বিরামপুর রেলস্টেশনে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ নারীর সন্তান প্রসব
Published: 11th, November 2025 GMT
দিনাজপুরের বিরামপুর রেলওয়ে স্টেশনে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ এক নারী সন্তান প্রসব করেছেন।
সোমবার (১০ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।
আরো পড়ুন:
কুষ্টিয়ায় রেলসেতুর নিচ থেকে নারীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার
সড়কের পাশে সন্তান জন্ম দিলেন নারী, হাসপাতালে নিল পুলিশ
মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) বিরামপুর রেলস্টেশন মাস্টার কাজী ফয়েজ আলাউদ্দীন বলেন, “গতকাল রাতে স্টেশনে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। বাচ্চা এবং মা দুজনেই ভালো আছেন। তারা বর্তমান হাসপাতালে ভর্তি আছেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম বেগম জানান, গত তিন-চার মাস ধরে গর্ভবতী ওই নারীকে স্টেশনের প্লাটফর্মেই ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছিল। তিনি কারো সঙ্গে বেশি কথা বলতেন না এবং কারো কাছে কিছু চাইতেনও না। কেউ স্বেচ্ছায় খাবার দিলে তবেই খেতেন। তিনি একেবারে নিঃসঙ্গ অবস্থায় স্টেশনের প্লাটফর্মে বসবাস করছিলেন।
তিনি বলেন, “সোমবার রাতে সন্তান প্রসবের সময় আমরা আশপাশের বাড়ির কয়েকজন নারী মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসি। নবজাতকের নাড়ি কেটে নিরাপদে আনার ব্যবস্থা করি। মা ও শিশুকে কাপড়, কম্বল এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রাতে মা ও নবজাতককে সুরক্ষিত রাখি। বর্তমানে মা-সন্তান সুস্থ আছেন।”
সন্তান প্রসবের খবর ছড়িয়ে পড়লে রেলস্টেশনে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ। অনেকে শিশুটিকে দেখতে আসেন এবং আর্থিক সহায়তা দেন। শিশুটিকে দেখে অনেক নারী কোলে নেন। তবে, কেউই শিশুটির বাবার পরিচয় জানাতে পারেননি।
স্থানীয়দের মতে, মা ও নবজাতকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সমাজসেবা দপ্তরের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো.
বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আওয়াল বলেন, “বিরামপুর রেলস্টেশনে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন, বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। আজকে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মা ও শিশুকে ভর্তি করেছি। বর্তমান তারা ভালো আছেন। ইউএনও মহোদয় ট্রেনিংয়ে আছেন, উনি এলে শিশুটির মঙ্গলের জন্য একটা সুব্যবস্থা করা হবে।”
বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নুজহাত তাসনীম আওন বলেন, “বিষয়টি আমি জানি, আমি ট্রেনিংয়ে আছি। সমাজসেবা কর্মকর্তাকে শিশুটির বিষয়ে বলা আছে, উনি দেখবেন। আমি এসে ব্যবস্থা নেব।”
ঢাকা/মোসলেম/মাসুদ
উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ব যবস থ জন ম দ
এছাড়াও পড়ুন:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাহীনতা: উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু ক্লাসরুম, পরীক্ষার খাতা আর সনদপত্র নয়। প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র, নতুন চিন্তার জন্মস্থান এবং সমাজের সমস্যার বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধানের কারখানা। বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই গবেষণাভিত্তিক পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। এখানে পড়াশোনা মানে শুধু পরীক্ষায় পাস করা, সিজিপিএ তোলা আর ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা। গবেষণা যেন একটি অতিরিক্ত বা গৌণ বিষয়। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি—এই গবেষণাহীনতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা।
১. বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণার সম্পর্কবিশ্ববিদ্যালয়ের মূল তিনটি কাজ—শিক্ষাদান, গবেষণা ও সমাজসেবা। এর মধ্যে গবেষণা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গবেষণার মাধ্যমেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়। গবেষণার ফল শিক্ষাদানকে সমৃদ্ধ করে এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে।
কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। সিলেবাসে গবেষণার কথা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ খুব সীমিত। অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করলেও প্রকৃত গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায় না। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
২. গবেষণাহীনতার বর্তমান চিত্রবর্তমানে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বলতে বোঝায়—থিসিসের জন্য কিছু তথ্য সংগ্রহ, ইন্টারনেট থেকে লেখালেখি কপি-পেস্ট করা এবং ডিগ্রি শেষ করা। মৌলিক গবেষণা, উদ্ভাবন বা নতুন ধারণা তৈরির পরিবেশ খুবই সীমিত।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণও হলো গবেষণায় দুর্বলতা। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা দেখছি—লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় জার্নাল নেই, গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, আর গবেষণা নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টির কোনো সংস্কৃতি নেই।
