এলাকায়। ঘটনাটি বরিশালের সাবেক সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের বাড়ি বেগম ভিলার ফটকের সামনে।
জুলাই আন্দোলনের সময় গত বছরের ৪ আগস্ট বরিশালে ছাত্র–জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার এক পর্যায়ে জাহিদ ফারুক শামীমের বাসভবন বেগম ভিলার সামনে থাকা একাধিক মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধরা। পরে উত্তেজিত জনতা সেই বাইকগুলোতে আগুন দেয়।
বরিশালের স্থানীয় মুদিদোকানি হারুন অর রশিদও ভিডিওটি দেখে একই কথা বলেন,‘এটা এই বছরের ঘটনা না, গত বছরের আগস্টের শুরুতে ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময়কার ঘটনা।’
২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্টের সংঘর্ষ নিয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল যমুনা টিভি ও মাছরাঙা টিভি যথাক্রমে ‘বরিশালে ব্যাপক সংঘর্ষ; পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বাসভবনে আগুন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রচার করে।
লিংক: এখানে, এখানে
এ ছাড়া প্রথম আলো, সমকাল, বাংলানিউজ২৪সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমও তখন সংবাদ প্রকাশ করেছিল, ‘বরিশালে প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি ভাঙচুর, ২০টি মোটরসাইকেলে আগুন।’
লিংক: এখানে, এখানে, এখানে
প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ৪ আগস্ট বরিশালের বটতলা নবগ্রাম রোড এলাকায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। সেখানে থাকা ২০–২৫টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এ সময় নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। পরে পুলিশ এসে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সুতরাং ভিডিওটি বরিশালে আওয়ামী লীগের নতুন কোনো কর্মসূচির নয়, বরং গত বছরের ৪ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানকালীন সংঘর্ষের দৃশ্য।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: গত বছর র ৪ আগস ট স ঘর ষ বর শ ল আওয় ম
এছাড়াও পড়ুন:
‘দুটি হাত ছাড়াই মানুষের কৌতূহলের জবাব দিতে পেরেছি’
দৃঢ় মনোবল আর প্রচেষ্টা থাকলে কোনো বাধা পেরোনোই কঠিন নয়। দরকার ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রম। আমাদের আশপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজেদের জীবনগাথায় লিখে চলেছেন অদম্য জয়ের গল্প। তাঁদের সেই সাফল্য ব্যক্তিগত অর্জনের সীমানা পেরিয়ে সমাজের নানাবিধ প্রতিবন্ধকতাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। তেমনই কয়েকজনের গল্প নিয়ে ধারাবাহিক এ আয়োজন। আজ জানব বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ৪ নম্বর সদর রোড বটতলা এলাকার বাসিন্দা ফাল্গুনী সাহার জীবনগল্প।
আমি ফাল্গুনী সাহা, আমার জন্ম বরিশালে; বেড়ে ওঠা পটুয়াখালীর গলাচিপায়। ২০০২ সাল, আমার বয়স তখন ছয়। একদিন বিকেলে পাশের বাড়ির ছাদে খেলছিলাম, হাতে ছিল লোহার রড। খেলতে খেলতে অসতর্কতায় হাতের রডটি বিদ্যুতের তারের সঙ্গে লাগে। বিদ্যুতের প্রবাহ শরীরকে প্রবলভাবে ঝাঁকি দেয়, আমি বেহুঁশ হয়ে যাই। একজন পড়শী প্রথম দেখতে পান, আমার হাত দুটি পুড়ে গেছে। আর আগুনের হলকায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোসকা পড়ে যায়।
আমাকে দ্রুত পটুয়াখালীর গলাচিপা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঝলসানো হাত আর শরীর দেখে বরিশালের আরেকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পাঠানো হয়। ১০ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢাকায় না গিয়ে পরিবার আমাকে ভারতে নিয়ে যায়।
কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা আমাকে দেখে বলেন, ‘হাত দুটি রক্ষা করা যাবে না। দ্রুত কেটে ফেলতে হবে। আর কোনো বিকল্প নেই। না হলে হাতে শুরু হওয়া পচন শরীরে ছড়িয়ে পড়বে।’
