প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ফুসফুস ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব
Published: 10th, November 2025 GMT
ফুসফুস ক্যানসার—শুনলেই ভয় লাগে। অথচ অনেক সময় এটি নীরবে শরীরের ভেতর বেড়ে ওঠে কোনো বড় উপসর্গ ছাড়াই। যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ফুসফুস ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
এসকেএফ অনকোলোজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় কথাগুলো বলেন ডা.
নভেম্বর মাস ‘ফুসফুস ক্যানসার সচেতনতার মাস’। ফুসফুস ক্যানসারবিষয়ক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনার এ পর্বে অতিথি ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. তুষার দাস। উপস্থাপনায় ছিলেন নাসিহা তাহসিন।
এ পর্বে আলোচনার বিষয় ছিল ‘ফুসফুস ক্যানসার বার্তা’। বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসার রোগের কারণ, ঝুঁকি, লক্ষণ, চিকিৎসা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন ডা. তুষার দাস। পর্বটি শনিবার (৮ নভেম্বর) সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো, এসকেএফ অনকোলোজি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।
ফুসফুস ক্যানসারের ধরন
ফুসফুস ক্যানসার মূলত দুই ধরনের বলে উল্লেখ করেন ডা. তুষার। এই দুই ধরন হলো—প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। তিনি বলেন, প্রাইমারি ক্যানসার ফুসফুসের নিজস্ব কোষ থেকে উৎপন্ন হয় আর সেকেন্ডারি ক্যানসার শরীরের অন্য অংশ থেকে ছড়িয়ে ফুসফুসে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি আবার দুভাগে ভাগ করা হয়—নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার এবং স্মল সেল লাং ক্যানসার। প্রথম ধরনের রোগী বেশি দেখা যায়।
ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ কী
ধূমপান না করলেও কি ফুসফুস ক্যানসার হতে পারে? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. তুষার দাস বলেন, অনেকের ধারণা, কেবল ধূমপায়ী হলেই ফুসফুস ক্যানসার হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ধূমপান অবশ্যই প্রধান কারণ, তবে বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান এবং জিনগত বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখে। পরোক্ষ ধূমপান মানে হচ্ছে অন্যের ধোঁয়া নিজের অজান্তে শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা।
রান্নাঘরের কয়লা বা লাকড়ির ধোঁয়া থেকে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বিষয়ে উপস্থাপক জানতে চাইলে ডা. তুষার দাস বলেন, রান্নাঘরের কয়লা বা লাকড়ির ধোঁয়া ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে যে নারীরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে এই ধোঁয়ার মধ্যে রান্না করেন, তাঁদের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই ধোঁয়ার মধ্যে এমন সব রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা ধীরে ধীরে ফুসফুসের কোষে ক্ষতি করে। শুধু ক্যানসার নয়, এই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা ফুসফুসের সংক্রমণও হতে পারে।
তুষার দাস বলেন, ফুসফুস ক্যানসারের পেছনে কিছু জিন মিউটেশন ভূমিকা রাখে। তাই যেসব পরিবারের কারও এ রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে বয়স ৩০ পেরোলেই নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত। বাংলাদেশে বেশির ভাগ রোগী দেরিতে অর্থাৎ স্টেজ-৩ বা স্টেজ-৪ পর্যায়ে হাসপাতালে আসেন। এর মূল কারণ হলো অসচেতনতা, ভুল চিকিৎসা কিংবা উপসর্গকে সাধারণ ঠান্ডা-কাশি ভেবে অবহেলা করা।
কাশির সঙ্গে রক্ত এলে দ্রুত ডাক্তার দেখান
ডা. তুষার দাস বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার পরামর্শ হলো, যদি তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি থাকে, বিশেষ করে কাশির সঙ্গে রক্ত আসে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।’
সাধারণ কাশি আর ফুসফুস ক্যানসারের কাশির মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে ডা. তুষার দাস বলেন, পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম, সচেতন থাকলেই তা বোঝা সম্ভব। সাধারণ সর্দি-কাশি ভাইরাস ও অ্যালার্জিজনিত কারণে হয়ে থাকে এবং সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়।
ডা. তুষার বলেন, যদি কাশি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার পরও না কমে, কিংবা কাশির সঙ্গে রক্ত ওঠে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তাহলে তা আর হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এ সময় একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা যেমন এক্স-রে বা লো-ডোজ সিটি স্ক্যান করানো উচিত। কারণ, ফুসফুস ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসার রোগের কারণ, ঝুঁকি, লক্ষণ, চিকিৎসা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন ডা. তুষার দাসউৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ত ষ র দ স বল ন
এছাড়াও পড়ুন:
প্রায়ই গলা ব্যথায় ভুগছেন? কারণ ও প্রতিরোধের উপায় জেনে নিন
শীতের শুরুতে তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যায়। কেউ কেউতো এই ঋতুতে প্রায়ই গলা ব্যথায় ভুগতে থাকেন। কারণ এই সময় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজে ছড়িয়ে পড়ে। গলার স্নায়ু ও টিস্যুতে জ্বালা, খসখসে ভাব এবং ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। গলা ব্যথা ছোট একটি সমস্যা মনে হলেও, এটি কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া, এমনকি ঘুমের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শীতকালে এই ধরনের অস্বস্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। বিভিন্ন কারণে গলা ব্যথা হয়।
ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
সাধারণ সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) এবং কোভিড-১৯ সবচেয়ে বেশি গলা ব্যথার কারণ হয়ে থাকে। এসব ভাইরাস গলার ভেতরের টিস্যুকে আক্রান্ত করে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা খসখসে ভাব তৈরি করে।
আরো পড়ুন:
পেটে ভর দিয়ে ঘুমানোর প্রভাব
শীতকালে কত সময় ধরে গোসল করা ভালো
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ
স্ট্রেপ থ্রোট নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ তীব্র গলা ব্যথার জন্য দায়ী। এতে গলায় প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর এবং লালচে ভাব দেখা যায়।
অ্যালার্জি
ধুলোবালি, পোলেন, পশুর লোম ইত্যাদির প্রতি অ্যালার্জি থাকলে নাক ও গলা দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরা বাড়ে, যা গলা ব্যথার কারণ হতে পারে।
শুষ্ক বাতাস
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায় এবং ঘরের ভেতরে হিটার ব্যবহারের কারণে পরিবেশ আরও শুষ্ক হয়। এতে গলার টিস্যু শুকিয়ে গিয়ে জ্বালা ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়।
ধূমপান
ধোঁয়ার রাসায়নিক উপাদান গলার ভেতরের অংশকে উত্তেজিত করে। এতে গলা শুকিয়ে যায় এবং ব্যথা বাড়ে।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স
পেটের এসিড গলার দিকে উঠে আসলে সেখানকার টিস্যুতে জ্বালা ধরায় এবং ব্যথা হয়।
গলা ব্যথার সাধারণ উপসর্গ
গলায় ব্যথা বা খসখসে অনুভূতি গিলতে সমস্যা বা গলায় চাপ অনুভব গলা বা চোয়ালের গ্রন্থি ফুলে যাওয়া মুখের ভেতর লালভাব বা প্রদাহ স্বর ভাঙ্গা, কর্কশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া কখনো কখনো হালকা জ্বর, কাশি বা নাক বন্ধ হওয়াগলা ব্যথা প্রতিরোধে কার্যকর উপায়
নিয়মিত হাত ধোওয়া
২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুলে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। বাইরে থেকে এসে, খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পরে হাত ধোওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রচুর পানি ও গরম পানীয় পান
শীতকালে শরীর সহজে পানিশূন্য হয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি, স্যুপ বা গরম পানীয় পান করলে গলা আর্দ্র থাকে এবং ব্যথা কম হয়।
হিউমিডিফায়ার ব্যবহার
ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ালে গলার শুষ্কতা কমে যায়। বিশেষ করে ঘুমের সময় হিউমিডিফায়ার ব্যবহার খুব উপকারী।
জ্বালামূলক উপাদান থেকে দূরে থাকা
ধোঁয়া, কড়া গন্ধের ক্লিনার, স্প্রে, ধুলোবালি এগুলো গলা উত্তেজিত করে। এগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো
ভিটামিন সি ও ডি সমৃদ্ধ খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
গলা ব্যথা উপশমে ঘরোয়া কার্যকর উপায়
লবণ-পানির গার্গল: গরম পানিতে অল্প লবণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করলে গলার ফোলা কমে এবং ব্যথা হ্রাস পায়।
মধু: এক চামচ মধু গলার ভেতরকে নরম করে এবং আরাম দেয়। তবে এক বছরের নিচের শিশুদের কখনো মধু দেওয়া যাবে না।
হার্বাল চা: ক্যামোমাইল, আদা বা লাইকোরিস রুট চা গলার প্রদাহ কমায় এবং শরীরকে আর্দ্র রাখে।
লজেন্স বা হার্ড ক্যান্ডি: এগুলো লালা নিঃসরণ বাড়ায়, যা গলা আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে।
সাধারণত গলা ব্যথা কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে নিচের অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি—
• গলা ব্যথা ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হলে
• উচ্চতাপমাত্রার জ্বর, শ্বাস নিতে সমস্যা বা তীব্র ব্যথা থাকলে
• গিলতে খুব বেশি কষ্ট হলে
• গলায় সাদা দাগ বা পুঁজ দেখা দিলে
সূত্র: ফ্যামিলি কেয়ার সেন্টার
ঢাকা/লিপি