৩. গবেষণাহীনতার প্রধান কারণসমূহ• পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব
গবেষণা একটি ব্যয়বহুল কার্যক্রম। উন্নত লাইব্রেরি, ল্যাব, জার্নাল সাবস্ক্রিপশন, সফটওয়্যার, ফিল্ডওয়ার্ক—সবকিছুর জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ খুবই সীমিত।
অনেক সময় বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় প্রশাসনিক কাজে, ভবন নির্মাণে বা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে। গবেষণা তখন উপেক্ষিত থেকেই যায়।
• শিক্ষক ও গবেষণার চাপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একদিকে নিয়মিত ক্লাস নেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এত চাপের মধ্যে গবেষণায় সময় দেওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে থাকে না।
অনেক শিক্ষক গবেষণা করতে চাইলেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণার অভাবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে গবেষণা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না।
• গবেষণাবান্ধব পরিবেশের অভাব
গবেষণার জন্য যে মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ দরকার, তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুপস্থিত। নিয়মিত সেমিনার, গবেষণা আলোচনা, ওয়ার্কশপ, একাডেমিক বিতর্ক—এসব খুব কম হয়।
ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয় না। গবেষণাকে অনেকেই বাড়তি ঝামেলা বা সময় নষ্ট মনে করে।
৪. শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার প্রভাবআমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ছোটবেলা থেকেই মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এর প্রভাব রয়ে গেছে। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তথ্য মুখস্থ করাই মুখ্য লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
গবেষণার জন্য প্রয়োজন বিশ্লেষণী চিন্তা, প্রশ্ন করার মানসিকতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা—যা মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় গড়ে ওঠে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও অনেক শিক্ষার্থী গবেষণাভিত্তিক চিন্তায় অভ্যস্ত হতে পারে না।
৫. গবেষণাহীনতার কারণে শিক্ষার মানের অবনতিগবেষণাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মানেই স্থবির জ্ঞান। যখন শিক্ষকেরা গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান অর্জন করেন না, তখন তাঁদের পাঠদানও পুরোনো ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
ফলাফল হিসেবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগহীন তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে। চাকরির বাজারে এই জ্ঞান অনেক সময় কাজে আসে না। এতে শিক্ষার্থী ও সমাজ—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৬. জাতীয় উন্নয়নে গবেষণার ভূমিকা ও আমাদের ব্যর্থতাএকটি দেশের কৃষি উন্নয়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিল্প, প্রযুক্তি—সবখানেই বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গবেষণাহীনতার কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় উন্নয়নে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারছে না।
কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি, পরিবেশসংকটের সমাধান, নগর সমস্যা, দারিদ্র্য দূরীকরণ—এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা হতে পারত দেশের জন্য বড় সম্পদ। কিন্তু গবেষণার অভাবে আমরা বিদেশি জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।
৭. শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অংশগ্রহণের সুযোগের অভাবগবেষণাহীনতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষার্থী গবেষণায় আগ্রহী হলেও সুযোগের অভাবে এগোতে পারে না।
সুপারভাইজারের পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া, গবেষণার অর্থসংকট, উপযুক্ত নির্দেশনার অভাব—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা গবেষণা থেকে দূরে সরে যায়। এতে ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
৮. আন্তর্জাতিক মান ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াবর্তমান বিশ্ব জ্ঞান ও গবেষণাভিত্তিক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকতে হলে গবেষণায় এগিয়ে থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাহীনতা আমাদের বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যৌথ গবেষণা, স্কলারশিপ—এসব সুযোগ কমে যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা অনুভব করি, বিশ্বমানের গবেষণায় অংশগ্রহণের স্বপ্ন অনেকটাই অধরা থেকে যাচ্ছে।
৯. গবেষণাহীনতার মানসিক ও সামাজিক প্রভাবগবেষণাহীন পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন হয়ে ওঠে কেবল রুটিনমাফিক ক্লাস ও পরীক্ষার চক্র। সৃজনশীলতা ও চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে যায়।
সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যখন নতুন ভাবনা দিতে পারে না, তখন সামাজিক উন্নয়নও স্থবির হয়ে পড়ে।
লুৎফুন্নাহার দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়