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমার দুটি হাতই কবজি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। আমার মা-বাবা আর আত্মীয়স্বজনদের সেকি আহাজারি! সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাই বলাবলি করছিল। একটি মেয়ে দুই হাত ছাড়া কীভাবে বড় হবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে, লেখাপড়াটা করবে কী করে ইত্যাদি। আমি এসবের কিছুই বুঝতাম না। তখন বোঝার মতো বয়সও ছিল না আমার।
এ দুর্ঘটনা আমাকে জীবনের কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম, আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে। আমি ঘরে বসে আছি। বন্ধুরা লেখাপড়া করছে। আমি পারছি না। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেল।
একসময় আমি আমার কবজিবিহীন দুই হাত নিয়েই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা শুরু করি। প্রথমে কোনো কিছু ধরার চেষ্টা করি। ব্যর্থ হই। কিন্তু হাল ছাড়ি না। কিছুদিন চেষ্টার পর চামচ ধরতে পারলাম। এরপর কলম ধরার চেষ্টা করি, পারলাম। তারপর লিখতে চেষ্টা করলাম। অবশেষে একদিন আমার নাম, বাসার ঠিকানা লিখলাম। ধীরে ধীরে যখন কলম দিয়ে লিখতে সক্ষম হলাম, মা-বাবার সেকি আনন্দ! আমিও ভীষণ খুশি ও আত্মবিশ্বাসী হলাম।
আমার এ অবস্থা দেখে মা–বাবার মনে একটু আশা জাগল যে আমাকে এখন স্কুলে ভর্তি করানো যায়। স্কুলের শিক্ষকেরা আমার লেখা দেখে খুবই আশাবাদী হলেন। আমাকে আর অভিভাবকদের নিশ্চিত করে বললেন, আপনাদের আর চিন্তা করতে হবে না। আমরা ফাল্গুনীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলাম। সব সময় ওর পাশে আছি।
স্কুলের সবাই আমাকে এতটাই সাদরে গ্রহণ করল যে মনে হলো, দ্বিতীয় জীবন ফিরে পেলাম। আমি লেখাপড়া শুরু করি। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি লাভ করি। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাই। এরপর আমাকে কোথাও থেমে থাকতে হয়নি। আমার পরীক্ষায় সাফল্যের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে আমাকে নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। একদিন আমার বাবার কাছে ফোন আসে ঢাকার উত্তরা ট্রাস্ট কলেজ থেকে। আমাকে সেই কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বরিশাল থেকে ঢাকা বহুদূর। তা ছাড়া প্রাইভেট কলেজে লেখাপড়া অনেক ব্যয়বহুল। এত দূরে আমার চলাফেরায় নানা অসুবিধা হবে—এসব বিবেচনায় বাবা রাজি হলেন না। সব শুনে কলেজের প্রিন্সিপাল বললেন, আমরা সম্পূর্ণ বৃত্তি দিয়ে ফাল্গুনীকে পড়াব। তাকে সহায়তা করার জন্য সার্বক্ষণিক আয়া রেখে দেওয়া হবে। বাবা সম্মতি দেন।
আমি উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হই। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পাই। এবারও আমার সাফল্যের কথা সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। আমিও প্রবল উৎসাহে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পার হতে চেষ্টা করি। দেশের অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান আমার পাশে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ‘প্রথম আলো ট্রাস্ট’ আর ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ থেকে আমি শিক্ষাবৃত্তি লাভ করি।
উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে আমি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ বিভাগে পড়ার সুযোগ পাই। ঠিক এই সময়ে আমার জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসে। আমার বাবা পৃথিবী থেকে চলে যান। মাথার ওপর থেকে যেন ছায়া সরে গেল। আবার অনিশ্চয়তা, আবার নতুন করে জীবন এগিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু হয়।
মা ঘরে মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি করে সংসার চালান। আমি বৃত্তির টাকা দিয়ে চলি। যদি কিছু সঞ্চয় হয়, সেটা সংসারে দিই। ঘরে তো আমার আরও দুই বোন আছে। তাদের লেখাপড়া চালাতে হবে। শত বাধা সত্ত্বেও কখনো দমে যাইনি। এভাবে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করি।
স্বজন ও চারপাশের মানুষদের সহযোগিতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতাই ফাল্গুনী সাহার বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা